আটটি কুকুর ছানাকে হত্যা করে কারাগারে এক নারী

এই ঘটনায় আইনের যে ধারায় মামলা হয়েছে সেখানে পথকুকুরদের হত্যা বা নির্যাতনের ব্যাপারটি উল্লেখ নেই। ফলে অভিযুক্ত ওই নারীকে ঠিক কী শাস্তি দিতে পারবে আদালত সেটা স্পষ্ট নয়। এর আগে ঢাকায় একটি পথকুকুর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের ক্ষেত্রেও আইনের এই সীমাবদ্ধতার কারণে ভুক্তভোগীদের পক্ষে রায় দিতে পারেনি আদালত।

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৮ পিএম

মাত্র দিন কয়েক আগে জন্ম নেয়া আট বাচ্চাকে খুঁজে না পেয়ে রাতভর আহাজারি মায়ের। ওলানভর্তি দুধ নিয়ে ব্যথায় ছটছট। সন্তান হারিয়ে মা কুকুরের ছোটাছুটি এবং আর্তনাদের এমন ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার হয়েছে অসংখ্যবার। 

পরে জানা গেল ৩০এ অক্টোবর রাতের কোনো এক সময় কুকুর ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন এক নারী। অনেক খোঁজের পর অভিযুক্ত ওই নারীর ছেলের মুখ থেকেই মিলেছে কুকুর ছানাগুলোর সন্ধান। তবে ততক্ষণে সব শেষ। 

পাবনার ঈশ্বরদীতে ঘটা সেই নির্মম ঘটনায় মামলা দায়ের হলে ২রা ডিসেম্বর রাতেই অভিযুক্ত আসামি নিশি রহমানকে (৩৮) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরআগে ওই দিন রাত সাড়ে এগারোটার দিকে মামলাটি দায়ের করেন ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন। 

এ বিষয়ে আকলিমা খাতুন বলেন, “এটি একটি বাজে দৃষ্টান্ত। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত সমালোচিত হয়েছে। তাছাড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দায়িত্ব রয়েছে। এ জন্য মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে আমি বাদি হয়ে থানায় এজাহার দায়ের করি।”

পেনাল কোড এর ৪২৯ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) প্রণব কুমার।

তিনি বলেন, “পেনাল কোডের ৪২৯ ধারায় ক্ষুদ্র কৃষক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নের স্ত্রী নিশি রহমানকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলার পর গতকাল রাতেই অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উনি এখন আমাদের হেফাজতে রয়েছেন। তবে আজকেই আমরা তাকে আদালতে সোপর্দ করব।”

এদিকে কুকুর ছানাগুলো সম্পর্কে অভিযুক্ত নারীর সন্তানই সন্ধান জানিয়েছে বলে নিশ্চিত করেন ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, “কুকুর ছানাগুলোকে যখন খোঁজা হচ্ছিল তখন ওনার ছোট ছেলেই জানায় যে তার মা কুকুরগুলোকে বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দিয়েছেন। এরপর পার্শ্ববর্তী পুকুর থেকে বস্তাসহ কুকুর ছানাগুলোকে উদ্ধার করা হয়। ততক্ষণে সেগুলো মারা গেছে।”

তিনি আরও জানান প্রাথমিকভাবে ১লা ডিসেম্বরই উপজেলা প্রশাসন থেকে অভিযুক্ত নিশি রহমান এর স্বামী ঈশ্বরদী উপজেলা পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নকে বাসভবন ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার ২রা ডিসেম্বর, তিনি পরিবার নিয়ে সরকারি বাসভবন ছেড়ে ভাড়া বাসায় উঠেন।  

“ঘটনা সম্পর্কে হাসানুর রহমান নয়নকে ডেকে পাঠানো হলে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান, তার স্ত্রী এটা করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না,” বলেন মো. মনিরুজ্জামান।

প্রাণী হত্যার শাস্তি

আটটি-কুকুর-ছানাকে

পেনাল কোড ৪২৯ একটি দণ্ডবিধি ধারা যা নির্দিষ্ট ধরনের গবাদি পশু ও অন্যান্য মূল্যবান পশু হত্যা, বিষ প্রয়োগ বা বিকলাঙ্গ করার অপরাধের জন্য শাস্তি প্রদান করে। 

এই ধারায় উল্লিখিত পশুদের মধ্যে রয়েছে হাতি, উট, ঘোড়া, গাধা, মহিষ, ষাঁড় বা গরু। অন্য কোনো পশুর ক্ষেত্রে যদি তার মূল্য ৫০ টাকা বা তার বেশি হয়, তবে এই ধারা প্রযোজ্য হবে। 

এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।

তবে যে ধারায় এই মামলাটি হয়েছে সেখানে পথকুকুর বা বিড়ালের ক্ষেত্রে কী শাস্তি হবে সেটা আলাদা করে উল্লেখ নেই।

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকার মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটিতে পথকুকুর ও বিড়ালকে বিষ প্রয়োগে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। ওই সময়ে একই ধারায় একটি মামলা দায়ের হয়।

সেই মামলার আইনজীবী জাকির হোসেন বলেন, “এই ধারায় মামলার ক্ষেত্রে প্রধান যে সমস্যা তা হলো- পুলিশ এই মামলাগুলো গুরুত্ব দিতে চায় না। প্রায়ই অবহেলা করা হয়। তবে মামলা যদি হয় এবং ঘটনা সত্য হলে, এ ধারায় শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।”

“তবে এ ধারার মামলায় পথকুকুর বা বিড়ালের ক্ষেত্রে কী শাস্তি হবে, সেটা আলাদা করে উল্লেখ নেই। তাছাড়া রাস্তার কুকুর বা বিড়ালের মূল্য কিভাবে নির্ধারণ হবে- সেটাও বলা নেই।” 

পেনাল কোডের ৪২৯ ধারা ছাড়াও ২০১৯ সালের প্রাণিকল্যাণ আইন রয়েছে। তবে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

পাবনার ঈশ্বরদীর মামলাটিও জাকির হোসেনের সঙ্গে আলাপ করে করা হয়েছে বলে জানান এই আইনজীবী।

তিনি বলেন, “সেখানে (প্রাণিকল্যাণ আইন) মালিকবিহীন প্রাণী হত্যা করা যাবে না বলা হয়েছে। সেটা বলছে ঠিকই, কিন্তু প্রয়োগ আবার নাগরিকের কাছে দেয় নাই। প্রয়োগ করবে অধিদপ্তর।”

জাপান গার্ডেন সিটির ওই ঘটনায় তখন আদাবর থানায় অভিযোগ করেছিলেন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবী সমন্বয়ক ও অভিনেতা কাজী নওশাবা আহমেদ।

তিনি বলেন, “মামলাটি এখনও তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। অথচ এক বছর হয়ে গেছে। যখন আরেকটি ঘটনা সামনে আসল তখন আবার এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এভাবে হবে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এমন ঘটনা বারবারই ঘটতে থাকবে।”