আউটরেইজ ইকোনমি বা রাগের অর্থনীতি মানে হলো এমন এক ডিজিটাল সিস্টেম, যেখানে মানুষের রাগ, ভয়, ক্ষোভ, ট্রল, বিতর্ক—এসব ইমোশনকে এনগেজমেন্টে পরিণত করা হয়। সহজভাবে বললে, অনলাইনে শান্ত, ব্যালান্সড কথা কম ছড়ায়; কিন্তু ‘কে কাকে কী বললো’, ‘কে কাকে ব্লক করলো’, ‘কোন পোস্টে আগুন লাগলো’—এসব দ্রুত ভাইরাল হয়।
প্ল্যাটফর্মগুলো অ্যালগরিদম দিয়ে এমন কনটেন্ট সামনে আনে, কারণ মানুষ রেগে গেলে বেশি কমেন্ট করে, শেয়ার করে, স্ক্রল করে—আর যত ‘বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকে, তত বেশি ডেটা তৈরি হয় এবং বিজ্ঞাপন থেকে লাভ হয়। এখানেই এটি সারভাইল্যান্স ক্যাপিটালিজমের অংশ: আমাদের ক্লিক, রিঅ্যাকশন, রাগ, পছন্দ-অপছন্দ সবকিছু ট্র্যাক করে প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের আচরণ বুঝে, প্রেডিক্ট করে এবং ব্যবসার পণ্যে পরিণত করে।
ডিজিটাল সোসাইটিতে তাই আমরা শুধু ইউজার না, আমরা একেকটা “ডেটা-মেশিন”; আমাদের ইমোশনও মনিটাইজড হয়। এক কথায়, রাগ এখানে শুধু অনুভূতি না—এটা অ্যালগরিদমের ফুয়েল, আর আমরা স্ক্রল করতে করতে সেই ফুয়েল সাপ্লাই করি।
‘আউটরেইজ ইকোনমি’ বা ‘রাগের অর্থনীতি’ ধারণাটি আলোচনায় আনতে অ্যালিসন ফিপসের কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তার বই ‘মি, নট ইউ: দ্য ট্রাবল উইথ মেইনস্ট্রিম ফেমিনিজম’–এর চতুর্থ অধ্যায়, ‘দ্য আউটরেইজ ইকোনমি’-তে দেখিয়েছেন, আধুনিক মিডিয়া ও ডিজিটাল পরিসরে ক্ষোভ, নৈতিক উত্তেজনা ও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার প্রবণতা কীভাবে মনোযোগ, প্রভাব ও ক্ষমতার অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’ শব্দটা শুনতে ভারী। কিন্তু এর ভেতরের বাস্তবতা খুব পরিচিত। এটি শুধু কোনো একনায়ক, কোনো সেন্সরশিপ আইন বা কোনো একক রাজনৈতিক দলের গল্প নয়। এটি এমন এক ধীরে-ধীরে গড়ে ওঠা ক্ষমতা-কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক শক্তি, করপোরেট প্ল্যাটফর্ম এবং অ্যালগরিদম একসঙ্গে মিলে জনপরিসরকে নতুনভাবে সাজায়। আগে ক্ষমতা মানুষের শরীর নিয়ন্ত্রণ করতো; এখন ক্ষমতা মানুষের মনোযোগ, আবেগ, ভয়, রাগ এবং প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
একটা সময় রাজনীতি মানে ছিল মিছিল, মঞ্চ, পোস্টার, সংবাদপত্রের হেডলাইন। এরপর এলো বোকা বাকসো- টিভি টকশো। এখন রাজনীতির বড় অংশ ঘটে স্ক্রিনের ভেতর—ফেইসবুকের নিউজফিডে, ইউটিউবের রিকমেন্ডেশনে, এক্স-এর ট্রেন্ডিং টপিকে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের ফরওয়ার্ডেড মেসেজে। আমরা ভাবি, আমরা শুধু স্ক্রল করছি। কিন্তু সত্যি কি তাই?
প্রশ্নটা এখানেই: আমরা কি কনটেন্ট দেখছি, নাকি কনটেন্টই আমাদের দেখছে?
গণযোগাযোগের ভাষায় এটাকে বলা যায় ‘মিডিয়েটেড পাবলিকস্ফিয়ার’ বা মধ্যস্থতাপ্রাপ্ত জনপরিসর। অর্থাৎ নাগরিকরা আর সরাসরি একে অপরের সঙ্গে রাজনৈতিক আলাপ করছে না; তাদের আলাপ প্ল্যাটফর্মের ডিজাইন, অ্যালগরিদমিক দৃশ্যমানতা এবং এনগেজমেন্টভিত্তিক অর্থনীতির মধ্য দিয়ে ফিল্টার হয়ে যাচ্ছে। কে সামনে আসবে, কে হারিয়ে যাবে, কোন পোস্ট ভাইরাল হবে, কোন বক্তব্য “অপ্রাসঙ্গিক” হয়ে পড়বে—এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় মানুষের হাতে থাকে না; থাকে মেশিন-লজিকের হাতে। এখানেই সোশ্যাল মিডিয়া আর শুধু “যোগাযোগের মাধ্যম” নয়। এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অবকাঠামো।
মেটা, ইউটিউব, এক্স— সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে আমরা সাদা চোখে নিরপেক্ষ প্রযুক্তি হিসেবে ভাবতে ভালোবাসি। কিন্তু নিউ মিডিয়া স্টাডিজ আমাদের শেখায়, কোনো প্ল্যাটফর্ম নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব ডিজাইন আছে, নিজস্ব ব্যবসায়িক মডেল আছে, নিজস্ব লাভের হিসাব আছে। আর সেই হিসাবের কেন্দ্রে আছে এনগেজমেন্ট—কে কতক্ষণ স্ক্রিনে থাকলো, কে কতবার রিঅ্যাক্ট করলো, কে কমেন্টে ঝাঁপিয়ে পড়লো, কে রেগে শেয়ার করলো। তাই মজার বেড়ালের ভিডিও কিংবা রাজনৈতিক বিদ্বেষ—দুটোকেই এসব প্লাটফর্ম একই লজিক মাপে - সেটা হলো অ্যাটেনশন।
সমস্যা হলো, রাজনৈতিক যোগাযোগে অ্যাটেনশন সবসময় নির্দোষ নয়।
ভয়, ঘৃণা, ক্ষোভ, ধর্মীয় উত্তেজনা, জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন—এসব কনটেন্ট সাধারণত দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আর যত বেশি প্রতিক্রিয়া, তত বেশি দৃশ্যমানতা। ফলে রাজনৈতিক ভাষা ধীরে ধীরে যুক্তি থেকে আবেগে, বিতর্ক থেকে চিৎকারে, মতভেদ থেকে শত্রু-নির্মাণে সরে যায়।
এই অবস্থায় জনপরিসর আর শান্ত আলোচনার জায়গা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্র—যেখানে সত্যের চেয়ে দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তির চেয়ে ভাইরালিটি গুরুত্বপূর্ণ, আর নীতির চেয়ে ন্যারেটিভ কন্ট্রোল গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনাতেও এই সংকট স্পষ্ট।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ৫ই জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনায় বলেন, সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার দেশের রাজনীতিকে বিপজ্জনক অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার বক্তব্যের মূল উদ্বেগ ছিল—অনলাইনে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এমনভাবে অপপ্রচার, হেয় প্রচার ও বুলিং করা হচ্ছে, যাতে রাজনীতির সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ বক্তব্যকে শুধু দলীয় অভিযোগ হিসেবে পড়লে ভুল হবে। বরং এটি বড় একটি রাজনৈতিক যোগাযোগ-সংকটের স্থানীয় প্রকাশ। কারণ আজকের অনলাইন অপপ্রচার অনেক সময় স্বতঃস্ফূর্ত নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ট্রল নেটওয়ার্ক, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, বুস্টেড কনটেন্ট, মিম-রাজনীতি, ক্লিপ-কাটিং, অর্ধসত্য, স্ক্রিনশট কালচার—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে “কেউ কী বলেছে” তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে “মানুষ কীভাবে তা অনুভব করছে”। এটাই পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনের নতুন বাস্তবতা: পলিটিক্স অব পারসেপশন।
এখন রাজনীতিবিদকে হারাতে সবসময় ভোটে হারানো লাগে না। তাকে আগে ফিডে হারানো হয়, মিমে হারানো হয়, চরিত্রে হারানো হয়, ট্রেন্ডে হারানো হয়। একবার যদি কোনো ব্যক্তি বা দলকে অনলাইনে ‘ঘৃণার বস্তু’ বানানো যায়, তাহলে বাস্তব রাজনৈতিক মঞ্চেও তার অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। এভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করতেও পারে, আবার তা ধ্বংসও করতে পারে।
ব্রাজিলের ২০১৮ সালের নির্বাচন এই প্রক্রিয়ার বড় উদাহরণ। সেখানে হোয়াটসঅ্যাপ শুধু মেসেজিং অ্যাপ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল ছায়া-প্রচারণার নেটওয়ার্ক। হাজার হাজার গ্রুপ, ফরওয়ার্ডেড কনটেন্ট, মিথ্যা ছবি, আবেগী জাতীয়তাবাদী ভাষা এবং বিরোধী পক্ষকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর বয়ান—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ডিজিটাল বাস্তবতা।
গবেষকরা একে ‘ডিজিটাল অ্যাস্ট্রোটার্ফিক’ বলছেন—যেখানে কৃত্রিমভাবে এমন একটা আবহ তৈরি করা হয় যেন জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একদিকে ঝুঁকে গেছে। মানে, জনমত সবসময় নিচ থেকে উঠে আসে না; কখনো কখনো সেটাকে ওপর থেকে ‘নিচের আওয়াজ’ হিসেবে সাজিয়ে দেওয়া হয়।
ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। রদ্রিগোর উত্থানকে অনেক গবেষক ‘সোশাল মিডিয়া প্রেসেডেন্সি’ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। ফেসবুক সেখানে শুধু প্রচারণার মাধ্যম ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক অনুভূতি তৈরির কারখানা।
ট্রল আর্মি, ফেক অ্যাকাউন্ট, মাইক্রো-ইনফ্লুয়েন্সার, হাইপার-পার্টিজান পেজ — এসবের মাধ্যমে একদিকে নেতার জনপ্রিয়তা বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে সমালোচক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানো হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, ডিজিটাল আক্রমণ অনেক সময় বাস্তব জীবনের ভয় তৈরি করে। অনলাইন হুমকি অফলাইন নীরবতা তৈরি করে। মানুষ কথা বলা বন্ধ করে। সাংবাদিক প্রশ্ন কম করে। নাগরিকরা রাজনৈতিক মত প্রকাশে সতর্ক হয়। আর এভাবেই সেন্সরশিপ কখনো কখনো আইন ছাড়াই কাজ করতে শুরু করে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেও সোশ্যাল মিডিয়া দ্বিমুখী চরিত্র নিয়ে হাজির।
একদিকে এটি প্রতিবাদ, সংগঠন ও বিকল্প মতপ্রকাশের জায়গা; অন্যদিকে এটি নজরদারি, মনিটরিং এবং রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার।
মিশর, সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অনেক সময় মনিটর করে জনপরিসরকে। সেখানে নাগরিক কথা বলে, কিন্তু জানে তাকে দেখা হচ্ছে।
এই ‘দেখা হচ্ছে’ অনুভূতিটাই রাজনৈতিক আচরণ বদলে দেয়। এটাই নজরদারি রাষ্ট্রের নতুন রূপ।
আগে নজরদারি মানে ছিল ক্যামেরা, গোয়েন্দা, ফোন-ট্যাপ। এখন নজরদারি মানে ডেটা প্যাটার্ন, লোকেশন হিস্ট্রি, সার্চ বিহেভিয়ার, লাইক, শেয়ার, কমেন্ট, গ্রুপ অ্যাকটিভিটি। আপনি কী বললেন শুধু তা নয়; আপনি কী দেখলেন, কোথায় থামলেন, কীসে রাগলেন, কোন ভিডিও শেষ পর্যন্ত দেখলেন— সবই রাজনৈতিকভাবে মূল্যবান ডেটা।
অধ্যাপক সুসানা যুবফ যাকে বলেছেন সারভেইল্যান্স ক্যাপিটালাজিম— মানুষের অভিজ্ঞতাকে ডেটায় রূপান্তর করে ভবিষ্যত আচরণের পূর্বাভাস ও প্রভাব তৈরির অর্থনীতি। রাজনীতির সঙ্গে যখন এই অর্থনীতি মিশে যায়, তখন ‘ভোটদাতা’ থাকে না; সে হয়ে ওঠে ‘ভোট ডেটা’। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা যায় এমন ডিজিটাল সত্তা।
এখানে অ্যালগরিদমের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালগরিদম সরাসরি বলে না, ‘এই দলকে ভোট দাও’। বরং সে বলে, ‘এই ভিডিওটা দেখো’, ‘এই রাগটা অনুভব করো’, ‘এই শত্রুকে চিনে রাখো’, ‘এই ভয়টা তোমার নিজের ভয়’। এভাবে রাজনৈতিক মনোভাব একদিনে বদলায় না; ধীরে ধীরে বদলায়। স্ক্রল করতে করতে বদলায়। রিলস দেখতে দেখতে বদলায়। একদিন দেখবেন, আপনি কোনো বিষয় নিয়ে আগে যেভাবে ভাবতেন, এখন আর সেভাবে ভাবছেন না—কিন্তু কখন বদলালেন, নিজেও জানেন না।
গ্লোবাল সাউথে এই সংকট আরও জটিল। কারণ এখানে ঐতিহ্যগত গণমাধ্যম অনেক সময় রাজনৈতিক বা করপোরেট প্রভাবাধীন। ফলে মানুষ বিকল্প তথ্যের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ঝোঁকে। কিন্তু সেই বিকল্প ক্ষেত্র আবার হয়ে ওঠে মিসইনফরমেশন, গুজব, ধর্মীয় উত্তেজনা, পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক ম্যানিপুলেশনের জায়গা।
ডিজিটাল সাক্ষরতার অসমতাও এখানে বড় ফ্যাক্টর। সবাই স্মার্টফোন ব্যবহার করে, কিন্তু সবাই তথ্য যাচাই করতে পারে না। সবাই ভিডিও দেখে, কিন্তু সবাই বুঝতে পারে না ভিডিওটি কাটা, সম্পাদিত, প্রাসঙ্গিক নাকি বিভ্রান্তিকর। সবাই স্ক্রিনশট বিশ্বাস করে, কিন্তু সবাই জানে না স্ক্রিনশটও বানানো যায়। এই ফাঁকটাই রাজনৈতিক ম্যানিপুলেশনের সবচেয়ে বড় সুযোগ।
আরেকটি বিষয় হলো পরিচয়-রাজনীতি। ধর্ম, জাতি, ভাষা, অঞ্চল, শ্রেণি—এসব পরিচয়কে ডিজিটাল কনটেন্টে রূপান্তর করা খুব সহজ। একটি আবেগী ক্যাপশন, একটি পুরনো ছবি, একটি ভুল অনুবাদ, একটি ‘তারা বনাম আমরা’ ফ্রেম—ব্যস, রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি। অ্যালগরিদম এই উত্তেজনাকে থামায় না; অনেক সময় আরও ছড়িয়ে দেয়, কারণ উত্তেজনাই এনগেজমেন্ট আনে।
তাহলে প্রশ্ন হলো— এই পরিস্থিতিতে জনপরিসর কোথায় দাঁড়াচ্ছে?
হাবেরমাস যে ‘জনপরিসর’-এর কথা বলেছিলেন, সেখানে নাগরিকরা যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মত গঠন করবে। কিন্তু আজকের ডিজিটাল জনপরিসরে যুক্তি অনেক সময় অ্যালগরিদমিক শব্দের নিচে চাপা পড়ে। মানুষ যুক্তি শুনতে আসে না; আসে নিজের বিশ্বাসের কনফার্মেশন নিতে। একে বলা যায় ইকো চেম্বার পলিটিক্স— নিজের মতো মানুষের মধ্যে থেকে নিজের মতকেই আরও শক্ত করে বিশ্বাস করা।
এর সঙ্গে যোগ হয় আউটরেইজ ইকোনমি বা রাগের অর্থনীতি। আপনি যত রাগবেন, তত কমেন্ট করবেন। যত কমেন্ট করবেন, তত পোস্ট উঠবে। যত পোস্ট উঠবে, তত মানুষ দেখবে। ফলে প্ল্যাটফর্মের লাভ, রাজনৈতিক পক্ষের লাভ, কিন্তু গণতন্ত্রের ক্ষতি।
এই জায়গাতেই ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি সবসময় পুরনো দিনের ফ্যাসিবাদের মতো ইউনিফর্ম, পতাকা, মিছিল বা সরাসরি দমন নিয়ে হাজির হয় না। এটি আসে ব্যক্তিগত পছন্দের ভাষায়, ট্রেন্ডিং টপিকের ছদ্মবেশে, ‘জনগণ যা বলছে’ এই দাবির আড়ালে। এটি বলে, ‘আমরা তো শুধু প্ল্যাটফর্ম।” কিন্তু বাস্তবে প্ল্যাটফর্মই অনেক সময় ঠিক করে দেয় কে দৃশ্যমান হবে, কোন আবেগ ছড়াবে, কোন ভাষা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
তাই আজকের রাজনৈতিক প্রশ্ন শুধু ‘কে ক্ষমতায়’ নয়। প্রশ্ন হলো— ‘ক্ষমতা কীভাবে কাজ করছে’? রাষ্ট্র কি নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করছে? নাকি প্ল্যাটফর্ম নাগরিকের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে? নাকি রাজনৈতিক শক্তি প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে আবেগের বাজার বানাচ্ছে? নাকি তিনটিই একসঙ্গে ঘটছে?
এই তিনটির মিলিত জায়গাতেই তৈরি হয় নতুন ক্ষমতা-জোট: স্টেট-প্ল্যাটফর্ম-পার্টি নেক্সাস। এই জোট সবসময় প্রকাশ্য নয়। অনেক সময় এর কোনো অফিস নেই, কোনো সাইনবোর্ড নেই, কোনো সরকারি ঘোষণা নেই। কিন্তু সর্বভূতে বিরাজমান যারা প্রভাব সর্বত্র—নিউজফিডে, মিমে, ট্রেন্ডে, ইউটিউব সাজেশনে, কমেন্ট সেকশনের বিষাক্ত ভাষায়।
নাগরিক ভাবে, সে স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছে। কিন্তু তার সামনে কোন তথ্য এসেছে, কোন তথ্য আসেনি, কোন রাগ তাকে দেখানো হয়েছে, কোন ভয় তাকে শেখানো হয়েছে—এসবের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ খুব সীমিত।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্ন আরও জরুরি। কারণ এখানে রাজনৈতিক অবিশ্বাস আগে থেকেই প্রবল। দলীয় মেরুকরণ, গণমাধ্যমের প্রতি সন্দেহ, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, নির্বাচনী উত্তেজনা—এসবের সঙ্গে যদি অ্যালগরিদমিক অপপ্রচার যুক্ত হয়, তাহলে জনপরিসর আরও অস্থির হয়ে ওঠে। তখন রাজনীতি আর সমাধানের ভাষা হারায়; হয়ে ওঠে সন্দেহ, গুজব ও ঘৃণার ঘূর্ণি।
তবে এর মানে এই নয় যে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু ক্ষতির জায়গা। এটি এখনও নাগরিক কণ্ঠের জায়গা, বিকল্প সংবাদপ্রবাহের জায়গা, রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিবাদের জায়গা, প্রান্তিক মানুষের দৃশ্যমানতার জায়গা।
সমস্যা প্রযুক্তি নয়; সমস্যা প্রযুক্তির ওপর গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাব। তাই সমাধানও শুধু ‘সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করো’ হতে পারে না। বরং দরকার প্ল্যাটফর্ম স্বচ্ছতা, অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের স্পষ্ট নিয়ম, সংগঠিত অপপ্রচার শনাক্তকরণ, ডিজিটাল সাক্ষরতা, স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং এবং নাগরিকদের তথ্য-সচেতনতা।
সবচেয়ে বড় কথা, দরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন—যেখানে বিরোধী মানেই শত্রু নয়, সমালোচনা মানেই ষড়যন্ত্র নয়, আর ভাইরাল মানেই সত্য নয়।
শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল জনপরিসর আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক পরীক্ষাগুলোর একটি। আমরা কি এটাকে নাগরিক আলোচনার জায়গা বানাব, নাকি অ্যালগরিদমিক শাসনের খেলাঘর হতে দেব?
কারণ আগামী দিনের রাজনীতি শুধু সংসদে, রাস্তায় বা টেলিভিশনের পর্দায় নির্ধারিত হবে না। তা নির্ধারিত হবে আমাদের ফোনের ভেতরেও—যেখানে প্রতিটি লাইক, প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি স্ক্রল হয়তো নীরবে লিখে দিচ্ছে ক্ষমতার নতুন ব্যাকরণ।
প্রশ্নটা তাই খুব সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর: আমরা কি সত্যিই স্ক্রল করছি— নাকি আমাদের দিয়েই ইতিহাস স্ক্রল করানো হচ্ছে?
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[মতামত লেখকের নিজস্ব]



