একজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা জনপরিচিত ব্যক্তি অবশ্যই জনজীবনে জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন। কিন্তু তাই বলে তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জনগণের পৈতৃক সম্পত্তি হয়ে যায় না। তিনি কার সঙ্গে খেতে গেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কখন হাসলেন, কখন মন খারাপ করলেন, সবকিছুর ওপর জনগণের ‘রাইট টু নো’ বসিয়ে দিলে সেটাকে সাংবাদিকতা না বলে নজরদারিনির্ভর বিনোদন বলাই ভালো।
রাজীব নন্দী
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২১ এএমআপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ পিএম
‘মানুষ তো এগুলোই খায়’, এই অজুহাতে সাংবাদিকরা কি সবকিছু কনটেন্ট বানায়, নাকি সাংবাদিকরা বারবার পরিবেশন করে বলেই মানুষের এসব খেতে নেশায় ধরে যায়? মুরগি আগে নাকি ডিম? সাংবাদিকতার প্রাচীন এই ফ্যালাসি কোশ্চেন দিয়েই লেখাটি শুরু করি।
সাংবাদিকতা জনরুচি তৈরি করবে, নাকি জনরুচি সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করবে? ডিজিটাল যুগে যে আমরা সাংবাদিকরা ঘটনার পেছনে অ্যালগরিদমের মতো দৌড়াই, এই প্রশ্ন উঠলেই সাংবাদিকতা, নৈতিকতা আর যুক্তিবিদ্যার ফ্যালাসিগুলো ঝামেলা পাকিয়ে ফেলে।
এখানে একটা খুব সাধারণ, কিন্তু অনেকের কাছে রহস্যময় পার্থক্য আছে। Public interest আর what interests the public মোটেও এক জিনিস না। বাংলায় বললে, ‘জনস্বার্থ’ আর ‘জনতা কী দেখতে চায়’, এ দুটোকে এক করে ফেললে সাংবাদিকতা আর নিউজ থাকে না, হয়ে যায় ডিজিটাল পাড়ার চায়ের দোকান।
একজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা জনপরিচিত ব্যক্তি অবশ্যই জনজীবনে জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন। কিন্তু তাই বলে তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জনগণের পৈতৃক সম্পত্তি হয়ে যায় না। তিনি কার সঙ্গে খেতে গেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কখন হাসলেন, কখন মন খারাপ করলেন, সবকিছুর ওপর জনগণের ‘রাইট টু নো’ বসিয়ে দিলে সেটাকে সাংবাদিকতা না বলে নজরদারিনির্ভর বিনোদন বলাই ভালো।
রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা জননিরাপত্তার ঝুঁকি প্রকাশে কখনো গোপন তথ্য সামনে আনা জরুরি হতে পারে। সেখানে জনস্বার্থ আছে, জবাবদিহি আছে, সাংবাদিকতার প্রয়োজন আছে। কিন্তু কারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, একান্ত মুহূর্ত বা সম্মতিমূলক ব্যক্তিজীবন প্রকাশ করে ক্যাপশনে ‘দেশবাসী জানতে চায়’ লিখে দিলেই সেটি জনস্বার্থ হয়ে যায় না। বেশির ভাগ সময় দেশবাসী কিছুই জানতে চায়নি। কয়েকজন অ্যাডমিন, কিছু ক্লিক আর অ্যালগরিদম প্রকাশ করতে চেয়েছে।
ডিজিটাল যুগে এই সীমারেখার অবস্থাই সবচেয়ে করুণ। মোবাইল ফোন, সিসিটিভি, ক্লাউড স্টোরেজ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু প্রাইভেসিকে বানিয়ে দিয়েছে কাঁচের ঘর।
একটি ব্যক্তিগত ছবি, অডিও বা ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের স্ক্রিনে পৌঁছে যেতে পারে। তারপর সবাই দুই মিনিটের নৈতিক আদালত বসায়, রায় দেয়, মিম বানায়, আবার পরের স্ক্যান্ডালে চলে যায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অনলাইনে একবার কিছু ছড়িয়ে পড়লে সেটি পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। পোস্ট ডিলিট হতে পারে, কিন্তু স্ক্রিনশট নামের অমর-আত্মা ইন্টারনেটে ঘুরতেই থাকে।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘মানুষ এটা দেখবে কি-না’ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এটা প্রকাশ করা উচিত কি-না। কারণ সব ভাইরাল জিনিস সংবাদ নয়, সব কৌতূহল জনস্বার্থ নয়, আর সব ক্লিক সাংবাদিকতার সাফল্যও নয়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বৈশ্বিক উদাহরণ ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কথা আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু ওয়াটারগেটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু এটি নয় যে গোপন তথ্য ফাঁস হয়েছিলো। বরং শিক্ষা হলো, কোন তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কেন প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়েছিলো গোপন তথ্য ও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে। কিন্তু সেটি ছিলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি ও সত্য গোপনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদাহরণ।
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন উন্মুক্ত করে দেওয়া বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়া কখনোই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সমার্থক নয়।
বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যক্তিগত ভিডিও ও অডিও ফাঁসের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে তিনি একটি ব্যাখ্যা দেন এবং রাজনৈতিক দল তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু এসব ঘটনার আগে যে প্রশ্নগুলো ওঠা দরকার ছিলো, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থেকেছে।
প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিলো, ভিডিওটি ধারণ করলো কে? এটি কি অনুমতি নিয়ে ধারণ করা হয়েছিলো? কীভাবে এটি বাইরে এলো? কারা প্রথম ছড়ালো? এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা সাইবার অপরাধ ছিলো কি না?
বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, ভিডিও প্রকাশের পর আলোচনা চলে শুধু ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিকে নিয়ে। ফলে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ করল, তারা অদৃশ্য থেকে যায়।
এখানেই শুরু হয় মোরাল পুলিশিং বা নৈতিকতার নামে ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ। সমাজে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষ আইন, আদালত বা যথাযথ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নিজেরাই বিচারকের ভূমিকা নিতে চায়।
কারও পোশাক, সম্পর্ক, চলাফেরা বা ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই একজন ব্যক্তি সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যান।
বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এখন একটি বড় সাইবার নিরাপত্তা সংকট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Identity Theft Resource Center (ITRC)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ওই বছরে ৩ হাজার ৩২২টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান Surfshark-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪২ কোটি ৫৭ লাখ ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট তথ্য ফাঁসের ঘটনার শিকার হয়েছে।
এই সংকট শুধু ডেটা চুরিতে সীমাবদ্ধ নয়, ব্যক্তিগত নজরদারির প্রযুক্তিও দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২১ সালের পেগাসাস (Pegasus) স্পাইওয়্যার কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে, কীভাবে স্মার্টফোনকে ব্যবহার করে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালানো সম্ভব। পরবর্তী সময়ে প্রিডেটর (Predator) ও গ্রাফাইট (Graphite)-এর মতো স্পাইওয়্যারের ব্যবহার নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০১৪ সালের সেলেবগেট (Celebgate) ঘটনায় হলিউড তারকাদের ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস হয়েছিলো, যা পরে একটি সাইবার অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। এসব ঘটনা দেখায়, ব্যক্তিগত তথ্য এখন শুধু ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় নয়, এটি নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রশ্ন।
সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেনের ‘মোরাল প্যানিক’ ধারণায় বলা হয়েছে, সমাজ কখনো কখনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নৈতিক বিপদের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করায়। তখন ওই ব্যক্তির ওপর সমাজের সব ক্ষোভ ও নৈতিক উদ্বেগ চাপিয়ে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের যুগে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে। একটি ভিডিও, একটি উত্তেজক শিরোনাম এবং কয়েক হাজার মন্তব্য মিলেই তৈরি হয় একটি ডিজিটাল জনআদালত।
এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো সত্য অনুসন্ধান করা, কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষতি কমানো। একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বলেই সেটি সংবাদযোগ্য হয়ে যায় না। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো যাচাই করা, তথ্যটি সত্য কি না, এর উৎস কী, এর সঙ্গে প্রকৃত জনস্বার্থ জড়িত কি না এবং প্রকাশের ফলে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি হবে কি না।
বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যমগুলোও এখন ‘right to privacy’ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। একজন জনপরিচিত ব্যক্তিও তার ব্যক্তিগত জীবনের সব অধিকার হারান না।
একজন রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত, নীতি, অর্থনৈতিক লেনদেন বা ক্ষমতার ব্যবহার জনগণের জানার অধিকারভুক্ত হতে পারে। কিন্তু তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত সবসময় জনস্বার্থের বিষয় নয়।
২০২১ সালের শেষদিকে বাংলাদেশের তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনাও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেই ফোনালাপের রাজনৈতিক প্রভাব ছিলো ব্যাপক এবং তিনি মন্ত্রিত্ব হারান। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, ফোনালাপটি ফাঁস করলো কে? কীভাবে সেটি সংগ্রহ করা হলো? ব্যক্তিগত যোগাযোগে অননুমোদিত প্রবেশের বিষয়টি কেন আলোচনার কেন্দ্রে এলো না?
বিশ্বব্যাপীও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এখন বড় নিরাপত্তা সংকট। ২০১৪ সালে হলিউড অভিনেত্রী জেনিফার লরেন্সসহ বহু তারকার ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছিলো। পরবর্তী তদন্তে এটি একটি সাইবার অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। সেখানে মূল বিষয় ছিলো না তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, মূল বিষয় ছিলো হ্যাকিং, তথ্য চুরি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ভয়াবহ লঙ্ঘন।
২০২২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সরকারি কর্মকর্তাদের কথোপকথন ফাঁস হওয়ার ঘটনাও দেখিয়েছে যে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। একইভাবে পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি দেখিয়েছে, আধুনিক যুগে একটি স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পূর্ণ মানচিত্র হয়ে উঠতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যত সহজ করেছে, নজরদারির ক্ষমতাকেও তত শক্তিশালী করেছে। আগে কাউকে অনুসরণ করতে মানুষের প্রয়োজন হতো। এখন একটি ফোন, একটি সফটওয়্যার বা একটি ডেটাবেইস যথেষ্ট। তাই সাইবার পুলিশিং প্রয়োজন, কিন্তু সেটি হতে হবে আইন, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে থেকে।
অপরাধ তদন্ত, সাইবার প্রতারণা প্রতিরোধ, শিশু সুরক্ষা বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার বৈধ হতে পারে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী বা সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি নিরাপত্তা নয়, সেটি নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এই অধিকার শুধু জনপ্রিয় মানুষের জন্য নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। একজন মানুষ ভুল করতে পারেন, বিতর্কিত হতে পারেন, এমনকি অভিযুক্তও হতে পারেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ হলো আইন, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া। গোপনে ভিডিও ধারণ, অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া এবং জনতার হাতে অপমানিত করা কোনো সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় ফাঁস হওয়া ভিডিও নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু ফাঁসকারীকে নিয়ে প্রশ্ন করি না।
আমরা জানতে চাই ব্যক্তি কী করেছে, কিন্তু জানতে চাই না কে তার ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করলো। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যে প্রযুক্তি একজন রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত প্রকাশ করছে, আগামীকাল সেটি একজন সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কোনো অপরাধীর ঢাল নয়। এটি সভ্য সমাজের মৌলিক ভিত্তি। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক, সবার দায়িত্ব হলো এই সীমারেখা রক্ষা করা। কারণ একটি সমাজের মানবিকতা বোঝা যায় শুধু জনপ্রিয় ও শক্তিশালী মানুষের অধিকার রক্ষায় নয়। বোঝা যায় তখন, যখন একজন বিতর্কিত বা অজনপ্রিয় ব্যক্তির অধিকারও আমরা সম্মান করি।
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই, আমরা কী দেখছি, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আমাদের কে দেখতে পাচ্ছে এবং সেই দেখার ক্ষমতার ওপর নজর রাখছে কে?
তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে আলোচনা মানে কোনো ব্যক্তির আচরণকে সমর্থন করা নয়। একজন জনপ্রতিনিধি বা জনপরিচিত ব্যক্তি তার কাজ, মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্তের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন। রাজনৈতিক দল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে, জনগণ তার মূল্যায়ন করতে পারে এবং আইন ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে রাষ্ট্র আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু জবাবদিহি ও জনতার আদালত এক বিষয় নয়। অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত প্রমাণ, তদন্ত ও আইনের মাধ্যমে, ব্যক্তিগত মুহূর্ত ফাঁস করে, অপমান করে বা সামাজিকভাবে ধ্বংস করে নয়।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে একই সঙ্গে দুটি বিষয় রক্ষা করতে হবে, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা। গোপনীয়তার সুরক্ষা অন্যায়কে আড়াল করার উপায় নয়, আবার অন্যায়ের অভিযোগ ব্যক্তিগত অধিকার ধ্বংসের লাইসেন্সও নয়।
ডিজিটাল যুগের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যেন আমরা নিজেরাই অধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি তৈরি না করি। কারণ আজ যে প্রযুক্তি একজন বিতর্কিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, আগামীকাল সেটি যে কোনো সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে।
গ্রিক পুরাণের প্যান্ডোরার বক্সের গল্পে বলা হয়, কৌতূহলবশত একটি বাক্স খুলে দেওয়ার পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে নানা অজানা দুর্ভোগ। ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও ভিডিওর ক্ষেত্রেও যেন একই সতর্কবার্তা প্রযোজ্য।
প্রযুক্তি নিজে অভিশাপ নয়, এটি জ্ঞান, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু যখন প্রযুক্তি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভাঙা, অপমান করা বা প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সেটিই নতুন ধরনের সংকট তৈরি করে।
তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তথ্যের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করা। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু কত দ্রুত সে তথ্য ছড়াতে পারে, তা দিয়ে নয়। বরং কত দায়িত্বশীলভাবে সে ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে, তা দিয়েই নির্ধারিত হয়।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বনাম জনতার আদালত: মোরাল পুলিশিংয়ের ডিজিটাল যুগে প্যান্ডোরা বক্স পলিটিক্স
একজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা জনপরিচিত ব্যক্তি অবশ্যই জনজীবনে জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন। কিন্তু তাই বলে তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জনগণের পৈতৃক সম্পত্তি হয়ে যায় না। তিনি কার সঙ্গে খেতে গেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কখন হাসলেন, কখন মন খারাপ করলেন, সবকিছুর ওপর জনগণের ‘রাইট টু নো’ বসিয়ে দিলে সেটাকে সাংবাদিকতা না বলে নজরদারিনির্ভর বিনোদন বলাই ভালো।
‘মানুষ তো এগুলোই খায়’, এই অজুহাতে সাংবাদিকরা কি সবকিছু কনটেন্ট বানায়, নাকি সাংবাদিকরা বারবার পরিবেশন করে বলেই মানুষের এসব খেতে নেশায় ধরে যায়? মুরগি আগে নাকি ডিম? সাংবাদিকতার প্রাচীন এই ফ্যালাসি কোশ্চেন দিয়েই লেখাটি শুরু করি।
সাংবাদিকতা জনরুচি তৈরি করবে, নাকি জনরুচি সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করবে? ডিজিটাল যুগে যে আমরা সাংবাদিকরা ঘটনার পেছনে অ্যালগরিদমের মতো দৌড়াই, এই প্রশ্ন উঠলেই সাংবাদিকতা, নৈতিকতা আর যুক্তিবিদ্যার ফ্যালাসিগুলো ঝামেলা পাকিয়ে ফেলে।
এখানে একটা খুব সাধারণ, কিন্তু অনেকের কাছে রহস্যময় পার্থক্য আছে। Public interest আর what interests the public মোটেও এক জিনিস না। বাংলায় বললে, ‘জনস্বার্থ’ আর ‘জনতা কী দেখতে চায়’, এ দুটোকে এক করে ফেললে সাংবাদিকতা আর নিউজ থাকে না, হয়ে যায় ডিজিটাল পাড়ার চায়ের দোকান।
একজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা জনপরিচিত ব্যক্তি অবশ্যই জনজীবনে জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন। কিন্তু তাই বলে তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জনগণের পৈতৃক সম্পত্তি হয়ে যায় না। তিনি কার সঙ্গে খেতে গেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কখন হাসলেন, কখন মন খারাপ করলেন, সবকিছুর ওপর জনগণের ‘রাইট টু নো’ বসিয়ে দিলে সেটাকে সাংবাদিকতা না বলে নজরদারিনির্ভর বিনোদন বলাই ভালো।
রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা জননিরাপত্তার ঝুঁকি প্রকাশে কখনো গোপন তথ্য সামনে আনা জরুরি হতে পারে। সেখানে জনস্বার্থ আছে, জবাবদিহি আছে, সাংবাদিকতার প্রয়োজন আছে। কিন্তু কারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, একান্ত মুহূর্ত বা সম্মতিমূলক ব্যক্তিজীবন প্রকাশ করে ক্যাপশনে ‘দেশবাসী জানতে চায়’ লিখে দিলেই সেটি জনস্বার্থ হয়ে যায় না। বেশির ভাগ সময় দেশবাসী কিছুই জানতে চায়নি। কয়েকজন অ্যাডমিন, কিছু ক্লিক আর অ্যালগরিদম প্রকাশ করতে চেয়েছে।
ডিজিটাল যুগে এই সীমারেখার অবস্থাই সবচেয়ে করুণ। মোবাইল ফোন, সিসিটিভি, ক্লাউড স্টোরেজ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু প্রাইভেসিকে বানিয়ে দিয়েছে কাঁচের ঘর।
একটি ব্যক্তিগত ছবি, অডিও বা ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের স্ক্রিনে পৌঁছে যেতে পারে। তারপর সবাই দুই মিনিটের নৈতিক আদালত বসায়, রায় দেয়, মিম বানায়, আবার পরের স্ক্যান্ডালে চলে যায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অনলাইনে একবার কিছু ছড়িয়ে পড়লে সেটি পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। পোস্ট ডিলিট হতে পারে, কিন্তু স্ক্রিনশট নামের অমর-আত্মা ইন্টারনেটে ঘুরতেই থাকে।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘মানুষ এটা দেখবে কি-না’ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এটা প্রকাশ করা উচিত কি-না। কারণ সব ভাইরাল জিনিস সংবাদ নয়, সব কৌতূহল জনস্বার্থ নয়, আর সব ক্লিক সাংবাদিকতার সাফল্যও নয়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বৈশ্বিক উদাহরণ ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কথা আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু ওয়াটারগেটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু এটি নয় যে গোপন তথ্য ফাঁস হয়েছিলো। বরং শিক্ষা হলো, কোন তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কেন প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়েছিলো গোপন তথ্য ও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে। কিন্তু সেটি ছিলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি ও সত্য গোপনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদাহরণ।
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন উন্মুক্ত করে দেওয়া বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়া কখনোই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সমার্থক নয়।
বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যক্তিগত ভিডিও ও অডিও ফাঁসের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে তিনি একটি ব্যাখ্যা দেন এবং রাজনৈতিক দল তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু এসব ঘটনার আগে যে প্রশ্নগুলো ওঠা দরকার ছিলো, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থেকেছে।
প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিলো, ভিডিওটি ধারণ করলো কে? এটি কি অনুমতি নিয়ে ধারণ করা হয়েছিলো? কীভাবে এটি বাইরে এলো? কারা প্রথম ছড়ালো? এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা সাইবার অপরাধ ছিলো কি না?
বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, ভিডিও প্রকাশের পর আলোচনা চলে শুধু ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিকে নিয়ে। ফলে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ করল, তারা অদৃশ্য থেকে যায়।
এখানেই শুরু হয় মোরাল পুলিশিং বা নৈতিকতার নামে ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ। সমাজে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষ আইন, আদালত বা যথাযথ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নিজেরাই বিচারকের ভূমিকা নিতে চায়।
কারও পোশাক, সম্পর্ক, চলাফেরা বা ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই একজন ব্যক্তি সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যান।
বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এখন একটি বড় সাইবার নিরাপত্তা সংকট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Identity Theft Resource Center (ITRC)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ওই বছরে ৩ হাজার ৩২২টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান Surfshark-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪২ কোটি ৫৭ লাখ ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট তথ্য ফাঁসের ঘটনার শিকার হয়েছে।
এই সংকট শুধু ডেটা চুরিতে সীমাবদ্ধ নয়, ব্যক্তিগত নজরদারির প্রযুক্তিও দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২১ সালের পেগাসাস (Pegasus) স্পাইওয়্যার কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে, কীভাবে স্মার্টফোনকে ব্যবহার করে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালানো সম্ভব। পরবর্তী সময়ে প্রিডেটর (Predator) ও গ্রাফাইট (Graphite)-এর মতো স্পাইওয়্যারের ব্যবহার নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০১৪ সালের সেলেবগেট (Celebgate) ঘটনায় হলিউড তারকাদের ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস হয়েছিলো, যা পরে একটি সাইবার অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। এসব ঘটনা দেখায়, ব্যক্তিগত তথ্য এখন শুধু ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় নয়, এটি নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রশ্ন।
সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেনের ‘মোরাল প্যানিক’ ধারণায় বলা হয়েছে, সমাজ কখনো কখনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নৈতিক বিপদের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করায়। তখন ওই ব্যক্তির ওপর সমাজের সব ক্ষোভ ও নৈতিক উদ্বেগ চাপিয়ে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের যুগে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে। একটি ভিডিও, একটি উত্তেজক শিরোনাম এবং কয়েক হাজার মন্তব্য মিলেই তৈরি হয় একটি ডিজিটাল জনআদালত।
এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো সত্য অনুসন্ধান করা, কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষতি কমানো। একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বলেই সেটি সংবাদযোগ্য হয়ে যায় না। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো যাচাই করা, তথ্যটি সত্য কি না, এর উৎস কী, এর সঙ্গে প্রকৃত জনস্বার্থ জড়িত কি না এবং প্রকাশের ফলে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি হবে কি না।
বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যমগুলোও এখন ‘right to privacy’ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। একজন জনপরিচিত ব্যক্তিও তার ব্যক্তিগত জীবনের সব অধিকার হারান না।
একজন রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত, নীতি, অর্থনৈতিক লেনদেন বা ক্ষমতার ব্যবহার জনগণের জানার অধিকারভুক্ত হতে পারে। কিন্তু তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত সবসময় জনস্বার্থের বিষয় নয়।
২০২১ সালের শেষদিকে বাংলাদেশের তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনাও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেই ফোনালাপের রাজনৈতিক প্রভাব ছিলো ব্যাপক এবং তিনি মন্ত্রিত্ব হারান। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, ফোনালাপটি ফাঁস করলো কে? কীভাবে সেটি সংগ্রহ করা হলো? ব্যক্তিগত যোগাযোগে অননুমোদিত প্রবেশের বিষয়টি কেন আলোচনার কেন্দ্রে এলো না?
বিশ্বব্যাপীও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এখন বড় নিরাপত্তা সংকট। ২০১৪ সালে হলিউড অভিনেত্রী জেনিফার লরেন্সসহ বহু তারকার ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছিলো। পরবর্তী তদন্তে এটি একটি সাইবার অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। সেখানে মূল বিষয় ছিলো না তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, মূল বিষয় ছিলো হ্যাকিং, তথ্য চুরি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ভয়াবহ লঙ্ঘন।
২০২২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সরকারি কর্মকর্তাদের কথোপকথন ফাঁস হওয়ার ঘটনাও দেখিয়েছে যে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। একইভাবে পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি দেখিয়েছে, আধুনিক যুগে একটি স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পূর্ণ মানচিত্র হয়ে উঠতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যত সহজ করেছে, নজরদারির ক্ষমতাকেও তত শক্তিশালী করেছে। আগে কাউকে অনুসরণ করতে মানুষের প্রয়োজন হতো। এখন একটি ফোন, একটি সফটওয়্যার বা একটি ডেটাবেইস যথেষ্ট। তাই সাইবার পুলিশিং প্রয়োজন, কিন্তু সেটি হতে হবে আইন, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে থেকে।
অপরাধ তদন্ত, সাইবার প্রতারণা প্রতিরোধ, শিশু সুরক্ষা বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার বৈধ হতে পারে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী বা সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি নিরাপত্তা নয়, সেটি নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এই অধিকার শুধু জনপ্রিয় মানুষের জন্য নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। একজন মানুষ ভুল করতে পারেন, বিতর্কিত হতে পারেন, এমনকি অভিযুক্তও হতে পারেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ হলো আইন, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া। গোপনে ভিডিও ধারণ, অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া এবং জনতার হাতে অপমানিত করা কোনো সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় ফাঁস হওয়া ভিডিও নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু ফাঁসকারীকে নিয়ে প্রশ্ন করি না।
আমরা জানতে চাই ব্যক্তি কী করেছে, কিন্তু জানতে চাই না কে তার ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করলো। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যে প্রযুক্তি একজন রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত প্রকাশ করছে, আগামীকাল সেটি একজন সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কোনো অপরাধীর ঢাল নয়। এটি সভ্য সমাজের মৌলিক ভিত্তি। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক, সবার দায়িত্ব হলো এই সীমারেখা রক্ষা করা। কারণ একটি সমাজের মানবিকতা বোঝা যায় শুধু জনপ্রিয় ও শক্তিশালী মানুষের অধিকার রক্ষায় নয়। বোঝা যায় তখন, যখন একজন বিতর্কিত বা অজনপ্রিয় ব্যক্তির অধিকারও আমরা সম্মান করি।
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই, আমরা কী দেখছি, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আমাদের কে দেখতে পাচ্ছে এবং সেই দেখার ক্ষমতার ওপর নজর রাখছে কে?
তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে আলোচনা মানে কোনো ব্যক্তির আচরণকে সমর্থন করা নয়। একজন জনপ্রতিনিধি বা জনপরিচিত ব্যক্তি তার কাজ, মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্তের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন। রাজনৈতিক দল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে, জনগণ তার মূল্যায়ন করতে পারে এবং আইন ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে রাষ্ট্র আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু জবাবদিহি ও জনতার আদালত এক বিষয় নয়। অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত প্রমাণ, তদন্ত ও আইনের মাধ্যমে, ব্যক্তিগত মুহূর্ত ফাঁস করে, অপমান করে বা সামাজিকভাবে ধ্বংস করে নয়।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে একই সঙ্গে দুটি বিষয় রক্ষা করতে হবে, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা। গোপনীয়তার সুরক্ষা অন্যায়কে আড়াল করার উপায় নয়, আবার অন্যায়ের অভিযোগ ব্যক্তিগত অধিকার ধ্বংসের লাইসেন্সও নয়।
ডিজিটাল যুগের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যেন আমরা নিজেরাই অধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি তৈরি না করি। কারণ আজ যে প্রযুক্তি একজন বিতর্কিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, আগামীকাল সেটি যে কোনো সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে।
গ্রিক পুরাণের প্যান্ডোরার বক্সের গল্পে বলা হয়, কৌতূহলবশত একটি বাক্স খুলে দেওয়ার পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে নানা অজানা দুর্ভোগ। ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও ভিডিওর ক্ষেত্রেও যেন একই সতর্কবার্তা প্রযোজ্য।
প্রযুক্তি নিজে অভিশাপ নয়, এটি জ্ঞান, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু যখন প্রযুক্তি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভাঙা, অপমান করা বা প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সেটিই নতুন ধরনের সংকট তৈরি করে।
তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তথ্যের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করা। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু কত দ্রুত সে তথ্য ছড়াতে পারে, তা দিয়ে নয়। বরং কত দায়িত্বশীলভাবে সে ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে, তা দিয়েই নির্ধারিত হয়।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়