মিরপুরে ক্লিনিক ও স্টুডিওতে হামলা-লুটপাট, ৪৮ ঘণ্টায় দুই ঘটনা কী বার্তা দিচ্ছে
রাজধানী ঢাকায় ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে আলোচিত দুই ঘটনা। মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে শত শত মানুষের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। এরপর ইসিবি চত্বরে গোলাগুলি, সশস্ত্র হামলা, স্টুডিয়ো ভাঙচুর ও লুটপাট। এক ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে ওসি প্রত্যাহার। অন্য ঘটনায়ও প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে। জমি ও রাজনৈতিক বিরোধের আড়ালে প্রকাশ্যে এমন তাণ্ডব কি মবতন্ত্রের নতুন বার্তা?
দিপু সিকদার
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএমআপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০২ পিএম
মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে শত শত মানুষের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। এরপর ইসিবি চত্বরে গোলাগুলি, সশস্ত্র হামলা, স্টুডিয়ো ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।
কাছাকাছি সময়ে রাজধানীর দুটি ঘটনায় সামনে এসেছে একই ধরনের আতঙ্কের চিত্র। কোথাও শত শত মানুষ হামলায় অংশ নিচ্ছে, কোথাও সশস্ত্র লোকজন গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঢুকে পড়ছে আবাসিক এলাকায়।
রাজধানীর বুকেই যদি এমন প্রকাশ্য তাণ্ডব ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়- উঠছে এমন প্রশ্নও।
বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুরের শাহআলী এলাকায় রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ঘটনার পর প্রত্যাহার করা হয়েছে থানার ওসিকে, দায়ের হয়েছে মামলা, গ্রেপ্তারও করা হয়েছে কয়েকজনকে।
কিন্তু হামলার নেপথ্যে জমি নিয়ে বিরোধ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সংঘবদ্ধ শক্তির ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার রাতে ইসিবি চত্বরের মানকদিতে আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গোলাগুলির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সেখানে হামলার শিকার হয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা।
পরপর এমন দুটি ঘটনায় সামনে এসেছে কয়েকটি প্রশ্ন।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে এত বড় জমায়েত ও সশস্ত্র তাণ্ডব ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা সক্ষম?
জমি, দখল কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের সমাধানে আইনের বদলে সংঘবদ্ধ শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা কি নতুন কোনো বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে?
পুলিশের উপস্থিতিতেই রাড্ডায় হামলা
দীর্ঘদিন ধরে নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে মিরপুর শাহ আলী থানা এলাকার মাজার রোডে অবস্থিত রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি।
১৯৭৪ সালে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির এই কেন্দ্রটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত রাড্ডা নামে।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হঠাৎ সেখানে হামলা চালায় দুই শতাধিক মানুষ।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। পাশাপাশি লুট করে নিয়ে যায় টিকা, ভ্যাকসিন, ওষুধ, জেনারেটর, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, এসি, ফ্রিজ, নগদ টাকা ও আসবাবপত্র।
দুই নিরাপত্তারক্ষীকে জিম্মি করা হয়। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা স্থাপনা। পরে সেখানে ঝোলানো হয় সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের ব্যানার।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে না চাইছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, হামলা ও লুটপাটকারীরা মুখোশ পরে এসেছিলৈন।
স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
স্থানীয় একজন নারী প্রশ্ন তোলেন, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে।
রাড্ডার চৌহদ্দির একটি সাইনবোর্ডে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ ও রেজিস্ট্রির ভিত্তিতে ১০ কাঠা জমির মালিক হিসাবে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের নাম উল্লেখ রয়েছে।
তবে রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আক্তারের দাবি, ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ওই জমি ব্যবহার করে আসছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতেই বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিলো জমিটি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চুক্তি নবায়নও হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জমি নিয়ে আগে থেকেই মামলা-পালটা মামলা ছিলো বলেও দাবি করেছে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ।
জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে বিরোধ থাকলে সমাধানের পথ আদালত ও আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু শত শত মানুষ নিয়ে হামলা, স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মালামাল লুটের ঘটনা প্রশ্ন উঠছে সাধারণের মনে।
হামলায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আক্তার।
তিনি বলেন, শিশুর নিয়মিত টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
তার দাবি, হামলা ও ভাঙচুরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার পর সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু হলেও কর্মী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়েছে।
ঘটনার পর শাহআলী থানায় দুই থেকে তিনশ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েকজনকে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপরই প্রত্যাহার করা হয়েছে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে।
রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্ব অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, গত ২৫এ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সংঘটিত ওই ঘটনায় শাহআলী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হচ্ছে।
মন্ত্রীর ভাষ্য আমলে নিলে হামলাকারীদের পাশাপাশি এখন পুলিশের ভূমিকাও তদন্তের মুখে পড়েছে।
রাড্ডায় হামলার ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে দায়ী করছে দলের আরেক পক্ষ। তবে ওই অভিযোগকে নিজের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে ঘটনাটিকে ‘মবতন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যাই থাকুক, এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানোর সুযোগ নেই।
পালটাপালটি অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক উত্তেজনাও নতুন করে সামনে এসেছে।
রাড্ডার রেশ না কাটতেই ইসিবিতে তাণ্ডব
রাড্ডার ঘটনার মাত্র অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়।
সেখানকার হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েকটি পিকআপে করে শতাধিক লোক যায় সেখানে। তাদের হাতে ছিলো ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা। । গুলি করতে করতে তারা প্রকল্প এলাকায় ঢুকে পড়ে।
সালমান মুক্তাদির জানান, তার স্টুডিও থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে তার কাজও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন। যদিও সালমানের চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলার সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনাতেও হামলা ও লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইসিবির ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে জমির দখল ও পালটা দখলকে কেন্দ্র করেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।
ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে গ্রেপ্তার হওয়া ৩ জনকে কারাগারে পাঠিয়ে বুধবার রিমান্ড শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।
কিন্তু নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছেন অন্য জায়গায়। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেই কি শতাধিক মানুষ অস্ত্র নিয়ে একটি এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে? প্রকাশ্যে গুলি ছুড়তে পারে? বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে পারে?
৪৮ ঘণ্টায় দুই ঘটনা, প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়ে
রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে ইসিবির আবাসন প্রকল্প- দুই ঘটনার ধরন আলাদা হলেও এক জায়গায় রয়েছে মিল।
আইনগত প্রক্রিয়ার বদলে সংঘবদ্ধ শক্তির হামলা ও দখলের পথ বেছে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুটি ঘটনাতেই পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে বড় সংখ্যক দুবৃত্তরা।
তাই প্রশ্ন শুধু এই দুই ঘটনার বিচার হবে কিনা, প্রশ্ন শুধু সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো রাজধানীতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এমন প্রবণতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা প্রস্তুত? রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে কেউ কি আইনের ঊর্ধ্বে চলে যাচ্ছে?
সাধারণ মানুষ যদি নিজের চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে? রাড্ডা ও ইসিবির দুই ঘটনা সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।
মিরপুরে ক্লিনিক ও স্টুডিওতে হামলা-লুটপাট, ৪৮ ঘণ্টায় দুই ঘটনা কী বার্তা দিচ্ছে
রাজধানী ঢাকায় ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে আলোচিত দুই ঘটনা। মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে শত শত মানুষের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। এরপর ইসিবি চত্বরে গোলাগুলি, সশস্ত্র হামলা, স্টুডিয়ো ভাঙচুর ও লুটপাট। এক ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে ওসি প্রত্যাহার। অন্য ঘটনায়ও প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে। জমি ও রাজনৈতিক বিরোধের আড়ালে প্রকাশ্যে এমন তাণ্ডব কি মবতন্ত্রের নতুন বার্তা?
কাছাকাছি সময়ে রাজধানীর দুটি ঘটনায় সামনে এসেছে একই ধরনের আতঙ্কের চিত্র। কোথাও শত শত মানুষ হামলায় অংশ নিচ্ছে, কোথাও সশস্ত্র লোকজন গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঢুকে পড়ছে আবাসিক এলাকায়।
রাজধানীর বুকেই যদি এমন প্রকাশ্য তাণ্ডব ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়- উঠছে এমন প্রশ্নও।
বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুরের শাহআলী এলাকায় রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ঘটনার পর প্রত্যাহার করা হয়েছে থানার ওসিকে, দায়ের হয়েছে মামলা, গ্রেপ্তারও করা হয়েছে কয়েকজনকে।
কিন্তু হামলার নেপথ্যে জমি নিয়ে বিরোধ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সংঘবদ্ধ শক্তির ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার রাতে ইসিবি চত্বরের মানকদিতে আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গোলাগুলির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সেখানে হামলার শিকার হয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা।
পরপর এমন দুটি ঘটনায় সামনে এসেছে কয়েকটি প্রশ্ন।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে এত বড় জমায়েত ও সশস্ত্র তাণ্ডব ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা সক্ষম?
জমি, দখল কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের সমাধানে আইনের বদলে সংঘবদ্ধ শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা কি নতুন কোনো বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে?
পুলিশের উপস্থিতিতেই রাড্ডায় হামলা
দীর্ঘদিন ধরে নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে মিরপুর শাহ আলী থানা এলাকার মাজার রোডে অবস্থিত রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি।
১৯৭৪ সালে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির এই কেন্দ্রটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত রাড্ডা নামে।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হঠাৎ সেখানে হামলা চালায় দুই শতাধিক মানুষ।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। পাশাপাশি লুট করে নিয়ে যায় টিকা, ভ্যাকসিন, ওষুধ, জেনারেটর, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, এসি, ফ্রিজ, নগদ টাকা ও আসবাবপত্র।
দুই নিরাপত্তারক্ষীকে জিম্মি করা হয়। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা স্থাপনা। পরে সেখানে ঝোলানো হয় সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের ব্যানার।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে না চাইছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, হামলা ও লুটপাটকারীরা মুখোশ পরে এসেছিলৈন।
স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
স্থানীয় একজন নারী প্রশ্ন তোলেন, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে।
রাড্ডার চৌহদ্দির একটি সাইনবোর্ডে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ ও রেজিস্ট্রির ভিত্তিতে ১০ কাঠা জমির মালিক হিসাবে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের নাম উল্লেখ রয়েছে।
তবে রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আক্তারের দাবি, ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ওই জমি ব্যবহার করে আসছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতেই বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিলো জমিটি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চুক্তি নবায়নও হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জমি নিয়ে আগে থেকেই মামলা-পালটা মামলা ছিলো বলেও দাবি করেছে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ।
জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে বিরোধ থাকলে সমাধানের পথ আদালত ও আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু শত শত মানুষ নিয়ে হামলা, স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মালামাল লুটের ঘটনা প্রশ্ন উঠছে সাধারণের মনে।
হামলায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আক্তার।
তিনি বলেন, শিশুর নিয়মিত টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
তার দাবি, হামলা ও ভাঙচুরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার পর সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু হলেও কর্মী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়েছে।
ঘটনার পর শাহআলী থানায় দুই থেকে তিনশ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েকজনকে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপরই প্রত্যাহার করা হয়েছে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে।
রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্ব অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, গত ২৫এ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সংঘটিত ওই ঘটনায় শাহআলী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হচ্ছে।
মন্ত্রীর ভাষ্য আমলে নিলে হামলাকারীদের পাশাপাশি এখন পুলিশের ভূমিকাও তদন্তের মুখে পড়েছে।
রাড্ডায় হামলার ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে দায়ী করছে দলের আরেক পক্ষ। তবে ওই অভিযোগকে নিজের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে ঘটনাটিকে ‘মবতন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যাই থাকুক, এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানোর সুযোগ নেই।
পালটাপালটি অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক উত্তেজনাও নতুন করে সামনে এসেছে।
রাড্ডার রেশ না কাটতেই ইসিবিতে তাণ্ডব
রাড্ডার ঘটনার মাত্র অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়।
সেখানকার হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েকটি পিকআপে করে শতাধিক লোক যায় সেখানে। তাদের হাতে ছিলো ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা। । গুলি করতে করতে তারা প্রকল্প এলাকায় ঢুকে পড়ে।
হামলায় কনটেন্ট ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয় ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও।
সালমান মুক্তাদির জানান, তার স্টুডিও থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে তার কাজও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন। যদিও সালমানের চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলার সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনাতেও হামলা ও লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইসিবির ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে জমির দখল ও পালটা দখলকে কেন্দ্র করেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।
ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে গ্রেপ্তার হওয়া ৩ জনকে কারাগারে পাঠিয়ে বুধবার রিমান্ড শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।
কিন্তু নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছেন অন্য জায়গায়। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেই কি শতাধিক মানুষ অস্ত্র নিয়ে একটি এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে? প্রকাশ্যে গুলি ছুড়তে পারে? বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে পারে?
৪৮ ঘণ্টায় দুই ঘটনা, প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়ে
রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে ইসিবির আবাসন প্রকল্প- দুই ঘটনার ধরন আলাদা হলেও এক জায়গায় রয়েছে মিল।
আইনগত প্রক্রিয়ার বদলে সংঘবদ্ধ শক্তির হামলা ও দখলের পথ বেছে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুটি ঘটনাতেই পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে বড় সংখ্যক দুবৃত্তরা।
একটিতে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার অভিযোগ, অন্যটিতে রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় সশস্ত্র লোকজনের তাণ্ডব।
তাই প্রশ্ন শুধু এই দুই ঘটনার বিচার হবে কিনা, প্রশ্ন শুধু সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো রাজধানীতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এমন প্রবণতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা প্রস্তুত? রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে কেউ কি আইনের ঊর্ধ্বে চলে যাচ্ছে?
সাধারণ মানুষ যদি নিজের চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে? রাড্ডা ও ইসিবির দুই ঘটনা সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।
বিষয়: