জাতীয় কন্যাশিশু দিবস

বাল্যবিয়ের কাছে হারতে পারে না কিশোরীদের স্বপ্ন

এখনো বাংলাদেশের অসংখ্য পুরুষ এবং তাদের পরিবার বিয়ের সময় অল্প বয়সী মেয়ে খোঁজেন। পরিবার ও সমাজের বড় একটি অংশ বিয়ে, সন্তান ধারণ ও সন্তান পালনকেই মেয়েদের জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখে। মেয়েদের পড়াশোনা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পেশাগত অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে বাল্যবিয়ের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এখনো প্রবল। আর কোনো ক্ষতিকর প্রথা যখন সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পায়, শুধু আইন দিয়ে তা দূর করা অত্যন্ত কঠিন।

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ এএম

 

কিশোরীদের কথা

“মা-বাবা বলেন, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে তার দায়িত্ব শ্বশুরবাড়ির। তখন তারা ছোট ভাইদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন।”

“ছেলেরা পরীক্ষায় খারাপ করলে মা-বাবা তাদের আবার সুযোগ দেন। কিন্তু মেয়েদের পরীক্ষার আগেই ভয় দেখানো হয়, পাস করতে না পারলে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে।”

“অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিলে যৌতুক কম দিতে হয়, এটাও বাল্যবিয়ের একটি কারণ।”

“আমি হয়তো মা-বাবাকে বুঝিয়ে আমার বিয়ে বন্ধ করতে পারব। কিন্তু সমাজের মানুষ এসে বলবে, ‘এত ভালো পাত্র পাওয়া গেছে, এখনই মেয়ের বিয়ে দাও।’ তখন মা-বাবার পক্ষে না বলা কঠিন হয়ে যাবে।”

“কিছুদিন আগে এলাকায় একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তাই মা-বাবা মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত। সেই ভয় থেকেও তারা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেন।”

কথাগুলো গাইবান্ধার কুন্দেরপাড়া গণ উন্নয়ন একাডেমির নবম ও দশম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীর। তাদের কথায় বাংলাদেশের বাল্যবিয়ের বাস্তবতার অনেকগুলো দিক উঠে এসেছে, মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবারে ছেলেদের তুলনায় তাদের কম গুরুত্ব দেওয়া, নিরাপত্তাহীনতা, যৌতুকের চাপ ইত্যাদি।

গাইবান্ধা থেকে গাড়িতে প্রায় ৪৫ মিনিট গেলে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট। সেখান থেকে আরও ৪০-৪৫ মিনিট নৌকায় করে কুন্দেরপাড়া চরে পৌঁছানো যায়। সেই চরের স্কুলের মেয়েদের কাছ থেকে তাদের স্বপ্নের কথা শুনছিলাম। কেউ উদ্যোক্তা হতে চায়, কেউ ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহী। কেউ হতে চায় পুলিশ বা সেনা কর্মকর্তা, কেউ আইনজীবী, ব্যবসায়ী, ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী।

শুধু কুন্দেরপাড়া নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিশোরীদের সঙ্গে কথা বললে একই বিষয় বোঝা যায়—তারা পড়তে চায়, নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের স্বপ্ন আছে। অথচ বাল্যবিয়ে অসংখ্য কিশোরীর সেই স্বপ্নের পথে দেয়াল তুলে দিচ্ছে।

স্বল্প অগ্রগতি ও বাস্তবের চিত্র

প্রায় প্রতি দুই নারীর একজনের বিয়ে ১৮ বছরের আগে। পৃথিবীর যেসব দেশে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার সর্বাধিক। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথভাবে প্রকাশিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই; ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগে।

২০১৯ সালের তুলনায় এই হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু প্রায় প্রতি দুই নারীর একজনের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে—এমন বাস্তবতায় সামান্য অগ্রগতি নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।

বাল্যবিয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও দারিদ্র্যের সম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্ট। যেসব নারী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি, মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ৬৯ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে এই হার ৬৫ শতাংশ। বিপরীতে, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন নারীদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ২৮ শতাংশ এবং সবচেয়ে ধনী পরিবারের নারীদের মধ্যে ৪১ শতাংশ।

বাল্যবিয়ের কারণে একটি মেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার সামনে থাকা সম্ভাবনার দরজাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসে।

“কন্যাদায়ে কাঁদিয়া মরি কেন?”

বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের পেছনে দারিদ্র্য, কিশোরীদের সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাসহ অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে মেয়েদের সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।

এখনো বাংলাদেশের অসংখ্য পুরুষ এবং তাদের পরিবার বিয়ের সময় অল্প বয়সী মেয়ে খোঁজেন। পরিবার ও সমাজের বড় একটি অংশ বিয়ে, সন্তান ধারণ ও সন্তান পালনকেই মেয়েদের জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখে। মেয়েদের পড়াশোনা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পেশাগত অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে বাল্যবিয়ের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এখনো প্রবল। আর কোনো ক্ষতিকর প্রথা যখন সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পায়, শুধু আইন দিয়ে তা দূর করা অত্যন্ত কঠিন।

বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন, “পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব।... কন্যাদায়ে কাঁদিয়া মরি কেন? কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন-বস্ত্র উপার্জন করুক।”

১৯০৪ সালে “মতিচূর”-এ লেখা বেগম রোকেয়ার এই কথাগুলো ২০২৬ সালের বাংলাদেশেও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। এক শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো “ভালো পাত্র” পেলে অনেক মা-বাবা স্কুলপড়ুয়া মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই যথেষ্ট এগিয়েছি?

উদ্বেগজনক কিছু পরিবর্তন

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, বাল্যবিয়ের হার অনেক বেশি হলেও আগের তুলনায় এখন এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট হয় কম। ফলে প্রশাসনের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

উপকূলীয় কয়েকটি জেলা ঘুরে আসা একজন সাংবাদিক জানালেন, বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে এবং মেয়ে ও নারীদের অধিকার নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করতে কিছু বেসরকারি সংস্থা এখন শঙ্কিত বোধ করছে। কোথাও কোথাও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারি পোস্টারও ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সম্প্রতি বাল্যবিয়ের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলা ও প্রচার চালানোর ঘটনা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ের বিরোধী কণ্ঠগুলো কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ও মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা বাধার মুখে পড়ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

বাল্যবিয়ে কোনো ‘মূল্যবোধ’, ‘পারিবারিক পছন্দ’, ঐতিহ্য কিংবা নিছক সামাজিক চর্চার বিষয় নয়। এটি শিশু অধিকারের লঙ্ঘন। একটি শিশুর অধিকার লঙ্ঘনের পক্ষে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় কোনো ব্যাখ্যাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাল্যবিয়ের পক্ষে প্রকাশ্য প্রচার সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে দুর্বল করে দিতে পারে।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-এর যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি জন্ম ও বিয়ে নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়নভিত্তিক বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলির কাজে গতি আনা প্রয়োজন। শিশু আইন ২০১৩-এর আলোকে সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।

মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি, যাতে দারিদ্র্য বা অন্য কোনো কারণে তাদের পড়াশোনা বন্ধ না হয়। একই সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবাকে ‘কন্যাদায়গ্রস্ত’ হওয়ার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবার ও সমাজ মেয়েদের শিক্ষা, দক্ষতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পেশাগত জীবনের মূল্য বুঝলে তা বাল্যবিয়ের হার কমাতে ভূমিকা রাখবে।

সমস্যার গভীরে যেতে হবে

যেকোনো সমস্যা সমাধানের আগে তার কারণগুলো গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার কাজের ঘাটতি কোথায়? বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-এর বিশেষ বিধানের কোনো প্রভাব পড়ছে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বাল্যবিয়ের ঘটনা রিপোর্ট করার বর্তমান অবস্থা কী? রিপোর্টিং কমে থাকলে কেন কমছে? কমিউনিটি পর্যায়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের কাজ কতটা সক্রিয়? সাম্প্রতিক সময়ে বাল্যবিয়ের পক্ষে প্রচারের কারণে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে কী প্রভাব পড়ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ সমস্যার পরিবর্তিত ধরন না বুঝে পুরোনো পদ্ধতিতে কাজ করে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

প্রতিটি মেয়ের শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার অধিকার আছে। তাই বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে আমাদের আরও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়া উচিত। সরকার, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবার—সবাইকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে হবে: শিশুর বিয়ে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা এবং প্রতিটি মেয়ের শিক্ষা ও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে নিজেদের কাছে প্রশ্নটি তাই করা দরকার—আমরা কি সেই দায়িত্ব যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করছি?

(লেখক: প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, শিশুরাই সব।)