৫ই অগাস্ট। সকালটা ছিলো থমথমে আর গুমোট। সরকারঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ চলছে। তিনদিনের সাধারণ ছুটির প্রথম দিন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো সেনা, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের ব্যারিকেড। কারফিউ ভেঙে পথে নেমে আসে ছাত্র-জনতা।
আলাপ রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০০ এএমআপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
৪ঠা অগাস্ট সারাদেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়। ঢাকাসহ সারাদেশ ফুঁসে ওঠে। ওইদিনই নিশ্চিত হয়ে যায় শেখ হাসিনার পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সরকারের নির্দেশে মোবাইলে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কেমন হবে, সেই রূপরেখা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
শুরুতে 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি পালনের কথা ছিলো ৬ই অগাস্ট। কিন্তু একদিন এগিয়ে ৫ই অগাস্ট এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আসে। ‘ছাড়তে হবে ক্ষমতা, ঢাকায় আসো জনতা’ স্লোগানে সারা দেশের ছাত্র, নাগরিক ও শ্রমিকদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানিয়ে ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
কর্মসূচি এগিয়ে আনার কারণ হিসাবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘আজ প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতাকে খুন করেছে খুনি হাসিনা। চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে।’
সেসময়কার আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক এবং পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সম্প্রতি আলাপে রেকর্ড করা এক পডকাস্টে বলেছেন, তারা মার্চ টু ঢাকার তারিখ একদিন এগিয়ে নিয়ে এসেছিলেন ‘মোমেন্টাম’ ধরে রাখার জন্য।
তার ভাষায়, ছয় তারিখ পর্যন্ত কর্মসূচীর জন্য অপেক্ষা করলে আন্দোলনের তীব্রতা কমে যেত এবং সরকার গুছিয়ে নিয়ে আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়ে যেত।
৫ই অগাস্ট। সকালটা ছিলো থমথমে আর গুমোট। সরকারঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ চলছে। তিনদিনের সাধারণ ছুটির প্রথম দিন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো সেনা, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের ব্যারিকেড। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও কারফিউ ভেঙে পথে নেমে আসে ছাত্র-জনতা।
পুরানো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ভেঙে ঢাকামুখী জনস্রোত বাড়তে থাকে।
সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১০ এর গোলচত্বর এলাকায় যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নেতৃত্বে সশস্ত্র নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। তবে আন্দোলনকারীদের ধাওয়ার মুখে সকাল ১১টার দিকে তারা পালিয়ে যান। নিখিল ছাড়া আর কাউকে ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনার পক্ষে নামতে দেখা যায়নি।
বেলা ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে শাহবাগে শক্ত অবস্থানে যায় আন্দোলনকারীরা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও তখন দেখা গেছে।
দুপুর ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবন ছাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরেই আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি খবর প্রকাশ করে, শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা গণভবন থেকে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন। সামাজিক মাধ্যমে হেলিকপ্টারে করে দেশ ত্যাগ করার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়।
ঢাকায় ইন্টারনেট সচল হতে থাকে। শেখ হাসিনা গণভবন ছাড়ার পর নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা সেখান থেকে চলে যায়।
ততক্ষণে গণভবনে প্রবেশ করে হাজার হাজার আন্দোলনকারী। অতিউৎসাহী কিছু মানুষও সেখানে যায়। যারা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালায়। গরু, মাছ, হাঁস, মুরগি, আসবাবপত্র, ফ্রিজ, এসি খুলে নিয়ে যেতে দেখা যায় অনেককে।
এ সময় সংসদ ভবনেও জনস্রোত দেখা গেছে। সেখানেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে সেখানে বিজয় মিছিল নিয়ে যান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ। বক্তব্য দেন তারা।
বিকালে ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কে সুধা সদন, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, কাকরাইলে প্রধান বিচারপতির বাসভবন, ধানমন্ডির ৩/এ সড়কে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমন্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসা, তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, গুলিস্তানে পুলিশ সদর দফতর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
সংকট নিরসনে সেনা প্রধানের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠক
দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের বৈঠক হয়।
সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ গঠনের প্রক্রিয়া ও রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস; জাতীয় পার্টির জি এম কাদের, মুজিবুল হক চুন্নু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ; জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, হামিদুর রহমান আজাদ; হেফাজতে ইসলামের মাওলানা মামুনুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।
বৈঠক শেষে সেনাবাহিনী প্রধান দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘সব হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচার করা হবে, আপনারা সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা রাখুন।’ সহিংসতার পথ ছেড়ে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান এবং ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিগ্গিরই ছাত্র–শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলেও জানান সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি অচিরেই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান মির্জা ফখরুলের
দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, আপনারা সবাই শান্ত থাকুন, ধৈর্য ধারণ করুন। কেউ কারো জানমাল বা কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির করবেন না। সেনা দপ্তরের বৈঠক শেষে তিনি এ আহ্বান জানান।
আসিফ নজরুলের ভিডিও বার্তা
বিকাল সোয়া ৩টায় নিজের ফেইসবুক পেইজে দেওয়া ৩৮ সেকেন্ডের এক ভিডিও-বার্তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা এখন আর্মি চিফের সঙ্গে একটা আলোচনায় আছি। আমি যতটুকু ওনার (সেনাপ্রধান) সঙ্গে কথা বলেছি, আমার কাছে মনে হয়েছে—আমাদের ছাত্র-জনতার যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা, তা উনি বুঝতে পেরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করছি আপনাদের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ আসছে। ছাত্র, জনতা ও তরুণ সমাজের প্রতি আমার আকুল অনুরোধ— আপনারা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখেন, ধৈর্য ধরেন। এ দেশটা আমাদের। এখন থেকে আমরা অত্যন্ত সঠিক পথে অগ্রসর হবো।’
সরকার গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক
সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানের উপস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন৷
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, আসাদুজ্জামান রিপন, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, গণতন্ত্র মঞ্চের প্রধান সমন্বয়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, হেফাজত নেতা মাহমুদুল হক, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হক।
বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘আমাদের সব রাজনৈতিক দলগুলোকে এখানে ডেকে নিয়ে এসেছিল আলোচনা করার জন্য। যারা আন্দোলনের মূল নেতা—ছাত্রনেতা, সমন্বয়ক, তাদের সঙ্গে কথা বলছেন৷’’
সন্ধ্যা ৬টায় আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ছয় ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা প্রকাশের দাবি
আন্দোলন চলাকালে আটককৃতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তির দাবি জানিয়ে রাতে সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
এ সময় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপের দিকে আমাদের যেতে হবে৷ আমরা অন্তবর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব করবো৷ সেই জাতীয় সরকারে অভ্যুত্থানকারী ছাত্র নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকবে৷ নানা নাগরিক পেশাজীবীদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করে সেই সরকারে কারা থাকবে আমরা ঘোষণা করবো৷ সমন্বিত সিদ্ধান্তে জাতীয় সরকারের রূপরেখা তুলে ধরা হবে৷’
অফিস-আদালত খুলে দেওয়ার ঘোষণা
রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানায়, ৬ই অগাস্ট সকাল থেকে দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা খোলা থাকবে। একইসঙ্গে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে হাসিনা পতন আন্দোলন
কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে সারাদেশের চাকরি প্রত্যাশী তরুণেরা একজোট হন। ২০২৪-এর ১লা জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হয়ে আন্দোলনের পরিসর বাড়াতে থাকেন। ‘বাংলা ব্লকেড’ নাম দিয়ে তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। দাবির বিষয়ে কথা বলতে শিক্ষার্থীরা সরকারের সঙ্গেও বসতে চেয়েছেন। তবে সাড়া পাননি। শুরুতে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কোটা সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও পরে বক্তব্য পালটে মারমুখী হয়ে ওঠে। এ সময়েই আন্দোলনের গতি প্রবাহ পালটে শেখ হাসিনা পতনের এক দফা দাবিতে উচ্চকিত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে চূড়ান্ত বিজয় আসে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
যেদিন হেলিকপ্টার চেপে গণভবন ছেড়েছিলেন শেখ হাসিনা
৫ই অগাস্ট। সকালটা ছিলো থমথমে আর গুমোট। সরকারঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ চলছে। তিনদিনের সাধারণ ছুটির প্রথম দিন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো সেনা, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের ব্যারিকেড। কারফিউ ভেঙে পথে নেমে আসে ছাত্র-জনতা।
৪ঠা অগাস্ট সারাদেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়। ঢাকাসহ সারাদেশ ফুঁসে ওঠে। ওইদিনই নিশ্চিত হয়ে যায় শেখ হাসিনার পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সরকারের নির্দেশে মোবাইলে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কেমন হবে, সেই রূপরেখা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
শুরুতে 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি পালনের কথা ছিলো ৬ই অগাস্ট। কিন্তু একদিন এগিয়ে ৫ই অগাস্ট এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আসে। ‘ছাড়তে হবে ক্ষমতা, ঢাকায় আসো জনতা’ স্লোগানে সারা দেশের ছাত্র, নাগরিক ও শ্রমিকদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানিয়ে ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তনের হঠাৎ সিদ্ধান্তে অপ্রস্তুত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কর্মসূচি এগিয়ে আনার কারণ হিসাবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘আজ প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতাকে খুন করেছে খুনি হাসিনা। চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে।’
সেসময়কার আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক এবং পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সম্প্রতি আলাপে রেকর্ড করা এক পডকাস্টে বলেছেন, তারা মার্চ টু ঢাকার তারিখ একদিন এগিয়ে নিয়ে এসেছিলেন ‘মোমেন্টাম’ ধরে রাখার জন্য।
তার ভাষায়, ছয় তারিখ পর্যন্ত কর্মসূচীর জন্য অপেক্ষা করলে আন্দোলনের তীব্রতা কমে যেত এবং সরকার গুছিয়ে নিয়ে আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়ে যেত।
৫ই অগাস্ট। সকালটা ছিলো থমথমে আর গুমোট। সরকারঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ চলছে। তিনদিনের সাধারণ ছুটির প্রথম দিন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো সেনা, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের ব্যারিকেড। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও কারফিউ ভেঙে পথে নেমে আসে ছাত্র-জনতা।
ঢাকার ডেমরা, যাত্রাবাড়ি, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বিমানবন্দর এলাকা, আমিনবাজার, শাহবাগ, শহিদ মিনার, চানখার পুল, পলাশী, পল্টন, মৎস্য ভবন, আগারগাঁও-সর্বত্রই ছিলো আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি।
টঙ্গি, নবীনগর, সাভার-আশুলিয়া, পূর্বাচল, কেরাণীগঞ্জের সড়কপথ হয়েও অনেকে ঢাকায় প্রবেশ করেন।
সকালেই শহিদ মিনার এলাকায় অ্যাকশনে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুরানো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ভেঙে ঢাকামুখী জনস্রোত বাড়তে থাকে।
সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১০ এর গোলচত্বর এলাকায় যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নেতৃত্বে সশস্ত্র নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। তবে আন্দোলনকারীদের ধাওয়ার মুখে সকাল ১১টার দিকে তারা পালিয়ে যান। নিখিল ছাড়া আর কাউকে ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনার পক্ষে নামতে দেখা যায়নি।
বেলা ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে শাহবাগে শক্ত অবস্থানে যায় আন্দোলনকারীরা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও তখন দেখা গেছে।
দুপুর ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবন ছাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরেই আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি খবর প্রকাশ করে, শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা গণভবন থেকে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন। সামাজিক মাধ্যমে হেলিকপ্টারে করে দেশ ত্যাগ করার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়।
ঢাকায় ইন্টারনেট সচল হতে থাকে। শেখ হাসিনা গণভবন ছাড়ার পর নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা সেখান থেকে চলে যায়।
ততক্ষণে গণভবনে প্রবেশ করে হাজার হাজার আন্দোলনকারী। অতিউৎসাহী কিছু মানুষও সেখানে যায়। যারা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালায়। গরু, মাছ, হাঁস, মুরগি, আসবাবপত্র, ফ্রিজ, এসি খুলে নিয়ে যেতে দেখা যায় অনেককে।
এ সময় সংসদ ভবনেও জনস্রোত দেখা গেছে। সেখানেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে সেখানে বিজয় মিছিল নিয়ে যান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ। বক্তব্য দেন তারা।
বিকালে ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কে সুধা সদন, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, কাকরাইলে প্রধান বিচারপতির বাসভবন, ধানমন্ডির ৩/এ সড়কে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমন্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসা, তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, গুলিস্তানে পুলিশ সদর দফতর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
সংকট নিরসনে সেনা প্রধানের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠক
দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের বৈঠক হয়।
সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ গঠনের প্রক্রিয়া ও রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস; জাতীয় পার্টির জি এম কাদের, মুজিবুল হক চুন্নু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ; জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, হামিদুর রহমান আজাদ; হেফাজতে ইসলামের মাওলানা মামুনুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।
বৈঠক শেষে সেনাবাহিনী প্রধান দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘সব হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচার করা হবে, আপনারা সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা রাখুন।’ সহিংসতার পথ ছেড়ে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান এবং ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিগ্গিরই ছাত্র–শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলেও জানান সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি অচিরেই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান মির্জা ফখরুলের
দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, আপনারা সবাই শান্ত থাকুন, ধৈর্য ধারণ করুন। কেউ কারো জানমাল বা কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির করবেন না। সেনা দপ্তরের বৈঠক শেষে তিনি এ আহ্বান জানান।
আসিফ নজরুলের ভিডিও বার্তা
বিকাল সোয়া ৩টায় নিজের ফেইসবুক পেইজে দেওয়া ৩৮ সেকেন্ডের এক ভিডিও-বার্তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা এখন আর্মি চিফের সঙ্গে একটা আলোচনায় আছি। আমি যতটুকু ওনার (সেনাপ্রধান) সঙ্গে কথা বলেছি, আমার কাছে মনে হয়েছে—আমাদের ছাত্র-জনতার যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা, তা উনি বুঝতে পেরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করছি আপনাদের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ আসছে। ছাত্র, জনতা ও তরুণ সমাজের প্রতি আমার আকুল অনুরোধ— আপনারা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখেন, ধৈর্য ধরেন। এ দেশটা আমাদের। এখন থেকে আমরা অত্যন্ত সঠিক পথে অগ্রসর হবো।’
সরকার গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক
সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানের উপস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন৷
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, আসাদুজ্জামান রিপন, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, গণতন্ত্র মঞ্চের প্রধান সমন্বয়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, হেফাজত নেতা মাহমুদুল হক, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হক।
বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘আমাদের সব রাজনৈতিক দলগুলোকে এখানে ডেকে নিয়ে এসেছিল আলোচনা করার জন্য। যারা আন্দোলনের মূল নেতা—ছাত্রনেতা, সমন্বয়ক, তাদের সঙ্গে কথা বলছেন৷’’
সন্ধ্যা ৬টায় আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ছয় ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা প্রকাশের দাবি
আন্দোলন চলাকালে আটককৃতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তির দাবি জানিয়ে রাতে সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
এ সময় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপের দিকে আমাদের যেতে হবে৷ আমরা অন্তবর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব করবো৷ সেই জাতীয় সরকারে অভ্যুত্থানকারী ছাত্র নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকবে৷ নানা নাগরিক পেশাজীবীদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করে সেই সরকারে কারা থাকবে আমরা ঘোষণা করবো৷ সমন্বিত সিদ্ধান্তে জাতীয় সরকারের রূপরেখা তুলে ধরা হবে৷’
অফিস-আদালত খুলে দেওয়ার ঘোষণা
রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানায়, ৬ই অগাস্ট সকাল থেকে দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা খোলা থাকবে। একইসঙ্গে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে হাসিনা পতন আন্দোলন
কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে সারাদেশের চাকরি প্রত্যাশী তরুণেরা একজোট হন। ২০২৪-এর ১লা জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হয়ে আন্দোলনের পরিসর বাড়াতে থাকেন। ‘বাংলা ব্লকেড’ নাম দিয়ে তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। দাবির বিষয়ে কথা বলতে শিক্ষার্থীরা সরকারের সঙ্গেও বসতে চেয়েছেন। তবে সাড়া পাননি। শুরুতে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কোটা সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও পরে বক্তব্য পালটে মারমুখী হয়ে ওঠে। এ সময়েই আন্দোলনের গতি প্রবাহ পালটে শেখ হাসিনা পতনের এক দফা দাবিতে উচ্চকিত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে চূড়ান্ত বিজয় আসে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
বিষয়: