কুইন অফ ফান টাইমস: কেন আশা ভোঁসলে ছিলেন আমাদের প্রথম ‘রকস্টার’
আট দশকের সঙ্গীতের ক্যারিয়ার আর ১২ হাজার অমর সৃষ্টি। আশা ভোঁসলে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেম থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’করা যায়।
জিয়াদ মুবাশ্বির ইসলাম
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএমআপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
সালটা ১৯৪৩। রেকর্ডিং স্টুডিওতে দাঁড়িয়ে ১০ বছরের একটি মেয়ে। বাবার অকাল মৃত্যুর পর বড় বোনের হাত ধরে স্টুডিওতে প্রথমবার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো। মারাঠি সিনেমা ‘মাঝা বাল’-এর জন্য গাওয়া সেই গানটি কেবল একটি ক্যারিয়ারের শুরু ছিল না, বরং ছিল গানের ব্যাকরণ বদলে দেওয়া এক দীর্ঘ মহাকাব্যিক ইতিহাসের শুরু। ১২ই এপ্রিল ২০২৬ সালে রবিবার ৯২ বছর বয়সে যখন আশা ভোঁসলের মৃত্যুর খবর এলো, তখন মনে হচ্ছে সেই ছোট্ট মেয়েটি আসলে আমাদের কয়েক প্রজন্মকে আধুনিক সুরের এক অবিরাম পাঠশালায় বসিয়ে বিদায় নিলেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমার বেড়ে ওঠা পশ্চিমা রকের হাত ধরে। পিংক ফ্লয়েড, লেড জেপলিন কিংবা নির্ভানার ‘ডিস্টর্টেড’ গিটারের সাউন্ডেই আমার নেশা। আমাদের প্রজন্মের অনেকের মতোই দেশি ক্ল্যাসিকাল বা প্লে-ব্যাক নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু একদিন বাবার লং প্লে বা এলপি, এখন যেটাকে আবার ভাইনাল বলে, সেই কালেকশন ঘাটতে গিয়ে কী যেন মনে করে রাহুল দেব (আরডি) বর্মণের কোনো একটি কম্পাইলেশনের রেকর্ডটা প্লেয়ারে দিলাম, স্পিকার ফেটে বেরিয়ে এলো ‘দম মারো দম’-এর সেই কাল্ট ওপেনিং নোট আর মায়াবী অথচ বিদ্রোহী এক কণ্ঠ। মুহূর্তেই আমার সব ভুল ভেঙে গেল! বুঝলাম ‘ফ্লাওয়ার পাওয়ার মুভমেন্ট’ বা ‘সাইকেডেলিক রক’ কেবল বিটলস বা লেড জেপলিনরা করেনি, আমাদের এখানে একজন শাড়ি পরা আশা ভোঁসলে সেটা অনেক আগেই ‘পারফেক্টলি ডেলিভার’ করে দিয়ে গেছেন।
বড় বোনের ছায়া থেকে নিজস্ব জগৎ
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের গ্রাফ দেখলে বোঝা যায় তার লড়াইটা ছিল দ্বিমুখী। একদিকে তখনকার পুরুষতান্ত্রিক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, অন্যদিকে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর। লতা যখন তার ‘ডিভাইন’ এবং ‘পারফেক্ট’ কণ্ঠ দিয়ে মন্দিরের পবিত্রতা আর নায়িকার আদর্শবাদ তুলে ধরছেন, আশা তখন হলেন ‘অপূর্ণ’ নারী, তিনি হলেন ‘ভ্যাম্প’, তিনি হলেন ক্যাবারে ড্যান্সার কিংবা সেই প্রেমিকা যে সরাসরি নিজের অধিকার দাবি করে। লতা যদি হন পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলো, তবে আশা ছিলেন নিওন লাইটের সেই চঞ্চলতা যা কেবল রাতকে জাগিয়ে রাখে।
গানের এই বিদ্রোহী ‘অ্যাটিচিউডট’-ই আশা ভোঁসলেকে করে তুলেছে আমাদের মতো মিলেনিয়ালদের কাছে আইকনিক, হয়তো বা জেন জিদের কাছেও। তথাকথিত ‘ভদ্র’ গায়কীর বাইরে গিয়ে গানের ভেতর ‘সিক্সথ সেন্স’ বা ‘সেন্সুয়ালিটি’ যোগ করেছিলেন।
নিজের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। শুরুতে তাকে বলা হতো লতা বা গীতা দত্তের বিকল্প, কিন্তু ১৯৫৭ সালে ওপি নাইয়ারের ‘নায়া দৌড়’সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন যে তার কণ্ঠের টেক্সচার একদম আলাদা। নাইয়ারের সেই ঘোড়ার খুরের তালের সাথে আশা ভোঁসলের কণ্ঠের তাল মিলিয়ে চলা ছিল ভারতীয় পপ মিউজিকের প্রথম দিককার সফলতম এক্সপেরিমেন্ট।
আরডি বর্মণ এবং জুতার হিল থেকে আসা সেই সুর
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের মোড় আমূল বদলে যায় যখন তার সাথে আরডি বর্মণের কেমিস্ট্রিটা তৈরি হলো । পঞ্চম (আরডি বর্মণের ডাক নাম)-এর মিউজিক্যাল এক্সপেরিমেন্টগুলোর একমাত্র যোগ্য পার্টনার ছিলেন আশা ভোঁসলেই। ‘তিসরি মাঞ্জিল’ সিনেমার মাধ্যমে তারা দুজনে মিলে বলিউড মিউজিকের ব্যাকরণ বদলে দিলেন। ‘আজা আজা মে হু পেয়ার তেরা’ গানে সেই যে ড্রামস আর ইলেকট্রিক গিটারের ব্যবহার, সেখানে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ ছিল যেন নিজেই একটা আলাদা জ্যাজ ইনস্ট্রুমেন্টাল।
মজার একটা তথ্য জানা যায়, অনেক সময় রেকর্ডিং স্টুডিওতে কাঙ্ক্ষিত সাউন্ড না পেলে আশা ভোঁসলে তার জুতার হিল দিয়ে মেঝেতে টোকা দিয়ে বিট তৈরি করতেন। এই যে স্বতঃস্ফূর্ততা, এটাই তাকে একজন রকস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কেবল সুরে গাওয়ার জন্য গাননি, তিনি শব্দ নিয়ে খেলেছেন। ‘পিয়া তু আব তো আজা’ গানে তার সেই হাঁপানোর শব্দ এগুলো হয়তো এখনকার সময়ে তেমন কোন ব্যাপার না। কিন্তু সেই সত্তরের দশকের শুরুতে উপমহাদেশের কোনো গায়িকা করার কথা ভাবলে হয়তো হাসাহাসি হতো, কিন্তু আশা ভোঁসলে সেটাকেই আর্টে পরিণত করেছিলেন।
ভার্সেটালিটি: যখন গজল আর পপ হাত ধরাধরি করে চলে
আশা ভোঁসলের অনন্যতা কেবল তার চপলতায় নয়, বরং তা অবিশ্বাস্যভাবে পাল্টে যাওয়ার ক্ষমতায়। যখন সবাই তাকে ‘ক্যাবারে কুইন’ হিসেবে তকমা দিয়ে দিয়েছিল, তখনই তিনি মুজাফফর আলীর ‘উমরাও জান’ সিনেমাতে সবাইকে স্তব্ধ করে দিলেন। খৈয়ামের সুরে সেই গজল ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখো কি মস্তি কে’শুনলে মনেই হয় না এটা সেই একই শিল্পী যিনি ‘পিয়া তু আব তো আযা’ গেয়েছেন। বলা হয় খৈয়াম নাকি আশাকে তার গলার ন্যাচারাল স্কেল থেকে কয়েক ধাপ নিচে গাইতে বলেছিলেন। সেই গম্ভীর, মায়াবী আর বিষণ্ণ কণ্ঠের আশা ভোঁসলে ছিল এক নতুন আবিষ্কার। প্রমাণ দিয়ে দিয়েছিলেন যে তার গায়কীর রেইঞ্জ কতটা ডাইনামিক!
এখন জেন জি-রা যেভাবে কোলাবরেশন নিয়ে মেতে থাকে, আশা ভোঁসলে সেটা সত্তরের দশকেই করে দেখিয়েছেন। তিনি যখন ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সাথে কাজ করছেন কিংবা বয় জর্জের সাথে গান গেয়েছেন, তখন তিনি কেবল একজন প্লে-ব্যাক সিঙ্গার নন, বরং একজন গ্লোবাল মিউজিক আইকন।
তার কণ্ঠের কোনো বয়স ছিল না। নব্বইয়ের দশকে এআর রহমানের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘রাঙ্গিলা’ সিনেমার জন্য যখন তিনি ‘তানহা তানহা’ গানটি গাইলেন, তখন তার বয়স ৬০-এর বেশি। কিন্তু শুনে কে বলবে!
তার কণ্ঠের সেই চিরযৌবনা ভাবটাই তাকে আজও আমাদের কানে ফ্রেশ রাখে। অটো টিউনের এই যুগে যেখানে গায়কদের কণ্ঠ আলাদা করা কঠিন, সেখানে আশা ভোঁসলের সেই ‘রাফনেস’, সেই ‘টেক্সচার’ আর ‘পারফেক্ট থ্রোয়িং’ ছিল এক বিরল আশীর্বাদ।
আমার মতো যারা হার্ড রক বা মেটাল শুনে বড় হয়েছে, তাদের কাছেও আশা ভোঁসলের গ্রহণযোগ্যতা তার সেই ‘অ্যাটিচিউড’-এর জন্যই। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেম থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’করা যায়।
বাবার সেই পুরনো এলপি কালেকশনে যে আগুনটা আমি প্রথমবার টের পেয়েছিলাম, আজ বুঝতে পারছি সেই আগুনটাই আসলে উপমহাদেশীয় সঙ্গীতের আধুনিকতার মশাল ছিল।
আশা ভোঁসলে মানে কেবল কয়েক হাজার গান নয়, আশা ভোঁসলে মানে জীবনকে উদযাপনের একটা মাধ্যম। তিনি চলে গেলেন মানে আমাদের 'ফান টাইমস'-এর ছাদটা সরে গেল। কিন্তু যতক্ষণ ডিজিটাল প্লে-লিস্ট আছে, যতক্ষণ পুরনো এলপির সেই ধুলোমাখা ঘ্রাণ আছে, ততক্ষণ ‘আশা টাইপ’ এনার্জি আমাদের রক্তে মিশে থাকবে। আশা ভোঁসলে, আপনার গানগুলো আমাদের রক কনসার্টের মতোই চিরকাল আমাদের অ্যাড্রিনালিন বাড়িয়ে দেবে।
স্মরণ
কুইন অফ ফান টাইমস: কেন আশা ভোঁসলে ছিলেন আমাদের প্রথম ‘রকস্টার’
আট দশকের সঙ্গীতের ক্যারিয়ার আর ১২ হাজার অমর সৃষ্টি। আশা ভোঁসলে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেম থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’করা যায়।
সালটা ১৯৪৩। রেকর্ডিং স্টুডিওতে দাঁড়িয়ে ১০ বছরের একটি মেয়ে। বাবার অকাল মৃত্যুর পর বড় বোনের হাত ধরে স্টুডিওতে প্রথমবার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো। মারাঠি সিনেমা ‘মাঝা বাল’-এর জন্য গাওয়া সেই গানটি কেবল একটি ক্যারিয়ারের শুরু ছিল না, বরং ছিল গানের ব্যাকরণ বদলে দেওয়া এক দীর্ঘ মহাকাব্যিক ইতিহাসের শুরু। ১২ই এপ্রিল ২০২৬ সালে রবিবার ৯২ বছর বয়সে যখন আশা ভোঁসলের মৃত্যুর খবর এলো, তখন মনে হচ্ছে সেই ছোট্ট মেয়েটি আসলে আমাদের কয়েক প্রজন্মকে আধুনিক সুরের এক অবিরাম পাঠশালায় বসিয়ে বিদায় নিলেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমার বেড়ে ওঠা পশ্চিমা রকের হাত ধরে। পিংক ফ্লয়েড, লেড জেপলিন কিংবা নির্ভানার ‘ডিস্টর্টেড’ গিটারের সাউন্ডেই আমার নেশা। আমাদের প্রজন্মের অনেকের মতোই দেশি ক্ল্যাসিকাল বা প্লে-ব্যাক নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু একদিন বাবার লং প্লে বা এলপি, এখন যেটাকে আবার ভাইনাল বলে, সেই কালেকশন ঘাটতে গিয়ে কী যেন মনে করে রাহুল দেব (আরডি) বর্মণের কোনো একটি কম্পাইলেশনের রেকর্ডটা প্লেয়ারে দিলাম, স্পিকার ফেটে বেরিয়ে এলো ‘দম মারো দম’-এর সেই কাল্ট ওপেনিং নোট আর মায়াবী অথচ বিদ্রোহী এক কণ্ঠ। মুহূর্তেই আমার সব ভুল ভেঙে গেল! বুঝলাম ‘ফ্লাওয়ার পাওয়ার মুভমেন্ট’ বা ‘সাইকেডেলিক রক’ কেবল বিটলস বা লেড জেপলিনরা করেনি, আমাদের এখানে একজন শাড়ি পরা আশা ভোঁসলে সেটা অনেক আগেই ‘পারফেক্টলি ডেলিভার’ করে দিয়ে গেছেন।
বড় বোনের ছায়া থেকে নিজস্ব জগৎ
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের গ্রাফ দেখলে বোঝা যায় তার লড়াইটা ছিল দ্বিমুখী। একদিকে তখনকার পুরুষতান্ত্রিক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, অন্যদিকে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর। লতা যখন তার ‘ডিভাইন’ এবং ‘পারফেক্ট’ কণ্ঠ দিয়ে মন্দিরের পবিত্রতা আর নায়িকার আদর্শবাদ তুলে ধরছেন, আশা তখন হলেন ‘অপূর্ণ’ নারী, তিনি হলেন ‘ভ্যাম্প’, তিনি হলেন ক্যাবারে ড্যান্সার কিংবা সেই প্রেমিকা যে সরাসরি নিজের অধিকার দাবি করে। লতা যদি হন পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলো, তবে আশা ছিলেন নিওন লাইটের সেই চঞ্চলতা যা কেবল রাতকে জাগিয়ে রাখে।
গানের এই বিদ্রোহী ‘অ্যাটিচিউডট’-ই আশা ভোঁসলেকে করে তুলেছে আমাদের মতো মিলেনিয়ালদের কাছে আইকনিক, হয়তো বা জেন জিদের কাছেও। তথাকথিত ‘ভদ্র’ গায়কীর বাইরে গিয়ে গানের ভেতর ‘সিক্সথ সেন্স’ বা ‘সেন্সুয়ালিটি’ যোগ করেছিলেন।
নিজের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। শুরুতে তাকে বলা হতো লতা বা গীতা দত্তের বিকল্প, কিন্তু ১৯৫৭ সালে ওপি নাইয়ারের ‘নায়া দৌড়’সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন যে তার কণ্ঠের টেক্সচার একদম আলাদা। নাইয়ারের সেই ঘোড়ার খুরের তালের সাথে আশা ভোঁসলের কণ্ঠের তাল মিলিয়ে চলা ছিল ভারতীয় পপ মিউজিকের প্রথম দিককার সফলতম এক্সপেরিমেন্ট।
আরডি বর্মণ এবং জুতার হিল থেকে আসা সেই সুর
আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের মোড় আমূল বদলে যায় যখন তার সাথে আরডি বর্মণের কেমিস্ট্রিটা তৈরি হলো । পঞ্চম (আরডি বর্মণের ডাক নাম)-এর মিউজিক্যাল এক্সপেরিমেন্টগুলোর একমাত্র যোগ্য পার্টনার ছিলেন আশা ভোঁসলেই। ‘তিসরি মাঞ্জিল’ সিনেমার মাধ্যমে তারা দুজনে মিলে বলিউড মিউজিকের ব্যাকরণ বদলে দিলেন। ‘আজা আজা মে হু পেয়ার তেরা’ গানে সেই যে ড্রামস আর ইলেকট্রিক গিটারের ব্যবহার, সেখানে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ ছিল যেন নিজেই একটা আলাদা জ্যাজ ইনস্ট্রুমেন্টাল।
মজার একটা তথ্য জানা যায়, অনেক সময় রেকর্ডিং স্টুডিওতে কাঙ্ক্ষিত সাউন্ড না পেলে আশা ভোঁসলে তার জুতার হিল দিয়ে মেঝেতে টোকা দিয়ে বিট তৈরি করতেন। এই যে স্বতঃস্ফূর্ততা, এটাই তাকে একজন রকস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কেবল সুরে গাওয়ার জন্য গাননি, তিনি শব্দ নিয়ে খেলেছেন। ‘পিয়া তু আব তো আজা’ গানে তার সেই হাঁপানোর শব্দ এগুলো হয়তো এখনকার সময়ে তেমন কোন ব্যাপার না। কিন্তু সেই সত্তরের দশকের শুরুতে উপমহাদেশের কোনো গায়িকা করার কথা ভাবলে হয়তো হাসাহাসি হতো, কিন্তু আশা ভোঁসলে সেটাকেই আর্টে পরিণত করেছিলেন।
ভার্সেটালিটি: যখন গজল আর পপ হাত ধরাধরি করে চলে
আশা ভোঁসলের অনন্যতা কেবল তার চপলতায় নয়, বরং তা অবিশ্বাস্যভাবে পাল্টে যাওয়ার ক্ষমতায়। যখন সবাই তাকে ‘ক্যাবারে কুইন’ হিসেবে তকমা দিয়ে দিয়েছিল, তখনই তিনি মুজাফফর আলীর ‘উমরাও জান’ সিনেমাতে সবাইকে স্তব্ধ করে দিলেন। খৈয়ামের সুরে সেই গজল ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখো কি মস্তি কে’শুনলে মনেই হয় না এটা সেই একই শিল্পী যিনি ‘পিয়া তু আব তো আযা’ গেয়েছেন। বলা হয় খৈয়াম নাকি আশাকে তার গলার ন্যাচারাল স্কেল থেকে কয়েক ধাপ নিচে গাইতে বলেছিলেন। সেই গম্ভীর, মায়াবী আর বিষণ্ণ কণ্ঠের আশা ভোঁসলে ছিল এক নতুন আবিষ্কার। প্রমাণ দিয়ে দিয়েছিলেন যে তার গায়কীর রেইঞ্জ কতটা ডাইনামিক!
ভারতীয় সঙ্গীতের প্রথম ‘গ্লোবাল কোলাবরেটর’
এখন জেন জি-রা যেভাবে কোলাবরেশন নিয়ে মেতে থাকে, আশা ভোঁসলে সেটা সত্তরের দশকেই করে দেখিয়েছেন। তিনি যখন ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সাথে কাজ করছেন কিংবা বয় জর্জের সাথে গান গেয়েছেন, তখন তিনি কেবল একজন প্লে-ব্যাক সিঙ্গার নন, বরং একজন গ্লোবাল মিউজিক আইকন।
তার কণ্ঠের কোনো বয়স ছিল না। নব্বইয়ের দশকে এআর রহমানের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘রাঙ্গিলা’ সিনেমার জন্য যখন তিনি ‘তানহা তানহা’ গানটি গাইলেন, তখন তার বয়স ৬০-এর বেশি। কিন্তু শুনে কে বলবে!
তার কণ্ঠের সেই চিরযৌবনা ভাবটাই তাকে আজও আমাদের কানে ফ্রেশ রাখে। অটো টিউনের এই যুগে যেখানে গায়কদের কণ্ঠ আলাদা করা কঠিন, সেখানে আশা ভোঁসলের সেই ‘রাফনেস’, সেই ‘টেক্সচার’ আর ‘পারফেক্ট থ্রোয়িং’ ছিল এক বিরল আশীর্বাদ।
আমার মতো যারা হার্ড রক বা মেটাল শুনে বড় হয়েছে, তাদের কাছেও আশা ভোঁসলের গ্রহণযোগ্যতা তার সেই ‘অ্যাটিচিউড’-এর জন্যই। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে একটা রক্ষণশীল সিস্টেম থেকেও নিজের ‘রুলস’ নিজে ‘সেট’করা যায়।
বাবার সেই পুরনো এলপি কালেকশনে যে আগুনটা আমি প্রথমবার টের পেয়েছিলাম, আজ বুঝতে পারছি সেই আগুনটাই আসলে উপমহাদেশীয় সঙ্গীতের আধুনিকতার মশাল ছিল।
আশা ভোঁসলে মানে কেবল কয়েক হাজার গান নয়, আশা ভোঁসলে মানে জীবনকে উদযাপনের একটা মাধ্যম। তিনি চলে গেলেন মানে আমাদের 'ফান টাইমস'-এর ছাদটা সরে গেল। কিন্তু যতক্ষণ ডিজিটাল প্লে-লিস্ট আছে, যতক্ষণ পুরনো এলপির সেই ধুলোমাখা ঘ্রাণ আছে, ততক্ষণ ‘আশা টাইপ’ এনার্জি আমাদের রক্তে মিশে থাকবে। আশা ভোঁসলে, আপনার গানগুলো আমাদের রক কনসার্টের মতোই চিরকাল আমাদের অ্যাড্রিনালিন বাড়িয়ে দেবে।
বিদায়, কুইন অফ ফান টাইমস!