‘প্রথম স্বাধীনতা’র রাজনীতি এবং একাত্তর মুছে ফেলার চেষ্টা
জিন্নাহকে নিয়ে আমরা ইতিহাসের জায়গা থেকে আলোচনা করতেই পারি। পাকিস্তান আন্দোলনও আমাদের বুঝতে হবে। কিন্তু সেই আলোচনাকে ব্যবহার করে আজকের বাংলাদেশে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে আবার রাজনৈতিকভাবে সেলিব্রেট করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
আসিফ বিন আলী
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪০ পিএমআপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
যে বাঙালি মুসলমান ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এত বড় ভূমিকা রাখল, সেই জনগোষ্ঠীর বড় অংশই মাত্র চব্বিশ বছরের মধ্যে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তাদের মধ্যে বিকশিত হলো আরেকটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
আজ ১৪ই অগাস্ট। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৪ই এবং ১৫ই অগাস্ট দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৪ই অগাস্ট পাকিস্তান তার স্বাধীনতা দিবস পালন করে, আর ১৫ই অগাস্ট ভারত। ১৯৪৭ সালের এই দুই দিনের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে এবং একই সঙ্গে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি বাংলার মুসলমানদের একটা বড় সমর্থন ছিলো। এই ইতিহাসকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ১১০টি আসন জিতেছিলো। অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলনের পেছনে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সমর্থন কোনো ছোট ঘটনা ছিলো না। বাংলার মুসলমানরা শুধু দূর থেকে পাকিস্তান আন্দোলন দেখেনি, তারা এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছিলো।
এখানে ইতিহাসের একটা অসাধারণ বাঁক আছে। যে বাঙালি মুসলমান ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এত বড় ভূমিকা রাখল, সেই জনগোষ্ঠীর বড় অংশই মাত্র চব্বিশ বছরের মধ্যে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তাদের মধ্যে বিকশিত হলো আরেকটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সেই পরিবর্তনটা এতটাই গভীর ছিলো যে ২৩এ মার্চ ১৯৭১, পাকিস্তান দিবসে, পূর্ব বাংলার প্রায় সর্বত্র পাকিস্তানের পতাকার জায়গায় বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিলো। প্রেসিডেন্টের বাসভবন এবং সামরিক দপ্তর ছাড়া পাকিস্তানের পতাকা কার্যত কোথাও ওড়েনি। ১৪ই অগাস্ট ১৯৭১-এর চিত্রটাও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তানি রাষ্ট্র তখনও পূর্ব বাংলায় স্বাধীনতা দিবস পালনের আয়োজন করছিলো। সামরিক প্রশাসন পতাকা উত্তোলন, মিছিলো, রাজাকার ও পুলিশের প্যারেড, সভা, এমনকি সরকারি-বেসরকারি ভবনে আলোকসজ্জার নির্দেশ পর্যন্ত দিচ্ছিলো। স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তানের পতাকা তোলার বা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলার মানুষ তখন হাতে গোনা। অর্থাৎ রাষ্ট্র পাকিস্তান তখনও ছিলো, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও ছিলো, প্রশাসনও ছিলো, কিন্তু বাঙালির রাজনৈতিক কল্পনায় পাকিস্তান প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
আমার কাছে এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র চব্বিশ বছরে কী এমন ঘটেছিলো যে একটি জনগোষ্ঠী যে রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করেছিলো, সেই রাষ্ট্র থেকেই স্বাধীন হওয়ার জন্য অস্ত্র হাতে নিলো?
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমরা যখন ইতিহাস নিয়ে আলাপ করেছি, সেখানে একটা সমস্যা প্রায় সব সময়ই থেকেছে। যিনি ক্ষমতায় থাকেন, তিনিই কোনো না কোনোভাবে ইতিহাসের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এটা শুধু বাংলাদেশের বিষয় নয়। ক্ষমতা সব জায়গাতেই ইতিহাসের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ইতিহাস তো শুধু অতীতে কী ঘটেছিলো, সেই গল্প নয়। বর্তমানের রাজনীতিতেও ইতিহাসের একটা বড় ভূমিকা আছে। কাকে আমরা নায়ক বানাচ্ছি, কাকে খলনায়ক বানাচ্ছি, কোন ঘটনাকে বেশি মনে রাখছি আর কোন ঘটনাকে আড়াল করছি, এর সবকিছুর সাথেই ক্ষমতার একটা সম্পর্ক থাকে। কিন্তু ইতিহাসের একটা বিষয় আছে, তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
ক্ষমতা যখন ইতিহাসের ওপর খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখন হয়তো কিছু সময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভকে রাষ্ট্রীয় সত্য বানানো যায়। পাঠ্যবই বদলানো যায়, স্মৃতির রাজনীতি তৈরি করা যায়, কিছু মানুষকে ইতিহাস থেকে বড় করা যায়, কাউকে ছোট করা যায়, কাউকে প্রায় অদৃশ্যও করে দেওয়া যায়। কিন্তু ক্ষমতা বদলালে সেই চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস আবার ফিরে আসে। কখনো গবেষণার মাধ্যমে, কখনো স্মৃতির মাধ্যমে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও জটিল। কারণ পাকিস্তান আন্দোলন থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম পর্যন্ত ইতিহাসটিকে নির্মোহভাবে আলোচনা করা আমাদের এখানে সব সময়ই কঠিন ছিলো। আমাদের ইতিহাসচর্চার কেন্দ্রে প্রায় সব সময় জাতীয়তাবাদ থাকে। আর জাতীয়তাবাদ যখন ইতিহাস লেখার প্রধান ফ্রেম হয়ে যায়, তখন অনেক সময় ফ্যাক্টের চেয়ে ন্যারেটিভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন কী ঘটেছিলো, সেটা জানার আগ্রহটা অনেক সময় আর প্রধান থাকে না। বরং নিজের যে রাজনৈতিক অবস্থান, সেটাকে ইতিহাসের কোন অংশ দিয়ে সমর্থন করা যায়, সেই চেষ্টাটাই বেশি দেখা যায়। এই প্রবণতা ২০১২ সালের পর, বিশেষ করে ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন এবং তার পরের রাজনৈতিক মেরুকরণের সময় আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি দাবি ছিলো যে ১৯৭১ সালে যারা যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, নির্যাতন এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলো, তাদের বিচার হতে হবে। এই দাবিটির নৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্র প্রথমে কোনো রাজনৈতিক দল ছিলো না। জাহানারা ইমাম এবং তার মতো মুক্তিযুদ্ধে সন্তান, পরিবার বা স্বজন হারানো মানুষ এবং নাগরিক সমাজের একটি অংশ এই দাবিকে দীর্ঘদিন ধরে সামনে রেখেছিলোেন। ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং গণআদালত সেই আন্দোলনের একটি বড় পর্যায়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলো এই দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এবং রাষ্ট্রীয় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
২০১৩ সালে আবদুল কাদের মোল্লার মামলার রায়ের পর শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্ন তখন আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। অন্যদিকে একই বছর হেফাজতে ইসলামের উত্থান এবং শাপলা চত্বরের সমাবেশ আরেক ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করে। শাপলা আন্দোলনকে শুধু শাহবাগের “পাল্টা আন্দোলন” বললে বিষয়টি অতিরিক্ত সরল হবে। কিন্তু শাহবাগ-পরবর্তী “নাস্তিক ব্লগার” বিতর্ক, ইসলাম বনাম সেক্যুলারিজমের রাজনৈতিক ফ্রেম এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ঘিরে উত্তেজনা হেফাজতের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলো। আমার আলোচনা এখানে শাহবাগ বা শাপলার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নয়। সেই রাজনৈতিক বিতর্কে এখন যাওয়ারও খুব একটা প্রয়োজন দেখি না।
বাস্তবতা হলো, এই তীব্র মেরুকরণ ইতিহাসকে নির্মোহভাবে বোঝার জায়গাটিকে আরও সংকুচিত করেছে। বিবাদমান দুই পক্ষের অনেকের মধ্যেই ইতিহাসের জটিল সত্য জানার আগ্রহের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করার মতো ফ্যাক্ট খোঁজার আগ্রহ বেশি দেখা গেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, দুই পক্ষই অনেক সময় ইতিহাসের সেই অংশগুলোই সামনে এনেছে যেগুলো তাদের নিজেদের বক্তব্যকে শক্তিশালী করে। ফলে ইতিহাসকে নির্মোহভাবে বোঝার চেষ্টা যতটা হওয়ার কথা ছিলো, তার বদলে ইতিহাসকে রাজনৈতিক তর্কের অস্ত্র হিসেবেই বেশি ব্যবহার করা হয়েছে।
আমার নিজের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ২০১৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তান আন্দোলন, জিন্নাহ, মুসলিম লীগের রাজনীতি কিংবা ১৯৪৭ নিয়ে একাডেমিক জায়গা থেকেও খোলামেলা আলোচনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পাবলিক স্পেসে তো আরও বেশি। পরিস্থিতিটা অনেকটা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে আপনি জিন্নাহকে নিয়ে কথা বলছেন মানেই ধরে নেওয়া হচ্ছে আপনি জিন্নাহর সমর্থক। পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করছেন, সেখান থেকেও আপনার রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করে ফেলার একটা প্রবণতা ছিলো। এই মনোভাব ইতিহাসচর্চার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
তারপর এলো ২০২৪। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে পাবলিক স্পেসে একটা নতুন ধরনের খোলামেলা জায়গা তৈরি হলো। আমি এই স্পেস তৈরি হওয়াকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। কারণ নিষিদ্ধ ইতিহাস বলে কিছু থাকা উচিত নয়। জিন্নাহ নিয়ে কথা বলা যাবে, গান্ধী নিয়ে কথা বলা যাবে, নেহরুকে নিয়ে কথা বলা যাবে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও কথা বলা যাবে। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, জিয়াউর রহমান সবাইকে নিয়েই আলোচনা হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, সেই নতুন স্পেসের মধ্যেই আবার আরেক ধরনের ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা দেখতে পেলাম।
সেখানে একটা বয়ান সামনে এলো যে আমাদের “প্রথম স্বাধীনতা” হচ্ছে ১৯৪৭, আর “দ্বিতীয় স্বাধীনতা” হচ্ছে ২০২৪। মাঝখান থেকে ১৯৭১ যেন আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আরও এগিয়ে একাত্তরকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কেউ বলছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, বরং ভারতের অধীন হয়েছে। ২০২৪ সালের পর ঢাকা শহরে এমন কিছু আয়োজন সামনে এসেছে, যেখানে ১৯৪৭-কে শুধু ইতিহাসের অংশ হিসেবে আলোচনা করা হয়নি, পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে সেলিব্রেট করা হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় প্রেসক্লাবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান হয়। সেখানে বক্তাদের কেউ বলেছেন, জিন্নাহ না থাকলে পাকিস্তান হতো না এবং পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও হতো না। একজন বক্তা এমনও বলেছেন যে জিন্নাহকে বাংলাদেশের “জাতির পিতা” হিসেবে স্বীকার করা উচিত। এগুলো আর জিন্নাহর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে নিরপেক্ষ একাডেমিক আলোচনা নয়। এগুলো স্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য। আরও স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় ১৪ই অগাস্ট ২০২৫ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “প্রথম স্বাধীনতা দিবস” নামে অনুষ্ঠান হয়েছে, “ফিরে দেখা আজাদি” নামে আলোচনা হয়েছে। অন্য একটি সংগঠন দিনব্যাপী কর্মসূচি করেছে। সেখানে প্রকাশ্যেই ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে বাঙালি মুসলমানের “প্রথম স্বাধীনতা” হিসেবে উদযাপন করা হয়েছে। জিন্নাহকে ডানপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।
এখানে ইতিহাসের একটা পরিহাস আছে। যে জিন্নাহকে আজ বাংলাদেশের জামায়াত-ঘনিষ্ঠ এবং কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ ও ডানপন্থী রাজনীতির আইকন বানিয়ে একাত্তরের বিপরীতে দাঁড় করাতে চাইছে, সেই জিন্নাহর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদির রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধ ছিলো অত্যন্ত তীব্র। মওদুদী মুসলিম লীগকে “জামাত-ই-জাহিলিয়াত” বলেছেন। জিন্নাহর ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। মুসলিম লীগের কল্পিত পাকিস্তানকে মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত একটি “কাফির সরকার” হয়ে উঠতে পারে বলেও আক্রমণ করেছেন।
ইসলামপন্থী সংগঠন মজলিস-ই-আহরারের নেতা মাজহার আলী আজহার জিন্নাহকে সরাসরি “কাফির-ই-আজম” বলে বিদ্রূপ করেছিলোেন। অথচ সেই জিন্নাহই ১১ই অগাস্ট ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বলেছিলোেন, নাগরিক তার মন্দিরে যেতে স্বাধীন, মসজিদে যেতে স্বাধীন, যে কোনো উপাসনালয়ে যেতে স্বাধীন এবং একজন নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ বা বিশ্বাস রাষ্ট্রের কাজের বিষয় নয়। অর্থাৎ আজ যারা জিন্নাহকে ব্যবহার করে ধরনের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী পাকিস্তানের রোমান্টিক ছবি আঁকছেন, তাদের জন্য ইতিহাসটা বেশ অস্বস্তিকর। কারণ যে জিন্নাহকে তারা এখন নিজেদের রাজনৈতিক আইকন বানাতে চাইছেন, তার রাষ্ট্রচিন্তার এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান নাগরিকত্বের কথা বলে। ডানপন্থি রাজনীতির আদর্শিক পূর্বসূরিরাই একসময় জিন্নাহ ও তার মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর ধর্মীয় ভাষায় আক্রমণ করেছিলোেন। ইতিহাসকে যদি সত্যিই গ্রহণ করতে হয়, তাহলে জিন্নাহর শুধু সুবিধাজনক অংশটি নয়, এই পুরো বৈপরীত্যটাও গ্রহণ করতে হবে।
এখানে আমার অবস্থান খুব পরিষ্কার। বাংলাদেশে জিন্নাহকে নিয়ে আলোচনা হবে। অবশ্যই হবে। গান্ধীকে নিয়ে হবে। নেহরুকে নিয়ে হবে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে হবে। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, ভাসানী, খাজা নাজিমুদ্দিন সবাইকে নিয়ে হবে। পাকিস্তান আন্দোলন কেন তৈরি হয়েছিলো সেটাও জানতে হবে। মুসলিম লীগের প্রতি বাংলার মুসলমানের এত বিপুল সমর্থন কেন তৈরি হয়েছিলো, জমিদারি কাঠামো, শ্রেণি, ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, কংগ্রেসের রাজনীতি, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি, সবকিছু নিয়েই গবেষণা হওয়া দরকার। বরং এগুলো না জানলে বাংলাদেশকে বোঝাই যাবে না।
কিন্তু এখানে একটা পার্থক্য আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিন্নাহকে নিয়ে আমরা ইতিহাসের জায়গা থেকে আলোচনা করতেই পারি। পাকিস্তান আন্দোলনও আমাদের বুঝতে হবে। কিন্তু সেই আলোচনাকে ব্যবহার করে আজকের বাংলাদেশে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে আবার রাজনৈতিকভাবে সেলিব্রেট করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। আমার আপত্তির জায়গা ঠিক এখানে।
এই গ্রুপগুলোর আলোচনা যতটুকু মিডিয়ায় দেখেছি, তাদের বক্তব্য যতটুকু অনলাইনে এসেছে এবং কিছু মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাস যতটুকু দেখেছি, আমার কাছে মনে হয়নি যে তাদের প্রধান আগ্রহ হচ্ছে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনকে ক্রিটিকাল লেন্সে বোঝা। কিংবা কেন পাকিস্তান আন্দোলন তৈরি হয়েছিলো এবং কীভাবে মাত্র চব্বিশ বছরের মধ্যে সেই পাকিস্তান থেকে বাঙালির রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটল, সেই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। বরং তাদের একটি অংশের আগ্রহ মনে হয়েছে অন্য জায়গায়। পাকিস্তান আন্দোলনকে সেলিব্রেট করা। ১৯৪৭-কে “প্রথম স্বাধীনতা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তারপর ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে ছোট করে ১৯৪৭ এবং ২০২৪-কে একটি সরল রাজনৈতিক রেখায় বসানো। আমার কাছে এই জায়গায় এসে বিষয়টা আর শুধু ইতিহাস নিয়ে আলোচনা থাকে না। এখানে ইতিহাসকে ব্যবহার করে একটা রাজনৈতিক ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু হয়।
১১ই অগাস্ট ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের গণপরিষদে জিন্নাহ যে রাষ্ট্রের কথা বলেছিলোেন, সেটাও দেখতে হবে। সেখানে তিনি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান নাগরিকত্ব এবং রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের সমান মর্যাদার কথা বলেছিলোেন। তারপর আমাদের দেখতে হবে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবে কী হয়েছিলো। ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে পূর্ব বাংলার মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত শুরু হলো। ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে মানুষকে জীবন দিতে হলো। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষ মুসলিম লীগকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করল। এরপর ষাটের দশকে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে এলো, ছয় দফা এলো, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান হলো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল, কিন্তু তাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হলো না। এবং শেষ পর্যন্ত ২৫এ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর সামরিক অভিযান চালাল। এই পুরো ধারাবাহিকতাটাকে একসঙ্গে না দেখলে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের যাত্রাটা বোঝা কঠিন।
এই ঘটনাগুলোকে বাদ দিয়ে যদি শুধু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গল্প বলা হয়, তাহলে ইতিহাসের একটা সুবিধাজনক অংশই শুধু বলা হবে। পুরো ইতিহাসটা আর বলা হবে না। একইভাবে ১৯৭১ নিয়ে আলোচনা করতে হলে ভারতের ভূমিকাও আলোচনা করতে হবে। ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ছিলো, সেটাও গবেষণার বিষয়। ভারত রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক হিসাব ছিলো। কিন্তু ভারতের স্বার্থ ছিলো বলেই বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ভারতের তৈরি হয়ে যায় না। ভারত এই পরিস্থিতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্যই করা যাবে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বাঙালির নিজের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাটাকেই ভারতের তৈরি বলে দিলে ঘটনাটা আর ঠিকভাবে বোঝা যায় না।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছিলো। ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। পহেলা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পর পূর্ব বাংলায় অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। পঁচিশে মার্চ সামরিক অভিযান আসে। তারপর স্বাধীনতার যুদ্ধ। ভারত সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে আরও পরে, ডিসেম্বর মাসে। ভারত যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে, এটা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু সেখান থেকে যদি বলা হয় ভারতই বাংলাদেশ তৈরি করেছে, তাহলে বাঙালির নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ১৯৭০ সালের গণরায় এবং মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে বাদ দেওয়া হয়।
এখন আসি জামায়াতে ইসলামীর প্রশ্নে। আমার রাজনৈতিক পাঠে, ১৯৭১-কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় সংগঠিত রাজনৈতিক সুবিধাভোগী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির ও ছাত্রী সংস্থা। কারণ ১৯৭১ সালে জামায়াতের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি। যুদ্ধাপরাধের বিচারও মূলত তাদের একাধিক শীর্ষ নেতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় সংঘাত তৈরি করেছে। ফলে এমন একটি ইতিহাস, যেখানে ১৯৪৭ হচ্ছে প্রথম স্বাধীনতা, ২০২৪ হচ্ছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা এবং ১৯৭১ মাঝখানে একটি ভারতীয় প্রকল্পে পরিণত হয়, সেই ন্যারেটিভ জামায়াতের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক। আমি এটাকে সেই অর্থে জামায়াতের বৃহত্তর ন্যারেটিভ প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দেখি। তবে এটাও মনে করি না যে এই বয়ানের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি জামায়াতের সদস্য বা জামায়াতের নির্দেশে কাজ করছেন। বিষয়টা এত সরল নয়।
এর সঙ্গে আরও কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী আছে। এমন কিছু ছোট সংগঠন আছে যাদের নাম হয়তো আমরা জানি, আবার কিছু নেটওয়ার্ক আছে যাদের হয়তো আনুষ্ঠানিক নামই নেই। আবার ঢাকা শহরের এক কালে বামপন্থি ছিলো বর্তমানে ডানপন্থিদের সাথে কাজ করছে এমন একটা বলয় ও রয়েছে। বাস্তবতা হল দেশে এই ধারার বক্তব্যের শ্রোতা আছে। ফলে এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে। কিছু অবসরপ্রাপ্ত একাডেমিক, কিছু ডানপন্থি সাংবাদিক, কিছু অ্যাক্টিভিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী দেখছেন, এই ধরনের কথা বললে দ্রুত পরিচিত হওয়া যায়, একটা রাজনৈতিক শ্রোতা পাওয়া যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থক পাওয়া যায়। ফলে কেউ কেউ খুব আগ্রহ নিয়ে এই বয়ানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাদ পাচ্ছেন।
আমি কাউকে পাকিস্তান নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করার পক্ষে নই। উল্টোটা। আরও কথা হোক। আরও গবেষণা হোক। জিন্নাহর পক্ষে লেখা হোক, বিপক্ষে লেখা হোক। পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে নতুন গবেষণা হোক। এমনকি বাংলাদেশের প্রচলিত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসকেও চ্যালেঞ্জ করা হোক। ইতিহাসকে প্রশ্ন ছাড়া রেখে দিলে ইতিহাস ধর্মগ্রন্থে পরিণত হয়। কিন্তু প্রশ্ন করার নামে আরেকটি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী পুরাণ তৈরি করাও ইতিহাসচর্চা নয়। বাংলাদেশের বাস্তব ইতিহাস অনেক বেশি জটিল, এবং সেই জটিলতাই আমাদের মেনে নিতে হবে।
অবিভক্ত বাংলার বিপুলসংখ্যক মুসলমান একসময় মুসলিম লীগের সঙ্গে ছিলো। তারা পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলো। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিলো। এই সত্য অস্বীকার করলে ইতিহাস বিকৃত হবে। আবার সেই একই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে ভাষাগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সেই রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তরের বিভিন্ন ধাপ।
এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসের জটিলতা। সাতচল্লিশকে আমরা বাদ দিতে পারি না, কারণ পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে বাংলার মুসলমানের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। একইভাবে একাত্তরকে বাদ দেওয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। আর চব্বিশও এখন আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। সমস্যা হয় তখনই, যখন একটা ঘটনাকে বড় করতে গিয়ে আরেকটা ঘটনাকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বরং সাতচল্লিশকে বুঝলে একাত্তর আরও পরিষ্কার হয়। কারণ তখন বোঝা যায় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো একদিন সকালে হঠাৎ শুরু হয়নি। যে বাঙালি মুসলমান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভেতরে নিজের রাজনৈতিক মুক্তির জন্য পাকিস্তানকে একটি সমাধান মনে করেছিলো, সেই মানুষই পরে দেখেছে যে নতুন রাষ্ট্র তার ভাষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সমান নাগরিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করছে না। সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নতুন রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি এসেছে। এই ইতিহাসে পাকিস্তান আন্দোলনকে মুছে ফেলার দরকার নেই। জিন্নাহকেও মুছে ফেলার দরকার নেই। কিন্তু একইভাবে একাত্তরকেও মুছে ফেলা যাবে না।
ঢাকায় কেউ যদি পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে সেমিনার করেন, আমি তার বিরোধিতা করব না। বরং শুনতে আগ্রহী হব। কিন্তু সেই সেমিনার যদি ইতিহাস বোঝার বদলে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সেলিব্রেট করার জায়গা হয়ে যায়, যদি সেখানে একাত্তরকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলা হয়, যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে ভুল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়, তাহলে সেটার রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও কথা বলতে হবে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষ লড়েছে। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের এক পর্যায়ে বাংলার মুসলমানের বড় অংশ পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক মুক্তি খুঁজেছে। আবার সেই পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন পূর্ব বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করেছে, তখন সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও মানুষ লড়েছে। এই দুই ইতিহাসকে পরস্পরের শত্রু বানানোর কোনো দরকার নেই। কিন্তু একটাকে ব্যবহার করে আরেকটাকে অস্বীকার করার চেষ্টা হলে সেখানে আপত্তি করতেই হবে।
ইতিহাসকে জানতে হবে। বুঝতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে। ক্রিটিকালি এনগেজ করতে হবে। নিজের পছন্দের মানুষকেও প্রশ্ন করতে হবে, নিজের অপছন্দের মানুষের ভূমিকাও তথ্য দিয়ে বিচার করতে হবে। ইতিহাসকে কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি বানানো ঠিক নয়। আওয়ামী লীগের সময় ইতিহাসের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যদি আমাদের আপত্তি থাকে, তাহলে সেই নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে এসে ইতিহাসকে আরেক ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির হাতে তুলে দেওয়ারও কোনো অর্থ হয় না। তাতে ইতিহাস মুক্ত হয় না, শুধু কে ইতিহাসের ওপর কর্তৃত্ব করবে সেই পক্ষটা বদলে যায়। আর সাতচল্লিশ ও চব্বিশকে পাশাপাশি বসিয়ে মাঝখান থেকে একাত্তরকে সরিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা, সেটাকেও ইতিহাসের নির্মোহ পাঠ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটা একটা রাজনৈতিক ন্যারেটিভ, এবং সেই ন্যারেটিভের সঙ্গে দ্বিমত করাটা গণতন্ত্রেরই অংশ।
‘প্রথম স্বাধীনতা’র রাজনীতি এবং একাত্তর মুছে ফেলার চেষ্টা
জিন্নাহকে নিয়ে আমরা ইতিহাসের জায়গা থেকে আলোচনা করতেই পারি। পাকিস্তান আন্দোলনও আমাদের বুঝতে হবে। কিন্তু সেই আলোচনাকে ব্যবহার করে আজকের বাংলাদেশে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে আবার রাজনৈতিকভাবে সেলিব্রেট করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
আজ ১৪ই অগাস্ট। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৪ই এবং ১৫ই অগাস্ট দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৪ই অগাস্ট পাকিস্তান তার স্বাধীনতা দিবস পালন করে, আর ১৫ই অগাস্ট ভারত। ১৯৪৭ সালের এই দুই দিনের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে এবং একই সঙ্গে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি বাংলার মুসলমানদের একটা বড় সমর্থন ছিলো। এই ইতিহাসকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ১১০টি আসন জিতেছিলো। অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলনের পেছনে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সমর্থন কোনো ছোট ঘটনা ছিলো না। বাংলার মুসলমানরা শুধু দূর থেকে পাকিস্তান আন্দোলন দেখেনি, তারা এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছিলো।
এখানে ইতিহাসের একটা অসাধারণ বাঁক আছে। যে বাঙালি মুসলমান ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এত বড় ভূমিকা রাখল, সেই জনগোষ্ঠীর বড় অংশই মাত্র চব্বিশ বছরের মধ্যে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তাদের মধ্যে বিকশিত হলো আরেকটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সেই পরিবর্তনটা এতটাই গভীর ছিলো যে ২৩এ মার্চ ১৯৭১, পাকিস্তান দিবসে, পূর্ব বাংলার প্রায় সর্বত্র পাকিস্তানের পতাকার জায়গায় বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিলো। প্রেসিডেন্টের বাসভবন এবং সামরিক দপ্তর ছাড়া পাকিস্তানের পতাকা কার্যত কোথাও ওড়েনি। ১৪ই অগাস্ট ১৯৭১-এর চিত্রটাও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তানি রাষ্ট্র তখনও পূর্ব বাংলায় স্বাধীনতা দিবস পালনের আয়োজন করছিলো। সামরিক প্রশাসন পতাকা উত্তোলন, মিছিলো, রাজাকার ও পুলিশের প্যারেড, সভা, এমনকি সরকারি-বেসরকারি ভবনে আলোকসজ্জার নির্দেশ পর্যন্ত দিচ্ছিলো। স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তানের পতাকা তোলার বা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলার মানুষ তখন হাতে গোনা। অর্থাৎ রাষ্ট্র পাকিস্তান তখনও ছিলো, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও ছিলো, প্রশাসনও ছিলো, কিন্তু বাঙালির রাজনৈতিক কল্পনায় পাকিস্তান প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
আমার কাছে এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র চব্বিশ বছরে কী এমন ঘটেছিলো যে একটি জনগোষ্ঠী যে রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করেছিলো, সেই রাষ্ট্র থেকেই স্বাধীন হওয়ার জন্য অস্ত্র হাতে নিলো?
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমরা যখন ইতিহাস নিয়ে আলাপ করেছি, সেখানে একটা সমস্যা প্রায় সব সময়ই থেকেছে। যিনি ক্ষমতায় থাকেন, তিনিই কোনো না কোনোভাবে ইতিহাসের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এটা শুধু বাংলাদেশের বিষয় নয়। ক্ষমতা সব জায়গাতেই ইতিহাসের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ইতিহাস তো শুধু অতীতে কী ঘটেছিলো, সেই গল্প নয়। বর্তমানের রাজনীতিতেও ইতিহাসের একটা বড় ভূমিকা আছে। কাকে আমরা নায়ক বানাচ্ছি, কাকে খলনায়ক বানাচ্ছি, কোন ঘটনাকে বেশি মনে রাখছি আর কোন ঘটনাকে আড়াল করছি, এর সবকিছুর সাথেই ক্ষমতার একটা সম্পর্ক থাকে। কিন্তু ইতিহাসের একটা বিষয় আছে, তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
ক্ষমতা যখন ইতিহাসের ওপর খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখন হয়তো কিছু সময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভকে রাষ্ট্রীয় সত্য বানানো যায়। পাঠ্যবই বদলানো যায়, স্মৃতির রাজনীতি তৈরি করা যায়, কিছু মানুষকে ইতিহাস থেকে বড় করা যায়, কাউকে ছোট করা যায়, কাউকে প্রায় অদৃশ্যও করে দেওয়া যায়। কিন্তু ক্ষমতা বদলালে সেই চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস আবার ফিরে আসে। কখনো গবেষণার মাধ্যমে, কখনো স্মৃতির মাধ্যমে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও জটিল। কারণ পাকিস্তান আন্দোলন থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম পর্যন্ত ইতিহাসটিকে নির্মোহভাবে আলোচনা করা আমাদের এখানে সব সময়ই কঠিন ছিলো। আমাদের ইতিহাসচর্চার কেন্দ্রে প্রায় সব সময় জাতীয়তাবাদ থাকে। আর জাতীয়তাবাদ যখন ইতিহাস লেখার প্রধান ফ্রেম হয়ে যায়, তখন অনেক সময় ফ্যাক্টের চেয়ে ন্যারেটিভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন কী ঘটেছিলো, সেটা জানার আগ্রহটা অনেক সময় আর প্রধান থাকে না। বরং নিজের যে রাজনৈতিক অবস্থান, সেটাকে ইতিহাসের কোন অংশ দিয়ে সমর্থন করা যায়, সেই চেষ্টাটাই বেশি দেখা যায়। এই প্রবণতা ২০১২ সালের পর, বিশেষ করে ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন এবং তার পরের রাজনৈতিক মেরুকরণের সময় আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি দাবি ছিলো যে ১৯৭১ সালে যারা যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, নির্যাতন এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলো, তাদের বিচার হতে হবে। এই দাবিটির নৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্র প্রথমে কোনো রাজনৈতিক দল ছিলো না। জাহানারা ইমাম এবং তার মতো মুক্তিযুদ্ধে সন্তান, পরিবার বা স্বজন হারানো মানুষ এবং নাগরিক সমাজের একটি অংশ এই দাবিকে দীর্ঘদিন ধরে সামনে রেখেছিলোেন। ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং গণআদালত সেই আন্দোলনের একটি বড় পর্যায়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলো এই দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এবং রাষ্ট্রীয় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
২০১৩ সালে আবদুল কাদের মোল্লার মামলার রায়ের পর শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্ন তখন আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। অন্যদিকে একই বছর হেফাজতে ইসলামের উত্থান এবং শাপলা চত্বরের সমাবেশ আরেক ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করে। শাপলা আন্দোলনকে শুধু শাহবাগের “পাল্টা আন্দোলন” বললে বিষয়টি অতিরিক্ত সরল হবে। কিন্তু শাহবাগ-পরবর্তী “নাস্তিক ব্লগার” বিতর্ক, ইসলাম বনাম সেক্যুলারিজমের রাজনৈতিক ফ্রেম এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ঘিরে উত্তেজনা হেফাজতের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলো। আমার আলোচনা এখানে শাহবাগ বা শাপলার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নয়। সেই রাজনৈতিক বিতর্কে এখন যাওয়ারও খুব একটা প্রয়োজন দেখি না।
বাস্তবতা হলো, এই তীব্র মেরুকরণ ইতিহাসকে নির্মোহভাবে বোঝার জায়গাটিকে আরও সংকুচিত করেছে। বিবাদমান দুই পক্ষের অনেকের মধ্যেই ইতিহাসের জটিল সত্য জানার আগ্রহের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করার মতো ফ্যাক্ট খোঁজার আগ্রহ বেশি দেখা গেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, দুই পক্ষই অনেক সময় ইতিহাসের সেই অংশগুলোই সামনে এনেছে যেগুলো তাদের নিজেদের বক্তব্যকে শক্তিশালী করে। ফলে ইতিহাসকে নির্মোহভাবে বোঝার চেষ্টা যতটা হওয়ার কথা ছিলো, তার বদলে ইতিহাসকে রাজনৈতিক তর্কের অস্ত্র হিসেবেই বেশি ব্যবহার করা হয়েছে।
আমার নিজের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ২০১৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তান আন্দোলন, জিন্নাহ, মুসলিম লীগের রাজনীতি কিংবা ১৯৪৭ নিয়ে একাডেমিক জায়গা থেকেও খোলামেলা আলোচনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পাবলিক স্পেসে তো আরও বেশি। পরিস্থিতিটা অনেকটা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে আপনি জিন্নাহকে নিয়ে কথা বলছেন মানেই ধরে নেওয়া হচ্ছে আপনি জিন্নাহর সমর্থক। পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করছেন, সেখান থেকেও আপনার রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করে ফেলার একটা প্রবণতা ছিলো। এই মনোভাব ইতিহাসচর্চার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
তারপর এলো ২০২৪। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে পাবলিক স্পেসে একটা নতুন ধরনের খোলামেলা জায়গা তৈরি হলো। আমি এই স্পেস তৈরি হওয়াকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। কারণ নিষিদ্ধ ইতিহাস বলে কিছু থাকা উচিত নয়। জিন্নাহ নিয়ে কথা বলা যাবে, গান্ধী নিয়ে কথা বলা যাবে, নেহরুকে নিয়ে কথা বলা যাবে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও কথা বলা যাবে। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, জিয়াউর রহমান সবাইকে নিয়েই আলোচনা হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, সেই নতুন স্পেসের মধ্যেই আবার আরেক ধরনের ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা দেখতে পেলাম।
সেখানে একটা বয়ান সামনে এলো যে আমাদের “প্রথম স্বাধীনতা” হচ্ছে ১৯৪৭, আর “দ্বিতীয় স্বাধীনতা” হচ্ছে ২০২৪। মাঝখান থেকে ১৯৭১ যেন আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আরও এগিয়ে একাত্তরকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কেউ বলছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, বরং ভারতের অধীন হয়েছে। ২০২৪ সালের পর ঢাকা শহরে এমন কিছু আয়োজন সামনে এসেছে, যেখানে ১৯৪৭-কে শুধু ইতিহাসের অংশ হিসেবে আলোচনা করা হয়নি, পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে সেলিব্রেট করা হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় প্রেসক্লাবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান হয়। সেখানে বক্তাদের কেউ বলেছেন, জিন্নাহ না থাকলে পাকিস্তান হতো না এবং পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও হতো না। একজন বক্তা এমনও বলেছেন যে জিন্নাহকে বাংলাদেশের “জাতির পিতা” হিসেবে স্বীকার করা উচিত। এগুলো আর জিন্নাহর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে নিরপেক্ষ একাডেমিক আলোচনা নয়। এগুলো স্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য। আরও স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় ১৪ই অগাস্ট ২০২৫ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “প্রথম স্বাধীনতা দিবস” নামে অনুষ্ঠান হয়েছে, “ফিরে দেখা আজাদি” নামে আলোচনা হয়েছে। অন্য একটি সংগঠন দিনব্যাপী কর্মসূচি করেছে। সেখানে প্রকাশ্যেই ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে বাঙালি মুসলমানের “প্রথম স্বাধীনতা” হিসেবে উদযাপন করা হয়েছে। জিন্নাহকে ডানপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।
এখানে ইতিহাসের একটা পরিহাস আছে। যে জিন্নাহকে আজ বাংলাদেশের জামায়াত-ঘনিষ্ঠ এবং কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ ও ডানপন্থী রাজনীতির আইকন বানিয়ে একাত্তরের বিপরীতে দাঁড় করাতে চাইছে, সেই জিন্নাহর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদির রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধ ছিলো অত্যন্ত তীব্র। মওদুদী মুসলিম লীগকে “জামাত-ই-জাহিলিয়াত” বলেছেন। জিন্নাহর ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। মুসলিম লীগের কল্পিত পাকিস্তানকে মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত একটি “কাফির সরকার” হয়ে উঠতে পারে বলেও আক্রমণ করেছেন।
ইসলামপন্থী সংগঠন মজলিস-ই-আহরারের নেতা মাজহার আলী আজহার জিন্নাহকে সরাসরি “কাফির-ই-আজম” বলে বিদ্রূপ করেছিলোেন। অথচ সেই জিন্নাহই ১১ই অগাস্ট ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বলেছিলোেন, নাগরিক তার মন্দিরে যেতে স্বাধীন, মসজিদে যেতে স্বাধীন, যে কোনো উপাসনালয়ে যেতে স্বাধীন এবং একজন নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ বা বিশ্বাস রাষ্ট্রের কাজের বিষয় নয়। অর্থাৎ আজ যারা জিন্নাহকে ব্যবহার করে ধরনের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী পাকিস্তানের রোমান্টিক ছবি আঁকছেন, তাদের জন্য ইতিহাসটা বেশ অস্বস্তিকর। কারণ যে জিন্নাহকে তারা এখন নিজেদের রাজনৈতিক আইকন বানাতে চাইছেন, তার রাষ্ট্রচিন্তার এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান নাগরিকত্বের কথা বলে। ডানপন্থি রাজনীতির আদর্শিক পূর্বসূরিরাই একসময় জিন্নাহ ও তার মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর ধর্মীয় ভাষায় আক্রমণ করেছিলোেন। ইতিহাসকে যদি সত্যিই গ্রহণ করতে হয়, তাহলে জিন্নাহর শুধু সুবিধাজনক অংশটি নয়, এই পুরো বৈপরীত্যটাও গ্রহণ করতে হবে।
এখানে আমার অবস্থান খুব পরিষ্কার। বাংলাদেশে জিন্নাহকে নিয়ে আলোচনা হবে। অবশ্যই হবে। গান্ধীকে নিয়ে হবে। নেহরুকে নিয়ে হবে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে হবে। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, ভাসানী, খাজা নাজিমুদ্দিন সবাইকে নিয়ে হবে। পাকিস্তান আন্দোলন কেন তৈরি হয়েছিলো সেটাও জানতে হবে। মুসলিম লীগের প্রতি বাংলার মুসলমানের এত বিপুল সমর্থন কেন তৈরি হয়েছিলো, জমিদারি কাঠামো, শ্রেণি, ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, কংগ্রেসের রাজনীতি, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি, সবকিছু নিয়েই গবেষণা হওয়া দরকার। বরং এগুলো না জানলে বাংলাদেশকে বোঝাই যাবে না।
কিন্তু এখানে একটা পার্থক্য আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিন্নাহকে নিয়ে আমরা ইতিহাসের জায়গা থেকে আলোচনা করতেই পারি। পাকিস্তান আন্দোলনও আমাদের বুঝতে হবে। কিন্তু সেই আলোচনাকে ব্যবহার করে আজকের বাংলাদেশে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে আবার রাজনৈতিকভাবে সেলিব্রেট করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। আমার আপত্তির জায়গা ঠিক এখানে।
এই গ্রুপগুলোর আলোচনা যতটুকু মিডিয়ায় দেখেছি, তাদের বক্তব্য যতটুকু অনলাইনে এসেছে এবং কিছু মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাস যতটুকু দেখেছি, আমার কাছে মনে হয়নি যে তাদের প্রধান আগ্রহ হচ্ছে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনকে ক্রিটিকাল লেন্সে বোঝা। কিংবা কেন পাকিস্তান আন্দোলন তৈরি হয়েছিলো এবং কীভাবে মাত্র চব্বিশ বছরের মধ্যে সেই পাকিস্তান থেকে বাঙালির রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটল, সেই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। বরং তাদের একটি অংশের আগ্রহ মনে হয়েছে অন্য জায়গায়। পাকিস্তান আন্দোলনকে সেলিব্রেট করা। ১৯৪৭-কে “প্রথম স্বাধীনতা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তারপর ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে ছোট করে ১৯৪৭ এবং ২০২৪-কে একটি সরল রাজনৈতিক রেখায় বসানো। আমার কাছে এই জায়গায় এসে বিষয়টা আর শুধু ইতিহাস নিয়ে আলোচনা থাকে না। এখানে ইতিহাসকে ব্যবহার করে একটা রাজনৈতিক ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু হয়।
১১ই অগাস্ট ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের গণপরিষদে জিন্নাহ যে রাষ্ট্রের কথা বলেছিলোেন, সেটাও দেখতে হবে। সেখানে তিনি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান নাগরিকত্ব এবং রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের সমান মর্যাদার কথা বলেছিলোেন। তারপর আমাদের দেখতে হবে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবে কী হয়েছিলো। ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে পূর্ব বাংলার মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত শুরু হলো। ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে মানুষকে জীবন দিতে হলো। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষ মুসলিম লীগকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করল। এরপর ষাটের দশকে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে এলো, ছয় দফা এলো, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান হলো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল, কিন্তু তাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হলো না। এবং শেষ পর্যন্ত ২৫এ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর সামরিক অভিযান চালাল। এই পুরো ধারাবাহিকতাটাকে একসঙ্গে না দেখলে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের যাত্রাটা বোঝা কঠিন।
এই ঘটনাগুলোকে বাদ দিয়ে যদি শুধু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গল্প বলা হয়, তাহলে ইতিহাসের একটা সুবিধাজনক অংশই শুধু বলা হবে। পুরো ইতিহাসটা আর বলা হবে না। একইভাবে ১৯৭১ নিয়ে আলোচনা করতে হলে ভারতের ভূমিকাও আলোচনা করতে হবে। ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ছিলো, সেটাও গবেষণার বিষয়। ভারত রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক হিসাব ছিলো। কিন্তু ভারতের স্বার্থ ছিলো বলেই বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ভারতের তৈরি হয়ে যায় না। ভারত এই পরিস্থিতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্যই করা যাবে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বাঙালির নিজের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাটাকেই ভারতের তৈরি বলে দিলে ঘটনাটা আর ঠিকভাবে বোঝা যায় না।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছিলো। ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। পহেলা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পর পূর্ব বাংলায় অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। পঁচিশে মার্চ সামরিক অভিযান আসে। তারপর স্বাধীনতার যুদ্ধ। ভারত সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে আরও পরে, ডিসেম্বর মাসে। ভারত যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে, এটা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু সেখান থেকে যদি বলা হয় ভারতই বাংলাদেশ তৈরি করেছে, তাহলে বাঙালির নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ১৯৭০ সালের গণরায় এবং মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে বাদ দেওয়া হয়।
এখন আসি জামায়াতে ইসলামীর প্রশ্নে। আমার রাজনৈতিক পাঠে, ১৯৭১-কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় সংগঠিত রাজনৈতিক সুবিধাভোগী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির ও ছাত্রী সংস্থা। কারণ ১৯৭১ সালে জামায়াতের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি। যুদ্ধাপরাধের বিচারও মূলত তাদের একাধিক শীর্ষ নেতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় সংঘাত তৈরি করেছে। ফলে এমন একটি ইতিহাস, যেখানে ১৯৪৭ হচ্ছে প্রথম স্বাধীনতা, ২০২৪ হচ্ছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা এবং ১৯৭১ মাঝখানে একটি ভারতীয় প্রকল্পে পরিণত হয়, সেই ন্যারেটিভ জামায়াতের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক। আমি এটাকে সেই অর্থে জামায়াতের বৃহত্তর ন্যারেটিভ প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দেখি। তবে এটাও মনে করি না যে এই বয়ানের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি জামায়াতের সদস্য বা জামায়াতের নির্দেশে কাজ করছেন। বিষয়টা এত সরল নয়।
এর সঙ্গে আরও কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী আছে। এমন কিছু ছোট সংগঠন আছে যাদের নাম হয়তো আমরা জানি, আবার কিছু নেটওয়ার্ক আছে যাদের হয়তো আনুষ্ঠানিক নামই নেই। আবার ঢাকা শহরের এক কালে বামপন্থি ছিলো বর্তমানে ডানপন্থিদের সাথে কাজ করছে এমন একটা বলয় ও রয়েছে। বাস্তবতা হল দেশে এই ধারার বক্তব্যের শ্রোতা আছে। ফলে এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে। কিছু অবসরপ্রাপ্ত একাডেমিক, কিছু ডানপন্থি সাংবাদিক, কিছু অ্যাক্টিভিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী দেখছেন, এই ধরনের কথা বললে দ্রুত পরিচিত হওয়া যায়, একটা রাজনৈতিক শ্রোতা পাওয়া যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থক পাওয়া যায়। ফলে কেউ কেউ খুব আগ্রহ নিয়ে এই বয়ানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাদ পাচ্ছেন।
আমি কাউকে পাকিস্তান নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করার পক্ষে নই। উল্টোটা। আরও কথা হোক। আরও গবেষণা হোক। জিন্নাহর পক্ষে লেখা হোক, বিপক্ষে লেখা হোক। পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে নতুন গবেষণা হোক। এমনকি বাংলাদেশের প্রচলিত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসকেও চ্যালেঞ্জ করা হোক। ইতিহাসকে প্রশ্ন ছাড়া রেখে দিলে ইতিহাস ধর্মগ্রন্থে পরিণত হয়। কিন্তু প্রশ্ন করার নামে আরেকটি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী পুরাণ তৈরি করাও ইতিহাসচর্চা নয়। বাংলাদেশের বাস্তব ইতিহাস অনেক বেশি জটিল, এবং সেই জটিলতাই আমাদের মেনে নিতে হবে।
অবিভক্ত বাংলার বিপুলসংখ্যক মুসলমান একসময় মুসলিম লীগের সঙ্গে ছিলো। তারা পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলো। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিলো। এই সত্য অস্বীকার করলে ইতিহাস বিকৃত হবে। আবার সেই একই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে ভাষাগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সেই রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তরের বিভিন্ন ধাপ।
এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসের জটিলতা। সাতচল্লিশকে আমরা বাদ দিতে পারি না, কারণ পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে বাংলার মুসলমানের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। একইভাবে একাত্তরকে বাদ দেওয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। আর চব্বিশও এখন আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। সমস্যা হয় তখনই, যখন একটা ঘটনাকে বড় করতে গিয়ে আরেকটা ঘটনাকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বরং সাতচল্লিশকে বুঝলে একাত্তর আরও পরিষ্কার হয়। কারণ তখন বোঝা যায় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো একদিন সকালে হঠাৎ শুরু হয়নি। যে বাঙালি মুসলমান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভেতরে নিজের রাজনৈতিক মুক্তির জন্য পাকিস্তানকে একটি সমাধান মনে করেছিলো, সেই মানুষই পরে দেখেছে যে নতুন রাষ্ট্র তার ভাষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সমান নাগরিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করছে না। সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নতুন রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি এসেছে। এই ইতিহাসে পাকিস্তান আন্দোলনকে মুছে ফেলার দরকার নেই। জিন্নাহকেও মুছে ফেলার দরকার নেই। কিন্তু একইভাবে একাত্তরকেও মুছে ফেলা যাবে না।
ঢাকায় কেউ যদি পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে সেমিনার করেন, আমি তার বিরোধিতা করব না। বরং শুনতে আগ্রহী হব। কিন্তু সেই সেমিনার যদি ইতিহাস বোঝার বদলে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সেলিব্রেট করার জায়গা হয়ে যায়, যদি সেখানে একাত্তরকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলা হয়, যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে ভুল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়, তাহলে সেটার রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও কথা বলতে হবে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষ লড়েছে। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের এক পর্যায়ে বাংলার মুসলমানের বড় অংশ পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক মুক্তি খুঁজেছে। আবার সেই পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন পূর্ব বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করেছে, তখন সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও মানুষ লড়েছে। এই দুই ইতিহাসকে পরস্পরের শত্রু বানানোর কোনো দরকার নেই। কিন্তু একটাকে ব্যবহার করে আরেকটাকে অস্বীকার করার চেষ্টা হলে সেখানে আপত্তি করতেই হবে।
ইতিহাসকে জানতে হবে। বুঝতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে। ক্রিটিকালি এনগেজ করতে হবে। নিজের পছন্দের মানুষকেও প্রশ্ন করতে হবে, নিজের অপছন্দের মানুষের ভূমিকাও তথ্য দিয়ে বিচার করতে হবে। ইতিহাসকে কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি বানানো ঠিক নয়। আওয়ামী লীগের সময় ইতিহাসের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যদি আমাদের আপত্তি থাকে, তাহলে সেই নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে এসে ইতিহাসকে আরেক ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির হাতে তুলে দেওয়ারও কোনো অর্থ হয় না। তাতে ইতিহাস মুক্ত হয় না, শুধু কে ইতিহাসের ওপর কর্তৃত্ব করবে সেই পক্ষটা বদলে যায়। আর সাতচল্লিশ ও চব্বিশকে পাশাপাশি বসিয়ে মাঝখান থেকে একাত্তরকে সরিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা, সেটাকেও ইতিহাসের নির্মোহ পাঠ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটা একটা রাজনৈতিক ন্যারেটিভ, এবং সেই ন্যারেটিভের সঙ্গে দ্বিমত করাটা গণতন্ত্রেরই অংশ।
আসিফ বিন আলী পেশায় একজন শিক্ষক ও গবেষক
[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব]
বিষয়: