কুইন অফ ফান টাইমস: কেন আশা ভোঁসলে ছিলেন আমাদের প্রথম ‘রকস্টার’
আট দশকের সঙ্গীতের ক্যারিয়ার আর ১২ হাজার গানের অমর সৃষ্টি; আশা ভোঁসলে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেমের মধ্যে থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’ করা যায়।
জিয়াদ মুবাশ্বির ইসলাম
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএমআপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
সময়টা ১৯৪৩, রেকর্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে ১০ বছরের একটি মেয়ে। বাবার অকাল মৃত্যুর পর বড় বোনের হাত ধরে প্রথমবার রেকর্ডিংয়ের জন্য মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো। মারাঠি সিনেমা মাঝা বাল-এর জন্য গাওয়া সেই গানটি কেবল একটি ক্যারিয়ারের শুরু ছিল না, বরং ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমার গানের ব্যাকরণ বদলে দেওয়া এক দীর্ঘ মহাকাব্যিক ইতিহাসের শুরু। ১২ই এপ্রিল ২০২৬ সালের রবিবার যখন ৯২ বছর বয়সী আশা ভোঁসলের মৃত্যুর খবর এলো, তখন মনে হচ্ছে সেই ছোট্ট মেয়েটি আসলে আমাদের কয়েক প্রজন্মকে আধুনিক সুরের এক অবিরাম পাঠশালায় বসিয়ে বিদায় নিলেন।
আমার বেড়ে ওঠাটা পশ্চিমা রক মিউজিকের হাত ধরে। পিংক ফ্লয়েড, লেড জেপলিন, আয়রন মেইডেন কিংবা নির্ভানা-এর 'ডিস্টর্টেড' গিটারের সাউন্ডেই আমার নেশা। আমাদের প্রজন্মের অনেকের মতোই দেশি ক্ল্যাসিকাল বা প্লে-ব্যাক নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না।
কিন্তু একদিন বাবার লং প্লে বা এলপি, এখন যেটাকে আবার ভাইনাল বলে, সেই কালেকশন ঘাটতে গিয়ে কী মনে করে যেন রাহুল দেব (আরডি) বর্মণের কোনো একটি কম্পাইলেশনের রেকর্ড প্লেয়ারে দিলাম। স্পিকার থেকে বেরিয়ে এলো 'দম মারো দম'-এর সেই কাল্ট ওপেনিং নোট আর মায়াবী অথচ বিদ্রোহী এক কণ্ঠ।
মুহূর্তেই আমার সব ভুল ভেঙে গেল! বুঝলাম ‘ফ্লাওয়ার পাওয়ার মুভমেন্ট’ বা ‘সাইকেডেলিক রক’ কেবল বিটলস, পিংক ফ্লয়েড বা লেড জেপলিন করে নাই, আমাদের এখানে একজন শাড়ি পরা আশা ভোঁসলে সেটা সেই তখনই ‘পারফেক্টলি ডেলিভার’ করে দিয়ে গেছেন।
বড় বোনের ছায়া থেকে নিজস্ব জগৎ
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের গ্রাফ দেখলে বোঝা যায় তার লড়াইটা ছিল দ্বিমুখী। একদিকে তখনকার পুরুষতান্ত্রিক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, অন্যদিকে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর। লতা যখন তার ‘ডিভাইন’ এবং ‘পারফেক্ট’ কণ্ঠ দিয়ে মন্দিরের পবিত্রতা আর নায়িকার আদর্শবাদ তুলে ধরছেন, আশা তখন হলেন ‘অপূর্ণ’ নারী, তিনি হলেন ‘ভ্যাম্প’, তিনি হলেন ক্যাবারে ড্যান্সার কিংবা সেই প্রেমিকা যে সরাসরি নিজের অধিকার দাবি করে।
লতা যদি হন পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলো, তবে আশা ছিলেন নিওন লাইটের সেই চঞ্চলতা যা কেবলই রাতকে জাগিয়ে রাখে।
গানের এই বিদ্রোহী ‘অ্যাটিচিউড’-ই আশা ভোঁসলেকে আমাদের মতো মিলেনিয়ালদের কাছে করে তুলেছে আইকনিক, হয়তোবা জেন-জি'দের কাছেও। তথাকথিত ‘ভদ্র’ গায়কীর বাইরে গিয়ে গানের ভেতর ‘সিক্সথ সেন্স’ বা ‘সেন্সুয়ালিটি’ যোগ করেছিলেন তিনি।
নিজের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। শুরুতে তাকে বলা হতো লতা বা গীতা দত্তের বিকল্প, কিন্তু ১৯৫৭ সালে ওপি নাইয়ারের নায়া দৌড় সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন যে তার কণ্ঠের 'টেক্সচার' একদম আলাদা। নাইয়ারের সেই ঘোড়ার খুরের তালের সাথে আশা ভোঁসলের কণ্ঠের তাল মিলিয়ে চলা ছিল ভারতীয় পপ মিউজিকের প্রথম দিককার সফলতম এক্সপেরিমেন্ট।
আরডি বর্মণ আর জুতার হিল থেকে আসা সেই সুর
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের মোড় একদম ঘুরে যায় যখন আরডি বর্মণের সাথে তার কেমিস্ট্রিটা তৈরি হলো। পঞ্চমের (আরডি বর্মণের ডাক নাম) মিউজিক্যাল এক্সপেরিমেন্টগুলোর একমাত্র যোগ্য পার্টনার ছিলেন তিনি।
তিসরি মাঞ্জিল সিনেমাতে তারা দুজনে মিলে বলিউড মিউজিকের ব্যাকরণ বদলে দিলেন। ‘আজা আজা মে হু পেয়ার তেরা’ গানে ড্রামস আর ইলেকট্রিক গিটারের মাঝে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ যেন নিজেই একটা আলাদা জ্যাজ ইনস্ট্রুমেন্টাল!
মজার একটা তথ্য জানা যায়, অনেক সময় রেকর্ডিং স্টুডিওতে কাঙ্ক্ষিত সাউন্ড না পেলে আশা ভোঁসলে তার জুতার হিল দিয়ে মেঝেতে টোকা দিয়ে বিট তৈরি করতেন। এই যে স্বতঃস্ফূর্ততা, এটাই তাকে একজন রকস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কেবল সুরে গাওয়ার জন্য গাননি তিনি, শব্দ নিয়ে খেলেছেন। ‘পিয়া তু আব তো আযা’ গানে তার সেই হাঁপানোর শব্দ—এগুলো হয়তো এখনকার দিনে কোন ব্যাপার না। কিন্তু সেই সত্তরের দশকের শুরুতে উপমহাদেশের কোনো গায়িকা তা করার কথা ভাবলে হয়তো হাসাহাসি হতো, কিন্তু আশা ভোঁসলে সেটাকেই আর্টে পরিণত করেছিলেন।
ভার্সেটালিটি: যখন গজল আর পপ হাত ধরাধরি করে চলে
আশা ভোঁসলের অনন্যতা কেবল তার চপলতায় নয়, বরং তা অবিশ্বাস্যভাবে পাল্টে দিতে পারার ক্ষমতায়।
যখন সবাই তাকে ‘ক্যাবারে কুইন’ হিসেবে তকমা দিয়ে দিয়েছিল, তখনই তিনি মুজাফফর আলীর উমরাও জান সিনেমার গান দিয়ে সবাইকে স্তব্ধ করে দিলেন। খৈয়ামের সুরে সেই গজল ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখো কি মাস্তি কে’ শুনলে মনেই হয় না এটা সেই একই শিল্পী যিনি ‘পিয়া তু আব তো আযা’ গেয়েছেন!
বলা হয় খৈয়াম নাকি তাকে তার গলার ন্যাচারাল স্কেল থেকে কয়েক ধাপ নিচে গাইতে বলেছিলেন। সেই গম্ভীর, মায়াবী আর বিষণ্ণ কণ্ঠের আশা ভোঁসলে ছিল এক নতুন আবিষ্কার। প্রমাণ দিয়ে দিয়েছিলেন যে তার গায়কীর রেইঞ্জ কতটা ডাইনামিক!
এখন জেন জি-রা যেভাবে কোলাবরেশন নিয়ে মেতে থাকে, আশা ভোঁসলে সেটা বহু আগেই করে দেখিয়েছেন। তিনি যখন বয় জর্জের সাথে গান গেয়েছেন কিংবা ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সাথে কাজ করছেন, তখন তিনি কেবল একজন প্লে-ব্যাক সিঙ্গার নন, বরং একজন গ্লোবাল মিউজিক আইকন।
আশা ভোঁসলের কণ্ঠের কোনো বয়স ছিল না। নব্বইয়ের দশকে এআর রহমানের সঙ্গীত পরিচালনায় রাঙ্গিলা সিনেমার জন্য যখন তিনি ‘তানহা তানহা’ গানটি গাইলেন, তখন তার বয়স ষাটেরও বেশি! কিন্তু গান শুনে কে তা বলবে!
তার কণ্ঠের সেই চিরযৌবনা ভাবটাই তাকে আজও আমাদের কানকে ফ্রেশ রাখে। অটো-টিউনের এই যুগে যেখানে গায়কদের কণ্ঠ আলাদা করা কঠিন, সেখানে আশা ভোঁসলের সেই ‘রাফনেস’, সেই ‘টেক্সচার’ আর ‘পারফেক্ট থ্রোয়িং’ ছিল এক বিরল আশীর্বাদ।
আমার মতো যারা হার্ড রক বা মেটাল শুনে যারা বড় হয়েছে, তাদের কাছে আশা ভোঁসলের গ্রহণযোগ্যতা তার সেই ‘অ্যাটিচিউড’-এর জন্যই। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেমের মধ্যে থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’ করা যায়।
বাবার সেই পুরনো এলপি কালেকশনে যে আগুনটা আমি প্রথমবার টের পেয়েছিলাম, এখন বুঝি যে সেই আগুনটাই আসলে উপমহাদেশীয় সঙ্গীতের আধুনিকতার মশাল ছিল।
আশা ভোঁসলে মানে কেবল হাজার হাজার গান নয়, আশা ভোঁসলে মানে জীবনকে উদযাপনের মাধ্যম। তিনি চলে গেলেন মানে আমাদের 'ফান টাইমস'-এর ছাদটা সরে গেল। কিন্তু যতক্ষণ ডিজিটাল প্লে-লিস্ট আছে, যতক্ষণ পুরনো এলপির সেই ধুলোমাখা ঘ্রাণ আছে, ততক্ষণ ‘আশা টাইপ’ এনার্জি আমাদের রক্তে মিশে থাকবে।
আশা ভোঁসলে, আপনার গানগুলো আমাদের রক কনসার্টের মতোই চিরকাল আমাদের অ্যাড্রিনালিন বাড়িয়ে চলবে।
কুইন অফ ফান টাইমস: কেন আশা ভোঁসলে ছিলেন আমাদের প্রথম ‘রকস্টার’
আট দশকের সঙ্গীতের ক্যারিয়ার আর ১২ হাজার গানের অমর সৃষ্টি; আশা ভোঁসলে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেমের মধ্যে থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’ করা যায়।
সময়টা ১৯৪৩, রেকর্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে ১০ বছরের একটি মেয়ে। বাবার অকাল মৃত্যুর পর বড় বোনের হাত ধরে প্রথমবার রেকর্ডিংয়ের জন্য মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো। মারাঠি সিনেমা মাঝা বাল-এর জন্য গাওয়া সেই গানটি কেবল একটি ক্যারিয়ারের শুরু ছিল না, বরং ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমার গানের ব্যাকরণ বদলে দেওয়া এক দীর্ঘ মহাকাব্যিক ইতিহাসের শুরু। ১২ই এপ্রিল ২০২৬ সালের রবিবার যখন ৯২ বছর বয়সী আশা ভোঁসলের মৃত্যুর খবর এলো, তখন মনে হচ্ছে সেই ছোট্ট মেয়েটি আসলে আমাদের কয়েক প্রজন্মকে আধুনিক সুরের এক অবিরাম পাঠশালায় বসিয়ে বিদায় নিলেন।
আমার বেড়ে ওঠাটা পশ্চিমা রক মিউজিকের হাত ধরে। পিংক ফ্লয়েড, লেড জেপলিন, আয়রন মেইডেন কিংবা নির্ভানা-এর 'ডিস্টর্টেড' গিটারের সাউন্ডেই আমার নেশা। আমাদের প্রজন্মের অনেকের মতোই দেশি ক্ল্যাসিকাল বা প্লে-ব্যাক নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না।
কিন্তু একদিন বাবার লং প্লে বা এলপি, এখন যেটাকে আবার ভাইনাল বলে, সেই কালেকশন ঘাটতে গিয়ে কী মনে করে যেন রাহুল দেব (আরডি) বর্মণের কোনো একটি কম্পাইলেশনের রেকর্ড প্লেয়ারে দিলাম। স্পিকার থেকে বেরিয়ে এলো 'দম মারো দম'-এর সেই কাল্ট ওপেনিং নোট আর মায়াবী অথচ বিদ্রোহী এক কণ্ঠ।
মুহূর্তেই আমার সব ভুল ভেঙে গেল! বুঝলাম ‘ফ্লাওয়ার পাওয়ার মুভমেন্ট’ বা ‘সাইকেডেলিক রক’ কেবল বিটলস, পিংক ফ্লয়েড বা লেড জেপলিন করে নাই, আমাদের এখানে একজন শাড়ি পরা আশা ভোঁসলে সেটা সেই তখনই ‘পারফেক্টলি ডেলিভার’ করে দিয়ে গেছেন।
বড় বোনের ছায়া থেকে নিজস্ব জগৎ
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের গ্রাফ দেখলে বোঝা যায় তার লড়াইটা ছিল দ্বিমুখী। একদিকে তখনকার পুরুষতান্ত্রিক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, অন্যদিকে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর। লতা যখন তার ‘ডিভাইন’ এবং ‘পারফেক্ট’ কণ্ঠ দিয়ে মন্দিরের পবিত্রতা আর নায়িকার আদর্শবাদ তুলে ধরছেন, আশা তখন হলেন ‘অপূর্ণ’ নারী, তিনি হলেন ‘ভ্যাম্প’, তিনি হলেন ক্যাবারে ড্যান্সার কিংবা সেই প্রেমিকা যে সরাসরি নিজের অধিকার দাবি করে।
লতা যদি হন পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলো, তবে আশা ছিলেন নিওন লাইটের সেই চঞ্চলতা যা কেবলই রাতকে জাগিয়ে রাখে।
গানের এই বিদ্রোহী ‘অ্যাটিচিউড’-ই আশা ভোঁসলেকে আমাদের মতো মিলেনিয়ালদের কাছে করে তুলেছে আইকনিক, হয়তোবা জেন-জি'দের কাছেও। তথাকথিত ‘ভদ্র’ গায়কীর বাইরে গিয়ে গানের ভেতর ‘সিক্সথ সেন্স’ বা ‘সেন্সুয়ালিটি’ যোগ করেছিলেন তিনি।
নিজের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। শুরুতে তাকে বলা হতো লতা বা গীতা দত্তের বিকল্প, কিন্তু ১৯৫৭ সালে ওপি নাইয়ারের নায়া দৌড় সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন যে তার কণ্ঠের 'টেক্সচার' একদম আলাদা। নাইয়ারের সেই ঘোড়ার খুরের তালের সাথে আশা ভোঁসলের কণ্ঠের তাল মিলিয়ে চলা ছিল ভারতীয় পপ মিউজিকের প্রথম দিককার সফলতম এক্সপেরিমেন্ট।
আরডি বর্মণ আর জুতার হিল থেকে আসা সেই সুর
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের মোড় একদম ঘুরে যায় যখন আরডি বর্মণের সাথে তার কেমিস্ট্রিটা তৈরি হলো। পঞ্চমের (আরডি বর্মণের ডাক নাম) মিউজিক্যাল এক্সপেরিমেন্টগুলোর একমাত্র যোগ্য পার্টনার ছিলেন তিনি।
তিসরি মাঞ্জিল সিনেমাতে তারা দুজনে মিলে বলিউড মিউজিকের ব্যাকরণ বদলে দিলেন। ‘আজা আজা মে হু পেয়ার তেরা’ গানে ড্রামস আর ইলেকট্রিক গিটারের মাঝে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ যেন নিজেই একটা আলাদা জ্যাজ ইনস্ট্রুমেন্টাল!
মজার একটা তথ্য জানা যায়, অনেক সময় রেকর্ডিং স্টুডিওতে কাঙ্ক্ষিত সাউন্ড না পেলে আশা ভোঁসলে তার জুতার হিল দিয়ে মেঝেতে টোকা দিয়ে বিট তৈরি করতেন। এই যে স্বতঃস্ফূর্ততা, এটাই তাকে একজন রকস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কেবল সুরে গাওয়ার জন্য গাননি তিনি, শব্দ নিয়ে খেলেছেন। ‘পিয়া তু আব তো আযা’ গানে তার সেই হাঁপানোর শব্দ—এগুলো হয়তো এখনকার দিনে কোন ব্যাপার না। কিন্তু সেই সত্তরের দশকের শুরুতে উপমহাদেশের কোনো গায়িকা তা করার কথা ভাবলে হয়তো হাসাহাসি হতো, কিন্তু আশা ভোঁসলে সেটাকেই আর্টে পরিণত করেছিলেন।
ভার্সেটালিটি: যখন গজল আর পপ হাত ধরাধরি করে চলে
আশা ভোঁসলের অনন্যতা কেবল তার চপলতায় নয়, বরং তা অবিশ্বাস্যভাবে পাল্টে দিতে পারার ক্ষমতায়।
যখন সবাই তাকে ‘ক্যাবারে কুইন’ হিসেবে তকমা দিয়ে দিয়েছিল, তখনই তিনি মুজাফফর আলীর উমরাও জান সিনেমার গান দিয়ে সবাইকে স্তব্ধ করে দিলেন। খৈয়ামের সুরে সেই গজল ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখো কি মাস্তি কে’ শুনলে মনেই হয় না এটা সেই একই শিল্পী যিনি ‘পিয়া তু আব তো আযা’ গেয়েছেন!
বলা হয় খৈয়াম নাকি তাকে তার গলার ন্যাচারাল স্কেল থেকে কয়েক ধাপ নিচে গাইতে বলেছিলেন। সেই গম্ভীর, মায়াবী আর বিষণ্ণ কণ্ঠের আশা ভোঁসলে ছিল এক নতুন আবিষ্কার। প্রমাণ দিয়ে দিয়েছিলেন যে তার গায়কীর রেইঞ্জ কতটা ডাইনামিক!
ভারতীয় সঙ্গীতের প্রথম ‘গ্লোবাল কোলাবরেটর’
এখন জেন জি-রা যেভাবে কোলাবরেশন নিয়ে মেতে থাকে, আশা ভোঁসলে সেটা বহু আগেই করে দেখিয়েছেন। তিনি যখন বয় জর্জের সাথে গান গেয়েছেন কিংবা ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সাথে কাজ করছেন, তখন তিনি কেবল একজন প্লে-ব্যাক সিঙ্গার নন, বরং একজন গ্লোবাল মিউজিক আইকন।
আশা ভোঁসলের কণ্ঠের কোনো বয়স ছিল না। নব্বইয়ের দশকে এআর রহমানের সঙ্গীত পরিচালনায় রাঙ্গিলা সিনেমার জন্য যখন তিনি ‘তানহা তানহা’ গানটি গাইলেন, তখন তার বয়স ষাটেরও বেশি! কিন্তু গান শুনে কে তা বলবে!
তার কণ্ঠের সেই চিরযৌবনা ভাবটাই তাকে আজও আমাদের কানকে ফ্রেশ রাখে। অটো-টিউনের এই যুগে যেখানে গায়কদের কণ্ঠ আলাদা করা কঠিন, সেখানে আশা ভোঁসলের সেই ‘রাফনেস’, সেই ‘টেক্সচার’ আর ‘পারফেক্ট থ্রোয়িং’ ছিল এক বিরল আশীর্বাদ।
আমার মতো যারা হার্ড রক বা মেটাল শুনে যারা বড় হয়েছে, তাদের কাছে আশা ভোঁসলের গ্রহণযোগ্যতা তার সেই ‘অ্যাটিচিউড’-এর জন্যই। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেমের মধ্যে থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’ করা যায়।
বাবার সেই পুরনো এলপি কালেকশনে যে আগুনটা আমি প্রথমবার টের পেয়েছিলাম, এখন বুঝি যে সেই আগুনটাই আসলে উপমহাদেশীয় সঙ্গীতের আধুনিকতার মশাল ছিল।
আশা ভোঁসলে মানে কেবল হাজার হাজার গান নয়, আশা ভোঁসলে মানে জীবনকে উদযাপনের মাধ্যম। তিনি চলে গেলেন মানে আমাদের 'ফান টাইমস'-এর ছাদটা সরে গেল। কিন্তু যতক্ষণ ডিজিটাল প্লে-লিস্ট আছে, যতক্ষণ পুরনো এলপির সেই ধুলোমাখা ঘ্রাণ আছে, ততক্ষণ ‘আশা টাইপ’ এনার্জি আমাদের রক্তে মিশে থাকবে।
আশা ভোঁসলে, আপনার গানগুলো আমাদের রক কনসার্টের মতোই চিরকাল আমাদের অ্যাড্রিনালিন বাড়িয়ে চলবে।
বিদায়, কুইন অফ ফান টাইমস!
রেস্ট ইন মেলোডি!