তখনও তার মাথায় ঝাঁকড়া চুল। মুখে কেবলই কৈশোর পেরোনোর সারল্য। বয়সটা এখনও বিশের ঘরে পৌঁছায়নি। লিওনেল মেসি বক্সের অনেকটুকু বাইরে থেকে দৌড়ে ঢুকে গেলেন সার্ভিয়া ও মন্টেনিগ্রের বক্সে।
তার ক্ষীপ্র গতিতে তখন অসহায় চোখে তাকিয়ে পেছনে থাকা ডিফেন্ডার, সামনের গোলরক্ষকের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বলটা জালে জড়াতেই একটা বার্তাও পৌঁছে গেলো সঙ্গে সঙ্গেই— লিওনেল মেসি এসে গেছেন বড় মঞ্চে। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন কেবল ২০০৬ সাল।
ওই ঘটনার ২০ বছর পেরিয়ে গেছে। মেসির বয়স এখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। মুখভর্তি দাঁড়ি, চুলগুলোও ছোট ছোট। এতদিনে লিওনেল মেসি বহু পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন উত্থান–পতনে, জিতে গেছেন সম্ভাব্য সবকিছুও।
তবু তার ক্ষুধা কমেনি। আর্জেন্টিনার হয়ে আরেকটি ম্যাচ, আরেকটা নতুন কিছু কিংবা আরেকটা বিশ্বকাপ— স্বপ্নের ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে তিনি নেমে গেছেন আবারও। ৩৯ বছর বয়সে প্রথম ম্যাচটা খেলেই কি-না করে ফেলেছেন হ্যাটট্রিক!
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডে মেসি বসে যান মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশাপাশি। পরের ম্যাচের ৫ মিনিটেই তার সামনে চলে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ— লাউতারো মার্তিনেসকে ফাউল করার পর শুরুতে পেনাল্টি দেননি রেফারি। এমনকি ফাউলের বাঁশিটাও বাজাননি অনেকক্ষণ।
পরে ভিএআরে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। মেসি আবার এগিয়ে আসেন। পুরো পৃথিবীই হয়তো তাকিয়ে ছিলো— মেসি বোধ হয় রেকর্ডটা করেই ফেললেন এবার। বিশ্বকাপ গোলের সংখ্যাটা ১৬ থেকে এবার ১৭ হবে। কিন্তু তিনি কি-না মারলেন বাইরে দিয়ে!

অপেক্ষাটা তার লম্বা হলো না খুব একটা। ওই অর্ধের খেলা শেষ হওয়ার আগেই মেসি তার কাঙ্ক্ষিত সেই গোলটা পেলেন। বক্সের বাইরে থেকে এসে ফাকুন্দা মেদিনার ক্রস আর থিয়েগো আলমাদার ‘ডামি’ পেরিয়ে তার শটে কিছুই করার ছিলো না অস্ট্রিয়া গোলরক্ষকের।
দৌড়ে মেসি যখন উদ্যাপনে, ততক্ষণে ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে। ‘টিপিক্যাল মেসি গোলে’ সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার খাতায় সবার উপরে নাম তুলেছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। দু’হাত প্রসারিত করে দাদীকে খুঁজতে চাওয়া মেসি ছাড়িয়ে গেছেন ক্লোসাকে।
যার রেকর্ড ভেঙেছেন, সেই ক্লোসার সঙ্গে ভূমিকার পার্থক্যও তার ‘গ্রেটনেসের’ প্রমাণ বয়ে বেড়ায় যেন। ক্লোসা বক্সের ভেতর নিখুঁত পজিশনিং, দুর্দান্ত হেডিং ক্ষমতা আর সুযোগসন্ধানী ফিনিশিংয়ে দুর্দান্ত। জার্মানির হয়ে সবসময়ই তিনি খেলেছেন ‘ক্লাসিক নম্বর নাইন’ হিসেবে।
আর মেসি? বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ডটাও আছে তার দখলে। তিনি শুধু গোলদাতা নন, প্লে-মেকার। মাঝমাঠ থেকে বল ড্রিবল করে নিয়ে রক্ষণ ভেঙে গোল করা কিংবা সতীর্থকে দিয়ে গোল করানো—জাদুকরি সব মুহূর্ত তিনি তৈরি করেন সবসময়।
মেসির এই রেকর্ডটা হয়তো ভেঙে যাবে কয়েক দিনেই। কিলিয়ান এমবাপ্পে তার চেয়ে খুব দূরে নন এখনও। হয়তো রেকর্ডটা সবসময়ই হয়ে থাকবে ফ্রেঞ্চ তারকার। কিন্তু রেকর্ড মেসিকে বোঝাতে পারে কতটা?
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কম আর সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলের রেকর্ড তার, সবচেয়ে বেশি বয়সেও। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট তার, বক্সের বাইরে থেকে সবচেয়ে বেশি গোল কিংবা বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি জয়ও। কত রেকর্ডই বা আর ভাঙা যায়?
সবকিছু ভেঙে গেলেও মেসি যত জাদুকরি রাত উপহার দিয়ে গেছেন এই পৃথিবীকে। সেটি কি আর কেউ দিতে পারবেন? উত্তরটা সম্ভবত বেশির ভাগ মানুষের কাছেই এখন ‘না!’
লিওনেল মেসি তাই আলাদা, অন্যরকম, অবিশ্বাস্যও। রেকর্ডের পথ পাড়ি দিয়ে যিনি পৌঁছে গেছেন আরও বহু দূরে।



