মতামত

সাংবাদিকতা পেশাটাকেই কি আমরা মেরে ফেলছি?

দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো প্রধান ও বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসাবে দেখলে গণমাধ্যমের গভীর কাঠামোগত সংকটটি আড়ালে থেকে যাবে।

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

কিছু দিন পর পর সাংবাদিকদের লাশ পাওয়া যেন বাংলাদেশে এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে খুন হন, কারও লাশ পাওয়া যায় নদীতে, কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত অবস্থায় ফিরে আসেন, আবার কেউ পরিস্থিতির চাপে নিজের জীবন শেষ করে দেন। এই তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো প্রধান ও বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জির নাম। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসাবে দেখলে গণমাধ্যমের গভীর কাঠামোগত সংকটটি আড়ালে থেকে যাবে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা জগতে সবচেয়ে বেশি কথা হয় স্বাধীনতা নিয়ে। সাংবাদিকের ওপর হামলা হলে প্রতিবাদ হয়, মামলা হলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, সেন্সরশিপের অভিযোগ উঠলে আলোচনা হয়। কিন্তু সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য, চাকরির স্থায়িত্ব এবং কর্মহীন হলে তার সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয় না বললেই চলে। অথচ পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক সরাসরি।

যে সাংবাদিক জানেন, একটি প্রতিবেদন বা প্রশ্নের কারণে চাকরি চলে যেতে পারে, তিনি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন? যে সাংবাদিক মাসের পর মাস বেতন পাওয়ার অনিশ্চয়তায় থাকেন, তার কাছে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার মূল্যই বা কতটা? তাই সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে শুধু রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক চাপের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বাস্তবতার অর্ধেকই দেখা হয়। মালিকানা, চাকরি ও জীবিকার ওপর নির্ভরশীলতাও সাংবাদিকের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এই সংকটের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা চাকরির নিরাপত্তা। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আর্থিক সমস্যায় পড়তে পারে, ব্যবসায়িক নীতি বদলাতে পারে, কর্মী ছাঁটাই করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সিদ্ধান্তের ভার কেন প্রায় সবসময় কর্মীর ওপরই পড়বে? একজন সাংবাদিক চাকরি হারালে তাঁর বকেয়া বেতন, ক্ষতিপূরণ বা আইনি প্রতিকারের নিশ্চয়তা কোথায়?

অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও তীব্র। বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা বাড়ে, কিন্তু স্থায়ী ও ভালো বেতনের চাকরির সংখ্যা সে অনুপাতে বাড়ে না। ফলে দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে চাকরি হারানো একজন সাংবাদিক তরুণদের মতো সহজে নতুন করে শুরু করতে পারেন না। অভিজ্ঞতার জন্যও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা নেই।

এই অনিরাপত্তার আরেকটি দিক হলো গণমাধ্যমের মালিকানা ও রাজনৈতিক অর্থনীতি। বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যম বৃহত্তর ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে সাংবাদিককে একই সঙ্গে জনস্বার্থে কাজ এবং প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক বাস্তবতা মেনে চলতে হয়। ক্ষমতাবান কাউকে প্রশ্ন করলে চাকরি হারানোর ভয় থাকলে স্বাধীনতা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।

২০২৫ সালের অগাস্টে গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে একাধিক সাংবাদিক নিহত ও বহু সাংবাদিক আহত হন। আর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার প্রতীক হয়ে আছে। ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট এক নয়, কিন্তু এগুলো সাংবাদিকের জীবন ও স্বাধীনতার নিরাপত্তাহীনতা দেখায়।

রাষ্ট্রের দায় এখানে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হলে নিরাপত্তা দেওয়া, হামলার তদন্ত করা এবং হত্যাকারীকে বিচারের মুখোমুখি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার ভেতরের সংকটও এখন আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সাংবাদিককে শুধু অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয় না; অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চাকরির ভয়, বেতন না দেওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার মধ্য দিয়েও একটি পেশাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করা যায়।

আমাদের সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশে সাংবাদিকের চাকরির নিশ্চয়তা নেই। মাসের পর মাস বেতন আটকে থাকে, পাওনা আদায়ের নিশ্চয়তা থাকে না। নিয়োগপত্র, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, স্বাস্থ্যসুবিধা কিংবা অবসরের নিরাপত্তা অনেকের কাছেই অনিশ্চিত। অথচ সেই সাংবাদিককেই বলা হয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করুন, ঝুঁকি নিয়ে কাজ করুন। নিজের পরিবারের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চিত একজন মানুষের কাছে আমরা কীভাবে নির্ভীক সাংবাদিকতা আশা করি?

আমি নিজেও একসময় সাংবাদিকতা পেশায় ছিলাম। মাসের পর মাস বেতন ছাড়া সংবাদপত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। দেখেছি, পেশার প্রতি ভালোবাসা মানুষকে কিছুদিন টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না। শেষ পর্যন্ত রুটি-রুজির জন্য আমাকেও সাংবাদিকতা ছাড়তে হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত হলেও সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়। এই পেশা থেকে এমন অসংখ্য মানুষ বেরিয়ে গেছেন, যারা সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সাংবাদিকতা তাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি।

সাংবাদিকদের আত্মহত্যা কিংবা সন্দেহজনক আত্মহত্যার ঘটনাগুলোও ভাবার দাবি রাখে। বিভুরঞ্জন সরকার, সোহানা পারভিন তুলি, শবনম শারমিন, রাহনুমা সারাহ, ওয়াহেদ-উজ-জামান বুলুসহ কয়েকজন সাংবাদিকের মৃত্যু আমাদের প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। এসব মৃত্যুর কারণ এক নয়; প্রতিটিকে পেশাগত সংকটের ফল বলা দায়িত্বজ্ঞানহীন। কিন্তু নিছক ব্যক্তিগত ঘটনা বলে পাশ কাটানোও ঠিক নয়। চাকরি, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পেশাগত চাপ বা সামাজিক অবস্থার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের বিষয়।

সাংবাদিকতার ভবিষ্যত নিয়েও আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা আছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগে হাজার হাজার তরুণ পড়াশোনা করছেন। তাদের সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল মিডিয়া শেখানো হয়। কিন্তু তাদের জন্য কর্মসংস্থান কোথায়? যে চাকরি আছে, সেখানে বেতন ও পেশাগত উন্নতির নিশ্চয়তা কতটা? দশ বছর পর একজন সাংবাদিক কোথায় দাঁড়াবেন, তার কোনো সুস্পষ্ট পথ কি আছে?

শিক্ষার মাধ্যমে একটি পেশা সম্প্রসারিত করে কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়া তরুণদের সঙ্গে প্রতারণা। আমরা চাই তারা সাংবাদিকতায় আসুন, কিন্তু এমন পেশাগত ভবিষ্যত তৈরি করছি না, যা দেখে তারা অনুপ্রাণিত হতে পারেন। মেধাবী তরুণেরা অন্য পেশায় চলে গেলে আবার অভিযোগ করি, সাংবাদিকতায় মেধাবীরা থাকছে না।

এখানে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। সাংবাদিকদের সংগঠন আছে, সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন আছে, প্রেস ক্লাব আছে। কিন্তু সাংবাদিকের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, বকেয়া পাওনা, আইনি সহায়তা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পায়? সাংবাদিক মারা গেলে বিবৃতি দেওয়া সহজ; কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বকেয়া বেতন আদায় করা কঠিন। অথচ সংগঠনের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।

মালিকদেরও বুঝতে হবে, সাংবাদিক কোনো সস্তা শ্রমিক নন। একটি সংবাদমাধ্যমের সম্পদ তার সাংবাদিক ও কর্মীরা। তাদের শ্রমের ওপরই সংবাদ, পাঠক ও ব্যবসা দাঁড়িয়ে থাকে। তাই সাংবাদিকের বেতন আটকে রাখা বা অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা কেবল ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নয়; এটি শ্রমের প্রতি অবমাননা এবং গণমাধ্যমের নৈতিকতারও প্রশ্ন।

তাই সাংবাদিক হত্যার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হত্যাকারীর বিচার চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সাংবাদিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত বেতন, নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির স্বচ্ছ নীতি, বকেয়া পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে পদ-পদবির রাজনীতি থেকে বের হয়ে অধিকারভিত্তিক সংগঠনে পরিণত হতে হবে।

রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়। সাংবাদিক নিরাপদ না থাকলে নাগরিকের জানার অধিকারও নিরাপদ থাকে না। একজন সাংবাদিককে হত্যা করা মানে শুধু একজন মানুষকে হত্যা করা নয়; এর মধ্য দিয়ে প্রশ্ন করার অধিকারকেও ভয় দেখানো হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, সাংবাদিকের লাশের পর আমরা যেন শুধু হত্যাকারী না খুঁজি, মৃত্যুর পেছনের কাঠামোটাও খুঁজি। কেন একজন সাংবাদিক অসহায় হয়ে পড়লেন? কেন তার পাশে কোনো প্রতিষ্ঠান দাঁড়ালো না? কেন চাকরি হারালে তার সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছু থাকে না? কেন সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা হয়ে উঠছে, যেখানে আদর্শ আছে, কিন্তু নিরাপদ ভবিষ্যত নেই?

একজন সাংবাদিককে একবার হত্যা করা যায়। কিন্তু সাংবাদিকতাকে প্রতিদিন একটু একটু করে হত্যা করা যায় ভয় দেখিয়ে, চাকরি কেড়ে নিয়ে, বেতন আটকে রেখে, পেশাগত মর্যাদা নষ্ট করে এবং তরুণদের এই পেশা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে। আমাদের সাংবাদিকতার সংকট তাই শুধু লাশের সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না; মাপতে হবে কতজন সাংবাদিক চুপ করে গেছেন, কতজন পেশা ছেড়েছেন এবং কতজন তরুণ এই পেশায় আসার স্বপ্ন হারিয়েছেন, তা দিয়েও।

নইলে আজ একজনের লাশ নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করবো, কাল আরেকজনের জন্য বিবৃতি দেব, পরশু আরেকজনের মৃত্যুকে দুঃখজনক ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাবো। একসময় সাংবাদিকের লাশও আর খবর থাকবে না। সেদিন বুঝতে হবে, আমরা শুধু সাংবাদিকদের হারাইনি; প্রশ্ন করার সাহসটাকেই মেরে ফেলেছি।

লেখক: কলামিস্ট, রম্য লেখক ও উন্নয়নকর্মী

[মতামত লেখকের নিজস্ব]