সামর্থ্যই আসল। নিজের সামর্থ্য না থাকলে পরিবারের সবার কাছেই গঞ্জনা সইতে হয়। কুরবানি ঈদ এলে তাই অকারণেই খলিলের কথা মনে পড়ে। খলিলের সাথে আমার পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কঠিন এক জীবন সংগ্রামের কথা জেনেছিলাম তার কাছ থেকে। ঢাকা শহরের মগবাজার থেকে বাংলামোটর পৌঁছানোর আগে ইস্কাটনের যেখানে কমিউনিটি সেন্টার ছিল, যেখানে বিয়ের অনুষ্ঠান লেগেই থাকতো, মাঝে মাঝে খলিলকে দেখতাম সেখানে।
বিয়েবাড়ির যে খাবার থেকে যেতো, রাতে সেগুলো কমদামে বিক্রি হতো রাস্তায়। খাবারের দোকান ঘিরে কমদামে বিয়ের খাবার খাওয়ার ভীড় জমতো। টিউশনি থেকে ফেরার পথে খলিল মাঝে মধ্যে সেই খাবার কিনে খেতো। যেদিন খলিলকে সেখানে খাবার খেতে প্রথম দেখলাম, খলিলের চোখে তখন বেদনার আলপনা দেখেছিলাম। খলিল বিখ্যাত কবিতার একটা লাইন বলেছিল তখন, ‘ভিখারিদের কী ডাকাত হতে ইচ্ছে করবে না একদিনও?’ (কথোপকথন ১১, পূর্ণেন্দ্র পত্রী)।
কুরবানি ঈদে অনেকেই এক দুই দিনের জন্য ‘ডাকাত’ হয়ে মাংস খেতে সক্ষম হয়। খলিলকে নিয়ে আজ আর কিছু না লিখি। খলিলের সেই দিনের অনুভূতি তার কাছে এখন কেমন সেটা নিয়েও না ভাবি। না ভাবি খলিল এখন কুরবানি দিতে পারে কী, পারে না, সেটা নিয়ে।
প্রথমেই বলেছি যে সবার সামর্থ্য থাকে না। কুরবানি ঈদ এলে অনেকের সেটা মনে হতে পারে। কবি নজরুল যেমন লিখেছিলেন, ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা’, কুরবানি দেয়ার সামর্থ্য তাদের থাকার কথা না। এটা জেনেই হয়তো ‘হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান’-এর কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখতে পারেন কুরবানি নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় কথা ‘মনের পশুরে কর জবাই/ পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই!’
শুরু থেকেই কুরবানি ছিল ধনী-গরিব, ‘আশরাফ-আতরাফ’ সবার জন্য, যা কিছু খারাপ তা বর্জনের জন্য। প্রসঙ্গ যখন এলো তখন খানিকটা বলে রাখা ভালো। ইসলামি পন্ডিতদের মতে হজ পালনের রীতিনীতি শুরু হয়েছিল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের শত শত বছর আগে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সময়কাল থেকেই। তবে এর আগে রেওয়াজ থাকলেও হিজরি দ্বিতীয় সন থেকেই ইসলামে ঈদুল আজহা বা কুরবানি ঈদের প্রচলন হয়।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের পর থেকে যে দশ বছর মদিনায় ছিলেন সেই দশ বছরই তিনি কুরবানি দিয়েছেন এবং তিনি দুটো করে দুম্বা কুরবানি দিতেন। একটা নিজ পরিবার আর অন্যটি মুসলিম উম্মাহর পক্ষে। সম্ভবত দুম্বা বেশি পছন্দ করতেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। পছন্দের জিনিস কিংবা প্রিয় কোনো কিছু উৎসর্গ করা সবচেয়ে বড় ত্যাগ। কুরবানির আসল অনুপ্রেরণা এখানেই। সূরা আল হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে কুরবানির মাধ্যমে আত্মিক উন্নয়ন ও উৎকর্ষ সাধন বা ‘তাকওয়া’ লাভের কথা বলা আছে। অন্তরের পাশবিক চিন্তা ভাবনার কুরবানির কথাই বলা হয়েছে।
কিন্তু কুরবানির অন্তর্হিত দর্শন এখনও কী তেমন আছে? লোক দেখানোর এই যুগে যারা কুরবানি দিতে পারেন না বা যাদের সামর্থ্য থাকে না তাদের বেদনা কয়জন অনুভব করতে পারেন? যারা কুরবানির গোশত নেয়ার জন্য সামর্থ্যবানদের ঘরের দরজায় লাইন দিতে পারেন না তারা কতটা নীরবে ঈদযাপন করেন? আসলে সামর্থ্যহীনদের জন্য কোনো উৎসব থাকে না, উৎসব ধরা দেয় সামর্থ্যবানদের আয়োজনে!
খলিলের মতো অনির্বাণ আর খোকনের কথাও মনে পড়ে খুব। কিশোরকালে আমার কাজ ছিল কুরবানির মাংস কাটা হলে এদের খুঁজে বের করে বাসায় নিয়ে আসা। খাওয়া-দাওয়ার পর ওদের সাথে নিয়ে ওদের বাসায় মাংস পৌঁছানো। অনির্বাণ আর খোকন ছিল এতিম। হারানো দিনের মতো অনির্বাণ আর খোকনকে হারিয়ে ফেলেছি। জানি না ওরা বেঁচে আছে কিনা, অনির্বাণ এখন দেশে আছে কিনা!
কিন্তু ঈদ নামের যে উৎসব, আরব কিংবা এই উপমহাদেশে তার ধরনটা কেমন ছিল? সামর্থ্যহীন আর সামর্থ্যবানদের অবস্থান কেমন ছিল? ইতিহাস কী বলে?
অবিভক্ত বাংলা ও পরবর্তীতে পূর্ববঙ্গে ঈদ উৎসবের স্মৃতি বেশিদিনের না। প্রথম ঈদ পালনের তথ্য মেলে মদিনাতে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে মার্চ। ঈদে মদিনায় বসবাসরত হাবসীরা (আবিসিনিয়া বা বর্তমান ইথিওপিয়ার একাংশের অধিবাসী) লাঠি খেলার আয়োজন করতো এবং প্রিয় মহানবীর স্ত্রী আয়েশার সেই লাঠি খেলা দেখার স্মৃতিও রয়েছে ইসলামের ইতিহাসে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আতর মাখা, সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাক পরা এবং মিষ্টান্ন খাবারের উল্লেখ রয়েছে ঈদ উৎসবের একেবারে প্রথম দিকের দিনগুলোতে।
উৎসবের আঙিনায় নতুন গল্প, সৃষ্টি বা কবিতা লেখা ছিল হাজার হাজার বছর ধরে বাস করে আসা আরব অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য। ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থে সুললিত ছন্দের ব্যাপারটা সম্ভবত এই ধারাবাহিকতারই ফসল। এখনও ঈদকে ঘিরে ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয়।
আমরা এখন যেভাবে ঈদ পালন করি সেই অভ্যাস ক্রমশ গড়ে উঠেছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে। মোঘল আমলের আগে ঈদ পালনের ঐতিহ্য তেমনভাবে ইতিহাসে নেই। এছাড়া বহুদিন ধরে ঈদ পালনের উৎসব দেখা যেতো শুধু শাসকদের মাঝে। শাসকরা চিরকালীন সামর্থ্যবান।
১৬৪০ সালে ঢাকার ধানমন্ডিতে ঈদগাহ তৈরি করেন বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অমাত্য মীর আবুল কাশেম। এই ঈদগাহে ঈদের নামাজ হতো যেখানে নায়েব-সুবেদার-জমিদার এবং অমাত্যরা অংশ নিতেন। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। আজও এই ঈদগাহের অংশবিশেষ রয়েছে ধানমন্ডিতে।
১৮৯০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ঈদের কিছু কিছু রেওয়াজ ঢাকার নবাবদের আয়োজনে দেখতে থাকে ঢাকাবাসী। হাতি ঘোড়া উটের সমাহার, রং বেরংয়ের পতাকা, ‘কাড় নাকাড়া’ তথা ব্যান্ড পার্টির বাজনা-বাদ্যি, রাস্তার দুই ধারের মানুষকে টাকা বিলানো এবং পায়েস-জর্দা ও ফিন্নি খাওয়ানো ছিল আয়োজনের অংশ। সাধারণের চোখে এসব ছিল চোখ-ধাঁধানো উৎসব যেখানে সামর্থ্যহীন বা সাধারণদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। মোঘলরা ভারতীয় মুসলিম ছিলেন না আবার ঢাকার নবাবরা নিজেদের নবাবই মনে করতেন। সাধারণ মানুষেরা ঈদ উৎসবকে ক্রমশ আপন মনে করেছিল হযরত শাহজালাল, শাহজামাল, শাহ মখদুম, শাহ পরান, খানজাহান আলীদের ধর্ম প্রচারের সময়ে।
সুফি মুসলিমদের ধর্ম প্রচার বা ঈদগাহ নির্মাণের সময়গুলোতে সুফিদের সাথে সাধারণ মানুষের যোগ ছিল, শাসক শ্রেণির সাথে কোনো যোগ ছিল না। সাধারণ বা সামর্থ্যহীন মানুষের ভাগ্য চিরকালই একরকম। তারা উৎসব করে না, দূর থেকে দেখে। কমদামে বা বিনামূল্যে গরু ছাগলের গোশত পেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ত্রাণ বা সাহায্য নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা যাওয়ার ইতিহাসও আছে। আর যাদের লজ্জা বা ‘পাছে লোকে কিছু বলে’-এর যোগ আছে তারা সয়ে যায় নীরবে। ঈদ বেশিরভাগ সময়ে তাদের কাছে দূর থেকে দেখা এক দীর্ঘশ্বাসের নাম।
হাল আমলে কুরবানির গরুর তাও বাহারি নাম আছে কিন্তু সামর্থ্যহীনদের কোনো নাম নাই, গোত্র নাই! গত কয়েক বছর ধরে এদেশে কুরবানির ষাড়ের নাম ‘হিরো আলম’, ‘ডিপজল’, ‘সাকিব খান’ কিংবা ‘মেসি’ যেমন আছে তেমনি আছে ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’, তেমনই আছে সাধারণ কিছু নাম। যেমন, লাল বাহাদুর, লালু, কালু, বড়কা, ছোটকা, মোটকা, নয়াদামান আরও কত বাহারি নাম! সাধারণরা যে ইতিহাস গড়ে সেখানে তাদের নাম লেখা থাকে না।
আগে রঙিন কাগজে ‘ঈদ মোবারক’ লিখে সেটা বাড়ির দেয়ালে টানানো হতো। কাগজ আর কাপড় দিয়ে বাড়ি সাজানো হতো। ঈদে এখন আধুনিকতা যোগ হয়েছে। হতে পারে সেটা আয়োজনের আধুনিকায়ন, আতশবাজির মহড়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাহারি ঈদ মোবারকের ডিজাইন প্রকাশ। আগে ঈদ পুনর্মিলনী হতো, হতো ‘ভেতর-বাহির’ (যারা এলাকায় থাকে তারা ভেতর দলে। আর যারা কর্মের কারণে এলাকার বাইরে থাকে তারা বাহির দলে) দুই দলের মধ্যে ফুটবল বা অন্যান্য প্রতিযোগিতার আয়োজন।
এখন ঈদ পুনর্মিলনী হয়, সাথে থাকে ডিজে মিউজিক বা কনসার্টের ব্যবস্থা। আগে মুড়ি-মুড়কি, ফিন্নি-পায়েস, পোলাও-মাংস খাওয়া যেতো আত্মীয় বা প্রতিবেশির বাড়িতে। এখন ঈদে পিৎজা বা বড় কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যায় কেউ কেউ। সালামির টাকা দিয়ে বিদেশ ভ্রমণও চলে।
বদলে গেছে ঈদ পালনের ধরনও। এখন ‘দোস্ত তুই গরু না ছাগল’ এটা জিজ্ঞাসা করার দিন যেন চলে গেছে। আগে কুরবানির পশুর সাথে ছবি তোলার রেওয়াজ ছিল না বললেই চলে। এখন গরু ছাগলের ছবি তুলে ফেসবুকে দেয়াটাও সেকেলে। ইদানিং সময়টা ভিডিও আপলোড করার যুগ। গরু বা ছাগল কেনার দৃশ্য, হাট থেকে নিয়ে আসা, বাসার নিচে গরু রাখা, খাওয়ানো, শেষমেষ জবাই করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা হচ্ছে স্মার্টনেস।
আগের মতো হাটে গিয়ে পশু দামাদামি, গরু ছাগল নিয়ে আসার সময় মানুষের জানতে চাওয়া, ‘ভাই কতো নিলো?’, গরু বা ছাগল কিনে জিতলেন না হারলেন সেই আলোচনা কমে গেছে মনে হয়। হাট থেকে নিয়ে আসার সময়ে গরুর ছুটে যাওয়া এবং প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় সেটা ধরার দৃশ্য এখন আর সহসা চোখে পড়ে না। যারা বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যেতেন তারা কুরবানি ঈদের এই পরিবেশটা মিস করতেন খুব। এখন কুরবানির দৃশ্য আপলোড করাটা ‘কনটেন্ট আপ’। এখন গরু-ছাগল বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে। সময়ের সাথে বদলে যায় অনেক কিছু।
ঈদ যায় কথা থাকে! ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার মতো কুরবানি দেওয়ার ঠিক আগে পশুর চোখে যে অপরিসীম কান্না আর বেদনার স্রোত জাগে মানুষ কি সেটা বুঝতে পারে? আমরা মনের পশু কুরবানি দিতে পারে কয়জনা?



