লুঙ্গির কোচরে ৫ লাখ টাকা দেখেই হত্যার পরিকল্পনা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

জামালপুর থেকে ঢাকাগামী বাসে উঠেছিলেন ইসমাইল হোসেন। সঙ্গে ছিল জমি বিক্রির প্রায় ৫ লাখ টাকা। পথে তার কাছে থাকা টাকা দেখে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বাসের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার। পরে শ্বাসরোধে হত্যার পর তার মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে বনানী থানা পুলিশ। ঘটনায় বাসচালক সোহেল রানা, সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং হেলপার মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিমানবন্দরগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। ঘটনাস্থলে গিয়ে মুখ ও দুই হাতে স্কচটেপ পেঁচানো এবং গলায় কালো দাগ পড়ে থাকা মরদেহটি উদ্ধার হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়। পরিবারের সদস্যরা মরদেহ শনাক্ত করার নিহতের ছেলে হাসান বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ইসমাইল জামালপুরের নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রির প্রায় ৫ লাখ টাকা নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাচ্ছিলেন। তার ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বাবা না আসায় এবং পরে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে সন্দেহ হয় হাসানের।

তদন্তে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে আসে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একটি বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয় পুলিশের। পরে বাসটি শনাক্ত করে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের বাসটি জব্দ করা হয়।

এ ঘটনায় প্রথমে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং হেলপার মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গ্রেপ্তার করা হয় বাসচালক সোহেল রানাকে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে জামালপুরের দিকপাইত বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসটিতে ওঠেন ইসমাইল। পথে সুপারভাইজার ভাড়া চাইলে তিনি লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন। তখনই সুপারভাইজারের ধারণা হয়, ইসমাইলের কাছে আরও টাকা রয়েছে।

পরে বিষয়টি বাসচালককে জানানো হলে তারা মিলে টাকা লুটের পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে নামতে দেওয়া হয়নি। পথে অন্য যাত্রীদের বিভিন্ন জায়গায় নামিয়ে বাসটি প্রায় ফাঁকা করা হয়।

পুলিশের দাবি, এরপর সুপারভাইজার ও হেলপার ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। তার নাক-মুখও টেপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। পরে গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।

হত্যার পর ইসমাইলের মরদেহ বাসে করে ঢাকার দিকে নিয়ে আসা হয়। বিমানবন্দর এলাকা দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে বনানীতে নেমে বাসটি আবার কাকলী মোড় হয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠে। পরে কাকলী থেকে কুড়িলগামী অংশে ১৭৯ ও ১৮০ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি এলাকায় মরদেহ ফেলে রেখে যায় তারা।

এরপর বাসটি কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে মহাখালী বাস টার্মিনালে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বাসটি ছাড়াও দুটি গামছা, রক্তমাখা দুটি সিট কভার এবং একটি ফিচার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সাজু ওরফে লিমনের বিরুদ্ধে আগে দুটি ডাকাতি মামলা রয়েছে। বাসচালক সোহেল রানার বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি ও দুটি মাদক মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ছিলো।