মতামত

ডাকসু যখন বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে জিন্নাহকে সামনে আনে: ইতিহাস না রাজনৈতিক প্রকল্প ?

ইতিহাস যদি এক ডাকসু প্যানেল কিংবা ইনকিলাব মঞ্চের লোকজন মুছে দিতে পারতো, তবে তো ভালোই হতো। ইতিহাসের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। তাকে যতো জোর করে নিয়ন্ত্রণ করতে যাবেন, সে ততো নতুন পথে ফিরে আসে। কখনো বইয়ে, কখনো স্মৃতিতে, কখনো সাহিত্যে, কখনো একটা তোতা পাখির মুখে। ইতিহাস কড়ায়-গণ্ডায় কর্মফল বুঝিয়ে দেয়।

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত-শিবির ও এনসিপির বুদ্ধিজীবীরা জিন্নাহ নিয়ে যে মাতামাতি শুরু করেছিলেন, তাতে খানিকটা অবাক হয়েছিলাম। পরে দেখলাম ডাকসুর শিবির-সমর্থিত প্যানেল ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে দিয়েছে ও জিন্নাহর ছবি বসিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছবি শুধু সেখানেই রেখেছে, যেখানে তারা বাকশালের ছবি দেখিয়েছে। অর্থাৎ শিবির-সমর্থিত ডাকসু প্যানেলের উদ্দেশ্য হলো এটা প্রমাণ করা, ছয় দফা থেকে ’৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কোনো অবদান নেই, তবে বাকশাল তার একমাত্র কাজ। এই যে বয়ান, এটা কিন্তু জামায়াত-শিবির ও এদের এ-বি টিম কোনো রাখঢাক না রেখেই বলে। সাম্প্রতিক সময়ে যোগ হয়েছে জিন্নাহ নিয়ে মাতামাতি। যেহেতু জামায়াত-শিবির ডাকসুর সংগ্রহশালায় গোলাম আজমের ছবি টাঙাতে পারবে না, কেননা সে গণহত্যায় সহযোগী ছিল, তাই বোধহয় জিন্নাহকে বেছে নিয়েছে।

এই ছবি টাঙানোর প্রেক্ষিতে দেখলাম আরেকজন গিয়ে সেই ছবি ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। ছবি টাঙানোর পক্ষে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা অনলাইনে নিজেদের যুক্তি দিচ্ছেন। জামায়াতের এক সিনিয়র নেতা সাংবাদিকদের বলছেন যে, যারা ইতিহাস জানে না তারা ইতিহাসে জিন্নাহর অবদান অস্বীকার করতে চায়। অন্যদিকে, আরেক দল এই ছবি ছিঁড়ে ফেলাকে উদযাপন করছে।

আলাপটা এই নয় যে ইতিহাসে জিন্নাহর অবদান নেই। অবশ্যই ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জিন্নাহ একজন শক্তিমান নেতা ছিলেন ও পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধানতম নেতা। কিন্তু জিন্নাহ যে দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন সেই দ্বিজাতি তত্ত্বকে রিজেক্ট করে অ্যান্টিথিসিস দিয়েছিলেন শেখ মুজিব। বাঙালিরা দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে বের হয়ে এসে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল, নিজেদের ধর্মের ও সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই অগ্রযাত্রায় মুজিব কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিল আর সে কারণেই তাকে বঙ্গবন্ধু বলা হয়। আর শিবির-সমর্থিত ডাকসু প্যানেল যখন ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করে মুছে ফেলতে চায় তখন আসলে ইতিহাসের রাজনীতি শুরু হয়। ইতিহাস শুধু অতীতে কী ঘটেছিল তার তালিকা নয়। কে কোন ঘটনাকে সামনে আনছে, কোন ঘটনাকে আড়াল করছে, কাকে জাতীয় নায়ক বানাচ্ছে, কাকে খলনায়ক বানাচ্ছে, কোন ছবিটা দেয়ালে রাখছে আর কোন ছবিটা নামিয়ে ফেলছে, এগুলোও ক্ষমতার রাজনীতির অংশ।

মাস্টার্স পড়ার সময় আমার একটি কোর্স ছিলো হিস্টোরিওগ্রাফি। সেখানে ইএইচ কার-এর লেখা হোয়াট ইজ হিস্ট্রি? বইটি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম। বইয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন ইএইচ কার। ইতিহাসের সব ঘটনা আপনাআপনি সমান গুরুত্ব নিয়ে আমাদের সামনে আসে না। ইতিহাসবিদরা কিছু তথ্য বেছে নেন, কিছু তথ্যকে গুরুত্ব দেন, কিছু তথ্য বাদ দেন। অর্থাৎ তথ্য থাকে, কিন্তু কোন তথ্যকে ঐতিহাসিক তথ্য বানানো হবে, সেই নির্বাচনের মধ্যে ইন্টারপ্রিটেশন কাজ করে। এই কাজটা করা হয় নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে। আর এখানেই সমস্যা শুরু হয়, যখন রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল বা কোনো আইডিওলজিক্যাল গ্রুপ এই নির্বাচনের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব নিতে চায়। এই কর্তৃত্ব নেওয়ার মাধ্যমে ইতিহাসকে যুদ্ধক্ষেত্র বানানো হয়। ইতিহাস তখন জানার বা বোঝার বিষয় থাকে না, হয়ে যায় পলিটিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট বা রাজনৈতিক হাতিয়ার।

শিবির সমর্থিত ডাকসু যখন শেখ মুজিবের বাকশাল রাখেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা বাদ দেন, তখন সে আসলে ইতিহাস বলছে না বরং ইতিহাস কিউরেট করছে। একই ভাবে আওয়ামী লীগ যখন জিয়ার সামরিক শাসনের কথা বলেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা বাদ দেন, সেটাও একই কাজ। শিবির বর্তমানে জিন্নাহর ১১ই আগস্টের ভাষণ তুলে ধরছে কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, পূর্ব বাংলার ভাষা ও প্রতিনিধিত্বের সংকট, কিংবা তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ফল বাদ দিয়ে আলাপ করছে। এই মাধ্যমে আসলে তারা সিলেক্টিভ হিস্ট্রির চর্চা করছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ যখন বঙ্গবন্ধুকে শুধু স্বাধীনতার প্রতীক বানিয়ে তার শাসনামলের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলতে বাধা দেয় তখন একই ধরনের ইতিহাসের রাজনীতি হয়। এ কাজগুলো করা হয় ক্ষমতার স্থান থেকে। যে বা যিনি ক্ষমতা পান তিনি ইতিহাসে এই সিলেক্টিভ বয়ান আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ইতিহাসকে ডমিনেট করার সবচেয়ে সহজ কৌশল হলো মানুষকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে না দেখিয়ে সিম্বলে পরিণত করা। তখন বঙ্গবন্ধু আর মানুষ নন, তিনি হয় দেবতা, না হয় ডিক্টেটর। জিয়া হয় শুধু মুক্তিযোদ্ধা, না হয় শুধু সামরিক শাসক। জিন্নাহ হয় কেবল মুসলিম জাতীয়তাবাদের আইকন, না হয় পাকিস্তানের সব সমস্যার একক উৎস। এই বাইনারি হিস্ট্রির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যারা এই ইতিহাস বলেন তারা আসলে মানুষকে বলতে চান ইতিহাস নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। নিজের ক্যাম্পের জন্য সুবিধাজনক অংশটুকু নিলেই হলো। কিন্তু ইতিহাস কি আসলে এভাবেই কাজ করে?

দেখুন, বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, জিয়া, ওসমানী, ভাসানী এরা আমাদের জাতীয় নেতা। এরা কেউ পারফেক্ট মানুষ ছিলেন না। দোষে-গুণে মানুষ ছিলেন। তবে এই ভূখণ্ডের মানুষের মুক্তির জন্য সব কিছু করেছেন। এরা যখন জীবিত ছিলেন, এরা যে নিজেদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার ব্যবহার করেননি তেমন নয়, করেছেন। রাজনীতির ধর্মই তাই। এই সব কিছু মিলিয়েই এরা আমাদের জাতীয় নেতা। একজন জাতীয় নেতাকে স্বীকার করা মানে তার সব সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়। বরং তার অবদান, সীমাবদ্ধতা, ভুল, সাফল্য, ব্যর্থতা সবকিছুকে একসঙ্গে ইতিহাসের ভেতরে রাখা। ম্যাচিউর সোসাইটি এ কাজটাই করে। দুর্ভাগ্য হলো আমাদের সমাজ সেই ম্যাচিউর সোসাইটি হতে পারেনি। আমাদের রাজনীতিবিদরা ও তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা ইম্যাচিউর পলিটিক্স করে ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করতে চান। এই কাজটি এখন প্রায় প্রজেক্ট আকারে গ্রহণ করেছে জামায়াত-শিবির ও তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তারা এখন যথেষ্ট ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন। আর ক্ষমতায় গিয়েই তারা নিজের নায়ক বানানোর প্রজেক্ট নিয়েছে অন্যদিকে জাতীয় নেতাদের দেয়াল থেকে নামানোর উদ্যোগই নিয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই রাজনীতিতে সমস্যা ছিলো না। সমস্যা তখন তৈরি হয় যখন জামায়াত ও তাদের ছাত্র উইং শিবিরের পূর্বতন সংগঠন ছাত্রসংঘ ১৯৭১-এর গণহত্যায় অংশ নিয়েছে, বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে হত্যায় অংশ নিয়েছে। গণহত্যার সহযোগীরা যখন ১৯৭১-এর সঠিক ইতিহাস শিক্ষা দিতে আসে তখন তো তার প্রতিবাদ করা বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশে এই রোগ নতুন না। কিন্তু বাস্তবতা থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। যেমন আওয়ামী লীগ জিয়াকে ছোট করতে গিয়ে তাকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে জিয়াকে আরও রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করেছে। এখন জামায়াত-শিবির যদি মনে করে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে, তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভেঙে ইতিহাসকে বাকশালের সময়ের মধ্যে বন্দি করে, কিংবা জিন্নাহকে সামনে এনে বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিকে নতুন করে সাজিয়ে ফেলবে, তাহলে তারা আগের একই ভুল করছে। জামায়াত-শিবির বুঝতে ভুল করছে যে কালেক্টিভ মেমোরিকে প্রশাসনিক আদেশে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

একটা মিউজিয়াম, একটা টেক্সটবুক, একটা মিউরাল, একটা ইউনিভার্সিটি কালেকশন বদলে দেওয়া যায়। এই কাজগুলো সহজ। যার হাতে ক্ষমতা থেকে তিনি খুব সহজে এ কাজ করতে পারেন। ডাকসু যেমন এই কাজটি করেছে। কিন্তু মানুষের পরিবারে যে গল্প আছে, সাহিত্যে যে স্মৃতি আছে, চলচ্চিত্রে যে রিপ্রেজেন্টেশন আছে, গানে যে ইতিহাস আছে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় যে ট্রমা আছে, সেগুলো মুছে ফেলা অনেক কঠিন। রাষ্ট্রের আর্কাইভ এক কথা বলতে পারে, কিন্তু সোসাইটির আর্কাইভ অন্য কথা বলে যেতে পারে। ডাকসু কি আমাদের সমাজের এই আর্কাইভ মুছে ফেলতে পারবে?

এ কারণেই অথরিটেরিয়ান পলিটিক্স কিংবা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা গ্রুপ সবসময় হিস্ট্রি নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে। কে ফাউন্ডিং ফাদার, কার ছবি থাকবে, কোন দিন জাতীয় দিবস হবে, কোন বক্তৃতা বইয়ে থাকবে, কার নাম রাস্তা থেকে সরানো হবে, কার বাড়ি মিউজিয়াম থাকবে, এসব কখনোই শুধু কালচারাল কোয়েশ্চেন নয়। এগুলো লেজিটিমেসির প্রশ্ন। এই প্রশ্ন নিয়ে তারা ব্যস্ত থাকেন। তারা অতীতকে ডিফাইন করতে চান, সে বর্তমানকে জাস্টিফাই করতে চান, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্লেইম করতে চান।

আবার ইএইচ কার-এর আলাপে ফেরত যাই। প্রেজেন্ট সবসময় পাস্টকে নতুন করে পড়ে। কিন্তু পাস্টকে নতুন করে পড়া আর পাস্টকে নিজের পলিটিক্যাল কনভিনিয়েন্স অনুযায়ী বিকৃত করা এক জিনিস নয়। জামায়াত-শিবির ও তাদের সমর্থিত ডাকসু সেই কাজটি করেছে। নতুন এভিডেন্স, নতুন পার্সপেক্টিভ, নতুন প্রশ্ন দিয়ে ইতিহাস পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু পলিটিক্যাল অবজেক্টিভ আগে ঠিক করে তারপর সেই অবজেক্টিভের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্যাক্ট বাছাই করা হিস্টোরিওগ্রাফি না, প্রোপাগান্ডা। আর সেই কাজটাই করছে ডাকসু।

ইতিহাস যদি এক ডাকসু প্যানেল কিংবা ইনকিলাব মঞ্চের লোকজন মুছে দিতে পারতো, তবে তো ভালোই হতো। ইতিহাসের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। তাকে যতো জোর করে নিয়ন্ত্রণ করতে যাবেন, সে ততো নতুন পথে ফিরে আসে। কখনো বইয়ে, কখনো স্মৃতিতে, কখনো সাহিত্যে, কখনো একটা তোতা পাখির মুখে। ইতিহাস কড়ায়-গণ্ডায় কর্মফল বুঝিয়ে দেয়।

আসিফ বিন আলী পেশায় একজন শিক্ষক ও গবেষক

[প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব]