শৈশবের কষ্ট থেকে কমেডির কিংবদন্তি: চার্লি চ্যাপলিনের বৈচিত্র্যময় জীবন
১৯১৫ সালের মধ্যে চার্লি চ্যাপলিন হয়ে ওঠেন একজন আইকন। মার্চেন্ডাইজ বিক্রি হতে থাকে দোকানে দোকানে, তার চেহারা দিয়ে বের হয় কার্টুন, কমিক্স। মোশন পিকচার ম্যাগাজিনে লেখা হয়, "আমেরিকাজুড়ে চ্যাপলিনাইটিস ছড়িয়ে পড়েছে।” তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের প্রথম 'ইন্টারন্যাশনাল স্টার'।
রাহী নায়াব
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৭ এএমআপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
বিশ্বের মানুষের মুখে হাসি ও চলচ্চিত্রের জগতে বিপ্লব আনা চার্লি চ্যাপলিন জন্মেছিলেন ১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিলে। ছবি: এআই জেনারেটেড
জন্মের পরপরই ছেড়ে যান বাবা, মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হয় মা’কে। তুমুল দারিদ্র্যের মধ্যে নয় বছর বয়স থেকে নিজেদের হাল ধরতে হয় তাকে ও তার ভাইকে।
বলছি চার্লি চ্যাপলিনের কথা - যিনি দারিদ্র্য ও দুঃখ ভরা জীবন থেকে উঠে এসে বিশ্বকে হাসিয়ে হয়ে ওঠেন সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন।
দারিদ্র্যভরা শৈশবে জীবিকার তাগিদে লন্ডনে মঞ্চে গান গাওয়া শুরু করেন চ্যাপলিন। তবে শুরু থেকেই তার স্বপ্ন ছিল কমেডিতে ক্যারিয়ার বানানোর। ১৪ বছর বয়সে লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে এক থিয়্যাট্রিকাল এজেন্সিতে নাম লিখান। চার্লির মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা দেখতে পান ম্যানেজার, এবং তাকে প্রথমবারের মতো মঞ্চে রোল দেয়া হয় নিউজবয় হিসেবে অভিনয় করার, এবং সেখানে অভিনয়ের জন্য প্রশংসা কুড়ান।
বড় ভাই সিডনির সুপারিশে ঢুকে পড়েন ফ্রেড কার্নো’স কোম্পানি নামক কমেডি ট্রুপে, এবং প্রথম শো-তেই লন্ডন কলোসিয়ামে দর্শকের মন জয় করে ফেলেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে মুখ্য চরিত্র পেতে থাকেন নাটকে। তারপর ১৯০৯ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
আমেরিকায় চ্যাপলিন তার শৈশবের দারিদ্র্য জর্জরিত দিনগুলোকে পিছনে ফেলে হয়ে ওঠেন ফ্রেড কার্নো’স কমেডি ট্রুপের শীর্ষ অভিনেতাদের একজন। ১৯১৩ সালে মঞ্চনাটক থেকে সরে তার অভিষেক হয় চলচ্চিত্রের দুনিয়ায়। কিস্টোন স্টুডিওসের সাথে সপ্তাহে ১৫০ ডলার পারিশ্রমিকের কন্ট্রাক্ট সই করেন, সাইলেন্ট ফিল্মের সময়ের কিংবদন্তি প্রযোজক ম্যাক সেনেটের অধীনে।
সেনেট মনে করেছিলেন চ্যাপলিনের বয়স কম, তাই পর্দার সামনে আনা হয়নি শুরুতে। সেই সময় চ্যাপলিন পর্দার আড়ালে থেকে শিখতে থাকেন চলচ্চিত্র নির্মাণের শিল্প। তার প্রথম সিনেমা পর্দায় আসে ১৯১৪ সালে; মেইকিং আ লিভিং নামক এক রিলের চলচ্চিত্র। চ্যাপলিনে নিজের পছন্দ না হলেও, দর্শকদের কাছে কুড়িয়েছিলেন প্রশংসা।
তবে তার আসল প্রতিভা সামনে আসে দ্বিতীয় সিনেমাতে। কস্টিউম রুমে বসে চ্যাপলিন চিন্তা করছিলেন, কীভাবে তার নিজের ব্যক্তিত্ব ও জীবনের গল্প নিয়ে আসা যায় চলচ্চিত্রের চরিত্রে। জন্ম হয় তার সবচেয়ে পরিচিত্র চরিত্র ট্র্যাম্প-এর; টাইট কোট, টুপি ও হাতে লাঠিওয়ালা সেই দরিদ্র ও দুর্ভাগা ব্যক্তি যাকে বয়স্ক দেখানোর জন্য মুখে লাগিয়েছিলেন ছোট গোঁফ। ফিল্মের নাম মেবেল’স স্ট্রেঞ্জ প্রেডিকামেন্ট ।
যদিও ট্র্যাম্প-কে পরিচালকদের পছন্দ হয়নি প্রথমে, এবং চ্যাপলিনের সাথে অনেক পরিচালকের বাক-বিতন্ডার পর তার কন্ট্রাক্ট বাতিলের কথাও ভাবছিলেন সেনেট। তবে জনপ্রিয়তার কারণে যখন বিভিন্ন থিয়েটার থেকে ট্র্যাম্প চরিত্রের আরও চলচ্চিত্রের অনুরোধ আসতে থাক, তখন সেনেট চ্যাপলিনকে পরের সিনেমাটি পরিচালনারও সুযোগ দেন।
পরিচালক হিসেবে চার্লি চ্যাপলিনের অভিষেক হয় ১৯১৪ সালের মে মাসে; সিনেমার নাম কট ইন দ্য রেইন । এরপর থেকে কিস্টোন স্টুডিওসের যত সিনেমা করেন চ্যাপলিন, তার প্রায় প্রত্যেকটি পরিচালনা করেন তিনি নিজেই।
একই বছর সপ্তাহে এক হাজার ডলারের মজুরিতে যোগ দেন শিকাগোর এসানে স্টুডিওসে।
১৯১৫ সালের মধ্যে চার্লি চ্যাপলিন হয়ে ওঠেন একজন আইকন। ট্র্যাম্প চরিত্রের মার্চেন্ডাইজ বিক্রি হতে থাকে দোকানে দোকানে, তার চেহারা দিয়ে বের হয় কার্টুন, কমিক্স। মোশন পিকচার ম্যাগাজিনে লেখা হয়, "আমেরিকাজুড়ে চ্যাপলিনাইটিস ছড়িয়ে পড়েছে।” তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের প্রথম 'ইন্টারন্যাশনাল স্টার'।
ছাব্বিশ বছর বয়সে চ্যাপলিন মিউচুয়াল ফিল্ম কর্পোরেশনের সাথে বছরে সাড়ে ৬ লাখ ডলারেরও বেশি কন্ট্রাক্ট সই করেন এবং হয়ে যান সে সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়াদের একজন।
মিউচুয়ালের সাথে কন্ট্রাক্ট শেষ হওয়ার পর চ্যাপলিন ভাই সিডনিকে তার বিজনেস ম্যানেজার করেন। ১৯১৭ সালে চ্যাপলিন ফার্স্ট ন্যাশনাল এক্সিবিটর’স সার্কিটের সাথে এক মিলিয়ন ডলারে আটটি সিনেমা বানানোর চুক্তি সই করেন।
পাঁচ একর জমিতে তিনি নিজের স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়। তিনি এই পর্যায়ে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯১৯ সালে চার্লি চ্যাপলিন, ম্যারি পিকফোর্ড ও পরিচালক ডি ডাব্লিউ গ্রিফিথ মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ইউনাইটেড আর্টিস্টস নামক ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।
শিল্পীদের নিয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানে তারা নিজেদের চলচ্চিত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। ১৯১৮ সালে চ্যাপলিন বিয়ে করেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী মিল্ড্রেড হ্যারিসকে। ১৯১৯ সালে তার প্রথম সন্তান নর্মান চ্যাপলিনের জন্ম হয়, তবে মারা যায় তিন দিনে বয়সেই এবং আস্তে আস্তে তার বিয়ে ভেঙে যায়।
১৯২১ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র দ্য কিড, যেখানে উঠে আসে তার কষ্টকর শৈশব ও সন্তান হারানোর বেদনা। ১৯২৪ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন, এবার ১৬ বছর বয়সী লিটা গ্রে-কে। তাদের প্রথম ছেলের জন্ম হয় ১৯২৫ সালের মে মাসে, নাম রাখা হয় তৃতীয় চার্লি চ্যাপলিন। সে বছরই চ্যাপলিন হন প্রথম অভিনেতা যাকে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ফিচার করা হয়। পরের বছর জন্ম হয় তাদের দ্বিতীয় ছেলে সিডনি আর্ল চ্যাপলিনের। ১৯২৭ সালে সন্তানদের নিয়ে চলে যান লিটা, এবং তালাক দেন চার্লিকে।
লিটা চার্লির বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, দুর্ব্যবহার ও বিকৃত যৌন চর্চার অভিযোগ তোলেন, যা দ্রুতই হয়ে যায় গণমাধ্যমে হেডলাইন। অবশেষে ছয় লাখ ডলারের সেটেলমেন্ট দিয়ে তালাকের মামলা সমাপ্ত হয়। তবে চ্যাপলিনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা স্ক্যান্ডেলের মুখে টিকে থাকে।
এই সময়ে হলিউডে সবাক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে, এবং সাইলেন্ট ফিল্মের অভিনেতারা হারাতে থাকেন জীবিকা। তবে নিজের চলচ্চিত্রের ফর্মুলা বদলাননি চ্যাপলিন। তৈরি করেন সিটি লাইটস, যা মুক্তি পায় ১৯৩১ সালে এবং যা ব্যবসা করে ৩ মিলিয়ন ডলার।
১৯৩৯ সালে যখন ইউরোপ জুড়ে ফ্যাসিবাদের উত্থান দেখা যাচ্ছিল, তখন চ্যাপলিন তার গোঁফের সাথে অ্যাডলফ হিটলারের গোঁফের মিল খেয়াল করেন এবং তাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি করেন দ্য গ্রেইট ডিকটেটর । রাজনৈতিক বার্তা পরিস্কারভাবে দেওয়ার জন্য, প্রথমবারের মতো যুক্ত করেন সংলাপ। চলচ্চিত্রটি শেষ করেন একটি পাঁচ মিনিটের বক্তৃতা দিয়ে, যা এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র সিনগুলোর একটি। এখান থেকে চার্লি চ্যাপলিন শুধুমাত্র একজন কমেডিয়ান থেকে হয়ে যান একজন রাজনৈতিক ফিগার। সিনেমাটি সেবারের অস্কারে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে নমিনেশন পায়।
১৯৪৭ সালে চ্যাপলিনের ওপর তদন্ত শুরু করে এফবিআই। আমেরিকান সরকারের সন্দেহ তিনি একজন কমিউনিস্ট। তখন আমেরিকায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের গ্রেফতার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বন্ধুত্বের ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণই ছিল এর মূল কারণ।
চ্যাপলিন তার পরবর্তী চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে লন্ডনের দিকে রওনা দেয়ার পরপরই জানতে পারেন, তার যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় প্রবেশের অধিকার বাতিল করা হয়েছে। আর ফেরার চেষ্টাও করেননি। আমেরিকার বাড়ি, স্টুডিও ও ইউনাইটেড আর্টিস্টসে তার শেয়ার বিক্রি করে দেন। স্ত্রী উনা ও’নিলও আমেরিকান নাগরিকত্ব প্রত্যাখান করে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
ষাটের দশক থেকে ধীরে ধীরে আমেরিকায় চ্যাপলিনকে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠতে থাকে। ১৯৭২ সালে অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স, আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস চ্যাপলিনকে আমেরিকায় আসার নিমন্ত্রণ জানান একটি সম্মানসূচক বা অনারারি অস্কার গ্রহণ করতে। অনেক চিন্তাভাবনার পর তা গ্রহণ করতে দুই দশক পর আমেরিকায় ফেরেন চ্যাপলিন। অ্যাওয়ার্ড গ্রহণের সময় তাকে ১২ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন দেওয়া হয়। তার কিছু পরেই তাকে নাইট সম্মাননা দেন রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
১৯৭৭ সালের বড় দিনে চার্লি চ্যাপলিন ৮৮ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বের মানুষের মুখে হাসি ও চলচ্চিত্রের জগতে বিপ্লব আনা এই কিংবদন্তি জন্মেছিলেন ১৩৭ বছর আছে আজকের দিনে, ১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিলে।
শৈশবের কষ্ট থেকে কমেডির কিংবদন্তি: চার্লি চ্যাপলিনের বৈচিত্র্যময় জীবন
১৯১৫ সালের মধ্যে চার্লি চ্যাপলিন হয়ে ওঠেন একজন আইকন। মার্চেন্ডাইজ বিক্রি হতে থাকে দোকানে দোকানে, তার চেহারা দিয়ে বের হয় কার্টুন, কমিক্স। মোশন পিকচার ম্যাগাজিনে লেখা হয়, "আমেরিকাজুড়ে চ্যাপলিনাইটিস ছড়িয়ে পড়েছে।” তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের প্রথম 'ইন্টারন্যাশনাল স্টার'।
জন্মের পরপরই ছেড়ে যান বাবা, মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হয় মা’কে। তুমুল দারিদ্র্যের মধ্যে নয় বছর বয়স থেকে নিজেদের হাল ধরতে হয় তাকে ও তার ভাইকে।
বলছি চার্লি চ্যাপলিনের কথা - যিনি দারিদ্র্য ও দুঃখ ভরা জীবন থেকে উঠে এসে বিশ্বকে হাসিয়ে হয়ে ওঠেন সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন।
দারিদ্র্যভরা শৈশবে জীবিকার তাগিদে লন্ডনে মঞ্চে গান গাওয়া শুরু করেন চ্যাপলিন। তবে শুরু থেকেই তার স্বপ্ন ছিল কমেডিতে ক্যারিয়ার বানানোর। ১৪ বছর বয়সে লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে এক থিয়্যাট্রিকাল এজেন্সিতে নাম লিখান। চার্লির মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা দেখতে পান ম্যানেজার, এবং তাকে প্রথমবারের মতো মঞ্চে রোল দেয়া হয় নিউজবয় হিসেবে অভিনয় করার, এবং সেখানে অভিনয়ের জন্য প্রশংসা কুড়ান।
বড় ভাই সিডনির সুপারিশে ঢুকে পড়েন ফ্রেড কার্নো’স কোম্পানি নামক কমেডি ট্রুপে, এবং প্রথম শো-তেই লন্ডন কলোসিয়ামে দর্শকের মন জয় করে ফেলেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে মুখ্য চরিত্র পেতে থাকেন নাটকে। তারপর ১৯০৯ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
আমেরিকায় চ্যাপলিন তার শৈশবের দারিদ্র্য জর্জরিত দিনগুলোকে পিছনে ফেলে হয়ে ওঠেন ফ্রেড কার্নো’স কমেডি ট্রুপের শীর্ষ অভিনেতাদের একজন। ১৯১৩ সালে মঞ্চনাটক থেকে সরে তার অভিষেক হয় চলচ্চিত্রের দুনিয়ায়। কিস্টোন স্টুডিওসের সাথে সপ্তাহে ১৫০ ডলার পারিশ্রমিকের কন্ট্রাক্ট সই করেন, সাইলেন্ট ফিল্মের সময়ের কিংবদন্তি প্রযোজক ম্যাক সেনেটের অধীনে।
সেনেট মনে করেছিলেন চ্যাপলিনের বয়স কম, তাই পর্দার সামনে আনা হয়নি শুরুতে। সেই সময় চ্যাপলিন পর্দার আড়ালে থেকে শিখতে থাকেন চলচ্চিত্র নির্মাণের শিল্প। তার প্রথম সিনেমা পর্দায় আসে ১৯১৪ সালে; মেইকিং আ লিভিং নামক এক রিলের চলচ্চিত্র। চ্যাপলিনে নিজের পছন্দ না হলেও, দর্শকদের কাছে কুড়িয়েছিলেন প্রশংসা।
তবে তার আসল প্রতিভা সামনে আসে দ্বিতীয় সিনেমাতে। কস্টিউম রুমে বসে চ্যাপলিন চিন্তা করছিলেন, কীভাবে তার নিজের ব্যক্তিত্ব ও জীবনের গল্প নিয়ে আসা যায় চলচ্চিত্রের চরিত্রে। জন্ম হয় তার সবচেয়ে পরিচিত্র চরিত্র ট্র্যাম্প-এর; টাইট কোট, টুপি ও হাতে লাঠিওয়ালা সেই দরিদ্র ও দুর্ভাগা ব্যক্তি যাকে বয়স্ক দেখানোর জন্য মুখে লাগিয়েছিলেন ছোট গোঁফ। ফিল্মের নাম মেবেল’স স্ট্রেঞ্জ প্রেডিকামেন্ট ।
যদিও ট্র্যাম্প-কে পরিচালকদের পছন্দ হয়নি প্রথমে, এবং চ্যাপলিনের সাথে অনেক পরিচালকের বাক-বিতন্ডার পর তার কন্ট্রাক্ট বাতিলের কথাও ভাবছিলেন সেনেট। তবে জনপ্রিয়তার কারণে যখন বিভিন্ন থিয়েটার থেকে ট্র্যাম্প চরিত্রের আরও চলচ্চিত্রের অনুরোধ আসতে থাক, তখন সেনেট চ্যাপলিনকে পরের সিনেমাটি পরিচালনারও সুযোগ দেন।
পরিচালক হিসেবে চার্লি চ্যাপলিনের অভিষেক হয় ১৯১৪ সালের মে মাসে; সিনেমার নাম কট ইন দ্য রেইন । এরপর থেকে কিস্টোন স্টুডিওসের যত সিনেমা করেন চ্যাপলিন, তার প্রায় প্রত্যেকটি পরিচালনা করেন তিনি নিজেই।
একই বছর সপ্তাহে এক হাজার ডলারের মজুরিতে যোগ দেন শিকাগোর এসানে স্টুডিওসে।
১৯১৫ সালের মধ্যে চার্লি চ্যাপলিন হয়ে ওঠেন একজন আইকন। ট্র্যাম্প চরিত্রের মার্চেন্ডাইজ বিক্রি হতে থাকে দোকানে দোকানে, তার চেহারা দিয়ে বের হয় কার্টুন, কমিক্স। মোশন পিকচার ম্যাগাজিনে লেখা হয়, "আমেরিকাজুড়ে চ্যাপলিনাইটিস ছড়িয়ে পড়েছে।” তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের প্রথম 'ইন্টারন্যাশনাল স্টার'।
ছাব্বিশ বছর বয়সে চ্যাপলিন মিউচুয়াল ফিল্ম কর্পোরেশনের সাথে বছরে সাড়ে ৬ লাখ ডলারেরও বেশি কন্ট্রাক্ট সই করেন এবং হয়ে যান সে সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়াদের একজন।
মিউচুয়ালের সাথে কন্ট্রাক্ট শেষ হওয়ার পর চ্যাপলিন ভাই সিডনিকে তার বিজনেস ম্যানেজার করেন। ১৯১৭ সালে চ্যাপলিন ফার্স্ট ন্যাশনাল এক্সিবিটর’স সার্কিটের সাথে এক মিলিয়ন ডলারে আটটি সিনেমা বানানোর চুক্তি সই করেন।
পাঁচ একর জমিতে তিনি নিজের স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়। তিনি এই পর্যায়ে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯১৯ সালে চার্লি চ্যাপলিন, ম্যারি পিকফোর্ড ও পরিচালক ডি ডাব্লিউ গ্রিফিথ মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ইউনাইটেড আর্টিস্টস নামক ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।
শিল্পীদের নিয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানে তারা নিজেদের চলচ্চিত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। ১৯১৮ সালে চ্যাপলিন বিয়ে করেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী মিল্ড্রেড হ্যারিসকে। ১৯১৯ সালে তার প্রথম সন্তান নর্মান চ্যাপলিনের জন্ম হয়, তবে মারা যায় তিন দিনে বয়সেই এবং আস্তে আস্তে তার বিয়ে ভেঙে যায়।
১৯২১ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র দ্য কিড, যেখানে উঠে আসে তার কষ্টকর শৈশব ও সন্তান হারানোর বেদনা। ১৯২৪ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন, এবার ১৬ বছর বয়সী লিটা গ্রে-কে। তাদের প্রথম ছেলের জন্ম হয় ১৯২৫ সালের মে মাসে, নাম রাখা হয় তৃতীয় চার্লি চ্যাপলিন। সে বছরই চ্যাপলিন হন প্রথম অভিনেতা যাকে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ফিচার করা হয়। পরের বছর জন্ম হয় তাদের দ্বিতীয় ছেলে সিডনি আর্ল চ্যাপলিনের। ১৯২৭ সালে সন্তানদের নিয়ে চলে যান লিটা, এবং তালাক দেন চার্লিকে।
লিটা চার্লির বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, দুর্ব্যবহার ও বিকৃত যৌন চর্চার অভিযোগ তোলেন, যা দ্রুতই হয়ে যায় গণমাধ্যমে হেডলাইন। অবশেষে ছয় লাখ ডলারের সেটেলমেন্ট দিয়ে তালাকের মামলা সমাপ্ত হয়। তবে চ্যাপলিনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা স্ক্যান্ডেলের মুখে টিকে থাকে।
এই সময়ে হলিউডে সবাক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে, এবং সাইলেন্ট ফিল্মের অভিনেতারা হারাতে থাকেন জীবিকা। তবে নিজের চলচ্চিত্রের ফর্মুলা বদলাননি চ্যাপলিন। তৈরি করেন সিটি লাইটস, যা মুক্তি পায় ১৯৩১ সালে এবং যা ব্যবসা করে ৩ মিলিয়ন ডলার।
১৯৩৯ সালে যখন ইউরোপ জুড়ে ফ্যাসিবাদের উত্থান দেখা যাচ্ছিল, তখন চ্যাপলিন তার গোঁফের সাথে অ্যাডলফ হিটলারের গোঁফের মিল খেয়াল করেন এবং তাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি করেন দ্য গ্রেইট ডিকটেটর । রাজনৈতিক বার্তা পরিস্কারভাবে দেওয়ার জন্য, প্রথমবারের মতো যুক্ত করেন সংলাপ। চলচ্চিত্রটি শেষ করেন একটি পাঁচ মিনিটের বক্তৃতা দিয়ে, যা এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র সিনগুলোর একটি। এখান থেকে চার্লি চ্যাপলিন শুধুমাত্র একজন কমেডিয়ান থেকে হয়ে যান একজন রাজনৈতিক ফিগার। সিনেমাটি সেবারের অস্কারে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে নমিনেশন পায়।
১৯৪৭ সালে চ্যাপলিনের ওপর তদন্ত শুরু করে এফবিআই। আমেরিকান সরকারের সন্দেহ তিনি একজন কমিউনিস্ট। তখন আমেরিকায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের গ্রেফতার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বন্ধুত্বের ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণই ছিল এর মূল কারণ।
চ্যাপলিন তার পরবর্তী চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে লন্ডনের দিকে রওনা দেয়ার পরপরই জানতে পারেন, তার যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় প্রবেশের অধিকার বাতিল করা হয়েছে। আর ফেরার চেষ্টাও করেননি। আমেরিকার বাড়ি, স্টুডিও ও ইউনাইটেড আর্টিস্টসে তার শেয়ার বিক্রি করে দেন। স্ত্রী উনা ও’নিলও আমেরিকান নাগরিকত্ব প্রত্যাখান করে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
ষাটের দশক থেকে ধীরে ধীরে আমেরিকায় চ্যাপলিনকে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠতে থাকে। ১৯৭২ সালে অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স, আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস চ্যাপলিনকে আমেরিকায় আসার নিমন্ত্রণ জানান একটি সম্মানসূচক বা অনারারি অস্কার গ্রহণ করতে। অনেক চিন্তাভাবনার পর তা গ্রহণ করতে দুই দশক পর আমেরিকায় ফেরেন চ্যাপলিন। অ্যাওয়ার্ড গ্রহণের সময় তাকে ১২ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন দেওয়া হয়। তার কিছু পরেই তাকে নাইট সম্মাননা দেন রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
১৯৭৭ সালের বড় দিনে চার্লি চ্যাপলিন ৮৮ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বের মানুষের মুখে হাসি ও চলচ্চিত্রের জগতে বিপ্লব আনা এই কিংবদন্তি জন্মেছিলেন ১৩৭ বছর আছে আজকের দিনে, ১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিলে।