মিমস থেকে গণআন্দোলন: বদলে যাচ্ছে ভারতীয় তরুণদের প্রতিবাদের ভাষা

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ০১:২৮ পিএম

পুরো বিষয়টা শুরু হয়েছিলো একটি অনলাইন মিমস থেকে যা কাঁপিয়ে দিচ্ছে ভারতের রাজপথ থেকে রাজ্যসভা। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলন দেশটির বিতর্কিত পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের জন্য।

আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিত দিপকে সম্প্রতি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সিএনএনকে। সেখানে ৩০ বছর বয়সী অভিজিত জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা।

সিএনএনকে অভিজিত বলেন, “যত দিনই লাগুক, আমরা দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্যই এখানে এসেছি। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।”

চলতি মাসের ২০এ জুন থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন দিপকে ও তার সমর্থকেরা। প্রতিদিন সেখানে জড়ো হচ্ছেন শত শত শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও তরুণ।

দিনের বেলায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা দুই থেকে তিনশ' হলেও সন্ধ্যার পর তা প্রায় পাঁচশ'তে পৌঁছায়। রাতেও অনেকে সেখানেই অবস্থান করছেন।

প্রশ্নফাঁস ইস্যু ও অনিশ্চিত ভবিষ্যত

ভারতের প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বহু বছর ধরেই প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির অভিযোগে বিতর্কিত। লাখো শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিলেও অনিয়ম বা প্রশ্নফাঁস তাদের ভবিষ্যতকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

সম্প্রতি ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিলো। ফলে ২০ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থীকে আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

অভিজিতের ভাষায়, “প্রশ্নফাঁস এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকট।”

ভারতে অনুষ্ঠিত সরকারি পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, বরং পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও সংস্কার নিশ্চিত করা।”

ব্যঙ্গই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা

ককরোচ পার্টির আন্দোলনের ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রতীকী ও ব্যঙ্গাত্মক। ককরোচ জনতা পার্টির নামটিও এসেছে একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে।

ভারতের প্রধান বিচারপতির এক বক্তব্যকে অনেকেই এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, তিনি বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেই শব্দকেই আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত করেন তরুণরা। একই সঙ্গে নামটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামেরও ব্যঙ্গাত্মক রূপ।

প্রতিদিন আন্দোলনের জন্য নির্ধারণ করা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকী কর্মসূচি। একদিন বিক্ষোভকারীরা স্টিলের থালা ও চামচ বাজিয়ে প্রতিবাদ করেন, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসন বাজানোর আহ্বানের প্রতি একটি ব্যঙ্গাত্মক ইঙ্গিত।

আরেকদিন আন্দোলনকারীরা ডায়াপার নিয়ে এসে তাতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি লিখেছেন। তাদের ভাষ্য, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবেই এই কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের বার্তা দিতে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের গোলাপ ফুলও উপহার দেন অনেক বিক্ষোভকারী। অনেকে হাতে জাতীয় পতাকা ও ভারতের সংবিধানের কপি নিয়ে সমাবেশে অংশ নেন।

শিক্ষার্থীদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন

আন্দোলনের একটি আবেগঘন পর্ব ছিল সম্প্রতি আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন।

ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষার চাপ, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা থেকে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিজিত বলেন, “এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল এমন শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। যারা একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে জীবন হারিয়েছেন বলে তাদের বিশ্বাস।”

সরকারের পাল্টা অবস্থান

আন্দোলনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ককরোচ জনতা পার্টিকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেন।

শিক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্য সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে অভিজিত বলেন, “সরকারের উচিত সমালোচকদের দমন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের জবাব দেওয়া।”

নৈতিক দায় স্বীকার করার পরিবর্তে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিরাপত্তা জোরদার, আন্দোলন অব্যাহত

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার পুনঃপরীক্ষাকে ঘিরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরিবহনে সামরিক বিমানও ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, নয়াদিল্লির আন্দোলনস্থলে প্রতিদিন স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসছেন। তাদের সহযোগিতায় টানা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।

সামনে কী?

অভিজিৎ দিপক-এর মতে, এই আন্দোলন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বিভিন্ন রাজ্যে সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

তার দাবি, আন্দোলনের লক্ষ্য কোনো রাজনৈতিক দল গঠন নয় বরং এমন একটি পরীক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মেধাই হবে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড।

ভারতের লাখো তরুণের হতাশা ও ক্ষোভ এখন একটি সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট ভারতের নতুন প্রজন্ম এখন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ মেশানো মিম শেয়ারে আটকে নেই। তারা রাজপথে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে শুরু করেছে।

 

(সিএনএন অবলম্বনে)