গ্রিক পুরাণের নায়ক থিসিয়ুস ক্রিট থেকে যে জাহাজে এথেন্সে ফিরেছিলেন, সেটি এথেন্সবাসী বহু বছর ধরে সংরক্ষণ করেছিলো। সময়ের সঙ্গে জাহাজের কাঠ পচে গেলে পুরোনো তক্তা খুলে নতুন তক্তা বসানো হতো। তারপর আরেকটি। এভাবে একসময় প্রশ্ন উঠল, জাহাজটির সব তক্তাই যদি বদলে যায়, তাহলে সেটি কি তখনো থিসিয়ুসের সেই জাহাজ? দর্শনশাস্ত্রে একে বলা হয় থিসিয়ুসের জাহাজের প্যারাডক্স।
এর কাছাকাছি আরেকটি ধাঁধা আছে। সোরাইটিস প্যারাডক্স। একটি বালুর স্তূপ থেকে একটি করে দানা সরাতে থাকলে কোন দানাটি সরানোর পর সেটিকে আর বালুর স্তূপ বলা যাবে না?
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা কঠিন।
রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই সমস্যা।
একটি দল এক সকালে ঘুম থেকে উঠে তার রাজনৈতিক চরিত্র বদলে ফেলে না। পরিবর্তন আসে একটি করে সিদ্ধান্তে। একটি নির্বাচনে। একটি আপসে। একটি প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার মধ্য দিয়ে। বিরোধী মতের জায়গা একটু কমে। ক্ষমতার কেন্দ্র একটু ছোট হয়।
প্রতিটি পরিবর্তন আলাদাভাবে দেখলে হয়তো খুব বড় মনে হয় না। কিন্তু অনেক বছর পর পেছনে তাকালে সোরাইটিসের প্রশ্নটাই আসে। ঠিক কোন দানাটি সরানোর পর স্তূপটি আর আগের স্তূপ ছিল না?
আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে এই দুই প্যারাডক্সের মধ্য দিয়ে দেখা যেতে পারে। শেখ হাসিনা এখনো জীবিত। তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়েননি। এখনো দলের সভাপতি। তাই ‘শেখ হাসিনার উত্তরসূরি কে’ প্রশ্নটি এখনই সাংগঠনিকভাবে জরুরি নয়। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে কে দল চালাবেন, তার উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন।
সাতই সেপ্টেম্বর কলকাতার বাংলা সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-কে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। শেখ রেহানার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেছেন।
প্রশ্নটা সেখানেই, শেখ সেলিম কেন?
শেখ হাসিনা তাকে জ্যেষ্ঠ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বলেছেন। কিন্তু বয়সের হিসেবে তিনি সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নন।
আওয়ামী লীগের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সভাপতিমণ্ডলীর জীবিত সদস্যদের মধ্যে সৈয়দা জেবুন্নেছা হকের বয়স প্রায় ৮২ বছর। সিলেটের প্রবীণ এই আওয়ামী লীগ নেত্রী সাবেক সংসদ সদস্য এবং বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত।
কাজী জাফরউল্লাহর বয়স ৭৯। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ৭৮। শেখ সেলিমের ৭৭। আব্দুর রাজ্জাক ও কামরুল ইসলামের ৭৬। মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ৭৫। ফারুক খান ও শাজাহান খান ৭৪। জাহাঙ্গীর কবির নানক ৭২। আব্দুর রহমান ৭১। খায়রুজ্জামান লিটন ৬৭ এবং সিমিন হোসেন রিমি ৬৫।
তবে বয়স আর রাজনৈতিক জ্যেষ্ঠতা এক নয়।
আর বর্তমান বাস্তবতাও স্বাভাবিক নয়।
জীবিত সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে কাজী জাফরউল্লাহ, আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম ও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন কারাগারে আছেন।
কাজী জাফরউল্লাহ শেখ পরিবারের সদস্য নন। আবার শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আস্থার বাইরের মানুষও ছিলেন না। দীর্ঘদিন সভাপতিমণ্ডলীতে ছিলেন। নির্বাচন পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন।
তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়।
কাজী জাফরউল্লাহ মুক্ত থাকলে কি শেখ হাসিনা একই নাম বলতেন? এমন তো হতেই পারে, তাকে বিবেচনায় না আনার সবচেয়ে বড় কারণ তার কারাবন্দি থাকা।
আবার শেখ সেলিমেরও আরেকটি পরিচয় আছে।
তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে। তার মা শেখ আছিয়া বেগম ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মেজো বোন। শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই তিনি। এই সম্পর্কটা কি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক?
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ও সাংগঠনিক রাজনীতিতে শেখ পরিবারের বিভিন্ন শাখার একাধিক সদস্য সামনে এসেছেন।
শেখ হেলালের ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময় বাগেরহাট-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। আগের দলীয় সংসদ সদস্য আর মনোনয়ন পাননি।
শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল খুলনা-২ আসনে একইভাবে নতুন মুখ হিসেবে আসেন।
শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সাঈদ খোকনের পরিবর্তে দলের প্রার্থী হন।
তার ভাই শেখ ফজলে শামস পরশ দীর্ঘ সাংগঠনিক পথ পেরিয়ে নয়, সরাসরি যুবলীগের চেয়ারম্যান হন।
আর নিক্সন চৌধুরীর ঘটনা আরও আলাদা। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন না। স্বতন্ত্র হয়ে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহকে তিনবার হারিয়েছেন।
কিন্তু ফরিদপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ তার সঙ্গে ছিল। পরে তিনিই যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন।
পুরোনো আওয়ামী লীগ নেতা হেরেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীর পেছনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অংশ আছে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বী আবার বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরে তিনি দলের সহযোগী সংগঠনের উচ্চপর্যায়ে জায়গা পাচ্ছেন। এটাকে কীভাবে দেখা হবে? স্থানীয় ক্ষমতার বাস্তবতা? পারিবারিক প্রভাব? নাকি পুরোনো নেতৃত্বের পাশাপাশি আরেকটি ক্ষমতার বলয় তৈরি হওয়া?
এখানে আরেকটি সমস্যা আছে।
যাদের আওয়ামী লীগের নতুন বা তরুণ প্রজন্ম হিসেবে একসময় তুলে ধরা হয়েছিল, তারা সবাই খুব তরুণও নন।
পরশ যুবলীগের চেয়ারম্যান হয়েছেন পঞ্চাশের পরে। তাপস তখন বহু বছরের সংসদ সদস্য। নিক্সনও এখন মধ্যবয়সী রাজনীতিক।
তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বলা ভালো।
কিন্তু ২০২৪ সালের পর সেই পরবর্তী প্রজন্ম কোথায়?
দলের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের সময় তন্ময় সামনে নেই। জুয়েল সামনে নেই। তাপস সামনে নেই। পরশ সামনে নেই। নিক্সনও আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে ওঠেননি।
শেষ পর্যন্ত আবার ৭৭ বছর বয়সী শেখ সেলিম।
এখানে আওয়ামী লীগের নিজের ইতিহাসটির দিকে তাকানো দরকার।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ ভয়াবহ সংকটে পড়ে। দল ভাঙে। নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ হয়। একাধিক ধারা তৈরি হয়।
১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয়। সেই বছরের ১৭ই মে তিনি দেশে ফেরেন।
তখন তার বয়স মাত্র ৩৩ বছর। কিন্তু দেশে ফেরাই তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা ছিল না।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রায় পুরো দশক তাকে পার করতে হয়েছে। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে পারেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল ক্ষমতায় আসে ১৯৯৬ সালে।
অর্থাৎ ৩৩ বছর বয়সে দেশে ফিরে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিতে তার প্রায় ১৫ বছর সময় লেগেছিলো।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে হিসাব করলে আওয়ামী লীগের আবার সরকার গঠন করতে লেগেছিল প্রায় ২১ বছর।
এই সময়ের ভূরাজনীতিও আজকের মতো ছিল না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিল। ডিসেম্বর ১৯৭১-এ জাতিসংঘেও সোভিয়েত বলয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভার তৈরি করেছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছিল।
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের বামঘেঁষা রাজনৈতিক অবস্থান এবং মস্কোপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা ছিল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়ও একটি খুঁটি ছিল।
আজ সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। বিশ্ব রাজনীতিও দ্বিমেরু নয়।
বাংলাদেশ এখন ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে। পুরোনো সোভিয়েত খুঁটি নেই এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পশ্চিমা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের গুরুত্ব এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান।
আওয়ামী লীগের জন্য এই পরিবর্তনও ছোট বিষয় নয়।
১৯৮১ সালে যে আন্তর্জাতিক পরিবেশে শেখ হাসিনা দল পুনর্গঠন করেছিলেন, ২০২৬ সালের পৃথিবী তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
কিন্তু বাইরের পৃথিবী বদলেছে বলেই শুধু সমস্যা নয়। থিসিয়ুসের জাহাজের আরও কিছু তক্তাও বদলেছে।
আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক পরিচয়ের একটি বড় অংশ ছিল অসাম্প্রদায়িকতা।
কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে সেই অবস্থান সব সময় একই থেকেছে কি?
২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে পাঁচ দফা সমঝোতা করেছিল। সেখানে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন না করা, আলেমদের ফতোয়া দেওয়ার অধিকার এবং কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির মতো বিষয় ছিল।
দল ও জোটের ভেতরেই এর বিরোধিতা হয়েছিল। পরে চুক্তি বাতিল হয়।
তারপর হেফাজতে ইসলাম।
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার ও হেফাজতের সম্পর্ক ভয়াবহ সংঘাতে পৌঁছায়।
কিন্তু কয়েক বছর পর সম্পর্কের আরেক চেহারা দেখা যায়।
২০১৭ সালে শেখ হাসিনা কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান দেওয়ার ঘোষণা দেন। পরে সেটি আইনি স্বীকৃতি পায়।
২০১৮ সালের নভেম্বরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদ্রাসার শোকরানা মাহফিলে শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয় ‘কওমি জননী’ উপাধি।
একটি অসাম্প্রদায়িক দল কওমি শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেবে, তার মধ্যে নিজে থেকে কোনো বিরোধ নেই।
কিন্তু সোরাইটিসের প্রশ্নটা এখানেই কাজে লাগে।
কোন পরিবর্তনটি শুধু বাস্তব রাজনীতি? আর কোন পরিবর্তনের পর বলা যাবে, মতাদর্শের চরিত্রও বদলেছে?
একটি বালুর দানা দিয়ে তো স্তূপের পরিচয় বদলায় না। দ্বিতীয় দানাতেও না।
কিন্তু দানা সরাতে সরাতে একসময় স্তূপ আর থাকে না।
গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম?
একটি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠল। তারপর আরেকটি। বিরোধী দলের রাজনৈতিক জায়গা কমলো। বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এলো। গুমের ঘটনা জমতে থাকলো। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন বাড়লো।
কোন ঘটনাটির পর বলতে হবে, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা দলটির রাজনৈতিক চরিত্র আর আগের জায়গায় নেই?
মানবাধিকার সংস্থাগুলো শেখ হাসিনার শাসনামলে বহু গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দমন-পীড়ন নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, সাবেক সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি রয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে।
অভিযোগ আর আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক কথা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নটি আদালতের রায়ের জন্য সব সময় অপেক্ষা করে না।
যে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য লড়েছে, সেই দলের শাসনের বিরুদ্ধেই যদি গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ ওঠে, তখন সামরিক শাসনের সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিভাজন কোথায় থাকবে?
ঐতিহাসিক বিভাজন অবশ্যই আছে।
সামরিক শাসক বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রক্ষমতা নেয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী রাজনীতি এবং স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে উঠে আসা দল। কিন্তু গণতন্ত্র কি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়া?
ক্ষমতায় থাকার পদ্ধতিও কি গণতন্ত্রের অংশ নয়? জামায়াতের সঙ্গে তুলনাটিও এখানেই আসে।
দুটি দলের ইতিহাস কোনোভাবেই এক নয়।
আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছে। জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতা পরে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন।
এই পার্থক্য মৌলিক।
কিন্তু স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়ার ইতিহাস কি ভবিষ্যতের কাজের দায় থেকে কোনো দলকে স্থায়ী অব্যাহতি দেয়?
স্বাধীনতার বিরোধিতার দায় যদি কয়েক দশক পরও একটি দলের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করে, তাহলে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দলের নেতাদের বিরুদ্ধে নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগ তার রাজনৈতিক পরিচয়ে কতটা প্রভাব ফেলবে?
এ প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য নতুন।
কিন্তু পৃথিবীতে একেবারে নজিরবিহীন নয়।
জিম্বাবুয়ের জানু-পিএফ দেশটির স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছিল। স্বাধীনতার পর রবার্ট মুগাবের সরকারের অধীনেই আশির দশকে মাতাবেলেল্যান্ডে গুকুরাহুন্ডি হত্যাকাণ্ড ঘটে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে এই হত্যাকাণ্ড এবং জবাবদিহির অভাবের কথা বলে আসছে। তবু সেই জানু-পিএফই দশকের পর দশক দেশ শাসন করেছে।
সুদানে ওমর আল-বশিরের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি ২০১৯ সালের গণআন্দোলনে ক্ষমতা হারায়। আল-বশিরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা রয়েছে। অথচ সেই দলের পুরোনো ইসলামপন্থী নেটওয়ার্ক আবার রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে।
লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মানবতাবিরোধী অপরাধের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল থাকার পরও তিনি ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
এই উদাহরণগুলোর কোনোটিই বাংলাদেশের হুবহু প্রতিরূপ নয়।
কিন্তু এগুলো একটি বিষয় দেখায়।
গুরুতর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিযোগ কোনো রাজনৈতিক দল বা পরিবারের রাজনীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ করে দেয় না।
আবার মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বৈধতার স্থায়ী নিশ্চয়তা নয়।
শেষ পর্যন্ত দলকে আবার সমাজের কাছে যেতে হয়।
এখানে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি দেশে ফিরেছিলেন ৩৩ বছর বয়সে। তার সামনে বঙ্গবন্ধুর নাম ছিলো। স্বাধীনতার ইতিহাস ছিলো। দলের বিশাল আবেগও ছিলো। তবু ক্ষমতায় যেতে তার ১৫ বছর লেগেছে। আজকের আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে কাজটি সম্ভবত আরও কঠিন। কারণ এবার শুধু একটি বিপর্যস্ত সংগঠন পুনর্গঠনের প্রশ্ন নেই।
দলের শাসনকাল নিয়ে গুরুতর অভিযোগের উত্তর দেওয়ার প্রশ্ন আছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের জায়গা তৈরির প্রশ্ন আছে। বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও আছে।
তার ওপর যে পরবর্তী প্রজন্মকে এত বছর ধরে রাজনৈতিক জায়গা দেওয়া হয়েছে, তাদের কাউকেই এখন পর্যন্ত ৩৩ বছর বয়সী শেখ হাসিনার মতো দলটির সামনে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় শেখ হাসিনার পছন্দ শেখ সেলিম। হতে পারে কারণটি খুব সাধারণ। কাজী জাফরউল্লাহ কারাগারে। অন্য কয়েকজন প্রবীণ নেতাও বন্দী। শেখ সেলিম দীর্ঘদিনের নেতা এবং দায়িত্ব নেওয়ার মতো অবস্থায় আছেন।
আবার প্রশ্নও থাকবে।
এত বছর ধরে পরবর্তী প্রজন্ম তৈরির পরও কেন শেষ পর্যন্ত আবার পুরোনো প্রজন্ম? আর সেই পুরোনো প্রজন্ম থেকেও কেন শেখ পরিবারের একজন?
দলের ভেতরও একই প্রশ্ন উঠেছে। গেলো ৭ই সেপ্টেম্বর কোলকাতায় অবস্থানরত শেখ হেলালের বাসায় ভারতে থাকা জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই এক বৈঠকে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিমকে দলের ‘প্রধান কাণ্ডারী’ বানানোর ঘোষণায় ক্ষোভ ঝেড়েছেন।
ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপনসহ ৮-১০ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন। বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা অভিযোগ করেন, শেখ সেলিম ‘যেমন পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না, তেমনি দলেও তার কোনও ভূমিকা নেই’।
অর্থাৎ শেখ সেলিমের মনোনয়ন খুব সহজে আওয়ামী লীগে মেনে নেওয়া হবে না বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যার বাসায় বৈঠক হয়েছে সেই শেখ হেলাল তো শেখ হাসিনারই চাচাতো ভাই।
থিসিয়ুসের জাহাজ আমাদের জিজ্ঞেস করে, সব অংশ বদলে যাওয়ার পরও জাহাজটি আগের জাহাজ কি না।
সোরাইটিস আরেকটু কঠিন প্রশ্ন করে। ঠিক কোন তক্তাটি বদলানোর পর, অথবা কোন বালুর দানাটি সরানোর পর, পরিবর্তনটি সম্পূর্ণ হয়ে গেল?
আওয়ামী লীগের সামনে হয়তো দুটি প্রশ্নই এখন পাশাপাশি। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে জাহাজের হাল কে ধরবেন, তার একটি উত্তর পাওয়া গেছে, শেখ সেলিম।
কিন্তু জাহাজটি এখনো কতটা সেই পুরোনো আওয়ামী লীগ, আর ঠিক কখন থেকে সেটি বদলাতে শুরু করেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়।
আবার সোশাল মিডিয়াতেও আওয়ামী লীগের এই ‘বিভাজন’ প্রকট।
আমাদের মনে রাখা দরকার, আওয়ামী লীগে কাউন্সিল হয় এবং সেখান থেকেই নেতা নির্বাচন হয়। শেখ হাসিনা থাকাতে সেটি হয়তো এতদিন গৌণ ছিলো। তবে তিনি সরে গেলে কাউন্সিল দলটির নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
কাজেই প্রশ্ন মনে আসা অবান্তর নয়, শেখ হাসিনার পরে আওয়ামী লীগ নামে একটি জাহাজই থাকবে, নাকি অনেকগুলো জাহাজের নাম ‘আওয়ামী লীগ’ হবে?
তন্ময় ইমরান একজন সংবাদকর্মী ও লেখক।
[মতামত লেখকের নিজস্ব]



