ভারতীয় রুপি সস্তা হচ্ছে, বাংলাদেশের শংকা কোথায়

রুপি সস্তা হচ্ছে কেন? ভারতের মতো বড় অর্থনীতির মুদ্রা টাকার বিপরীতে এতটা দুর্বল হলো কীভাবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই দরপতনের পুরো সুবিধা কি সত্যিই বাংলাদেশের ঘরে ঢুকছে, নাকি হিসাবের আরেক পাশে অপেক্ষা করছে অন্য কোনো মূল্য?

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

গত বছরের জুলাইয়ে ভারত যাওয়া বাংলাদেশি পর্যটকের পকেটে যদি ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা থাকত, রুপিতে ভাঙিয়ে তিনি পেতেন প্রায় ৮০ হাজার রুপি। ঠিক একই পরিমাণ টাকা নিয়ে তিনি যদি এ বছরের মে মাসে যেতেন, তাহলে হাতে প্রায় ৯১ হাজার রুপি। দশ মাসে বাড়তি প্রায় ১১ হাজার রুপি, অথচ তার পকেটে টাকার অঙ্কটা এক বিন্দুও বদলায়নি। 

প্রথম দেখাতে এই ব্যাপারটা শুধুই এমন মনে হতে পারে যে, রুপি সস্তা হচ্ছে, বাংলাদেশিদের লাভ। হোটেল ভাড়া ও চিকিৎসা-ঘোরাঘুরির খরচ কমছে এবং কেনাকাটায় বাড়তি স্বস্তি। ভারতে যেতে চাওয়া প্রতিটি বাংলাদেশি এই হিসাবটাই করছেন।

তবে রুপির এই দরপতনের প্রভাব একমুখি না। একটি দেশের মুদ্রা যখন অন্য দেশের মুদ্রার বিপরীতে সস্তা হয়, তখন সেই একই পরিবর্তন রপ্তানিকারকের হিসাবের খাতা, আমদানিকারকের মার্জিন আর স্থানীয় উৎপাদকের প্রতিযোগিতার সমীকরণেও ঢুকে পড়ে, নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে।

হিসেবটা তাই অতটা সহজ নয়। রুপি সস্তা হচ্ছে কেন? ভারতের মতো বড় অর্থনীতির মুদ্রা টাকার বিপরীতে এতটা দুর্বল হলো কীভাবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই দরপতনের পুরো সুবিধা কি সত্যিই বাংলাদেশের ঘরে ঢুকছে, নাকি হিসাবের আরেক পাশে অপেক্ষা করছে অন্য কোনো মূল্য?  

এক টাকায় কত রুপি বেশি পাওয়া যাচ্ছে এখন

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিময় হার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩রা জুলাই ১ ভারতীয় রুপির মূল্য ছিল ১ টাকা ৪৪ পয়সা। ২০২৬ সালের ২১এ মে তা নেমে আসে ১ টাকা ২৬ পয়সায়।

অর্থাৎ ১১ মাসের কিছু কম সময়ে এক রুপির মূল্য কমেছে ১৮ পয়সা। শতাংশের হিসাবে পতন প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই পরিবর্তনের প্রভাব বোঝা যায় একটি সহজ হিসাবেই। 

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে পাওয়া যেত প্রায় ৮০ হাজার রুপি।

৭৯ হাজার ৮৬১ রুপি। ১ টাকা ২৬ পয়সা দরে একই টাকা ভাঙালে পাওয়া যেত প্রায় ৯১ হাজার ২৭০ রুপি।

অর্থাৎ, বিনিময় হারের পরিবর্তন একজন বাংলাদেশির হাতে প্রায় ১১ হাজার ৪০০ রুপি বেশি তুলে দিচ্ছিলো।

তবে ২১ মে-র সেই সর্বনিম্ন দর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ১ রুপির মূল্য দাঁড়ায় ১ টাকা ২৮ পয়সা। তার মানে এখন মিলছে ৮৯ হাজার ৮৪৩ টাকা মানে প্রায় ৯০ হাজার টাকা।

অর্থাৎ মে মাসের তুলনায় রুপি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও ২০২৫ সালের জুলাইয়ের তুলনায় এখনো বেশ সস্তা।

তবে বাংলাদেশের টাকার বিপরীতে রুপির এই পরিবর্তন বুঝতে হলে শুধু টাকা-রুপির দর দেখলে হবে না। কারণ এই বিনিময় হার আসলে তৈরি হয় দুই মুদ্রার ডলারের বিপরীতে অবস্থানের পার্থক্য থেকে।

তেলের বিল বেড়েছে, তেল আমদানি বাড়েনি 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য এখনো অনেক বেশি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত আইএমএফের একটি গবেষণায় ১৩২টি দেশের ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নমুনাভুক্ত বৈশ্বিক রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৪৯ শতাংশের মূল্য ডলারে নির্ধারণ করা হয়।

ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের ডলারের প্রয়োজনও বেড়ে যায়।

ভারতের ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়।

ভারতের সরকারি পেট্রোলিয়াম প্লানিং অ্যান্ড এনালাইসিসের (পিপিএসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি-নির্ভরতা ছিল ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।

অর্থাৎ ভারতের ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আসছে।

এই নির্ভরতার কারণে তেলের আন্তর্জাতিক দাম ভারতের মুদ্রাবাজারেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। 

২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে অগাস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির বিল দাঁড়ায় ৭৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এই বিল ছিল ৫০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

বিল বেড়েছে ২৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

অথচ আমদানি করা তেলের পরিমাণ প্রায় বাড়েনি বরং কিছুটা কমেছে। 

২০২৫ সালের এপ্রিল–অগাস্টে ভারত প্রায় ১০১ দশমিক ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছিলো। ২০২৬ সালের একই সময়ে পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন।

অর্থাৎ পরিমাণ সামান্য কমলেও আমদানি ব্যয় অনেক বেড়েছে।

এর মানে, একই পরিমাণ তেল কিনতে ভারতের অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। আর সেই বাড়তি ডলারের চাহিদা রুপির ওপর চাপ তৈরি করেছে।

ঘাটতির আরেক নাম ডলারের চাহিদা

ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের আরেকটি চাপ এসেছে পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতি থেকে। 

রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) ব্যালেন্স অব পেইমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল–জুন সময়ে ভারতের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৮৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এটি ছিল ৬৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।

মার মানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

সহজ করে বললে, একটি দেশের আমদানি যখন রপ্তানির চেয়ে বেশি হয়, তখন পণ্য কেনার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনও বাড়ে। ভারতের ক্ষেত্রেও আমদানির তুলনায় রপ্তানি থেকে আসা অর্থের ঘাটতি ডলারের চাহিদা বাড়ানোর একটি কারণ।

ভরসা রাখেনি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও 

ভারতের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ বেরিয়ে যাওয়াও মুদ্রাটির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন ভারতে অর্থ আনেন, সাধারণত ডলার বা অন্য বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে রুপি কিনতে হয়। এতে রুপির চাহিদা বাড়ে। বিপরীতে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার সময় রুপি বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রায় ফিরতে হয়।

ফলে বড় অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে গেলে রুপির সরবরাহ এবং ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে।

মানিকন্ট্রোল-এর ২০এ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে সিডিএসএল-এর তথ্য দিয়ে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা নিট ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি রুপি তুলে নিয়েছেন।

অর্থাৎ, বছরের শুরু থেকেই বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ রুপির জন্য একটি চাপের জায়গা হয়ে আছে।

ডলার নিজেই শক্তিশালী হচ্ছে 

রুপির দুর্বলতার সঙ্গে ডলারের অবস্থানও জড়িত। ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেড তাদের ফেডারেল ফান্ডস রেট ০ দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫–৪ শতাংশে নিয়ে যায়।

২০২৫ সালে কয়েক দফা সুদ কমানোর পর ২০২৬ সালে এটি ছিলো ফেডের প্রথম সুদ বৃদ্ধি।

সুদের হার বাড়লে ডলারভিত্তিক সম্পদের আকর্ষণ বাড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়লে উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে।

ভারতেও এর প্রভাব দেখা যায়। ১৭ই সেপ্টেম্বর এক পর্যায়ে এক ডলারের দাম ৯৬ দশমিক ০৮ রুপিতে উঠে যায়।

রুপির ওপর চাপ কমাতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরবিআই বাজারে ডলার সরবরাহ শুরু করে।

তবে আরবিআই-এর ডেপুটি গভর্নর পুনম গুপ্তা রুপির দুর্বলতাকে একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। 

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের বৈদেশিক লেনদেনের অবস্থার উন্নতি হলে রুপি আবার স্থিতিশীল হতে পারে।

অর্থাৎ রুপির বর্তমান দুর্বলতার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। তেলের আমদানি ব্যয়, বাণিজ্য ঘাটতি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান সবগুলোই এখানে ভূমিকা রাখছে।

রুপির ওপর চাপ কমাতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরবিআই বাজারে ডলার সরবরাহ শুরু করে।

টাকার বিপরীতে রুপির ধ্বস

এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের খুঁজতে ডলারের বিপরীতে টাকা ও রুপির দর কতটা পড়েছে সে হিসাবটা বুঝতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা দুর্বল হয়েছে ০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। 

একই সময়ে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপি দুর্বল হয়েছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

অর্থাৎ, একই সময়ে রুপি ডলারের বিপরীতে যতটা মূল্য হারিয়েছে, টাকা তার তুলনায় অনেক কম হারিয়েছে।

তাই টাকার বিপরীতে রুপির বড় পতনের একটি অংশ আসলে দুই দেশের মুদ্রার ডলারের বিপরীতে ভিন্ন গতিপথের ফল।

ভ্রমণে স্বস্তি, আমদানিতে সুযোগ

রুপি দুর্বল হওয়ার সবচেয়ে সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন ভারতগামী বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীরা। শিক্ষার্থীরাও বেশ ভালোই সুবিধা পাচ্ছেন। 

কারণ একই পরিমাণ টাকা ভাঙিয়ে এখন আগের তুলনায় বেশি রুপি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ভারতে থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা, যাতায়াত বা কেনাকাটায় টাকার হিসাবে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হতে পারে।

এর পরের বড় সুবিধার জায়গা ভারত থেকে আমদানি।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিলো প্রায় ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে তা ছিল ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

তুলা, জ্বালানি ও খনিজ তেলজাত পণ্য, যানবাহন ও যন্ত্রাংশ, চাল, গম, ভুট্টা, মেশিনারি—বিভিন্ন ধরনের পণ্য আসে ভারত থেকে। তাই রুপি দুর্বল হওয়ায় ভারতীয় এসব পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব লেনদেনে রুপির বিনিময় হার সরাসরি প্রভাব ফেলে, সেখানে বাংলাদেশি আমদানিকারক সুবিধা পেতে পারেন।

তবে রুপি ১০ শতাংশ কমেছে মানেই ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে ১০ শতাংশ সস্তা হবে এমন নয়। 

আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, ডলার-রুপি বিনিময় হার, পরিবহন, শুল্ক-কর, ব্যাংকিং খরচ ও আমদানিকারকের মার্জিন, সব মিলেই বাংলাদেশে চূড়ান্ত দাম ঠিক হয়।

বাংলাদেশ ও ভারত ২০২৩ সালে কিছু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রুপিতে নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও চালু করে। এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো ডলারনির্ভর। ফলে রুপির দরপতনের সুবিধা সব আমদানিতে একইভাবে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

যে সুবিধা ভোক্তার, সেই চাপ উৎপাদকের

রুপির দুর্বলতার গল্পের অন্য দিকটা দেখা যায় রপ্তানিতে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে কোনো পণ্য গেলে রুপি দুর্বল হওয়ার কারণে ভারতীয় ক্রেতার কাছে সেই পণ্য তুলনামূলক ব্যয়বহুল মনে হতে পারে। তখন ভারতীয় ক্রেতার সামনে স্থানীয় পণ্য বা অন্য দেশের বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়ে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি হতে পারে।

একই বিষয় বাংলাদেশের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতীয় পণ্য যদি রুপির দুর্বলতার কারণে তুলনামূলক কম দামে বাংলাদেশে আসে, তাহলে ভোক্তা সুবিধা পাবেন। কিন্তু একই ধরনের পণ্য বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি করলে তাকে কম দামের ভারতীয় পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

অর্থাৎ একই রুপির পতন একদিকে বাংলাদেশি ভোক্তার জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদকের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে।

তবে এখানেও পুরো সুবিধা ভারতীয় রপ্তানিকারক বাংলাদেশি ক্রেতাকে দেবেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন, শুল্ক, কর ও অন্যান্য খরচও শেষ পর্যন্ত দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা

রুপির দরপতনের প্রভাব শুধু বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ওপরও।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য বিশ্ববাজারে ভারতের পণ্যের সঙ্গে একই ক্রেতার জন্য প্রতিযোগিতা করে। এখানে ক্রেতার সিদ্ধান্তে পণ্যের মান, সরবরাহের সক্ষমতা ও সময়ের পাশাপাশি দামও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

রুপি দুর্বল হলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। তারা চাইলে আগের মতোই রুপিতে আয় ধরে রেখে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক কম ডলারে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। আবার চাইলে একই ডলারমূল্য রেখে রুপিতে বেশি আয় করতে পারেন। অর্থাৎ বিনিময় হারের পরিবর্তন তাদের দাম নির্ধারণে বাড়তি জায়গা দিতে পারে।

ধরা যাক, একই ধরনের একটি পণ্য বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই ইউরোপের একজন ক্রেতার কাছে বিক্রি করছে। ভারতীয় রপ্তানিকারক রুপির দুর্বলতার কারণে যদি কিছুটা কম দামে পণ্য দিতে পারেন, তাহলে ক্রেতার কাছে ভারতীয় পণ্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সেই একই ক্রেতাকে ধরে রাখতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারককেও দামের বিষয়ে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে রুপি দুর্বল হলেই ভারতীয় রপ্তানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে এমন নয়। একটি পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা শুধু মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদন খরচ, তুলার মতো কাঁচামালের দাম, শ্রম ব্যয়, জ্বালানি, পরিবহন, বন্দর ও লজিস্টিকস, পণ্যের মান, সরবরাহের সময় এবং বাণিজ্যনীতিও চূড়ান্ত দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

সস্তার রুপির সরল হিসাবে ফাঁকিটা কোথায়

একদিকে ভারতের মুদ্রা দুর্বল হওয়ায় বাংলাদেশি পর্যটক, রোগী ও শিক্ষার্থীরা একই টাকায় বেশি রুপি পাচ্ছেন। ভারত থেকে কিছু পণ্য আমদানিতেও খরচ কমার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে, এই সস্তা রুপি বাংলাদেশি অর্থনীতির জন্য কিছু নতুন চাপও তৈরি করছে। 

যেমন স্থানীয় উৎপাদককে বেশি প্রতিযোগিতা করতে হতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা দামের বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।

সবমিলে তাই টাকার বিপরীতে রুপি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে বলেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সুবিধা পাচ্ছে এমন কোনো সরল হিসাব নেই।

কারণ মুদ্রার বিনিময় হার একা বাজার ঠিক করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডলারের হিসাব, আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, জ্বালানি, পরিবহন, শুল্ক-কর, উৎপাদন খরচ এবং দুই দেশের বাণিজ্যের নিজস্ব কাঠামো।

একজন বাংলাদেশি ভারতে গিয়ে একই ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় যদি আগের চেয়ে প্রায় ১০ হাজার রুপি বেশি পান, সেই সুবিধা চোখে দেখা যায়। কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতির হিসাব এতটা সরল নয়।

সেখানে প্রশ্নটা আরও বড় রুপির দুর্বলতা ভারতীয় পণ্যের দাম কতটা কমাচ্ছে, ভারতীয় রপ্তানিকারকদের কতটা বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে, আর বাংলাদেশের ব্যবসা ও ভোক্তার কাছে তার প্রভাব কীভাবে পৌঁছাচ্ছে।

কারণ শেষ পর্যন্ত মুদ্রার দরপতনের আসল প্রভাব বোঝা যায় মানিব্যাগে শুধু কত রুপি বাড়লো তা দিয়ে নয়, বরং পণ্যের দাম, বাণিজ্য আর প্রতিযোগিতার মানচিত্র কতটা বদলালো সেটি দিয়ে।