পিএসজির উৎসবের রাতে নিদ্রাহীন সাকা

সাকা যদি ফুটবলের ফাইনাল থেকে পেনাল্টি উঠিয়ে দেয়ার পিটিশন করেন, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে কি?

আপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

২০২০ সালের ইউরো ফাইনালের কথা মনে আছে? লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে কাব্যিক এক ফাইনাল উপহার দিয়েছিলো ইংল্যান্ড আর ইতালি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এবারের ফাইনালটা যেন সেই ইউরো ফাইনালকেই স্মৃতি পটে নিয়ে এসেছে বারবার।

কৌশলে আর্সেনাল আর ইতালিকে আপনি এক কাতারে রাখতেই পারেন। প্রতিপক্ষকে শক্তিশালী ধরে এবং নিজের দুর্বলতাকে বুঝে রক্ষণের এক অপূর্ব কৌশল এটেছিলো আর্সেনাল, ইতালি দুটো দলই। কিন্তু জীবনের বাকি সব কিছুর মতোই ফুটবলেও চাই ভাগ্য। ওই ভাগ্যদেবী ইতালির সাথে ছিলো বলেই ইংল্যান্ডের মাটি থেকে তাদেরই পাড় ভক্তদের সামনে ট্রফি নিয়ে উৎসবে মেতেছিলো রবার্তো মানচিনির ইতালি।

আর্সেনালের সাথে ঐ ভাগ্যদেবীর কৃপা ছিলো না। সে কারণেই পুরো মৌসুমের অন্যতম হিরো গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালায়েস টাইব্রেকারে বল আকাশে উড়িয়ে মেরে পরিণত হয়েছেন ট্র্যাজিক হিরোতে। আর এই এক ভুলে গানার কোচ মিকেল আর্তেতার কিংবদিন্ত হতে গিয়েও হতে পারেননি। আর্সেনালকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিতিয়েছেন ২২ বছর পর। বিশ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠে শিরোপা হাতছাড়া হলো ঐ ম্যাগালায়েসের এক ভুলে।

ভিআইপি গ্যালারিতে বসে থাকা আর্সেনালের কিংবদন্তি আর্সেন ওয়েঙ্গারের চোখের কোণ চিকচিক করছিলো কেন, সেটাও অনুমেয়। “এত কাছে, তবু কেন এত দূরে!” আপন মনে ওয়েঙ্গার-আর্তেতা অনুভব করতেই পারেন।

২০২০ সালের ইউরো ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ম্যাচের দুই মিনিটে ফেভারিট ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দিয়েছিলেন লুক শ। হাঙ্গেরির বুদাপেষ্টের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও গোলের দেখা মিলেছে শুরুতেই। আচমকা এক আক্রমণে কাই হাভার্টজ পিএসজি গোলকিপার সাফোনভকে বোকা বানান। ম্যাচের তখন মাত্র পাঁচ মিনিট। আর্তেতার হিসেব ছিলো সহজ। শুরুতে মিলে যাওয়া লিড ধরে রাখতে হবে বাকি ৮৫ মিনিট। আর্সেনালকে এনে দিতে চেয়েছিলেন তাদের ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি।

বিশ বছর আগে খেলা এই টুর্নামেন্টের ফাইনালেও এক গোলে এগিয়ে ছিলো আর্সেনাল। তবে চার মিনিটের ব্যবধানে বার্সেলোনা দুই গোল দিয়ে শেষ মূহূর্তে হৃদয় ভেঙ্গে দেয় গানারদের। আর্তেতার সেই হারের পুনরাবৃত্তি চাননি। তাই তো গোল দেয়ার পর থেকেই দুই স্তরের ডিফেন্স লাইন সাজিয়েছিলেন গানার বস। অনেক ফুটবল পন্ডিত আবার বলছেন, দুই নয় আর্তেতা তিন স্তরের ডিফেন্স নিয়েই রুখে দিতে চেয়েছিলেন পিএসজিকে।

গোলকিপার দাভিদ রায়ার সামনে ছিলেন তিন রক্ষণ সেনা। সেটা আর্তেতার দুর্ভেদ্য ডিফেন্সের প্রথম সারি। তিনজনের সামনে আরও তিনজন, আর সেই তিনের দুই পাশে দুইজন মিলিয়ে মোট পাঁচজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন পিএসজির সাঁড়াশি আক্রমণের সামনে। আট জনের ডিফেন্স সাজিয়েও মন ভরেনি আর্তেতার। ফরোয়ার্ড সাকা আর কাই হাভার্টজকেও নিয়ে এসেছিলেন মাঝ রেখার নিচে। এমন আটসাটো ডিফেন্সের ফাঁক গলে গোলটা করবে কোথা থেকে পিএসজি?

প্রথমার্ধে লিড নেয়ার পর থেকে তাই গানারদের সময়টা কেটেছে ডিফেন্স সামলাতে। তাতে ১০০ তে ১০০ মার্ক পেতে পারেন আর্তেতা। তার কৌশলে ফুটবলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে বটে, ফাইনাল দাগ কাটেনি মনের ভেতর। কিন্ত ফুটবলে অমর হতে গেলে মাঝে মাঝে কুৎসিত কদাকার হওয়ারও প্রয়োজন আছে। সেই কুৎসিত খেলা খেলে প্রথমার্ধে পুরোপুরি সফল মিকেল আর্তেতা।

ঘঁড়ির কাটা যখন ৬০ মিনিটের ঘর ছুঁয়েছে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের পরিসংখ্যানে তখন মাত্র ২৫ শতাংশ বল আর্সেনালের পায়ে। সঠিক পাসের সংখ্যায় ১৮০-এর ঘর টেনেটুনে পেরিয়েছে গানাররা, আর পিএসজির পাস তখন সাড়ে সাতশ ছুঁই ছুঁই। ওই যে সেই ইউরো ফাইনাল ২০২০ সালের মতো! খেলেছে ইংল্যান্ড, ট্রফি গিয়েছে ইতালির ঘরে।

ইংল্যান্ডের গোলটা ইতালি খেলার ধারার বিপরীতে শোধ দেয় ৬৭ মিনিটে। আর পাগলা ঘোড়া বনে যাওয়া পিএসজি আর্সেনালের বিপক্ষে সমতায় আসে ৬৬ মিনিটে। এখানেও ভাগ্যের পরশ রয়েছে। পেনাল্টি ছাড়া আর্সেনালের জালে বল জড়ানো অসম্ভব হয়ে পরেছিলো। সেই পেনাল্টি এলো আশীর্বাদ হয়ে। আর দেম্বেলের গোলে মিললো সমতা। ফাইনালে আরেকটা টুইস্ট!

ইউরোর সেই ফাইনালের সাথে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এই ফাইনালে মিল খুঁজতে গেলে এক পক্ষের আক্রমণ, আরেক পক্ষের রক্ষণের সাদৃশ্য পাবেন। বল পজেশনে দুই ফাইনাল বেশ কাছাকাছি। কিন্তু ইতালির মতো আন্ডারডগ হয়েও ফাইনাল জিততে চাই ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদ। সেটাই যে ছিলো না আর্সেনালের। অবিশ্বাস্য এক পরিসংখ্যান নিয়েও, ১২০ মিনিটের ফাইনাল শেষেও ট্রফির হাত ছোঁয়া দূরত্বে দাড়িয়ে ছিলেন আর্তেতা। মাত্র ২৮ শতাংশ বল পজেশন আর ১৯৯ পাস নিয়ে টাইব্রেকে গানাররা। ভাবা যায়!

নয়টি পেনাল্টি শেষে ৪-৩ গোলে পিছিয়ে আর্সেনাল। গ্যাব্রিয়াল ম্যাগালায়েস গোল করলে বেঁচে থাকবে আর্সেনালের ট্রফি জয়ের আশা; আর মিস করলে ঐ কখনোই ছুঁতে না পারা ট্রফি চলে যাবে আরও দূরে। 

এই যে বারবার ইউরো ২০২০ সালের ফাইনালের প্রসঙ্গ টেনে আনলাম। সাকাও ছিলেন সেই ম্যাচে। শেষ পেনাল্টি মিস করে ইংল্যান্ডকে করেছিলেন বিষাদে নিমজ্জিত। বদলি হিসেবে নেমেছিলেন ৭০ মিনিটে। অনেক পরিণত, পাকা বনে যাওয়া বুকায়ো সাকা এখন আর্সেনালের স্টারটিং ইলেভেনের সদস্য। তাকে আর্তেতা তুলে নিলেন ৮৩ মিনিটে। ম্যাগালায়েস যখন ‘ডিসাইসিভ’ পেনাল্টি নিচ্ছিলেন, কী চলছিলো ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা সাকার মনে, জানা গেলো ভালো হতো। দুই ম্যাচেই যে তিনি হেরে যাওয়া দলের খেলোয়াড়। ছয় বছর আগে নিজে ডুবিয়েছিলেন দলকে, এবার দেখলেন তার মতো চাপে পিষ্ট হয়ে যাওয়া ম্যাগালায়েসের আকাশে বল উড়িয়ে মারার দৃশ্য।

গ্যালারিতে বসে থাকা আর্সেন ওয়েঙ্গার, ডাগআউটে থাকা অলমোস্ট কিংবদন্তি মিকেল আর্তেতা, পেনাল্টি মিস করা ম্যাগালায়েস নয়, এই ফাইনালের ট্র্যাজিক হিরো আসলে বুকায়ো সাকা। ইংল্যান্ড ও আর্সেনালের জার্সিতে ঐ পেনাল্টি নামক যন্ত্রণায় দুবারই পুড়তে হলো তাকে। সাকা যদি ফুটবলের ফাইনাল থেকে পেনাল্টি উঠিয়ে দেয়ার পিটিশন করেন, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে কি?