নাম বদলের রাজনীতির কাছে বাংলাদেশ কি জিম্মি থাকবে?

ক্ষমতাসীনদের পারিবারিক বা দলীয় সূত্রে প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নামকরণকে ‘সামন্তীয় সংস্কৃতি’ বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, “নামকরণ একটি সামন্তীয় মানসিকতা, একটা সামন্তীয় সংস্কৃতি আরকি। এখন তো অনেক কিছু থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটেছে অর্থনীতির জগতে। কিন্তু সংস্কৃতির জগতে আমরা এখনো সামন্তীয় মানসিকতায় রয়ে গেছি। এজন্যে নামকরণের ব্যাধি থেকে, এটি একটি মানসিক ব্যাধিও বটে, এর থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটছে না আরকি।”

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

ঢাকার শের-এ-বাংলা নগর এলাকায় ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’। ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’, নাকি ‘জিয়া উদ্যান’? এর উত্তর নির্ভর করে কারা ক্ষমতায় আছে, তার ওপর। ১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ ‘চন্দ্রিমা উদ্যানে’ দাফনের পর এর নাম হয় ‘জিয়া উদ্যান’।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আগের নাম ফিরিয়ে আনে, আবার নাম হয় ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’। ২০০১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে বিএনপি আবারও নাম পরিবর্তন করে ‘জিয়া উদ্যান’ রাখে। 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে চন্দ্রিমা উদ্যান হয়, এবং আওয়ামী লীগের পতনের পর ২০২৫ সালের ১৯এ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তে এই উদ্যানের নাম পুনরায় হয় জিয়া উদ্যান, যা এখন পর্যন্ত বহাল আছে।

এমন আরেকটি উদাহরণ ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী’ সম্মেলন কেন্দ্র। নির্মাণ শুরু হয় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শাসনামলের শেষ দিকে, আনুষ্ঠানিকভাবে নাম হওয়ার কথা ছিলো ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র’, তবে ২০০২ সালে বিএনপি সরকার নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র’ রাখে। জিয়া উদ্যানের মতো একইভাবে এরপর বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নাম বারবার অদল-বদল হয়ে এখন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র নামটি বহাল রয়েছে।

এই নামকরণ ও নাম বদলের গল্প শুধু দুই জায়গায় সীমাবদ্ধ না। ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠিত বয়ানের সাথে বিভিন্ন সড়ক, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে যাওয়া বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কোনো ব্যাপার না, তা হয়ে আসছে বহু দশক ধরে, জিয়া উদ্যানের ঘটনারও অনেক আগে থেকে।

বাংলাদেশে নাম বদলের রাজনীতি নতুন নয়

পুরান ঢাকাতেই আছে দু’টি বিখ্যাত উদাহরণ। হাটখোলা এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে একটি বালিকা বিদ্যালয়, যার প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগ। তিনি প্রতিষ্ঠানটির নাম রেখেছিলেন নারী শিক্ষা মন্দির। ১৯৭০ সালে তিনি মারা যাওয়ার পরের বছরই প্রতিষ্ঠানটির নাম বদলে রাখা হয় শের-এ-বাংলা বালিকা বিদ্যালয়।

তার কিছুটা দূরে টিপু সুলতান রোড, যার নাম আগে ছিলো মদন মোহন বসাক লেন।

বাংলাদেশে নাম বদলের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হয়তো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। গুগল ম্যাপে ঢাকা শহরের মানচিত্র দেখতে গেলে সবচেয়ে বড় যে স্থাপনাটি চোখে পড়ে তা এই বিমানবন্দর। ১৬ কিলোমিটার দূরে সেই শাহবাগ মোড় পার করতে গেলেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিক চেনানো সাইনবোর্ড দেখা যায়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ গাড়ি, মোটরসাইকেল, সিএনজি কিংবা বাসে করে একবার হলেও এই নামটি দেখেন। 

তবে ১৬ বছর আগেও বিমানবন্দরের এই নাম ছিলো না, তা অনেকেরই জানা। ব্রিটিশ আমলে তৈরি স্পেয়ার ল্যান্ডিং স্ট্রিপকে স্বাধীনতার পর ১৯৮০ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এটিকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে পুনরোদ্বোধন করেন।

২০১০ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমল চলাকালে বিমানবন্দরটির নাম বদলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নাম রাখা হয়, যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।

দুই রাষ্ট্রপতির টানাপোড়েন

‘৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নামকরণ ও নাম বদলের ইতিহাসে মুখ্য ছিলো দুই সাবেক রাষ্ট্রপতির নামে বিভিন্ন নামকরণ, এবং পরের সরকারের সময় শুরু হয় নাম বদলে ফেলার হিড়িক। 

বর্তমানে বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের নাম প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র রাখা হলেও, ২০০২ সালে নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র রাখা হয়। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে আবারও ফিরে আসে বঙ্গবন্ধুর নাম, এবং ২০২৫ সালে আবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে নামটি ফিরে পায়। 

একইভাবে, যমুনা বহুমুখী সেতুও বঙ্গবন্ধু সেতু হিসেবে শুরু হয় এবং তিনবার নাম বদলের পর এখন তা আবার যমুনা বহুমুখী সেতু হিসেবে পরিচিত। এছাড়া বিএনপি আমলে বিভিন্ন স্টেডিয়াম, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে নামকরণ করার নজির আছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ৯৭৭টি প্রতিষ্ঠান শেখ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নামে নামকরণ করা হয়। ভাসানী নভোথিয়েটার হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, খুলনার বিভাগীয় স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয় শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের নামকরণ করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক্সপ্রেসওয়ে। 

বিএনপি আমলে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের যেই জাহাজগুলোর নাম দলীয় নেতাদের নামে রাখা হয়েছিলো, সেগুলো বদলে এমভি জ্যোতি, এমভি শেখ রাসেলের মতো নাম রাখা হয়। শেখ রাসেল শিশু পার্ক, শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন জায়গায় শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পরিচিত উদাহরণ।

একইসাথে এই আমলে বিগত সরকারের আমলে চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনাস্থলে প্রতিষ্ঠিত জিয়া স্মৃতি জাদুঘর ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়াউর রহমান হল ও খালেদা জিয়া হলের নাম বদলানোর জন্য ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের থেকে বিভিন্ন সময়ে চাপ আসতে থাকে।

অন্তর্বর্তী সরকার ও ‘বেসরকারি নাম বদল’

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেখা যায় বিপরীত ধারা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শেখ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নাম সরাতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে বিভিন্ন পক্ষ।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাখা অনেকগুলো নাম বদলানো হয়। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকার ৮০৮টি স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেছে, এবং আরও ১৬৯ করার পরিকল্পনা করছে বলে ঘোষণা করে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা।

এই সময়ে বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনা চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন জনপ্রিয় নামের ভিত্তিতে নামকরণ করা হয়। শাহবাগে শেখ ফজুলাতুননেছা মুজিব কনভেনশন সেন্টারের নাম বদলে রাখা হয় শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টার, গেন্ডারিয়ায় বিখ্যাত দ্বীননাথ সেন সড়কের নাম বদলে রাখা হয় শহীদ আনাস সড়ক, পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে।   

তবে সরকারিভাবে বদলানো নামগুলো ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে বেশকিছু নাম পরিবর্তন দেখা যায়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে বদলানো না হলেও, অনেক ক্ষেত্রে বেআইনিভাবে বা জোর করে রাখা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম নিয়ে একাধিক ঘটনা দেখা যায়। শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সরিয়ে সেখানে এক সময় টানানো হয়েছিলো ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল’ লেখা ব্যানার, আবার এক সময় লাগানো হয় ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা ব্যানার।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের নাম বদলে বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হল রাখার দাবিও উঠেছিলো সম্প্রতি। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনাসহ শেখ পরিবারের চারজনের নামে রাখা হলের নাম পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্ক হয়।

এক্ষেত্রে আগের সময়ের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বাইরেও একটি ধর্মীয় দিক দেখা যায়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের ঠিক তিন দিন পর ৮ই অগাস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক্সপ্রেসওয়ে বা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সম্বলিত ফলকটি ভেঙে ফেলে একদল ব্যক্তি। সেখানে “জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এক্সপ্রেসওয়ে” লেখা একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও পর্যায়ক্রমে নির্বাচিত সরকার আসার পরও এটি সরানো বা বদলানো হয়নি।

সবক্ষেত্রে বদলে যাওয়া নামের সাথে অভ্যুত্থানে পতীত সরকারের কোনো সম্পর্কও ছিলো না। কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের জন্মের শহর পাবনায় সেখানকার সরকারি কলেজের সুচিত্রা সেন হলের নাম বদলে রাখা হয় জুলাই ৩৬ ছাত্রীনিবাস। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ও প্রশাসনিক ভবন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় জীববিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, কবি জীবনানন্দ দাশ, শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আলীম চৌধুরীর মতো নাম। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ ও সুলতানা কামালের মতো নামও সরিয়ে দেওয়া হয়।

শুধু বাংলাদেশে না

সরকার বদলের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, সড়ক ও সেতুর নাম বদল বাংলাদেশে যেমন নতুন না, তেমনই বাংলাদেশের একক বৈশিষ্ট্যও না। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে কোনো স্থাপনা, অঞ্চল এবং অনেক সময় দেশের নামই বদলে ফেলা হয়। এর পেছনে অনেক সময় থাকে রাজনীতি, অনেক সময় ধর্ম, অনেক সময় থাকে ঔপনিবেশিক লিগ্যাসি-বিরোধী জাতীয়তাবাদ।

ভারতীয় উপমহাদেশের উদাহরণগুলোই ধরা যাক। পাকিস্তানের বিভিন্ন সড়ক, এলাকা ও স্থাপনার নাম ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর হিন্দু বা শিখ সম্পৃক্ত এবং ইংরেজি নাম বদলে ফেলা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের লাহোরে আগের নামগুলো ফিরিয়ে আনার একটি উদ্যোগ দেখা যায়। কৃষন নগর, জৈন মন্দির রোড, সন্তনগর, ধরমপুরা, কুমহারপুরা, টেম্পল স্ট্রিট - এসব নাম ফিরে আসতে দেখা যায়।

ভারতে বিজেপি সরকার ২০১৮ সালে মোগলসরাই রেলস্টেশনের নাম বদলে দক্ষিণপন্থি নেতার নামে দীনদয়াল উপাধ্যায় জাংশন রাখে। এছাড়া আহমেদাবাদের নাম বদলে কর্ণাবতী করার চেষ্টাও করেছে বিজেপি সরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে না বদলালেও বিজেপি সরকার বিভিন্ন দলিলপত্রে এই নামই লিখতে শুরু করে।

ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরেও আছে উদাহরণ। বেলজিয়ামের থেকে স্বাধীন হওয়ার পর ঔপনিবেশিক রাজা লিওপোল্ডের নামে রাখা রাজধানী লিওপোল্ডভিলের নাম বদলে রাখা হয় কিনশাসা। তুর্কিয়ের রাজধানীর নাম থেকে গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যের স্মৃতি মুছে ফেলে টার্কিশ জাতীয়তাবাদি চেতনায় নাম রাখা হয় ইস্তানবুল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়ার শহর লেনিনগ্রাদের নাম রাখা হয় সেইন্ট পিটার্সবার্গ। 

রাষ্ট্রপ্রধানের নামে নামকরণের উদাহরণও আছে, ভিয়েতনামে সায়গন বদলে হো চি মিন সিটি, যুক্তরাষ্ট্রে বাঁধের নাম হুভার ড্যাম, প্রেসিডেন্ট কেনেডি নিহত হওয়ার পর কেপ ক্যানাভেরালের নাম বদলে কেপ কেনেডি কিছু বিখ্যাত উদাহরণ।

তবে বিদেশে উদাহরণগুলোতে পুরনো রাষ্ট্রপ্রধানের স্মৃতিরক্ষা কিংবা পরাধীনতার চিহ্ন মুছে ফেলার উদ্দেশ্য থাকলেও, ভারতীয় উপমহাদেশে দেখা যায় ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা ধর্মীয় অ্যাজেন্ডা।

তবে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণে হোক, নামকরণ ও নাম বদলের রাজনীতি থেকে কি নিরপেক্ষ ইতিহাস চর্চায় আসা বাংলাদেশে কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভব নয়?

উত্তরণ কি সম্ভব?

ক্ষমতাসীনদের পারিবারিক বা দলীয় সূত্রে প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নামকরণকে ‘সামন্তীয় সংস্কৃতি’ বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, “নামকরণ একটি সামন্তীয় মানসিকতা, একটা সামন্তীয় সংস্কৃতি আরকি। এখন তো অনেক কিছু থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটেছে অর্থনীতির জগতে। কিন্তু সংস্কৃতির জগতে আমরা এখনো সামন্তীয় মানসিকতায় রয়ে গেছি। এজন্যে নামকরণের ব্যাধি থেকে, এটি একটি মানসিক ব্যাধিও বটে, এর থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটছে না আরকি।”

আলতাফ পারভেজ বলেন, রাজনৈতিক সূত্রে নামকরণ ও নাম বদলের রীতির যেই পরিবর্তন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আশা করা হয়েছিলো, তা আসেনি।

“মনে করা হচ্ছিলো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর এসব কালচার বন্ধ হবে, কিন্তু হয়নি। আসলে সাংস্কৃতিক কোনো অভ্যুত্থান তো হয় নাই। আমাদের এখানে অভ্যুত্থান মানে রাজপথে গুলিতে গুলিতে মানুষ শহীদ হয়, ক্ষমতার বদল ঘটে, কিন্তু আমাদের মনোভবে, মনজগতে যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, যে আধুনিকায়ন, এটার কোনো পরিবর্তন হয় না।”

আলতাফ পারভেজের মতে, এই ধরনের সংস্কৃতির পেছনে অন্যকে জায়গা না দেওয়ার প্রবণতা দায়ী। তিনি বলেন, “আমাদের সমাজ এক ধরনের আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ওপর দাঁড়িয়ে টিকে আছে। সে নিজে সেরা, নিজে ভালো, এই ধরনের একটা কল্পিত জগতে সে থাকে, কল্পিত জগতে বাস করে। এবং সে অপরের জন্য কোনো স্পেস রাখে না। এটা খুব অগণতান্ত্রিক একটা সমাজ আমাদের। মানে কালেক্টিভলি এই সমাজটা খুবই অগণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে বাঁচে।” 

“ভিন্ন আদর্শের, ভিন্ন পছন্দের, ভিন্ন রুচির কোনো জায়গা নেই। এটাই হলো এখানকার রুলিং মাইন্ডসেট,” যোগ করেন তিনি।

এই ধরনের সংস্কৃতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলাপকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা বলেন, নাম স্থায়ী হওয়ার জন্য ক্ষমতা স্থায়ী হওয়া প্রয়োজন। “আমাদের যে রুচি, আমাদের যে ক্ষমতা কাঠামো তা কতটা স্থায়ী হবে, তার ওপর নামগুলোর স্থায়িত্ব নির্ভর করে,” বলেন তিনি। 

এছাড়া, ইতিহাসের কিছু মৌলিক বিষয়ের ওপর ঐকমত্য আসা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি। ড. মামুন আল মোস্তফা বলেন, “যদি আমাদের মধ্যে কিছু কিছু বিষয় কিছু পরিমাণে ঐকমত্য তৈরি হয়, তা হলে কিছুটা ঠেকবে। এবং এটা যে ঠেকবে তা চিরস্থায়ী নয়। কতটা স্থায়ী হবে তা নির্ভর করবে আমাদের ক্ষমতা কতটা দ্রুত বদল হয়, কিংবা কতটা স্থায়ী হয়, কিংবা যারা ক্ষমতাবান তাদের রুচি কিংবা যারা কিংবা যারা তাদের ক্ষমতাবান বানাই তাদের রুচির ওপর।”

তবে আপাতত শুধু বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়াতে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। এর জন্য ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ’ বা ‘রিলিজিওফ্যাসিজম’কে দায়ী করেন তিনি। “আমি মনে করি আপাতত সাউথ এশিয়া এগুলো থেকে পজিটিভ দিকে যাবে না, আরও নেতিবাচক দিকে যাবে। এখানে রক্ষণশীলতা, অপরকে জায়গা না দেওয়া, এবং একটা রিলিজিওফ্যাসিজম এটা পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আরও বাড়বে। কমার কথা বললে আমারও ভালো লাগবে, কিন্তু কমবে না,” বলেন আলতাফ পারভেজ।

এর জন্যে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থানকেও দায়ী করে তিনি বলেন, “আগে ছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাধান্য, সেখান থেকে বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ, তারপর এখন শুধু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রাধান্য। সমাজে যেইভাবে আইডেন্টিটির পরিবর্তন ঘটছে, আইডিওলজিকাল চেইঞ্জ ঘটছে, তার আকাঙ্ক্ষা, তার চাওয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটছে।”

“ধর্মভিত্তিক একটা আইডেন্টিটি এখানে ডেভেলপ করেছে দক্ষিণ এশিয়ায়, কেউ অন্যকে কোনো স্পেস দিতে চায় না। অন্য আদর্শ বা বিশ্বাসকে,” যোগ করেন আলতাফ পারভেজ।