সত্যজিৎ রায় কি অতর-নির্মাতা?

উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর পৌত্র ও সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালের ২ মে, কলকাতায়। মাত্র দুই বছরের মাথায় পিতৃবিয়োগ ঘটে সত্যজিতের। এতে পারিবারিক ঐতিহ্যমণ্ডিত ছাপাখানা ও শিশুদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’ বন্ধ হয়ে যায়। তবে পত্রিকাটির হাল পরবর্তী সময়ে ধরেন সত্যজিৎ।

আপডেট : ০২ মে ২০২৬, ০২:১৪ পিএম

চৌকস নির্মাতা আর লেখক নির্মাতার ভেতর সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। চৌকস নির্মাতার ধারণাকে ধরতে ফরাসি চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক আদ্রে বাজঁ ব্যবহার করেছিলেন মেতোখঁসেন (metteur-en-scène) শব্দবন্ধটি, মঞ্চ থেকে ধার নিয়ে।

অপরদিকে লেখক বা অতর নির্মাতা (auteur film maker) হিসেবে পরিচিত ধারণাটি আলেক্সান্দার আসট্রুক ও ফ্রাসোঁয়া ত্রুফোর হাত ঘুরে তত্ত্বে রূপ নেয় মার্কিন তাত্ত্বিক অ্যান্ড্রু স্যারিসের লেখায়।

তো এই দুয়ের ভেতর পার্থক্য হলো যিনি মেতোখঁসেন, তিনি একটি ভালো চিত্রনাট্য থেকে ত্রুটিবিহীন চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে দিতে পারেন। কারিগরি দিক থেকে তিনি বেশ চৌকস।

আর একজন অতর নির্মাতা খারাপ চিত্রনাট্য থেকেও একটি ভালো ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ছবি বানিয়ে ফেলতে পারেন। এই অতর নির্মাতার তাই থাকতে হয় একাধারে তিনটি গুণ।

অ্যান্ড্রু স্যারিস এই গুণত্রয়ীকে ব্যাখ্যা করেন সমকেন্দ্রিক তিনটি বৃত্তের (Concentric Circles) মাধ্যমে। যদিও স্যারিসের এই মডেল সমালোচনার উর্ধ্বে নয়, তারপরও আমরা এই কাঠামোটি ধরে আলোচনা শুরু করলাম দুটি কারণে: এক, স্যারিসই অতর নির্মাতার ধারণাকে তত্ত্বায়নে প্রধান ভূমিকা রাখেন। আর তত্ত্বটি এখনো বেশ প্রভাবশালী, তাই এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো কাঠামো ধরে এগোলে নির্মাতার অতর হয়ে ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলতে সহজ হয়।

স্যারিস তিনটি বৃত্ত অঙ্কন করেন যেন সেসব একটি পেয়াঁজের তিনটি খোসা। সবচেয়ে বাইরের খোসা বা বৃত্তটির নাম তিনি দেন ‘টেকনিক’ বা ‘কৌশল’। দ্বিতীয় বৃত্তের পরিচয় ‘পারসোনাল স্টাইল’ বা ‘নিজস্ব শৈলী’, আর তৃতীয় ও শেষ বৃত্তটি সচেতন থাকে, তিনি বলেন, ‘ইনটেরিয়র মিনিং’ বা ‘মর্মার্থ’ নিয়ে। 

যাদের কেবল কৌশল আয়ত্তে থাকে তারা চৌকস নির্মাতা, কিন্তু তাকে যদি অতর হয়ে উঠতে হয় তাহলে ভেতরের আরো দুটো বৃত্তের গুণকে আত্মস্থ করতে হবে। এখন এই তিন বৃত্তের গুণাবলী নিয়েই দেখা যায় আমাদের সমুখে রয়েছেন সমুজ্জ্বল সত্যজিৎ রায়। 

চলচ্চিত্রের ভাষাকে তিনি শুদ্ধ আয়ত্ত করেছেন তা নয়, নিজস্ব শৈলী সৃষ্টি করেছেন, পাশাপাশি সকল চলচ্চিত্রে যে মর্মার্থ তিনি পুরে দিয়েছেন, যেভাবে কাজটি করেছেন, সেটার শিল্পগুণ ছিল বলেই কালকে অতিক্রম করে গেছেন তিনি। 

তার চলচ্চিত্রের ভেতর, বিশেষ করে পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের ভেতর অতর হয়ে ওঠার যে গুণাবলী রয়েছে, সেই আলাপে প্রবেশের আগে সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে কিছু প্রারম্ভিক কথা বলে নিলে বাহুল্য হবে না।

১.

উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর পৌত্র ও সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালের ২ মে, কলকাতায়। মাত্র দুই বছরের মাথায় পিতৃবিয়োগ ঘটে সত্যজিতের। এতে পারিবারিক ঐতিহ্যমণ্ডিত ছাপাখানা ও শিশুদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’ বন্ধ হয়ে যায়। তবে পত্রিকাটির হাল পরবর্তী সময়ে ধরেন সত্যজিৎ। 

আঁকার হাত ছিল ভীষণ ভালো, লেখার হাতটাও পাকা। ১৯৪০ সালে কলকাতা ছেড়ে, মায়ের ইচ্ছেতে গিয়ে ভর্তি হন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতীতে। কিন্তু পরের বছর রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু এবং কলকাতার উপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালোছায়া সত্যজিৎকে বাধ্য করে ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় ফিরে আসতে।

শান্তিনিকেতনের লেখাপড়াটা সম্পূর্ণ হয়নি, কিন্তু তাতে খুব একটা ক্ষতি বৃদ্ধি হয়নি, ভবিষ্যতের জন্য তিনি রসদ জোগাড় করে নিয়েছিলেন এই কম সময়েই। 

কয়েকদিনের মাথায়, ১৯৪৩ সালে সত্যজিৎ যোগ দেন ডি জে কেইমার নামের এক বিজ্ঞাপনী সংস্থায় জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার হিসেবে। খুব কম সময়ের ভেতরেই তিনি আর্ট ডিরেক্টর পদে উন্নীত হন। এখানে কাজ করতে করতেই চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠতে থাকেন সত্যজিৎ।

যদিও ছোটবেলায় ‘বেনহার’, ‘দ্য কাউন্ট অব মন্টে ক্রিস্টো’, ‘দ্য থিফ অব বাগদাদ’, ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’ প্রভৃতি ছবি তিনি দেখে ফেলেছেন। প্রেসিডেন্সি ও বিশ্বভারতীতে পড়ার সময়েও কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে প্রায়ই ছবি দেখা হতো। সেসবের ভেতর হলিউডের ছবিই ছিল বেশি।

বন্ধুদের সাথে মিলে ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ রায় গড়ে তোলেন ফিল্ম সোসাইটি। একদিকে তারা ফোর্ড, ওয়াইল্ডার, রেনোয়া প্রমুখের ছবি দেখছেন ও দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে সত্যজিৎ নিজে মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছেন চলচ্চিত্র বানানোর জন্য। তিনি তখন খেরোখাতায় বিভিন্ন পরিচালকের নির্মাণ সম্পর্কে টুকে রাখতেন, শখ করে চিত্রনাট্যও লিখতে শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে তো তিনি বন্ধু চিদানন্দ দাশগুপ্তকে বলেই ফেলেন, দেখো, একদিন আমি একটা গ্রেট ফিল্ম বানাব।

চিদানন্দ সেদিন হেসেছিলেন। ভেবেছিলেন সত্যজিৎ বোধহয় ঠাট্টা করছেন। কিন্তু সেই ঠাট্টা বাস্তবে রূপ নিতে সময় নিল মাত্র ৭ বছর। ১৯৫৫ সালের ভেতর তিনি বানিয়ে ফেললেন ‘পথের পাঁচালী’।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে যে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে পারে, সেটি প্রথমে সত্যজিৎকে বলেছিলেন সহকর্মী ডি কে গুপ্ত। ডি কে গুপ্ত নিজের সিগনেট প্রেস থেকে এই বইটির একটি ছোটদের সংস্করণ বের করতে চাইছিলেন আর সেটাতে অলঙ্ককরণ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল সত্যজিৎকে। তো এই বইয়ের ছবি আঁকতে আঁকতেই সত্যজিতের মনে সেলুলয়েডের ছবি আঁকা হয়ে যায়, যা পরে আমরা স্টোরিবোর্ডে রূপান্তর হতে দেখি। 

এর মাঝে দুটি ঘটনা না বললে সত্যজিতের প্রস্তুতিকাল সম্পর্কে জানা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৪৯ সাালে, কলকাতায় তখন ‘দ্য রিভার’ ছবির জন্য লোকেশন দেখতে এসেছিলেন বিশ্বখ্যাত ফরাসি পরিচালক জঁ রেনোয়া। তখন রেনোয়ার সঙ্গে সত্যজিতের সাক্ষাৎ হয় এবং অগ্রজের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় উপদেশ পান তিনি। সাথে অনুপ্রেরণাও। 

আরেকটি ঘটনা ঘটে ১৯৫০ সালে, বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে সত্যজিৎকে লন্ডনে পাঠানো হয় মূল কার্যালয়ে পাঁচ মাস কাজ করার জন্য। জাহাজে করে সত্যজিৎ ও বিজয়া বিলেতে যান, থাকেন, নিত্যদিনের কাজ সারেন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি হয় সেসময়, তারা পশ্চিমা বিভিন্ন স্বাদের ৯৯টি চলচ্চিত্র দেখে ফেলেন। সেগুলোর ভেতর সত্যজিৎকে প্রভাবিত করে ইতালীয় অতর নির্মাতা ভিত্তোরিও ডি’সিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’। ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে যখন সত্যজিৎ মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখন তার সামনে দিশারী হয়ে হাজির হন এই ডি’সিকা।

সত্যজিৎ রায় যখন নিজের প্রথম ছবিটি বানাতে শুরু করেন, তখনও তিনি জানতেন না, তিনি অতর ফিল্মমেকার হয়ে উঠবেন। কিন্তু তার মানসিক গড়নে যে নির্মাতারা গভীর রেখাপাত করেছিলেন, তাদের দুজনেই ছিলেন বিশ্বখ্যাত লেখক-নির্মাতা। কাজেই অতর নির্মাতাদের প্রভাব নিয়েই তিনি শুরু করলেন ‘পথের পাঁচালী’র কাজ। 

অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ছবিটি বানালেন, মুক্তি পেল ১৯৫৫ সালে। পরের বছর ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি পেল ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ হিসেবে। প্রথম ছবিতেই অনুমান করা যাচ্ছিল ধ্বনিচিত্রে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন তিনি। কারণ আর দশটা রোমান্টিক নারী-পুরুষ বা গানের সমাহার ঘটানো হয়নি চলচ্চিত্রটিতে। 

ছবিটি তৈরি হয়েছে ইউরোপীয় ধাঁচে, কিন্তু সেখানে আবার বিষয় বা আধার হিসেবে নিবিড়ভাবে রয়েছে গ্রামবাংলার মানুষ ও প্রকৃতি। তো এই একটি ছবি দিয়ে আসলে সত্যজিৎ লেখক-নির্মাতা হয়ে ওঠেননি, সেটা কেউ পারেনও না, কারণ অতর ফিল্মমেকার হিসেবে কাউকে আখ্যা দিতে গেলে তার সামগ্রিক কাজকে আমলে নিতে হয়। অ্যান্ড্রু স্যারিসের সমকেন্দ্রিক বৃত্তটি সেই কাজটিই করে দেয়, একজন পরিচালকের সকল কাজকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে কি না, সেটা নির্ণয়ের মাধ্যমে একজন পরিচালকের ‘অতর’ পরিচয়কে নিশ্চিত করে।

২.

সত্যজিৎ রায় ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ২৮টি, স্বল্পদৈর্ঘ্য ৮টি ও প্রামাণ্যচিত্র পাঁচটি। তো এই ২৮টি ছবির উপর যদি বৃত্ত অঙ্কন করা হয় তাহলে দেখব, প্রথম বৃত্তের শর্ত পূরণ করে প্রতিটি ছবিই যথাযথ ও পটুত্বের সাথে গল্পটা বলতে পেরেছে। দর্শক গ্রহণ করেছে। 

দ্বিতীয় বৃত্তের শর্তে দেখা যায় নিজস্ব শৈলী: এক্ষেত্রেও  দেখা যায় সত্যজিৎ প্রতিটি চলচ্চিত্রেই নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন।

শুরুতেই আসা যাক নামলিপি প্রসঙ্গে। সত্যজিৎ রায়ের প্রতিটি ছবির পোস্টার থেকে শুরু করে ছবি শুরুর যে নামধাম বা টাইটেল কার্ড, সকলটাই নকশা করে নিজে লিখতেন সত্যজিৎ। কাজেই দর্শক শুরু থেকেই একটা ইঙ্গিত পেয়ে যান, কাজটি কার এবং যে চলচ্চিত্রটি তারা দেখতে যাচ্ছেন সেটি কেমন হতে পারে। যেহেতু নামলিপি একধরনের চিত্রলেখ, তাই সেটি মানুষের মনে দাগ কেটে যায় এবং পরবর্তী যে কোনো জায়গায় এর দেখা মিললে মানুষ বুঝে নিতে পারে কাজটি কার করা।

প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’তে আমরা দেখলাম সত্যজিৎ তুলোট কাগজের উপরে পুঁথির হরফে লিখলেন নামলিপি। এর কারণ অপুর বাবা হরিহর পুঁথিপত্র পাঠ করেন, ছেলেও সেসব ব্যাপারে আগ্রহী। 

আবার এই অপু-ত্রয়ীর তৃতীয় ছবি ‘অপরাজিত’তে আমরা দেখি নামলিপিটি লেখা হয়েছে ছাপাখানার ছাচে, অপু সেই পর্বে ছাপাখানায় কাজ করবে, এ যেন তারই ইঙ্গিত। 

একইভাবে ‘জলসাঘর’ ছবির নামাঙ্কনে ঝাড়বাতি, ‘দেবী’তে কুলুঙ্গি ও দিব্যজ্যোতি, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় তিব্বতি হরফের টান, ‘মহানগরে’ নাগরিক স্থাপত্যের ছায়া ইত্যাদি। এভাবে দেখলে দেখা যাবে প্রতিটি ছবিতেই সত্যজিৎ রায় ছবির গল্পের সঙ্গে নামলিপি ও টাইটেল কার্ডের সাযুজ্য রক্ষা করেছেন, বলা যায়, ছবির প্রারম্ভ থেকেই নিজস্ব শৈলীর ছাপ রেখেছেন।

এরপর দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব শৈলী তা হলো সঙ্গীত আয়োজন। ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘পরশপাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘অপুর সংসার’ ও ‘দেবী’ ছবিগুলো ছাড়া বাকি সব ছবিতে সত্যজিৎ সঙ্গীত পরিচালকের আসনে বসেছেন। 

উল্লিখিত যেসব ছবিতে তিনি রবিশঙ্কর (চারটি ছবিতে), আলি আকবর খাঁ (একটি ছবিতে) ও বেলায়েত খাঁকে (একটি ছবিতে) দায়িত্ব দিয়েছিলেন আবহসঙ্গীতের, সেসব ছবিতেও সত্যজিৎ আশ্চর্যজনকভাবে স্বতন্ত্র। কারণ কে না জানে, চলচ্চিত্র নির্মাতার মাধ্যম, আর সেই নির্মাতা যদি হন সত্যজিতের মতো অতর ফিল্মমেকার তাহলে সকল ক্ষেত্রেই ঐকতান থাকটা খুবই স্বাভাবিক। এ কারণেই সত্যজিতের চলচ্চিত্রের সঙ্গীত বা গান শুনলে এখনো যে কেউ চোখ বুজে বলে দিতে পারবেন এটা কোন ছবির আবহসঙ্গীত, আর কার ছবিতেই বা এর প্রয়োগ ঘটেছে। 

তার চলচ্চিত্রে প্রাচ্যের ধ্রুপদী সঙ্গীত, লোকগীতি, পাহাড়ি তান্ত্রিক সুর, মধ্যযুগের গ্রেগরিয়ান স্তোত্রগীতি, এমনকি আধুনিক ও রম্য সুরও ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু তারপরও সত্যজিতের সুরকে আলাদা করেই চেনা যায়। ‘তিনকন্যা’ থেকে সত্যজিৎ নিজেই নিজের ছবির সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন। এর কারণটা তিনি নিজেই বলেছেন: “The reason why I do not work with professional composers any more is that I get too many musical ideas of my own, and composers, understandably enough, resent being guided too much.”

অতর পরিচালকের এমনটাই হওয়ার কথা, তার নিজেরই এত ভাবনা ভর করে সৃষ্টিকে ঘিরে যা অন্যদের দিয়ে প্রয়োগ ঘটাতে গেলে অন্যদের স্বাতন্ত্র আর থাকে না। তাছাড়া, রবিশঙ্কর বা বেলায়েত খাঁয়ের মতো দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞরা নিজস্বতা হারিয়ে কেন সত্যজিতের ছবিতে কাজ করতে যাবেন? কাজেই সত্যজিৎকেই দায়িত্বটা নিতে হয়েছে। 

নিজে সেভাবে সঙ্গীতের মানুষ না হওয়ার পরও সঙ্গীত রচনায় একঘেয়ে হয়ে ওঠেননি তিনি। পশ্চিমা ও ভারতীয় সঙ্গীতের উপর ভালো দখল থাকার কারণেই বিচিত্র গল্পের সাথে সাযুজ্য রেখে বিচিত্র সঙ্গীত প্রয়োগ করতে পেরেছেন এবং সেসবের ভেতর একটা টোনাল হারমনিও তৈরি করতে পেরেছিলেন সত্যজিৎ, আর একারণেই তিনি অন্যদের চেয়ে তীব্রভাবে আলাদা হয়ে উঠেছেন।

এবার আসা যাক সিনেমাটোগ্রাফি, মিজোঁসেন, শব্দ-সংলাপ ও সম্পাদনা প্রসঙ্গে। এগুলো বয়ান-শৈলী বা ‘ন্যারেটিভ স্টাইলে’র সহজাত উপাদান। সত্যজিৎ রায় গল্পটি যে তরিকায় বলেন সেটি বেশ ধীর ও শান্ত লয়ে এগোয় এবং এই গতির নিয়ন্ত্রণ মূলত হয় উল্লিখিত বিষয়গুলোর দ্বারাই। 

‘পথের পাাঁচালী’তে যেমন ক্যামেরা বেশ শান্তভাবে চরিত্রদের অনুসরণ করেছে, ‘অভিযানে’ও তাই। আমরা জানি, ‘অভিযানে’ গাড়ির গতির সাথে তাল মিলিয়ে কিছুটা গতিময় সম্পাদনা হয়েছে বটে, কিন্তু জগদ্দল পাথরের সাথে মানুষের চরিত্র যখন উন্মোচন করেন সত্যজিৎ, তখন কিন্তু চলচ্চিত্র ধীরস্থির গতিতেই চলে। 

একইভাবে বলা যায় ‘হীরক রাজার দেশে’, হৈহুল্লোড় আছে, কিন্তু ক্যামেরাকে আমরা ছুটে বেড়াতে দেখি না। এত গতিময় গল্পটাকেও বেশ ধীর লয়ে দর্শকের সামনে উন্মোচিত করেন সত্যজিৎ। বড় মাপের সাহিত্যিক যেমন জমিয়ে বসে ধীরে ধীরে গল্পের সুতো ছাড়তে শুরু করেন, সত্যজিৎও সেরকম সাহিত্যিকের মেজাজ নিয়ে চলচ্চিত্রে ধ্বনিচিত্রের বয়ান রচনা করেন। তাই কোনো তাড়াহুড়ো চোখে পড়ে না। 

এমনকি ‘টু’, ‘পিকু’ ও ‘সদগতি’র মতো স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিতেও সত্যজিৎ গল্প বলেন সৌম্য ভঙ্গিতে। অতর পরিচালক যেহেতু নিজস্ব শৈলী দিয়েই গোটা প্রযোজনা পরিচালনা করেন, তাই পুরো দলের কলাকুশলীরাও তাকে আস্থায় রেখে অনুসরণ করেন। সত্যজিতের জবানিতে: “When a director is a true auteur—that is, if he controls every aspect of production—then the cameraman is obliged to perform an interpretative role.” 

এখানে শুধু ক্যামেরাম্যানের কথা বলা হলেও, বাক্যটি সমানভাবে অভিনয়শিল্পী, শিল্প নির্দেশক, সম্পাদক প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; অর্থাৎ নির্মাতার স্বপ্ন তর্জমায় নিজেদের উৎসর্গ করে দিতে হয় অন্য সকলকেই।

সত্যজিৎ চলচ্চিত্রে আরো একটি বিষয় করতে পছন্দ করেন, সেটা হলো কল্পনা বা স্বপ্নের ছুতোয় দর্শককে অপটিকাল ইল্যুশনে নিয়ে যাওয়া। ‘চারুলতা’র চারু যেমন নিজের গ্রাম সম্পর্কে লিখতে গিয়ে হারিয়ে যায় কল্পনায়, সেখানে নানাধরনের স্মৃতি ভিড় করে, ডিজলভের মাধ্যমে; তেমনি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইনে’ আমরা দেখি ভূতের নৃত্য। আর ‘নায়ক’ ছবির স্বপ্নদৃশ্য তো ভোলবার নয়।

আলোকসম্পাতের কথা যদি বলি, সেখানেও সত্যজিতের বিশেষ পছন্দের দেখা মেলে: কিয়ারোস্কুরো লাইটিং। আবহসঙ্গীতের সঙ্গতে আলো-আঁধারের বৈপরিত্যের ভেতর দিয়ে চলচ্চিত্রে ওভার টোনাল মন্তাজের প্রয়োগ দেখা যায় ‘সোনার কেল্লা’তে। ফেলুদা যখন চিন্তিত, জানালার বাইরে থেকে আলোর বিপরীতে চিন্তিত ছায়ার পাইচারি দেখি। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইনে’ ভূতের নৃত্য, ‘অপরাজিত’তে হরিহরণের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সান্ধ্যকালীন আকাশে পাখিদের উড়ে যাওয়া, কিংবা ‘দেবী’ ছবিতে দয়াময়ীকে যখন তার স্বামী ভোর হওয়ার প্রাক্কালে কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছিল, আলো-আঁধারের প্রকট পার্থক্য রাখা ফ্রেমে তখন একই সাথে শোনা যায় ঝিঁঝিঁপোকার গুঞ্জন, শেয়ালের ডাক আর সেতারের সুর; ডায়েজেটিক ও নন-ডায়েজেটিক সাউন্ডের মাধ্যমে এমন টোনাল মন্তাজ সৃষ্টি করা অতর ফিল্মমেকারেরই লক্ষণ। একই ঘটনা আমরা ঘটতে দেখি ‘পথের পাঁচালী’তেও, যখন সর্বজয়া কন্যার মৃত্যু সংবাদ না দিতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ছে হরিহরের সামনে, তখন ঝড়-স্তব্ধ শান্ত পরিবেশে পাখির ডাককে ছেদ করে করুণ সুরে বেজে ওঠে দক্ষিণারঞ্জন ঠাকুরের তার-সানাই। 

এ সকল কিছুই সত্যজিৎ রায়কে অন্য পরিচালকদের চেয়ে আলাদা করে দেয়। অ্যান্ড্রু স্যারিস যেমনটা বলেন, দ্বিতীয় বৃত্তে পরিচালক কিছু শৈলীর ব্যবহার বারবার করেন, যা তাকে স্বতন্ত্র করে তোলে এবং সেই শৈলী তার নিজস্ব স্বাক্ষর হিসেবে পরিগণিত হয়। সত্যজিতের ছবিতে নামলিপি থেকে সঙ্গীত, বয়ান-শৈলীর ভেতর সাহিত্যিক মেজাজের পাশাপাশি আলোছায়া ও ওভার টোনাল মন্তাজের পুনঃপুনঃ প্রয়োগ হয়েছে, চলচ্চিত্রের বিষয়ানুগ করে। এখন এই পর্যন্ত থাকলেই একজন নির্মাতা অতর চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে ওঠেন না। স্যারিসের মতে চলচ্চিত্রের ভেতর যদি দক্ষতা ও নিজস্ব শৈলীর সাথে শৈল্পিক উপায়ে প্রথিত মর্মার্থকে অনুধাবন করা না যায়, তাহলে আসলে সেই নির্মাতাকে অতর বলা যায় না। 

৩.

সত্যজিতের গোটা চলচ্চিত্র সৃজনে একটু গভীর মনোযোগ দিলেই কিছু মর্মার্থ অনুধাবন করা যায়। সেটা হলো ব্যক্তি মানুষের আনন্দ-বেদনা, জয়-পরাজয় ও তার সাথে পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রতিবেশের সঙ্গে সংঘাত ও সংশ্লেষ। এমনকি এই সংঘাত ও সংশ্লেষ ঘটতে দেখা যায় ব্যক্তির ভেতরে নিজের সাথেও। 

অপু-ত্রয়ীর ভেতর অপুকে আমরা দেখি আপন মানুষদের মৃত্যু দেখতে দেখতে সে এগিয়ে যায়, স্থান-কাল-পাত্রকে বিদায় জানাতে জানাতে, বেদনা সহ্য করতে করতে সে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার মন্ত্রণা পায়, নিজের সন্তানের ভেতর। কষ্টের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট আনন্দ মানুষকে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। অপুর জীবনে আমরা দেখি বোন ও বাবার মৃত্যু, এরপর সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় মায়ের মৃত্যু। মাকে একা গ্রামে ফেলে শহরে লেখাপড়া করতে থাকা অপুর ভেতর মা ও গ্রামের জন্য টানাপোড়েন সৃষ্টি হতেও দেখি আমরা। একটা সময়ে যুবক বয়সে ঘটনাক্রমে প্রেম ও বিয়ে, সন্তানলাভ, কিন্তু স্ত্রী বিয়োগের শোক, আবার সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা, সবটাই যেন আনন্দ আর বেদনার জোয়ারভাটা। ব্যক্তির জীবনে অবশ্যম্ভাবী ঘটনা ও এর সাথে ঘাতপ্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে মানিয়ে নিয়ে নতুন মানুষে রূপ নেওয়ার আখ্যানকেই অপু চরিত্রটির মাধ্যমে তুলে ধরেন সত্যজিৎ।

তবে মানুষের জীবনে কি শুধু জন্ম আর মৃত্যুই থাকে? ব্যর্থতা, হেরে যাওয়া, উৎসর্গ করা, ছোটলোকী করা, নিজের বিবেককে জলাঞ্জলী দেয়া কি থাকে না? সব মিলিয়েই তো ব্যক্তি মানুষ। চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যগুলোর দেখা পাওয়া যায় কলকাতা-ত্রয়ীতে। 

‘প্রতিদ্বন্দ্বী’তে দেখি সিদ্ধার্থ বিপ্লবী হতে না পেরে, চাকরি নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়, কিন্তু তার ভাই টুলুকে সে দেখে বিপ্লবের পথে নিজেকে উৎসর্গ করে দিতে। নিজে রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়, কিন্তু সেখানে সরাসরি কিছু করতে না পারার একটা বেদনাও ভর করে তার ভেতর। 

‘সীমাবদ্ধে’র শ্যামলেন্দুকে দেখা যায় নিজের চাকরি ও আরামদায়ক জীবনযাপনকে সুরক্ষিত করতে হীনকাজে লিপ্ত হতে, যে কাজে একজনের প্রাণ যাওয়ার শঙ্কাও দেখা দেয়। মানবিক মূল্যবোধকে হত্যা করে, বিবেকের সামনে দাঁড়াতে তার আবার অস্বস্তিবোধও হয়। 

অপরদিকে ‘জন-অরণ্যে’র সোমনাথ ধনী হওয়ার প্রলোভনে নিজের বিবেক ও বিবেচনাকে জলাঞ্জলী দিতে কসুর করে না। অন্তরে বিষয়টি নিয়ে খচখচ থাকলেও, ভোগবাদের দুনিয়ায় সে নিজেকে ঠিকই মানিয়ে নেয়।

ব্যক্তির আশ্রয়প্রার্থিতা, ভোগবাদিতা, স্বাধীনচেতা মনোভাব ও প্রেমকে সত্যজিৎ চিত্রিত করেন ‘তিনকন্যা’ নামের একটি অ্যান্থলোজি ফিল্ম বা চলচ্চিত্র-চয়নিকাতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে নির্মিত এই ছবিতে ছোট ছোট তিনটি ছবি তৈরি করেন রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোট গল্প অবলম্বনে।

‘পোস্টমাস্টারে’ আমরা দেখি রতন নামের ছোট্ট মেয়েটি স্নেহ আর আশ্রয় খুঁজেছিল পোস্টমাস্টার নন্দলালের কাছে। কিন্তু পোস্টমাস্টার বালিকার সেই আবেগকে নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কাছে ম্লান করে দিয়ে চলে যায়। তবে প্রস্থানের আগে তার মনের ভেতরেও দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয় বৈকি। 

‘মণিহারা’র ভেতর মণিমালিকা ও ফণীভূষণের ধনসম্পদের প্রতি লোভ লালসা, বিশেষ করে গহনার প্রতি মণিমালার অপরিসীম টান ব্যক্তি চরিত্রের অন্ধকার দিক উন্মোচিত করে। 

তৃতীয় ছবি ‘সমাপ্তি’তে দেখি মৃন্ময়ী নামে গ্রামের এক স্বাধীনচেতা ষোড়শীকে। যে সংসারের বাঁধনে আটকে পড়তে চায় না। কাঠবিড়ালির মতো চঞ্চলা সেই মেয়েটির একসময় রূপান্তর ঘটে, প্রেম তাকে পাল্টে দেয়। মৃন্ময়ীর স্বামীর প্রথম দিককার সঙ্কটও কেটে যায়। অর্থাৎ সমাজ ও পরিবারের ভেতরে থেকে ব্যক্তির যে সংঘাত ও সংশ্লেষ ঘটে তারই খতিয়ান এই ‘তিনকন্যা’।

‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ তো ছবির নামের ভেতর দিয়েই ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে নির্ধারণ করে দিচ্ছেন সত্যজিৎ। দুটি ভিন্নস্বাদের গল্প নিয়ে দুটি চলচ্চিত্রকে একসাথে মুক্তি দেয়া হয়, এটিও একটি চলচ্চিত্র-চয়নিকা। 

প্রথম অংশ ‘কাপুরুষে’ দেখা যায় চিত্রনাট্যকার অমিতাভ রায় দৈবঘটনায় দেখা পায় পুরোনো প্রেমিকা করুণার। কিন্তু করুণার বিয়ে হয়ে গেছে। করুণা বিয়ের আগে একবার এসেছিল অমিতাভের কাছে, থেকে যাবে বলে, আর এবারও স্টেশনে এসেছিল অমিতাভের সাথে চলে যাবে বলে। কিন্তু দুবারই অমিতাভ দারিদ্র্য ও সমাজের ভয়ের কারণে নিজের গণ্ডি পেরুতে পারেনি। পারেনি যাকে ভালোবাসে, তার হাতটা শক্ত করে ধরতে। প্রেমের মূল্যকে অমিতাভ বারবার ফিরিয়ে দিয়ে, নিজেই আত্মগ্লানির শিকার হয়ে পড়ে। 

অপরদিকে, ‘মহাপুরুষে’ দেখি নিবারণ নামের এক প্রগতিশীল মানুষ শক্ত হাতে বিরিঞ্চিবাবা নামের এক ভণ্ডসাধুর মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছে। সমাজে একদিকে যেমন রয়েছে ব্যক্তির ভণ্ডামি, পরজীবিতা, অন্যদিকে রয়েছে সত্যের পক্ষে থেকে ঝুঁকি নিয়ে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো ব্যক্তিমানুষ। চারিত্রিক এই বিপরীতমুখী দুই বৈশিষ্ট্যই রয়েছে এই ‘মহাপুরুষে’।

বলা হয়, অতর-পরিচালকের অপেক্ষাকৃত কম ভালো ছবিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেই হিসেবে অন্যসব ছবির তুলনায় ‘পরশপাথর’কে কম ভালো ঠিক নয়, কম আলোচিত ছবি বলা যায়। তো সেই ছবিতেও সত্যজিৎ ব্যক্তির দুর্ভাগ্য, সৌভাগ্য, লোভ, উত্থান ও পতনের গল্পটা বলেছেন। ছাপোশা কেরানি পরেশচন্দ্র দত্তের পরশপাথর পাওয়া, তারপর রাতারাতি ধনী বনে যাওয়া। রাজনীতিবিদ হওয়ার বাসনা চেপে বসা। এরপর একদিন গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর সমাজের ভেতর সামষ্টিক চাঞ্চল্য: গরীবরা ভাবছে সোনার দাম কমে যাবে, কাজেই লাইন দিয়ে তারা সোনা বিক্রি করতে লেগে যায়; অন্যদিকে ধনী ব্যবসায়ীরা দেখল সোনার দাম ওঠানামা হচ্ছে বলে শেয়ারবাজারে প্রভাব পড়ছে, তারা হয়ে পড়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। শ্রেণি চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের ভেতর ব্যক্তি এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাদের ভেতর যে অপরিসীম লোভ, বিশেষ করে সোনাদানার প্রতি, জাগতিক এক ধাতুর প্রতি, সেটিকে কটাক্ষ করাই এই ছবির মূল উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি পরেশচন্দ্রের মূল্যবোধের সঙ্কটটাও চমৎকার করে কমেডির কাঠামোতে তুলে ধরা হয়েছে এখানে।

সত্যজিতের গোয়েন্দা গল্প অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতেও কিন্তু সৎ ব্যক্তির মেধা ও প্রতিভাকে সমাজের মন্দের বিপরীতে তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে, সে হোক প্রদোষ চন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা কিংবা ব্যোমকেশ বক্সী। 

ব্যোমকেশ চরিত্রটি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টি, তারপরও চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ তাকে গড়ে নেন নিজের মতো করেই। এই গোয়েন্দারা সামাজিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে লড়াই করে ব্যক্তির শঠতা ও অসততার বিরুদ্ধে। 

গোয়েন্দা চরিত্রের মতোই প্রখর মেধা দেখা যায় সত্যজিতের আরেক চরিত্র মনোমোহনের মাঝে, তাকে আমরা দেখি ‘আগন্তুকে’। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও জ্ঞানপিপাসা তাকে শুধু প্রখর নয়, প্রজ্ঞাবানও করে তোলে। মনোমোহন তাই দার্শনিকের দৃষ্টিতে সভ্য লোকেদের ভেতর, পরমানু বোমা মেরে মানুষ মেরে ফেলার মতো ‘অসভ্যতা’কে দেখতে পান। দেখতে পান সভ্যতার সঙ্কটকে।

মনোমোহনের মতো দৃঢ় আরেক চরিত্রের দেখা মেলে ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রে– ডক্টর অশোক গুপ্ত। তিনি সমাজের মানুষের প্রতি দায়িত্ববান, নিজের পেশার প্রতি সৎ। ‘আগন্তুকে’ মনোমোহন যেমন ছোট নাতিটিকে শিখিয়ে যায় কূপমণ্ডূক হওয়া যাবে না, ঠিক সেরকম ডক্টর গুপ্তও মৌলবাদী কূপমণ্ডূকদের বিরুদ্ধে, সকল প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কারণ তিনি জানতেন সত্যের জয় হবেই। মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে যাওয়ার যে মূল্যবোধ, সেখানে তিনি একবারের জন্যও আপোষ করেন না। 

এরকম আরেকটি একরোখা চরিত্রের দেখা মেলে ‘জলসাঘরে’, বিশ্বম্ভর রায়, জমিদার পরিবারের সন্তান। সামন্তযুগ শেষ হয়ে নতুন পুঁজিবাদী যুগ শুরু হচ্ছে, জমিদারি ঠাঁটবাট আর চলছে না, তারপরও পুরনো মূল্যবোধ সে ছাড়তে নারাজ। অনেকটা জেদি আর বোকা মানুষের মতোই সে বর্তমানকে অস্বীকার করে আকড়ে থাকতে চায় অতীতকালকে।

সত্যজিৎ একদিকে ব্যক্তির ঋজু চরিত্র ফুটিয়ে তুলছেন, অন্যদিকে গ্রামীণ পটভূমিতে দয়ালু নারী চরিত্রকেও ফুটিয়ে তুলেছেন যত্ন নিয়ে। বলছি ‘অশনী সংকেতে’র অনঙ্গ বউয়ের কথা। রাজ্যে যখন দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, তখন নিজের সংসার সামলে অন্যের জন্যও এই নারী দয়ামায়া দেখায়। এবং সবচেয়ে বড় কথা নিজেকে সে বিক্রি করে দেয় না। 

‘মহানগর’ ছবির আরতির ভেতরেও দেখি একই মমতা, সঙ্গে দৃঢ়তা, দেখি চড়ামূল্যের বাজারে শত কটূকথা শুনেও একহাতে সংসার সামাল দেয় আরতি; যদিও এর প্রেক্ষাপট নাগরিক মধ্যবিত্ত পরিবার। 

নারী চরিত্রের নামে নামাঙ্কিত চলচ্চিত্র ‘চারুলতা’র ভেতরেও আমরা এক দৃঢ় চরিত্রের নারীর দেখা পাই, চারুলতা, যে পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে নিজের একাকিত্ব, আবেগ ও প্রেম নিয়ে দৃঢ়ভাবে লড়াই চালিয়ে যায়।

মানুষের ভেতরকার এরকম শতশত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সমাজ ও পরিবেশের সাথে সেসব বৈশিষ্ট্যের মিথষ্ক্রিয়াকে হীরাপান্নাচুনির মতো করে চলচ্চিত্রে তুলে আনেন মানিক। অন্য আর দশটা চলচ্চিত্র নির্মাতার চেয়ে তিনি এ জায়গাতেই অতর হয়ে ওঠেন। তিনি বাজার কাটতি, বাণিজ্যিক উপাদান মেশানো মশলায় বিশ্বাসী নন। তিনি প্রতিবারই নতুন নতুন মানুষের নতুন নতুন গল্প শোনাতে চেয়েছেন। গল্পের ভেতর সঙ্কট ও সংঘাতের কথা বলতে চেয়েছেন। 

এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলছেন, “আমার সমস্ত ছবি বিচার করলে একটা থিম হয় তো বেরিয়ে আসতে পারবে, ‘মূল্যবোধের সংঘাত’, পুরনো এবং নতুনের পাশাপাশি অবস্থান। পুরনো মূল্যবোধ ও আজকের মূল্যবোধের পাশাপাশি অবস্থান। এবং দুই যুগ, দুটো যুগের মধ্যে যে সংঘর্ষ, দুই ভ্যালুজের মধ্যে যে সংঘর্ষ, সেইটাই হয় তো একটা থিম হতে পারে। সব সময় আমার ছবিতে মানুষের স্থান খুব বড়। মানুষ, চরিত্র, চরিত্রের পরস্পরের সম্পর্ক, এইটার স্থানই খুব বড়। এইটা ধরে নিতেই হবে, এইটা প্রত্যেক ছবিতেই আছে। তবে শিশুদের জন্য যে সব চলচ্চিত্র করেছি তাইতে এই থিম হয় তো ততটা পরিষ্কারভাবে পাওয়া যাবে না।”

সত্যজিতের সমসাময়িক অনেক পরিচালক সমাজের ভেতর দিয়ে মানুষ আবিষ্কার করতে চেয়েছেন, সত্যজিৎ ঠিক তাদের উল্টো, তিনি ব্যক্তি মানুষের ভেতর দিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাজনীতিকে বুঝতে চেয়েছেন। সে কারণে হয় তো আপাত দৃষ্টিতে সত্যজিতের ছবিতে রাজনীতি সরাসরি উপস্থিত থাকে না, তবে ইঙ্গিত ও রূপক আকারে ঠিকই হাজিরা দিয়ে যায়। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে তিনি অনেক বেশি আগ্রহী বিচিত্র চরিত্রের মানুষের প্রতি। তাদের গল্পের প্রতি। তাই তার ছবির গল্প ও চরিত্র হয় তো আলাদা, একেবারে ভিন্নরকমের, কিন্তু সেখানে একটা জিনিস ধ্রুবতারার মতোই জ্বলজ্বল করে, সেটি হলো মানুষ বড় বিচিত্র! সত্যজিতের সকল চলচ্চিত্রের ভেতর যদি অনুসন্ধান করা যায়, তাহলে এই মর্মার্থই আমাদের সামনে প্রতীয়মান হয় যে– বিচিত্র মানুষের গল্প কুড়নোই তার শখ, কারণ সেসব গল্প থেকে মানুষ সম্পর্কে পাঠ নেওয়া যায়। সেজন্যই হয় তো ভিন্ন আরেক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলেছিলেন, “আমি নিজেকে মূখ্য একজন গল্প বলিয়ে হিসেবেই দেখি– অর্থাৎ কাহিনীচিত্রকার।”

৪.

অতর নির্মাতাদের কাজের ভেতর সারাংশ সম্পর্কে অ্যান্ড্রু স্যারিস বলছেন, “The third ultimate premise of auteur theory is concerned with interior meaning, the ultimate glory of cinema as an art. Interior meaning is extrapolated from the tension between a director’s personality and his material.” 

সত্যজিৎ নিজের গল্প থেকে যেমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, এমনকি তুলনামূলকভাবে তরুণ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্য থেকেও ছবি তৈরি করেছেন। কিন্তু তারপরও সেগুলো ভীষণরকম সত্যজিতের শৈলীতে সজ্জিত হয়ে ওঠে, কারণ স্যারিসের কথার সূত্র ধরে বলি, অতর নির্মাতার চলচ্চিত্র প্রাপ্তগল্প আর নিজের ব্যক্তিত্ব তথা চেতনার দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে। 

অতর নির্মাতা সবসময়ই একটি মূল বিষয়কে তার নির্মিত চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে রেখে গল্প ও প্লট সাজান, অথবা উল্টোটাও হয়– অতর নির্মাতার সকল চলচ্চিত্রেই গড়পরতায় একটি মূল বিষয়কে আবিষ্কার করা যায়। সত্যজিতের ছবিতে যেমন বিচিত্র মানুষ ও তার সাথে অন্য মানুষের সম্পর্ক ও মিথষ্ক্রিয়া পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় মূল্যবোধ ও বিবেকের সংঘাত, সঙ্কট ও সংশ্লেষ। কাজেই স্যারিসের তিন বৃত্তের পরিধি পরিভ্রমণ করে বলা যায়, স্বমহিমায় বাংলা চলচ্চিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অতর-নির্মাতা হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সত্যজিৎ রায়। 

(লেখক: প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্র সমালোচক; সম্পাদক 'কাট টু সিনেমা'। চলচ্চিত্র পড়ান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে।)