ইশতিয়াক হোসেন থেকে মির্জা ইশতিয়াক: আইন থাকলেও বন্ধ হচ্ছে না হেফাজতে মৃত্যু
'রাষ্ট্র যখন কাউকে হেফাজতে নিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব তাকে নিরাপত্তা দেওয়া। রাষ্ট্র যদি সেই সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে একে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই।'
কামরুজ্জামান পৃথু
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৫ এএমআপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে ২০এ জুন আটক করেছিলো ডিবি পুলিশ। পরদিন সকালে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, নির্যাতনেই মৃত্যু হয় ইশতিয়াকের।
এদিকে গণমাধ্যমে পুলিশ জানিয়েছে, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম গোন্দারদিয়া গ্রাম থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ ইশতিয়াককে আটক করে। এর পর তাকে রাত তিনটায় ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়লে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ফরিদপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে, হেফাজতে ইশতিয়াক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে কমিটি করা হয়েছে।
ইশতিয়াকের মৃত্যুর দুই দিন পর, ২৩এ জুন গ্রেফতার করা হয় চট্টগ্রাম সাতকানিয়া উপজেলা শাখার যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আলমকে। চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষ আলাপ-কে জানিয়েছে, ২৪এ জুন সকালে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন নুরুল আলম। প্রথমে তাকে কারাগার হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই নুরুল আলমকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
এক যুগ, এক চিত্রনাট্য
ফরিদপুরে ইশতিয়াক আহমেদের ঘটনার এক যুগ আগে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হয় আরও এক ইশতিয়াকের। মৃত্যুর পর বাদী হয়ে মামলা করেন ইশতিয়াক হোসেনের ভাই ইমতিয়াজ। যা বাংলাদেশে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর আওতায় হওয়া প্রথম মামলা। ২০২০ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর এই মামলার রায়ে তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন এবং দুই সোর্স সুমন ও রাসেলকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকার পল্লবীর ইরানি ক্যাম্পে চলছিলো একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন পুলিশের সোর্স সুমন। এর প্রতিবাদ করে ইশতিয়াক ও তার ভাই ইমতিয়াজ। এতে সুমনের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয় ইশতিয়াক ও ইমতিয়াজের। পরবর্তীতে পুলিশ এসে দুই ভাইকে নিয়ে যায় পল্লবী থানায়। সেখানেই গুরুতর অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়।
বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও করেন আসামিরা। শুনানি শেষে ২০২৫ সালের অগাস্ট মাসে হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে এসআই জাহিদুর রহমান ও এএসআই কামরুজ্জামানের। তবে এএসআই রাশেদুল হাসানের সাজা কমিয়ে ১০ বছর করা হয় এবং সোর্স রাসেলকে খালাস দেওয়া হয়।
খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে ‘লিভ টু আপিল’ করে বাদীপক্ষ। বর্তমানে মামলাটি নিয়ে আইনি লড়াই চলমান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ৯৪৩ জনের। এর মধ্যে ৫৭৫ জনই অভিযুক্ত অবস্থায় মারা যান।
আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
যে কোনো অভিযোগে আটককৃতদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাওসার আহ্মেদ আলাপ-কে বলেন, “গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করতে হবে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নিজের পছন্দের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের অধিকার আছে। যেকোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে কোনো ব্যক্তিকে বাধ্য করা যাবে না।”
এসব কিছু সংবিধানে একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বলা আছে বলে জানান কাওসার।
এ ছাড়াও এ ধরনের ঘটনাকে তিনি আন্তর্জাতিক টর্চার কনভেনশন ১৯৮৪ পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালের ৫ই অক্টোবর এই কনভেনশনে স্বাক্ষরের মাধ্যমে সদস্য হয়।”
‘টর্চার কনভেনশন’ বা ‘কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার অ্যান্ড আদার ক্রুয়েল', 'ইনহিউম্যান অর ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট অর পানিশমেন্ট’ হলো জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি। যা ১৯৮৪ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।
এই কনভেনশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে যে কোনো ধরনের নির্যাতন বা অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
কাওসার আহ্মেদ জানান, টর্চার কনভেনশনের দায়বদ্ধতা থেকেই বাংলাদেশ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। “এই আইনের উদ্দেশ্য হলো, সরকারি হেফাজতে যেকোনো ব্যক্তি যেন অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণের শিকার না হন, সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করা।”
ইশতিয়াকের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিজ্ঞপ্তিতে আসক বলেছে, “রাষ্ট্রীয় হেফাজত কোনো অবস্থাতেই জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হতে পারে না”।
আছে আইন, তবুও কেন থামছে না হেফাজতে মৃত্যু
আইন থাকলেও হেফাজতে মৃত্যুকে কেন থামানো যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আলাপ-কে বলেন, “রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং আইন না মানার সংস্কৃতির কারণে হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা বারবার ঘটছে।”
“অতীতে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোতে যেমন অসুস্থতা, হার্ট অ্যাটাক বা আত্মহত্যার ভাষ্য তৈরি করা হতো, এখনো সেই একই চিত্রনাট্য অনুসরণ করা হচ্ছে।”
তবে এইসব অপরাধের জন্য ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু আইন একটি "শক্তিশালী আইন" বলে মনে করেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
এই আইনকে একটি ‘যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করলেও মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলছেন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে।
“রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের ও তা প্রমাণ করার মতো সহায়ক পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি”, আলাপ-কে বলেছেন ফয়জুল কবির। “হেফাজতে মৃত্যু হলে তার দায়ভার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না পুলিশ”।
এজন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের পক্ষে মত দেন ফয়জুল কবির। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব দেন তিনি।
মানবাধিকার ইস্যুতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের পরামর্শ দেন কাওসার আহমেদ। এছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এ ছাড়াও হেফাজতে মৃত্যু বন্ধে একটি ‘কম্বাইন্ড এফোর্ট’ বা সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
“রাষ্ট্র যখন কাউকে হেফাজতে নিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব তাকে নিরাপত্তা দেওয়া। রাষ্ট্র যদি সেই সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে একে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই।”
ইশতিয়াক হোসেন থেকে মির্জা ইশতিয়াক: আইন থাকলেও বন্ধ হচ্ছে না হেফাজতে মৃত্যু
'রাষ্ট্র যখন কাউকে হেফাজতে নিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব তাকে নিরাপত্তা দেওয়া। রাষ্ট্র যদি সেই সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে একে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই।'
ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে ২০এ জুন আটক করেছিলো ডিবি পুলিশ। পরদিন সকালে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, নির্যাতনেই মৃত্যু হয় ইশতিয়াকের।
এদিকে গণমাধ্যমে পুলিশ জানিয়েছে, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম গোন্দারদিয়া গ্রাম থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ ইশতিয়াককে আটক করে। এর পর তাকে রাত তিনটায় ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়লে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ফরিদপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে, হেফাজতে ইশতিয়াক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে কমিটি করা হয়েছে।
ইশতিয়াকের মৃত্যুর দুই দিন পর, ২৩এ জুন গ্রেফতার করা হয় চট্টগ্রাম সাতকানিয়া উপজেলা শাখার যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আলমকে। চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষ আলাপ-কে জানিয়েছে, ২৪এ জুন সকালে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন নুরুল আলম। প্রথমে তাকে কারাগার হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই নুরুল আলমকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
এক যুগ, এক চিত্রনাট্য
ফরিদপুরে ইশতিয়াক আহমেদের ঘটনার এক যুগ আগে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হয় আরও এক ইশতিয়াকের। মৃত্যুর পর বাদী হয়ে মামলা করেন ইশতিয়াক হোসেনের ভাই ইমতিয়াজ। যা বাংলাদেশে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর আওতায় হওয়া প্রথম মামলা। ২০২০ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর এই মামলার রায়ে তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন এবং দুই সোর্স সুমন ও রাসেলকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকার পল্লবীর ইরানি ক্যাম্পে চলছিলো একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন পুলিশের সোর্স সুমন। এর প্রতিবাদ করে ইশতিয়াক ও তার ভাই ইমতিয়াজ। এতে সুমনের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয় ইশতিয়াক ও ইমতিয়াজের। পরবর্তীতে পুলিশ এসে দুই ভাইকে নিয়ে যায় পল্লবী থানায়। সেখানেই গুরুতর অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়।
বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও করেন আসামিরা। শুনানি শেষে ২০২৫ সালের অগাস্ট মাসে হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে এসআই জাহিদুর রহমান ও এএসআই কামরুজ্জামানের। তবে এএসআই রাশেদুল হাসানের সাজা কমিয়ে ১০ বছর করা হয় এবং সোর্স রাসেলকে খালাস দেওয়া হয়।
খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে ‘লিভ টু আপিল’ করে বাদীপক্ষ। বর্তমানে মামলাটি নিয়ে আইনি লড়াই চলমান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ৯৪৩ জনের। এর মধ্যে ৫৭৫ জনই অভিযুক্ত অবস্থায় মারা যান।
আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
যে কোনো অভিযোগে আটককৃতদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাওসার আহ্মেদ আলাপ-কে বলেন, “গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করতে হবে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নিজের পছন্দের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের অধিকার আছে। যেকোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে কোনো ব্যক্তিকে বাধ্য করা যাবে না।”
এসব কিছু সংবিধানে একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বলা আছে বলে জানান কাওসার।
এ ছাড়াও এ ধরনের ঘটনাকে তিনি আন্তর্জাতিক টর্চার কনভেনশন ১৯৮৪ পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালের ৫ই অক্টোবর এই কনভেনশনে স্বাক্ষরের মাধ্যমে সদস্য হয়।”
‘টর্চার কনভেনশন’ বা ‘কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার অ্যান্ড আদার ক্রুয়েল', 'ইনহিউম্যান অর ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট অর পানিশমেন্ট’ হলো জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি। যা ১৯৮৪ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।
এই কনভেনশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে যে কোনো ধরনের নির্যাতন বা অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
কাওসার আহ্মেদ জানান, টর্চার কনভেনশনের দায়বদ্ধতা থেকেই বাংলাদেশ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। “এই আইনের উদ্দেশ্য হলো, সরকারি হেফাজতে যেকোনো ব্যক্তি যেন অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণের শিকার না হন, সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করা।”
ইশতিয়াকের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিজ্ঞপ্তিতে আসক বলেছে, “রাষ্ট্রীয় হেফাজত কোনো অবস্থাতেই জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হতে পারে না”।
আছে আইন, তবুও কেন থামছে না হেফাজতে মৃত্যু
আইন থাকলেও হেফাজতে মৃত্যুকে কেন থামানো যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আলাপ-কে বলেন, “রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং আইন না মানার সংস্কৃতির কারণে হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা বারবার ঘটছে।”
“অতীতে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোতে যেমন অসুস্থতা, হার্ট অ্যাটাক বা আত্মহত্যার ভাষ্য তৈরি করা হতো, এখনো সেই একই চিত্রনাট্য অনুসরণ করা হচ্ছে।”
তবে এইসব অপরাধের জন্য ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু আইন একটি "শক্তিশালী আইন" বলে মনে করেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
এই আইনকে একটি ‘যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করলেও মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলছেন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে।
“রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের ও তা প্রমাণ করার মতো সহায়ক পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি”, আলাপ-কে বলেছেন ফয়জুল কবির। “হেফাজতে মৃত্যু হলে তার দায়ভার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না পুলিশ”।
এজন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের পক্ষে মত দেন ফয়জুল কবির। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব দেন তিনি।
মানবাধিকার ইস্যুতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের পরামর্শ দেন কাওসার আহমেদ। এছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এ ছাড়াও হেফাজতে মৃত্যু বন্ধে একটি ‘কম্বাইন্ড এফোর্ট’ বা সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
“রাষ্ট্র যখন কাউকে হেফাজতে নিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব তাকে নিরাপত্তা দেওয়া। রাষ্ট্র যদি সেই সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে একে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই।”