বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: এবার কি সত্যিই হবে

পৃথিবীর যে সব দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফল তার প্রতিটি দেশেরই মূল উদ্দেশ্য সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে কোনো কোনো দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনকে তাদের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরিণত করেছে।

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৮ পিএম

বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ-আয়োজন, প্রকল্প গ্রহণ কোনোটাই নতুন নয়। গত দুই দশকে সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক অন্ততঃ ছয়টি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশরনকেন্দ্রিক আরো ২০টি প্রকল্পের কথা জানা যায়, যার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। 

সেজন্যই চীনের বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতায় ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নতুন একটি প্রকল্পের খবরে কিছুটা সংশয় জেগেছে।

অবশ্য আগে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি বলে এবারও হবে না তেমন কোনো কথা নেই। বরং বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং বায়োগ্যাস প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়াটা খুব জরুরিও বটে। 

এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংস্থান হতে পারে, তেমনি বর্জ্যের নোংরা থেকে আমাদের পরিবেশ সুরক্ষিত থাকতে পারে। তার ওপরে বাড়তি পাওনা রয়েছে জৈব সার (কম্পোস্ট)। প্রকৃতপক্ষে বর্জ্যভিত্তিক গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূখ্য উদ্দেশ্যই পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা।

এই উদ্দেশ্যেই ব্যয় বেশি হওয়ার পরও পৃথিবীর অনেক দেশ, বিশেষ করে উন্নত অনেক দেশই বর্জ্য ব্যবহার করে গ্যাস-বিদ্যুতের উৎপাদন করছে। আমরাও বহুকাল যাবৎ চেষ্টা করছি।

কিন্তু নোংরা থেকে বিন্দুমাত্র পরিত্রাণ আমরা পাইনি। বরং ক্রমাগতভাবে অধিক থেকে অধিকতর নোংরায় তলিয়ে যাওয়ার দশা হয়েছে। এখন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একাধিক প্রকল্প এবং ক্ষুদ্রাকার বায়োগ্যাস প্রকল্প বাস্তায়িত হওয়া অত্যন্ত দরকারি একটি কাজ।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ-গ্যাস উৎপাদন নবায়নযোগ্য জ্বালানি অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে হিসাবে এই খাতের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনস্ত টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেরও (স্রেডা) কার্যক্রম রয়েছে। স্রেডার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যেই ৩১ দশমিক ০৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং কিছু বায়োগ্যাস বর্জ্য থেকে উৎপাদিত হওয়ার কথা। তাদের কর্মসূচির মধ্যে পৌরবর্জ্য ছাড়াও ডেইরি ও পোলট্রি বর্জ্য, কসাইখানার বর্জ্য প্রভৃতি থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে।

এই কর্মসূচির অওতায় স্রেডা দেশের ৬টি পৌরসভায় (ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, দিনাজপুর এবং যশোর)  ‘ওয়েইস্ট টু এনার্জি’ বিষয়ক সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ২০১৯ সালে ইউএনডিপির সহায়তায় স্রেডা কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় একটি এবং পরে ঢাকার কেরাণীগঞ্জে এক মেগাওয়াট পৌরবর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প নিয়েছিলো। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় চুক্তিপত্রও হয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটিও হলো না। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প কেন বাস্তবায়িত হয় না সে কথায় একটু পরে আসছি।

পৃথিবীর যে সব দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফল তার প্রতিটি দেশেরই মূল উদ্দেশ্য সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা।

বেশ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সমন্বয়ে বাংলাদেশ বায়োগ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামে একটি অলাভজনক সংস্থাও বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে দীর্ঘকাল ধরে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের প্রকল্পগুলো অবশ্য অনেক ছোট আকারের। অনেকগুলো ছিলো বাড়িভিত্তিক এবং ছোট ছোট কমিউনিটিভিত্তিক। এই প্রকল্পগুলো এক সময় যথেষ্ট সফল হিসেবে সাড়া ফেলেছিলো। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরকারি নীতিগত আনুকূল্যের অভাবে সেগুলো এখন অব্যাহত আছে খুব কমই। সুতরাং চেষ্টা আমাদের অনেক হয়ে থাকলেও সাফল্য একেবারে শূন্যের কোটায় বলা যায়। সংশয়ের কারণ এগুলোই।

আমাদের দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম যে উদ্যোগের কথা আমরা জানি, সেটি প্রায় ৩০ বছর আগে নেওয়া হয়েছিলো। ‘ওয়েইস্ট কনসার্ন বাংলাদেশ’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে সায়েদাবাদ ল্যান্ডফিলে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করেছিলো। প্রস্তাবটি নিয়ে তখন সরকারি পর্যায়ে যে অনেক অধ্যবসায় হয়েছে, তেমনি আমরা সংবাদকর্মীরাও অনেক লোখালেখি করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি কিছুই।

২০১৩ সালে ইতালিয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিলো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য থেকে একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরপর নারায়ণগঞ্জে ছয় মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিপত্র চূড়ান্ত হয়েছিলো। সেটিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

২০১৯ সালে ইউএনডিপির সহায়তায় স্রেডা কুষ্টিয়া পৌরসভার বড়াদি ল্যান্ডফিলে বাস্তবায়নের জন্য যে প্রকল্পটি নিয়েছিলো তার কথা আগেই বলেছি। কেরাণীগঞ্জে স্রেডার এক মেগাওয়াটের প্রকল্পটির কথাও আগে উল্লেখ করেছি। সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

সর্বশেষ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে দৈনিক তিন হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষম একটি প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছিলো। এটি বাস্তবায়নের জন্যও পিডিবি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএমইসি-এর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিলো। কিন্তু এটিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

এবার যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনের উদ্যোগ সরকার নিয়েছে সেটিও আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে। সেটিও ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার। এই প্রকল্পেও দৈনিক তিন হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে। এটিও বাস্তবায়ন করবে চীনের রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না’। 

ধারণা করা যায়, ২০২১ সালে গৃহীত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য যে সব সমীক্ষা চালানো হয়েছিলো, সেগুলো বর্তমান প্রকল্পটির জন্য সহায়ক হতে পারে। সেই কারণেই হয়তো সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবে এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

তবে ১৮ মাস কবে থেকে হিসাব করা হবে সে বিষয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। আগামী ২রা সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে এই প্রকল্পের চুক্তি সই হওয়ার কথা। প্রায় ৩০ কোটি (৩০০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ এই প্রকল্পের পুরো খরচ বহন করবে চীনা প্রতিষ্ঠান। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ২৫ টাকা।

এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলেও ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সরকার সক্রিয়ভাবে চিন্তা করছে। আগেই বলেছি দৈনন্দিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নগরকেন্দ্রিক পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি।

দেশের কোথাও বর্জ্য প্রকারভেদ অনুযায়ী আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। এখানে গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গেই অন্যান্য বর্জ্যও রাখা হয় এবং ল্যান্ডফিলিংয়ে ফেলা হয়। এই রকম মিশ্র বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী নয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ‘জাইকা’-এর সহায়তায় কয়েক বছর আগে এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু সেটি বোধহয় এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়নি। কিংবা পেলেও সে অনুযায়ী যে কাজ হচ্ছে তাও নয়।

চট্টগ্রাম নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জাপানের প্রতিষ্ঠান জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। আরেকটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে, ডিপি ক্লিন টেক ইউকে লিমিটেড ও ইমপ্যাক্ট এনার্জি গ্লোবাল। ২০১৯ সালের ১০ই অক্টোবর সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছিলো চীনের আরেক কোম্পানি পাওয়ার চায়না। ২০২৩ সালের জুনে চীনের প্রতিষ্ঠান সেভিয়া-চেক-অর্চাড জেভি বর্জ্য থেকে ৩০-৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছিলো।

প্রস্তাব জমা দিয়েছিলো ন্যানোটেক সলিউশন অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড; টেকনিস রিউনিডাস আলফানার অ্যান্ড সিইইজি ইম্প্যাক্ট এনার্জি; স্যাটারাম ফাইভ কো-ফার্ম-এমই-জয়েন্ট ভেঞ্চার; অকল্যান্ড গ্রিন এনার্জি লিমিটেড; গ্রিন পাওয়ার লিমিটড; সিটি ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট কোম্পানি; স্কলার্স পাওয়ার লিমিটেড; ডঙ্গুয়ান কিউই রাফা এনভায়রনমেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড।

প্রস্তাব জমা দিয়েছিলো লিড অ্যান্ড ইপিসি পার্টনার ও এসডিআইসি পাওয়ার হোল্ডিং কোং লিমিটেড; এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেড; সৌদি-জার্মান পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড; চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট; কনসোর্টিয়াম অব সিএনটিআই এলওয়াইজেড; নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন লিমিটেড; গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক এবং কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ছয় থেকে ৩৫ একর জমি এবং এক থেকে আড়াই হাজার টন বর্জ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছিলো। বলা বাহুল্য যে, এর একটি প্রস্তাবও বাস্তবায়িত হয়নি।

 এতসব উদ্যোগ আয়োজন সত্ত্বেও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প কেন বাস্তবায়িত হয় না, সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের যে জবাবগুলো পাওয়া যায়, সেদিকে এবার আলোকপাত করা যেতে পারে।

ক) প্রকল্প গ্রহণের আগে কিংবা পরে প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহন করা হয়। প্রকল্প প্রস্তাবকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে পারেন না। ফলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে প্রকল্প আর অগ্রসর হয় না।

খ) দেশের কোথাও বর্জ্য প্রকারভেদ অনুযায়ী আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। এখানে গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গেই অন্যান্য বর্জ্যও রাখা হয় এবং ল্যান্ডফিলিংয়ে ফেলা হয়। এই রকম মিশ্র বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী নয়।

গ) বাংলাদেশের বর্জ্যে আর্দ্রতা খুব বেশি। অর্থাৎ ভেজা। এই বর্জ্যে জ্বালানি মান (ক্যালোরিফিক ভ্যালু) অনেক কম, সাধারণতঃ প্রতি কেজিতে ৬০০ কিলোক্যালোরি। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি কেজি বর্জ্যের জ্বালানি মান এক হাজার কিলোক্যালোরি হওয়া অবশ্যক। না হলে সেই বর্জ্য পুড়িয়ে তাপ উৎপন্ন করে  বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন ও অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এই কারণেই বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ে।

ঘ) ইনসিনারেটরে (বর্জ্য পোড়ানোর চুলা) বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে বিশাল জায়গা জুড়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা এবং সেজন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার হয় তাতে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ‘কনভেনশনাল’ বিদ্যুতের চেয়ে অনেক বেশি পড়ে। তাই লাভজনক না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে যায়।

ঙ) প্রকল্প অনুমোদনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা, বিনিয়োগকৃত অর্থের সার্বভৌম গ্যারান্টির মত বিষয়গুলোও অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ার বড় কারণ হয়ে ওঠে।

পৃথিবীর যে সব দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফল তার প্রতিটি দেশেরই মূল উদ্দেশ্য সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে কোনো কোনো দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনকে তাদের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরিণত করেছে। 

এক্ষেত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা উল্লেখ করা যায়। যেমন সুইডেন এখন তাদের ৯৯ শতাংশ বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করছে। নরওয়ে তো রীতিমত বর্জ্য আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তাদের বর্জ্যের বড় উৎস যুক্তরাজ্য। ইউরোপের প্রতিটি দেশেই, পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত-অনুন্নত অনেক দেশেও প্রকারভেদ অনুযায়ী বর্জ্যগুলো আলাদা আলাদভাবে রাখার ব্যবস্থা আছে। ফলে সেগুলো প্রকারভেদ অনুযায়ী ব্যবহার করা সহজ ও স্বল্প ব্যয়সাধ্য।

জাপানের জায়গা কম। তাই তারা বর্জ্য কোথাও স্তুপাকারে জমায় না। প্রতিদিনের বর্জ্য তারা ইনসিনারেটরে পুড়িয়ে ব্যবহার করে ফেলে। চীন বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। কাজেই এই বিষয়ে তাদের বিশেষত্ত্বের ওপর নির্ভর করাই যায়। আমাদের বর্তমান আমিনবাজার প্রকল্পটিও চীনের একটি একটি বিখ্যাত ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করবে। তাই এবার আমাদের অভিজ্ঞতা অন্য রকম হবে সে আশা করাই যায়।

 

অরুণ কর্মকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক 

(মতামত লেখকের নিজস্ব)