যুগের প্রয়োজনে সময় বদলায়। মানুষও বদলায়। কিন্তু সময় নাকি মানুষ? কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করবে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ঈদ উৎসবের কথাই যদি বলি, সময় নাকি মানুষ? কে ঈদ উৎসবকে নিয়ন্ত্রণ করে?
ঈদ মানে কী? শুধুই কি খুশি আর আনন্দ? না, তা নয়। ঈদ মানে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, বৈষম্য দূর করার সবচেয়ে বড় আয়োজন। ঈদে নাড়ির টানে ঘরে ফিরে মানুষ। ঈদ যাত্রায় খুব যে একটা স্বস্তি থাকে তা তো নয়।
বাস, ট্রেন, লঞ্চে টিকেট পেতে কত যে ঝক্কি ঝামেলা। জীবন বাজি রেখে ট্রেনের ছাদে বসে, বাসে ঝুলে লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যায়। কেন যায়? বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হবে। প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে। বাড়ির উঠোনে বসে আড্ডা হবে। কত কথা, কত স্মৃতি যে রোমন্থন হবে। পাশাপাশি ভোজন বিলাসের ব্যাপক আয়োজন তো আছেই।
এক অর্থে সারা বছরের ক্লান্তি, অবসাদ, একঘেয়েমি দূর করতেই শহরের মানুষ ঈদে গ্রামে যায়। কিন্তু ওই যে বললাম এক্ষেত্রে কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে? সময় নাকি মানুষ? কঠিন প্রশ্ন।
আমরা মানুষ হয়তো বলবো, সময়ের কী এমন স্পর্ধা যে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে? আমি নিশ্চিত এ কথা শুনে সময় হয়তো হাসবে। বলবে, আসো একটা বিতর্ক হয়ে যাক। আমি নিশ্চিত এই বিতর্কে মানুষ হেরে যাবে। কেন হারবে তার একটা ব্যাখ্যা আছে আমার কাছে।
ঈদ উপলক্ষে এই যে এত কষ্ট করে সবাই শহর ছেড়ে গ্রামে যায়, অতীতকালের মতো সবাই কি প্রিয়জনকে সময় দেয়? বাবা-মা, ভাই-বোনের সঙ্গে হয়তো সময় কাটায়। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশী, দূরের-কাছের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সবার কি দেখা হয়? হয়তো যোগাযোগ হয়, সেটা মোবাইল ফোনে। গ্রামে গিয়েও যদি আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে হয়, তাহলে নাড়ির টানে ঘরে ফেরার দরকারই বা কী? ঘর মানে যদি হয় শুধুমাত্র বাবা-মা, ভাই-বোন, তাহলে আমরা কি আত্মীয় স্বজনকে ভুলে যাবো?
অতীতকালে ঘর অর্থাৎ পরিবার মানে শুধুই মা-বাবা আর ভাই-বোন ছিল না। চাচা-চাচী, ফুফা-ফুফু, মামা-মামী, চাচাতো- মামাতো, ফুফাতো ভাইবোন সবাই পরিবারের অংশ ছিল। শহর থেকে কেউ গ্রামে গেলে তাকে বা তাদেরকে ঘিরে উৎসবের রং আরও উজ্জ্বল হতো। আত্মীয় স্বজন দেখতে আসতো। এ বাড়ি ও বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার ধুম পড়ে যেতো। ঈদের দিনটা হয়ে উঠতো সবচেয়ে বেশি আনন্দের। কুরবানির ঈদে গরিব দুঃখীর মাঝে কুরবানির মাংস বিলিয়ে দেওয়া হতো সবার আগে।
সাইকেলে চড়ে দূরের, কাছের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে কুরবানির মাংস পৌঁছে দেয়া হতো। ঈদের জামাতে তো বটেই; বাড়িতে, রাস্তায় পরিচিত-অপরিচিত যার সঙ্গেই দেখা হোক না কেন পরম আন্তরিকতায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করা ছিল ঈদ উৎসবের একটি উজ্জ্বল অংশ।
অথচ এখনকার ঈদে আন্তরিকতার সেই ছোঁয়া, স্পর্শ তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। শহরের ঈদের জামাতে অধিকাংশরাই নামাজ শেষের অপেক্ষায় থাকেন। ঈদের নামাজ শেষ হওয়া মাত্র কে কার আগে মসজিদ অথবা নামাজের মাঠ থেকে বেরিয়ে যাবেন রীতিমতো তার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। অথচ ঈদের নামাজ শেষে পরিচিত, অপরিচিত সবার সঙ্গেই কোলাকুলি করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান রয়েছে। কী শহর, কী গ্রামে এই বিধান কি আমরা মানি?
কুরবানির ঈদের কথাই যদি বলি। পশু কুরবানি করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান মানি ক’জন? কুরবানির মাংসের ক্ষেত্রে গরিব দুঃখীদের হক আগে আদায় করতে হয়। ক’জন এ ব্যাপারে আন্তরিকতা দেখাই? এমনও হয় পশু কুরবানির পর গরিব দুঃখীদের হক আদায় না করে অনেকে ডিপ ফ্রিজে কুরবানির মাংস ভরানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে যান। এটা এক ধরনের অন্যায়।
ইদানিং দেখা যায় অনেক কষ্ট করে শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার পর অনেকে বাড়ি থেকে বের হতে চান না। সারাক্ষণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ত থাকেন। তাহলে গ্রামে যাওয়ার অর্থ কী? গ্রামে গিয়ে যদি পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখাই না হয় তাহলে ঈদের প্রকৃত আনন্দ পাবেন কি?
এমন অনেককে দেখা যায় ঈদে গ্রামে গিয়ে ওইযে শোবার ঘরে ঢোকেন, আর ঘর থেকে বের হতে চান না। আত্মীয়-স্বজন দেখা করতে এলেও অনেকে এড়িয়ে চলেন। এটা ঈদ উৎসবের আদর্শের সঙ্গে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
তবে হ্যাঁ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে ঈদ উৎসবের রঙ পাল্টেছে এটা ঠিক। অতীতকালে ঈদ উৎসবে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতো সিনেমা। প্রতি ঈদে একাধিক নতুন সিনেমা মুক্তি পেতো। তখনকার দিনে টেলিভিশন সবার ড্রয়িং রুমে ছিল না। ফলে সিনেমা দেখা ছিলো ঈদের দিনের অন্যতম আকর্ষণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে সিনেমা এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। সিনেমা দেখতে চাইলে হলেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। মুঠোফোনই এখন এক একটি সিনেমা হল। কাজেই অতীতকালের সঙ্গে বর্তমান কালের তুলনা করা ঠিক হবে না। তাই বলে ঈদের মূল আদর্শ থেকে আমরা কি সরে যাবো? ঈদের আদর্শটা আসলে কী? ঈদ খুশির দিন। ধনী গরিবের মধ্যে বৈষম্য দূর করার দিন। ঈদে পরিবারের বন্ধন সবচেয়ে বেশি দৃঢ় হয়। হিংসা, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা এবং বৈষম্য থেকে দূরে থাকার প্রেরণা জোগায় পবিত্র ঈদ। প্রকৃত অর্থে ঈদে আমরা কি এমন আন্তরিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছি?
আবারও বলি সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময় মানুষকে বদলে দেয়, পরিবেশ পরিস্থিতিও বদলে দেয়। সময়ের প্রভাবেই মানুষের আচার-আচরণেও পরিবর্তন ঘটে। অতীতে ঈদে একটা পারিবারিক সংস্কৃতি চালু ছিল। বড়রা ছোটদেরকে স্নেহ করতেন, ছোটরা বড়দেরকে শ্রদ্ধা, সম্মান করতো। ঈদে ছোটরা বড়দের পায়ে সালাম করতো। দোয়া নিতো। বড়রা ছোটদেরকে বুকে টেনে নিয়ে সাধ্যমতো ঈদি (টাকা) উপহার দিতো।
বর্তমানে এমনটা আর দেখা যায় না। একটা প্রজন্ম হঠাৎ করেই যেন বদলে গেছে। বড়দের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ভক্তি নেই বললেই চলে। একটা সময় বাবা-মায়ের পাশাপাশি চাচা-চাচী, চাচাতো ভাই-বোনকেও ভাবা হতো পরিবারের অংশ।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বর্তমান সময়ে বাবা-মাকেও অনেকে পরিবারের অংশ ভাবে না। বংশ লতিকা বলে একটা কথা আছে। দাদা-দাদী, নানা-নানীর নাম হয়তো ছেলে-মেয়েরা জানে। কিন্তু দাদা-দাদী, নানা-নানীর বাবা-মায়ের নাম তাদের কেউই বলতে পারবে না। পরিবারের বিচ্ছিন্নতাই এজন্য দায়ী।
শুরুতে প্রশ্ন তুলেছিলাম সময় নাকি মানুষ, কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে? সময়ের পক্ষেই ভোট বেশি পড়বে। তাহলে কি মানুষ সময়ের দাস? মানুষ কেন সময়ের দাস হবে?
এই ঈদে আসুন না আমরা নিজেদেরকে বদলাই। সময় হয়তো ‘না না’ করে উঠবে। ‘করো কী? করো কী?’ বলে চোখ রাঙাবে। আপনাকে হয়তো বলবে ঈদে বাড়ি গেছো, স্বস্তিতে সময় কাটানোর জন্য। সেটাই করো। ঘুম আর খাওয়া। ফেসবুক তো আছেই। টেলিভিশনে ঈদের অনুষ্ঠান দেখো। বাড়তি ঝামেলায় যেও না...
প্রিয় পাঠক, আবারও বলছি আসুন না নিজেদেরকে বদলাই। সময় তার কথা বলবে। আমরা মানুষ নিজেদের কথা বলি। শেকড়ের টানেই তো ঈদে এত কষ্ট করে গ্রামে যাই আমরা। শেকড়টা আসলে কী? বাবা-মা ভাই-বোন তো আছেই। শেকড় জুড়ে আরও আছেন চাচা-চাচী, চাচাতো ভাইবোন, খালা, খালু, ফুফা, ফুফু তাদের ছেলে-মেয়ে, প্রতিবেশী, কাছের, দূরের আত্মীয় স্বজন। তাদের সঙ্গে দেখা করুন।
সম্ভব হলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে পারেন। নাম দিলেন স্বজন সমাবেশ অথবা ঈদ পুনর্মিলনী। গ্রামে যে স্কুলে পড়েছেন নিশ্চয়ই সেই স্কুলের প্রিয় শিক্ষক অথবা শিক্ষিকা বেঁচে আছেন। তাদের সঙ্গে দেখা করে দোয়া নিন। দেখবেন তারা খুব খুশি হবে। আপনার বাড়ির পাশেই একটি পাঠাগার আছে। পাঠাগারের বর্তমান অবস্থা কেমন এ ব্যাপারে খোঁজ নিন। বই পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিন। সম্ভব হলে গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে আনুষ্ঠানিক ভাবে তদেরকে বৃত্তি দেয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন। এই অনুষ্ঠানে এলাকার একজন বিশিষ্ট মানুষ, তিনি হতে পারেন শিক্ষক অথবা সমাজকর্মী, তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সংবর্ধনা দিতে পারেন। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে কিছু গান বাজনারও আয়োজন থাকতে পারে।
ভাবুন তো একবার যদি এমনটা করতে পারেন তাহলে আপনার ঈদের খুশিটা কোন স্তরে পৌঁছে যাবে?
এবার ভাবুন, ঈদে বাড়ি গিয়ে ঘুম আর খাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানোই আনন্দের নাকি গ্রামের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের আনন্দকে ভাগাভাগি করা আনন্দের?
ও হ্যাঁ, জানেন নিশ্চয়ই এই কুরবানির ঈদে আপনার কুরবানির পশুর মাংসের একটা ভাগ রয়েছে গরিব অসহায় মানুষদের জন্য। তাদের হক আদায় করবেন আশা করি।
শুভ কামনা সকলের জন্য। ঈদ মোবারক।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার; সম্পাদক, আনন্দ আলো।



