গুলশানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে যেসব প্রশ্ন 

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কূটনৈতিক মিশনে ঘেরা গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল - দুপুর বেলায় মিছিল হলো, স্লোগান হলো, আবার দ্রুত সরে গেলেন অংশগ্রহণকারীরা। যেন ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলে নিরাপত্তার বলয়কে চ্যালেঞ্জ করে দেওয়া হলো বার্তা। 

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

ঢাকার গুলশান শুধু রাজধানীর অভিজাত এলাকাই নয়- রাষ্ট্রের ক্ষমতা, কূটনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসভবন, বিদেশি কূটনৈতিক মিশন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসবাসের কারণে এই এলাকার নিরাপত্তা সবসময়ই থাকে বিশেষ নজরদারিতে।

কিন্তু সেই গুলশানেই হঠাৎ প্রকাশ্যে একটি মিছিল বের করে ফেললো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকশো মানুষ।

দুপুর বেলায় মিছিল হলো, স্লোগান হলো, আবার দ্রুত সরে গেলেন অংশগ্রহণকারীরা। যেন ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলে নিরাপত্তার বলয়কে চ্যালেঞ্জ করে দেওয়া হলো বার্তা।

প্রশ্ন উঠছে, এত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে গুলশানের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এমন একটি মিছিল কীভাবে সম্ভব হলো?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি বিষয়টি আঁচ করতে পারেনি? গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কি কোনো আগাম তথ্য ছিলো না? নাকি তথ্য থাকার পরও কোথাও সমন্বয়ের ঘাটতি ছিলো?

আরও বড় প্রশ্ন, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরপরই এই মিছিল; দুই ঘটনার মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র আছে?

গুলশানের এই মিছিল আসলে কী বার্তা দিলো? আওয়ামী লীগ কি রাজপথের সক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করলো? 

আর এই ঘটনার আড়ালে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণের ইঙ্গিত রয়েছে?

শুক্রবার কী ঘটেছে গুলশানে 

গুলশানে এমন কিছু স্থাপনা আছে যা একইসঙ্গে ‘বিশেষ শ্রেণির’ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই এবং ভিভিআইপি (ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন) এলাকা হিসাবে ঘোষিত। 

এরমধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

এ রকম একটি এলাকায় শুক্রবার দুপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল করেছে। এসময় ককটেল বিস্ফোরণেরও ঘটনা ঘটেছে।

গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা পৌনে ১২টার দিকে গুলশান- ১ এর ভোলা মসজিদের সামনে থেকে মিছিলটি বের করার চেষ্টা হয়।

পুলিশ ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে মিছিলকারীরা দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় দুজনকে। 

উদ্ধার করা হয় পাঁচটি ককটেল। জমায়েতকারীরা মারমুখী হয়ে উঠলে মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে শটগানের দুই রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়।

পরে রাতভর অভিযানে আওয়ামী লীগের আরো ৩২ জন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।  

গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন

এ ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা আছে কিনা, জানতে চাইলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে “ব্যর্থতার বিষয়ে কিছু বলার এখনি সময় হয়নি।”

তবে সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গুলশান-বারিধারা-বনানী খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। গুলশানে প্রধানমন্ত্রী বসবাস করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এই এলাকায় বসবাস করতেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশসহ ঢাকাস্থ প্রায়সব কূটনৈতিক মিশনও এই এলাকায়।” 

তিনি বলেন, “সশস্ত্রবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), গোয়েন্দা পুলিশ–সবাই অ্যাকটিভ আছে। তারপরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কীভাবে জমায়েত করতে পারলো, পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করলো, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেনইবা রাবার বুলেট ছুড়তে হলো–এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই স্পষ্ট হবে গোয়েন্দা ব্যর্থতা না-কি অন্য কোনো কারণ নেপথ্যে আছে।”

শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বার হাসান সিজার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লিখেছেন, “বাংলাদেশের গোয়েন্দারা সভা-সেমিনার-পাঁচ তারকা হোটেলে নজরদারিতে এত বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, মনে হচ্ছে আমাদের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের মিছিল নিয়ে তেমন প্রস্তুতি ছিলো না।”

তিনি বলেন, “জুলাই পরবর্তী আমার প্রত্যেকবারের ট্রিপে যত সভা সেমিনারে গিয়েছি গোয়েন্দাবাহিনীর লোকজন ছিলো, জিজ্ঞেস করলেই বলসে আমরা এজেন্সি থেকে আসছি। হোক তা গুলশানে, ডেইলি স্টারে, হোটেল রূপসী বাংলা অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমনকি দুই সাংবাদিক কফি পান করলেও ঐটার গোয়েন্দা রিপোর্ট হয় হোয়াটসঅ্যাপগ্রুপ-এ, আমার কাছে রিপোর্টের কপিও আছে।”

মোবাশ্বার হাসান আরও লিখেছেন, “কিন্তু যে এলাকায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী থাকেন সেই এলাকায় এতগুলো মানুষ মিছিল করবে তা এই বাহিনী জানে না, এইটা তো পুরা কমেডি হয়ে যাচ্ছে।”

আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনায় সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।

শুক্রবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে তিনি লেখেন, “প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চায় বলেই… পতিত স্বৈরাচার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মিছিল দিতে পারে।”

আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। শুক্রবার রাতে গুলশানে এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

ছাত্রদলের সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতের নেতৃত্বে মিছিলটি বের করা হয়। এতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। মিছিল থেকে দেশজুড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়।

শনিবার সকালে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে কথা বলেন ডিসি (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন।  

তিনি বলেন, শুক্রবারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১৮ জনের নামে, অজ্ঞাত ৮০ থেকে ১০০ জন। তাদের বিরুদ্ধে ককটেল বিস্ফোরণসহ রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।  

গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিলো কিনা, জানতে চাইলে আকতার হোসেন জানান, ব্যর্থতার বিষয়ে কিছু বলার এখনি সময় হয়নি।

গুলশানের মতো জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের মিছিল করায় কারো ব্যর্থতা থাকলেও তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানায় পুলিশের এই কর্মকর্তা।

পরে একাধিক জায়গায় সমবেত হওয়ার চেষ্টা

শুক্রবার গুলশানে ঝটিকা মিছিলের পর ভাটারায় সভা করার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

তবে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা ওই সভা পণ্ড করে দেন। গুলশানের পাশেই ভাটারা থানার অবস্থান।

আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে উত্তরা থেকে মিছিলের প্রস্তুতির সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের আরো চার নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশ। 

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, “বেলা সোয়া ১টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানার আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের নিচে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা–কর্মীরা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। 

“পরে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশের একটি দল সেখানে গিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে মিছিলের একটি ব্যানার জব্দ করা হয়।”

স্বাভাবিক গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলকে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবেই দেখা হচ্ছে না। এই ঘটনা প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার সামনে।

এটি কি নিছক আকস্মিক ঘটনা, নাকি এর পেছনে ছিলো পরিকল্পনা এবং বড় কোনো রাজনৈতিক বার্তা- এসব প্রশ্নও এখন তদন্তকারীদের সামনে।