মতামত

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন ঠেকাতে আলেমদের ভুল যুক্তি

‘সমকামী সহিংসতা’ ঠেকাতে ৬০০ জন আলেমের সাক্ষর সম্বলিত এক বিবৃতিতে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে। বিবৃতির যুক্তিটা এমন, সমকামী ও উভকামী ব্যক্তিদের হাতে শিশু যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি নাকি বেশি; সমকামিতা দমন করা গেলে মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনও কমবে। আসলেই কি ব্যাপারটা তাই?

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

দেখলাম সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পর ‘সমকামী সহিংসতা’ ঠেকাতে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে। ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতির নিচে ৬০০ জন আলেমের নামও দেওয়া আছে। আমি এই ৬০০ জনের প্রত্যেকের সম্মতি বা স্বাক্ষর আলাদাভাবে যাচাই করিনি, কাজেই নির্ভুল ভাষা হচ্ছে, এইটা ৬০০ জনের নামযুক্ত বিবৃতি।

বিবৃতির যুক্তিটা এমন: সমকামী ও উভকামী ব্যক্তিদের হাতে শিশু যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি নাকি বেশি; সমকামিতা দমন করা গেলে মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনও কমবে।

আমি বুঝলাম না, ছয়শ নামের ভিড়ে একজনেরও মাথায় এই সামান্য কিন্তু জরুরি তফাৎটা এলো না কেন, দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে ঘটা যৌন সম্পর্ক আর একটা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন এক জিনিস না। প্রথমটায় দুজন প্রাপ্তবয়স্কের সম্মতি আছে। দ্বিতীয়টায় বৈধ সম্মতির প্রশ্নই আসে না। একটা যৌন অভিমুখিতা বা প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কের প্রশ্ন, অন্যটা ক্ষমতা, জবরদস্তি, ক্ষতি ও অপরাধের প্রশ্ন।

তফাৎটা বোঝা এত কঠিনও না। আপনার অনুমতি নিয়ে কেউ আপনার টাকা নিলে সেইটা উপহার, ঋণ বা বৈধ লেনদেন হতে পারে। অনুমতি ছাড়া নিলে চুরি। টাকা একই, হাতবদলের ঘটনাও একই; সম্মতি কাজটার নৈতিক ও আইনি অর্থ বদলে দিল। যৌন সম্পর্কেও সম্মতি সেই সীমারেখা।

আর শিশু চুপ ছিল, ভয় পেয়ে বাধা দেয় নাই, অথবা শিক্ষক-হুজুরের কথায় ‘হ্যাঁ’ বলেছে, এইগুলার কোনোটাই বৈধ সম্মতি না। সিডিসি, পুরো নাম সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সরকারি জনস্বাস্থ্য সংস্থা, শিশু যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞায় ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর এমন যৌন কর্মকাণ্ডে জড়ানোকে রেখেছে, যা সে পুরোপুরি বোঝে না, যাতে সে সম্মতি দেয়নি বা অবহিত সম্মতি দিতে পারে না, অথবা যার জন্য সে বিকাশগতভাবে প্রস্তুত নয়। অর্থাৎ শিশু নির্যাতনের কেন্দ্রে আছে বয়স, বোঝার ক্ষমতা, ক্ষমতার অসমতা ও সম্মতির অসম্ভবতা। অপরাধী আর ভুক্তভোগী একই লিঙ্গের কি না, সেইটা না।

এবার ৩৭৭ ধারাটা একটু মন দিয়ে পড়েন। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৭৭ ধারা বলে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা প্রাণীর সঙ্গে ‘প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ যৌনসঙ্গম’ করবে, তার যাবজ্জীবন অথবা সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে। ব্যাখ্যায় বলা আছে, অপরাধটি ঘটার জন্য প্রবেশ বা পেনিট্রেশন-ই যথেষ্ট।

এখানে চারটা কথা পরিষ্কার করা দরকার।

প্রথমত, ‘স্বেচ্ছায়’ মানে দুই পক্ষের স্বাধীন ও পারস্পরিক সম্মতি না। বাক্যটি অভিযুক্ত ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কাজটি করেছে কি না, সেই কথা বলে। অন্য পক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক না শিশু, রাজি না অরাজি, ধারাটি এই শব্দ দিয়ে সেই পার্থক্য করে নাই।

দ্বিতীয়ত, ‘প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ’ কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞানের সংজ্ঞা না। আইনের ভেতরেও কথাটার সংজ্ঞা দেওয়া নাই। এইটা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নৈতিকতার অস্পষ্ট শব্দবন্ধ। উপমহাদেশের পুরোনো আদালতগুলো প্রথমে মূলত পায়ুসঙ্গম এবং পরে কোনো কোনো রায়ে মুখমৈথুনকেও এর মধ্যে ধরেছে, যুক্তি ছিল, যে যৌনকর্মে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা নাই, সেইটা ‘প্রকৃতির নিয়ম’ অনুযায়ী না। আইনটির ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিশদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, আদালতভেদে ‘প্রকৃতি’ আর ‘প্রবেশ’-এর অর্থও বদলেছে। কাজেই ‘প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ’ কোনো নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক সত্য না; পুরোনো বিচারকদের বানানো নৈতিক শ্রেণি।

তৃতীয়ত, ‘পুরুষ, নারী বা প্রাণী’ কেন? কারণ ধারাটা যৌন পরিচয়ের তালিকা করছে না; কার সঙ্গে ওই কথিত ‘অপ্রাকৃতিক’ পেনিট্রেটিভ অ্যাক্ট  ঘটেছে, তার তালিকা করছে। ‘পুরুষ’ থাকায় পুরুষ-পুরুষ যৌনকর্ম, ‘নারী’ থাকায় নারী-পুরুষের মধ্যেও পায়ু বা মুখে যৌনকর্ম, আর ‘প্রাণী’ থাকায় পশুর সঙ্গে যৌনকর্ম এর ভাষায় ধরা সম্ভব হয়েছে। তাই দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কেবল ‘সমকামিতার আইন’ না; কিছু বিষমকামী যৌনকর্মও এর ভাষায় পড়তে পারে। আবার পেনিট্রেশন-কেন্দ্রিক হওয়ায় সব সমলিঙ্গের সম্পর্কও এতে পড়ে না। আইনটি পরিচয়কে না, পুরোনো নৈতিক ধারণায় নির্দিষ্ট যৌনকর্মকে শাস্তি দেয়।

চতুর্থত, এই ধারা দুজন সম্মত প্রাপ্তবয়স্ক আর একটি নির্যাতিত শিশুকে আলাদা করার জন্য বানানোই না। একই ঝুড়িতে সম্মত সম্পর্ক, জবরদস্তি, শিশু নির্যাতন ও পশুর সঙ্গে যৌনকর্ম ঢুকিয়ে রেখেছে। এইটা আধুনিক শিশু-সুরক্ষা আইন না।

তার ওপর এখন শিশু নির্যাতনের জন্য আরও সরাসরি আইন আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বর্তমান পাঠে ছেলে শিশুর মুখ বা পায়ুপথে কোনো ব্যক্তির সংঘটিত যৌনকর্মকে ‘বলাৎকার’ বলা হয়েছে, আর ৯ ধারায় স্পষ্ট করা হয়েছে, ‘ধর্ষণ’ অর্থে বলাৎকারও অন্তর্ভুক্ত। বিধানটি ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে আসে এবং ২০২৬ সালের সংশোধনী আইনে রাখা হয়, ২৫এ মার্চ ২০২৫ থেকে কার্যকর ধরে। আইন নিখুঁত কি না সেই আলোচনা আলাদা; কিন্তু সাত বছরের শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের বিচার করতে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাই একমাত্র রাস্তা, এই দাবি এখন আর চলে না। শিশু রক্ষাই উদ্দেশ্য হলে, শিশু-কেন্দ্রিক আইনের প্রয়োগ, নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা আর প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি চান।

এবার আসেন গবেষণায়। বিবৃতি বলছে, ‘বিভিন্ন গবেষণামূলক বিশ্লেষণে’ নাকি সমকামী ও উভকামীদের হাতে শিশু নির্যাতনের ঝুঁকি বেশি। কোন গবেষণা? কোথায় হয়েছে? কারা করেছে? নমুনা কত? অপরাধীর যৌন অভিমুখিতা কীভাবে মাপা হয়েছে? দলিল কই, ডেটা কই, প্রমাণ কই? ছয়শ মানুষের নাম একটা তথ্যসূত্রের কাজ করে না। একই প্রমাণহীন কথা ছয়শবার বললে আওয়াজ বাড়ে, প্রমাণের ওজন বাড়ে না।

এই প্রসঙ্গে যে গবেষণাটি বহুল উদ্ধৃত হয়, তার পরিচয় অন্তত পরিষ্কার করে দিই। ১৯৯৪ সালে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের জার্নালের ক্যারোল জেনি, থমাস এ রস্লার এবং কিম্বারলি এল পয়ার -এর গবেষণা  ‘আর চিলড্রেন অ্যাট রিস্ক ফর সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ বাই হোমোসেক্সুয়ালস?’ প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের ডেনভারে  ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো হেলথ সাইন্সেস সেন্টারের ডিপার্টমেন্ট অফ পিডিয়াট্রিক্স-এর কেমপে চিলড্রেনস সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গবেষণার জায়গা ছিল ডেনভারের একটি আঞ্চলিক শিশু হাসপাতালের চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ক্লিনিক। নথিগুলো ১লা জুলাই ১৯৯১ থেকে ৩০এ জুন ১৯৯২ সময়ের। অর্থাৎ এইটা বাংলাদেশের জরিপও না, আমেরিকার জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল নমুনাও না, একটি ক্লিনিকে পাঠানো শিশুদের চিকিৎসা-নথির পর্যালোচনা।

গবেষকেরা সন্দেহভাজন শিশু যৌন নির্যাতনের মূল্যায়নের জন্য পাঠানো ৩৫২ শিশুর নথি দেখেন। ৩৫টি ঘটনায় নির্যাতন হয়নি বলে সিদ্ধান্ত হয়, ৭৪ ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী, ৯ ঘটনায় অভিযুক্ত শনাক্ত হয়নি। বাকি ২৬৯ ঘটনায় মাত্র দুই অভিযুক্তকে সমকামী বা লেসবিয়ান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল; ২২২ ঘটনায়, অর্থাৎ ৮২ শতাংশে, অভিযুক্ত ছিল শিশুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বিষমকামী সঙ্গী। পাবমেড-এ গবেষণাটির পদ্ধতি ও ফল দুইটাই দেখা যায়

একটা ক্লিনিকের একটা পুরোনো গবেষণা দিয়ে পৃথিবীর সব অপরাধীর হিসাব শেষ হয়ে যায় না। গবেষকেরাও সেই দাবি করেননি। কিন্তু এই ফল অন্তত ‘সমকামী বা উভকামীরাই বেশি শিশু নিপীড়ন করে’, এই সর্বজনীন কথাটাকে সমর্থন করে না। বরং একটা মৌলিক ভুল দেখায়: ছেলে শিশুকে কোনো পুরুষ নির্যাতন করেছে মানেই ওই পুরুষ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট, এমন না। ভুক্তভোগীর লিঙ্গ অপরাধীর প্রাপ্তবয়স্ক যৌন অভিমুখিতার পরীক্ষা না।

এখানে গ্রেগরি হেরেকের পরিচয়ও পরিষ্কার থাকা দরকার। গ্রেগরি এম হেরেক এই ৩৫২ শিশুর গবেষণার লেখক না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস-এর মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এমেরিটাস এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি অনুযায়ী, তার গবেষণার প্রধান বিষয় সেক্সুয়াল প্রেজুডিস বা যৌন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে পক্ষপাত, সমকামীবিরোধী সহিংসতা, যৌন অভিমুখিতাভিত্তিক কলঙ্ক এবং এইচআইভি/এইডস-সংক্রান্ত স্টিগমা । তিনি আগের গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করে একটি তথ্যভিত্তিক নিবন্ধে দেখিয়েছিলেন, ছেলে শিশুর পুরুষ নির্যাতনকারীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘সমকামী’ ধরে নেওয়া ভুল এবং সমকামী বা উভকামী পুরুষেরা বিষমকামী পুরুষের চেয়ে বেশি শিশু নির্যাতন করে, এমন সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে তার ওই ওয়েবপেজ এখন আর হালনাগাদ হয় না, সাইটেই সেই সতর্কতা আছে। তাই হেরেককে নতুন গবেষণার লেখক বানানো যাবে না; তাকে পুরোনো গবেষণাসাহিত্যের একজন পর্যালোচক হিসেবেই উদ্ধৃত করতে হবে।

মাদ্রাসার ঘটনায় অভিযুক্তদের যৌন অভিমুখিতা নিয়ে কোনো তথ্য আছে? না থাকলে যুক্তিটা দাঁড়ায়: একজন পুরুষ ছেলে শিশুকে নির্যাতন করেছে, তাই সে সমকামী; আর সে সমকামী, তাই প্রমাণ হলো সমকামীরা শিশু নির্যাতন করে। এইটা গবেষণা না, যুক্তিও না। নিজেদের সিদ্ধান্তকেই নিজের সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা।

এতে আসল প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে। মাদ্রাসায় কে শিশুর সঙ্গে একা থাকতে পারে? আবাসিক কক্ষে নজরদারি কী? শিশু অভিযোগ করবে কার কাছে? অভিযোগ পাওয়া মাত্র অভিযুক্তকে শিশুদের কাছ থেকে সরানো হবে কি? থানায় জানানো হবে, নাকি ‘মাদ্রাসার সম্মান’ আর ‘মুসলমান ভাইয়ের দোষ’ রক্ষার নামে ধামাচাপা দেওয়া হবে? অস্ট্রেলিয়ার সরকারি রয়াল কমিশন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন তদন্ত করে দেখেছে, প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা, নেতার অতিরিক্ত কর্তৃত্ব, অভিযোগ গোপন, পুলিশকে না জানানো এবং অভিযুক্তকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া নির্যাতন টিকিয়ে রাখে। অস্ট্রেলিয়ার গির্জা বাংলাদেশের মাদ্রাসা না; কিন্তু প্রতিষ্ঠান যখন নিজের সুনামকে শিশুর নিরাপত্তার ওপরে রাখে, কৌশলগুলো ভয়াবহ রকম চেনা।

এখন কেউ বলবেন, বিবাহবহির্ভূত যৌনতা নিয়ে বলি না কেন, সমকামিতা নিয়ে বলি না কেন, ধর্ম রক্ষার কথা বলি না কেন।

শুনেন।

ইসলামী আইনচিন্তায় হাক্কুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর হক, আর হাক্কুল ইবাদ, অর্থাৎ মানুষের হক, আলাদা করে আলোচনা করা হয়। তবে সব অপরাধকে দুইটা বদ্ধ বাক্সে ঢুকানো ঠিক না; অনেক অপরাধের মধ্যে দুই ধরনের হকই জড়িত থাকে।

হাক্কুল্লাহর লঙ্ঘন মূলত আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয়। বান্দা আন্তরিকভাবে তওবা করলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাকে ক্ষমা করতে পারেন। তওবা না করলে আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার অনুযায়ী শাস্তি দিতে পারেন, আবার নিজ রহমতে ক্ষমাও করতে পারেন। অর্থাৎ আল্লাহর হকের বিচার ও ক্ষমা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইখতিয়ারে।

কিন্তু হাক্কুল ইবাদের  হিসাব শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে শেষ করা যায় না। যার অধিকার নষ্ট করা হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, ক্ষতি পূরণ করতে হবে এবং তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা করলে আলাদা কথা। কিন্তু সে ক্ষমা না করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ জুলুমকারীর কাছ থেকে তার হক আদায় করে দেবেন।

এই হিসাবে, সম্মত প্রাপ্তবয়স্কদের সমলিঙ্গের যৌনকর্মকে কেউ ধর্মীয়ভাবে পাপ মনে করলে সেটি প্রধানত হাক্কুল্লাহর লঙ্ঘন। কিন্তু শিশু যৌন নিপীড়ন সরাসরি হাক্কুল ইবাদের লঙ্ঘন। একই সঙ্গে সেটি আল্লাহর বিধানও লঙ্ঘন করে। কারণ এখানে শুধু ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ কোনো যৌনকর্ম ঘটে নাই; একটি শিশুর শরীর, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার ওপর জবরদস্তি করা হয়েছে। ফলে নির্যাতনকারী শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করে বা ঘটনাটিকে ‘যৌন পাপ’ বলে শিশুর অধিকার থেকে মুক্ত হতে পারে না। তার বিচার করতে হবে, শিশুর ক্ষতির প্রতিকার করতে হবে এবং শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এই জায়গায় হিনা আজমের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিন -এর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়-পরিচিতি অনুযায়ী, তার গবেষণার বিষয় ইসলামী আইন, নৈতিকতা, ধর্মতত্ত্ব, তাফসির, হাদিস এবং ইসলামে নারী, জেন্ডার ও যৌনতা। তার বই সেক্সুয়াল ভায়োলেশন ইন ইসলামিক ল: সাবস্ট্যান্স, এভিডেন্স, অ্যান্ড প্রসিজিউর ২০১৬ সালে অ্যামেরিকান হিস্টোরিকাল অ্যাসোসিয়েশনের জেমস হেনরি ব্রেস্টেড প্রাইজ পায়।

বইটিতে তিনি ইসলামের প্রথম ছয় শতকের গঠনপর্ব ও ধ্রুপদী যুগের হানাফিমালিকি ফিকহে ধর্ষণ ও যৌন জবরদস্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে ধর্ষণের বিচার, প্রমাণ, শাস্তি, ক্ষতিপূরণ এবং আল্লাহর হক ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হকের সম্পর্ক পরীক্ষা করেছেন। তার গবেষণা দেখায়, ধ্রুপদী ফিকহে ধর্ষণ নিয়ে একটিমাত্র সরল মত ছিল না; হানাফি ও মালিকি ফকিহদের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল। কিন্তু জবরদস্তির শিকার ব্যক্তিকে আর স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে অংশ নেওয়া ব্যক্তিকে একই অবস্থানে রাখা হয়েছিল, এমন সরল দাবি তার গবেষণা সমর্থন করে না। বরং ধর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, ক্ষতিপূরণ ও বিচার কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নই ফিকহি বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

সহিহ মুসলিমের ‘নিঃস্ব ব্যক্তি’র হাদিসেও এই পার্থক্য পরিষ্কার। সেখানে এমন একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে। কিন্তু সে কাউকে অপমান করেছে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ খেয়েছে, কারও রক্ত ঝরিয়েছে এবং কাউকে আঘাত করেছে। তখন তার নেক আমল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের পাপ তার ওপর চাপানো হবে। অর্থাৎ ইবাদতের খাতা মানুষের ওপর করা জুলুম মুছে দেয় না। আল্লাহর কাছে নিজের ধার্মিকতার দাবি দেখিয়ে বান্দার হক থেকে পালানোর রাস্তা নেই।

কাজেই আমাকে আর বলবেন না, বিবাহবহির্ভূত যৌনতা নিয়ে বলি না কেন, সমলিঙ্গের যৌনকর্ম নিয়ে বলি না কেন কিংবা ধর্মের অন্য পাপগুলো নিয়ে বলি না কেন। ধর্মের কোন পাপ নিয়ে কে কথা বলবেন, সেই দায়িত্ব তার। আমি সব ধর্মীয় পাপের তালিকা করতে বসি নাই। আমি শৈশব রক্ষার দাবিতে আলাপ তুলেছি, ধর্ম রক্ষার দাবিতে না।

শিশুর ওপর জুলুম হলে আপনারা অভিযোগ নেবেন কি না, পুলিশকে জানাবেন কি না, অভিযুক্তকে শিশুদের কাছ থেকে সরাবেন কি না, নাকি মাদ্রাসার সুনাম ও ‘মুসলমান ভাইয়ের দোষ’ রক্ষার নামে ঘটনাটি ধামাচাপা দেবেন—এই প্রশ্নের জবাব এখনই দিতে হবে।

শিশু নির্যাতনকারীকে তার অপরাধের জন্য বিচার করেন, তার কল্পিত যৌন পরিচয়ের জন্য না। প্রতিটি মাদ্রাসায় লিখিত শিশু-সুরক্ষা নীতি করেন। স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করেন। অভিযোগ পাওয়া মাত্র পুলিশকে জানান। অভিযুক্তকে তদন্ত চলাকালে শিশুদের সংস্পর্শ থেকে সরান। ভুক্তভোগীকে চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা দেন। আর অভিযোগ ধামাচাপা দিলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দায়ও নির্ধারণ করেন।

ছয়শ নাম একটি শ্রেণিগত ভুলকে জ্ঞান বানায় না। আবার পড়েন, আমি মানুষের শৈশব রক্ষার দাবিতে কথা বলছি। আল্লাহর হক রক্ষার জন্য আল্লাহ অসহায় নন। কিন্তু শিশুর হক রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। সেই দায়িত্ব এড়িয়ে শিশুদের শৈশবকে অন্য কোনো রাজনীতির ঢাল বানাবেন না।

 

মীর হুযাইফা আল মামদূহ ধর্ম, গণমাধ্যম, পরিচয় ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে কাজ করা একজন গবেষক ও সাংবাদিক। তার গবেষণার আগ্রহের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজ, ধর্মীয় ডিসকোর্স এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব।

[মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব]