স্থানীয় সরকার নির্বাচন: আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত কী

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার একটি বক্তব্য নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

সুবিধাজনক সময়ে চলতি বছরেই হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সে লক্ষ্যে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। সরকার থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেলেই ঘোষণা হবে তারিখ, জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন।

আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে বলে ১৪ই মে গণমাধ্যমে জানিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছিল, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং মৌসুমি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।

এর মাঝে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের একটি বক্তব্য স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গেল মঙ্গলবার (৯ই জুন) তথ্য অধিদপ্তরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের  শর্তাবলি পূরণ করতে পারলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে সমস্যা নেই। 

“একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগও হন। কারণ এটা নির্দলীয়। একজন নির্দলীয় ব্যক্তি এলেন, কিন্তু প্রচারে আওয়ামী লীগ বা তাদের যা যা বলার সেটা বলেন, সেটা সমস্যা হবে। এর বাইরে নির্দলীয় ব্যক্তি, তার যে ক্রাইটেরিয়া আছে নির্বাচন করার জন্য, সেটা যদি পূরণ করতে পারেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন।”

তার এই বক্তব্যের পরই জনপরিসরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। অনেকেই  মনে করছেন যেহেতু দলীয় পরিচয়ে এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না, তাই সেই সুযোগে আওয়ামী লীগের অনেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাবেন।

অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন  

অনেক সমালোচনার পরও গেলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলো জাতীয় পার্টি। তবে কোনো আসনেই জেতেনি দলটি।

তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নিতে চায় বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের। আলাপ-কে তিনি জানান, পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে পর্যবেক্ষণ করে তারিখ ঘোষণার পর জানাবেন।

স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় পরিচয় থাকছে না। আওয়ামী লীগের কাউকে দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি-না, এমন প্রশ্নের উত্তরে জিএম কাদের আলাপ-কে বলেন, “আমাদের ক্ষেত্রেই তো মিছিল মিটিংয়ে তারা (সরকার) বাধা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগকে তো আমাদের চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দেবে, এটা আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছি। কারণ বিএনপি এবং জামায়াত আওয়ামী লীগকে ভয় পাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারও ভয় পেয়েছিল, এই সরকারও ভয় পাচ্ছে।”

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রচার-প্রচারণা করতে পারবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব আলউদ্দীন মোহাম্মদ আলাপ-কে বলেন, “আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী আমাদের সমাজে আছে। যারা পালিয়ে যায়নি, তারা তো স্থানীয় নির্বাচনকে সুযোগ হিসেবে নেবে। কিন্তু যারা পালিয়ে গেছে, তারা যদি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফিরতে চায়, তাহলে তো সমাজের প্রতিরোধের মুখে পড়বে।“

আলাউদ্দীনের মতে, যে কারণে তাদের পালিয়ে যেতে হয়েছিল, সেই কারণকে যদি তারা সঠিকভাবে ‘অ্যাড্রেস’ না করেই ফিরতে চান তাহলে নির্বাচনটা সহিংস হয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হবে।  

এদিকে দেশব্যাপী অসংখ্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকেই আটক কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এমন পরিস্থিতি তাদের জন্য নির্বাচন অনুকূল নয় বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহবুব কামাল। তিনি মনে করেন এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

তিনি আলাপ-কে বলেন, “ইতোমধ্যেই সারাদেশে ধড়পাকড় চলছে। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ পেলেই তো মামলা দিচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে। এক মামলায় জামিন পেলে আরেক মামলায় এরেস্ট দেখানো হচ্ছে। সেখানে কীভাবে তারা নির্বাচন করবে? এটা সম্ভব না।”

রাজনীতি বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদের মতে ফৌজদারী অপরাধে শাস্তি ভোগ করছেন না এমন কাউকে আইনসঙ্গতভাবে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কোনও উপায় বা কারণ নেই।

“জনগণকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং গুম ও ক্রসফায়ারের মতো ভয়াবহ সব অপরাধের জন্য, বিক্ষোভ ঠেকাবার চেষ্টায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাযজ্ঞের নির্দেশ প্রদানের জন্য শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচার হবে। এটা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের চাওয়া। একইসাথে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তার ফ্যাসিবাদী কাঠামো নির্মাণের সহযোগীদেরও বিচার করা দরকার,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

ফিরোজ আহমেদের মতে এই রকম অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে নেই, তারা আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। “তারা কি দল করবেন, সেটাও আমরা জানি না।”

এদিকে স্থানীয় তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক আওয়ামী লীগের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে জানিয়েছেন দলের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্বাচন নিয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। একইসঙ্গে তারা মনে করেন যারাই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, তখনই তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা হতে পারে, আটকও হতে পারেন অনেকে। সেই আশঙ্কা থেকেও নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা।

যদিও একজন স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, নির্বাচন তারা অংশ নিতে চান, তবে পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। প্রচার-প্রচারণায় বাধা আসবে খোদ সরকারের তরফ থেকেই। তারপরও দলীয় সিদ্ধান্ত জানার পর বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবেন বলে তিনি জানান।    

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা যেখানে আটকে আছে

বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকাই সকল বিবেচনায় যৌক্তিক এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণও তার মাঝে একটা বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ।  

তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় নির্বাচনে যদিও দলগতভাবে না হওয়াই বাঞ্চনীয়, প্রচারকাজে কাউকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম বিস্তারের সুযোগ দেওয়া অনুচিত হবে। তবে আমি এটাও মনে করি, বিচার কার্যক্রম শেষে একটা পুনর্বাসন ও জাতীয় সমঝোতার প্রক্রিয়াও চালু করা উচিত। ন্যায়-বিচার সম্পন্ন হলে প্রতিহিংসার অবসান ঘটানো দরকার।“

সরকার পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের ‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দটি এসেছে বহুবার। এর মধ্যে এনসিপি’র পক্ষ থেকে বিচার এবং রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ এসেছে সবচাইতে বেশি।  

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার প্রসঙ্গে এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ মনে করেন সবার আগে আওয়ামী লীগের যারা অপরাধী তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে জুলাইকেও স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। 

“অতীতে গুম-খুনসহ যে নিপীড়ন আওয়ামী লীগ করেছে, সেগুলোরও সুরাহা করতে হবে। এসবের বিচার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে হবে। এসব সুরাহা না করে যদি স্পেস দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক যে অভিযাত্রা সেটা হোঁচট খাবে,” বলেন আলাউদ্দীন।

তার মতে আওয়ামী লীগ কি গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সঠিকভাবে অংশ নিতে ফিরে আসবে নাকি প্রতিশোধ নিতে আসবে- সেই প্রশ্নটিরও সুরাহা প্রয়োজন। এ সব সুরাহা সম্ভব বিচার এবং রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে।  

এসব কিছুকে ধোঁয়াশায় রেখে স্থানীয় নির্বাচনে তাদের কেউ অংশ নিতে পারবে কী পারবে না- সেই আলোচনা অবান্তর বলেও মত দেন আলাউদ্দীন মোহাম্মদ।

তবে সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মওলা রনি’র মতে এই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ সুযোগ হিসেবেই নেবে কারণ তারা নির্বাচনমুখী দল। তবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধের মুখে পড়বে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে রনি আলাপ-কে বলেন, “আওয়ামী লীগের অনেক ফ্রেশ প্রার্থী আছেন, তারা এই সুযোগটা নিতেও পারেন। দেশে অনেক এলাকা আছে যেখানে বিএনপির আধিপত্য আছে, জামায়াতের আধিপত্য আছে এবং এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে আওয়ামী লীগের এখনও আধিপত্য আছে। সুতরাং আমি কোনো সমস্যা দেখছি না।