মতামত

ধর্মের হেফাজত আছে, মাদ্রাসার শিশুদের হেফাজত কোথায়?

হেফাজত, বেফাক এবং বড় কওমি সংগঠনগুলোরই এখন এই সংস্কারের দাবি নিয়ে সামনে আসা উচিত। কারণ আপনি পুরো সমাজকে কীভাবে চলতে হবে শেখাতে চাইবেন, কিন্তু আপনার নিজের মাদ্রাসায় একটি শিশু নিরাপদে ঘুমাতে পারবে কি না, তার নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না, এই দ্বৈততা আর বেশিদিন টেকসই হবে না।

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

২০১৯ সালের জুনে আমি যখন প্রথম ফেইসবুকে মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন নিয়ে কথা বলা শুরু করি, তখন এসব ঘটনা এখনকার মতো নিয়মিত সংবাদে আসতো না। বরং এই নিয়ে কথা বলাটাই অনেকটা ট্যাবু ছিল। তারপরও বিভিন্ন সংবাদে একের পর এক ঘটনা চোখে পড়ছিলো। নিজের মাদ্রাসাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেও আমি জানতাম, খবরে যে কয়টি ঘটনা আসে, সমস্যাটি তার চেয়ে বড়।

প্রথমে আমি আমার জানা ও দেখা অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে লিখেছিলাম। এরপর ফেইসবুকে বলেছিলাম, কেউ যদি মাদ্রাসা বা মক্তবে যৌন নিপীড়নের কোনো অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে ভাগ করতে চান, তাহলে করতে পারেন। আমার পরিচিতদের মধ্য থেকেই বেশ কয়েকজন যোগাযোগ করেছিলেন। কেউ বলেছেন বড় হুজুর বা পরিচিত মুফতির হাতে নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা, কেউ বলেছেন শৈশবে মক্তবে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতার কথা। তাদের পরিচয় গোপন রেখে আমি সেসব ঘটনা আমার তৎকালীন ফেইসবুক আইডিতে প্রকাশ করেছিলাম।

প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ। অনলাইনে আমাকে ঘিরে গালাগালি ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছিল। এমনকি আমাকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে বড় আক্রমণটা এসেছিল আমার কিছু আত্মীয়ের কাছ থেকে। আমার ফেইসবুক পোস্ট এবং কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আমার বিভিন্ন ফিচারের প্রিন্ট কপি নিয়ে তারা মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন মসজিদে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। দাবি ছিলো, মাদ্রাসা নিয়ে আমার লেখা আসলে আমার কথিত ‘ইসলামবিদ্বেষের’ ধারাবাহিকতা।

আমার এই কাজ নিয়ে সে সময় এএফপিও একটি প্রতিবেদন করেছিল। সেই প্রতিবেদন পরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু গালাগালি, হুমকি ও সামাজিক চাপের ধাক্কা আমার চেয়ে আমার পরিবারের ওপর বেশি যাচ্ছিল। বিশেষ করে আম্মু খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকা ছেড়ে দিই।

তারপর থেকে মাদ্রাসার শিশু নিপীড়নের সংবাদ আমি অনেকটাই এড়িয়ে চলেছি। এ ধরনের সংবাদ দেখলেই পুরোনো সময়টার কথা মনে পড়ে। ফলে কয়েক বছর বিষয়টি নিয়ে আর নিয়মিত কাজ করিনি।

গত বছর থেকে, বিশেষ করে এ বছর, মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়নের সংবাদ আবার ঘন ঘন সামনে আসতে শুরু করেছে। পার্থক্য হলো, এখন এসব ঘটনা নিয়ে মানুষ কথা বলছে। ২০১৯ সালে যাদের অনেককে চুপ থাকতে দেখেছি, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ এখন উদ্বেগ জানাচ্ছেন। তখন যারা আমাকে ভুল বুঝেছিলেন, তাদের কেউ কেউ এখন প্রকাশ্যে সেটা স্বীকারও করছেন। এটা অবশ্যই ভালো দিক।

২০১৯ সালেই আমি মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নকে ‘মহামারী’ বলেছিলাম। এই শব্দটি আমি শুধু ঘটনার সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহার করিনি। আমার তখনকার যুক্তি ছিলো, সমস্যাটি বড় হওয়ার একটা কারণ হলো মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সমাজের ভেতরে এসব ঘটনা গোপন রাখার প্রবল চাপ। কোনো মাদ্রাসা, আলেম বা শিক্ষককে ঘিরে নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ হলে সেটাকে অনেকেই প্রতিষ্ঠানের বা ইসলামের বদনাম হিসেবে দেখেন। ফলে অভিযোগকারীর কথা শোনা বা ঘটনার তদন্তের বদলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়, ঘটনাটা চেপে রাখা।

এই প্রবণতা এখনও আছে। সম্প্রতি সাভারের একটি মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্টার নিউজের একজন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন। সেখানে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন, একজন মুসলমানের দোষ অন্য মুসলমানের গোপন রাখা উচিত। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়, যৌন নিপীড়নের অভিযোগকেও কীভাবে প্রতিষ্ঠানের ‘ইজ্জত’ বা ‘মুসলমানের দোষ গোপন’-এর প্রশ্নে বদলে ফেলা হয়। আমি এই লেখায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে যতটা সম্ভব পদ্ধতিগত নিরীখে উঠে আসা তথ্য এবং বিশ্লেষণ উত্থাপন করেছি।

প্রশ্নটা খুব সাধারণ: মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের ঘটনা আসলে কতটা বিস্তৃত?

কাজের পদ্ধতি

এই লেখার জন্য ৪ জুলাই থেকে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় ও স্থানীয় বাংলা ও ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শিশু নিপীড়নের সংবাদ অনুসন্ধান করা হয়েছে।

এ অনুসন্ধানে ওপেন এআই -এর কোডেক্স ব্যবহার করে সংবাদ খোঁজা, একই ঘটনার একাধিক প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা, ঘটনাগুলো প্রাথমিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা এবং একই ঘটনা একাধিকবার গণনা হয়ে যাচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করার কাজ করা হয়েছে। এরপর প্রতিটি অন্তর্ভুক্ত ঘটনা সংবাদসূত্র ধরে আবার যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করেছি। অর্থাৎ কোডেক্স এখানে গবেষণা-সহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোন ঘটনা অন্তর্ভুক্ত হবে, কীভাবে শ্রেণিবিন্যাস হবে এবং এই তথ্য থেকে কোন দাবি করা যাবে, সেই সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি।

অনুসন্ধানে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি, গুরুতর শারীরিক নির্যাতন এবং নির্যাতনের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত শিশুমৃত্যুর ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেবল ১৮ বছরের কম বয়সী ভুক্তভোগীর ঘটনাই নেওয়া হয়েছে।

একই ঘটনা নিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড বা তদন্তের একাধিক সংবাদ পাওয়া গেলে সেগুলোকে আলাদা ঘটনা হিসেবে ধরা হয়নি। একটি ঘটনা হিসেবেই গণনা করা হয়েছে। কোনো শিশুর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সংবাদে থাকা অভিযোগকেও আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

মাদ্রাসা ও অন্যান্য স্থানের ঘটনা আলাদা করার ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সক্রিয় কোনো মাদ্রাসার ভেতরে বা তার আবাসিক ব্যবস্থার মধ্যে সংঘটিত ঘটনাকে ‘মাদ্রাসা’ হিসেবে ধরা হয়েছে। ভুক্তভোগী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি মাদ্রাসার শিক্ষক হলেও ঘটনা যদি বাড়ি, বাগান, রাস্তা বা অন্য কোনো জায়গায় ঘটে থাকে, সেটি ‘অন্যান্য’ বিভাগে রাখা হয়েছে।

পুরোনো মামলার শুধু রায় বা পরবর্তী আদালত-সংক্রান্ত সংবাদ বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে আগে ঘটে গেলেও অনুসন্ধানকালের মধ্যে প্রথমবার বিস্তারিতভাবে সংবাদে আসা বা এ সময় মামলা হওয়া কয়েকটি ঘটনা বিশেষ নোটসহ রাখা হয়েছে।

কী পাওয়া গেছে

দুই মাসের সংবাদ অনুসন্ধানে মোট ৯২টি পৃথক শিশু নিপীড়নের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি ঘটনা সরাসরি মাদ্রাসার ভেতরে বা মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থায় ঘটেছে। অর্থাৎ সংবাদে শনাক্ত মোট ঘটনার ২৮.৩ শতাংশ মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। বাকি ৬৬টি ঘটনা মাদ্রাসার বাইরে।

একাধিক ঘটনায় একের বেশি শিশু ভুক্তভোগী হওয়ায় ৯২টি ঘটনায় ন্যূনতম ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১২৮ জন।

মাদ্রাসার ২৬টি ঘটনায় অভিযুক্তদের প্রায় সবাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা মুহতামিম। কয়েকটি ঘটনায় জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ভেতরের এমন কেউ, যার হাতে শিশুটির ওপর সরাসরি ক্ষমতা আছে।

এই ২৬টি ঘটনার একটিকেও আলিয়া মাদ্রাসার ঘটনা হিসেবে শনাক্ত করা যায়নি। ১৫টি প্রতিষ্ঠানের নাম বা সংবাদে ব্যবহৃত বর্ণনায় হিফজ, হাফেজিয়া, নূরানি, তাহফিজ, কিতাব বিভাগ, মুহতামিম বা সরাসরি ‘কওমি’ পরিচয়ের মতো স্পষ্ট লক্ষণ আছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক বোর্ড-পরিচয় সংবাদে স্পষ্ট নয়, তবে নাম ও শিক্ষার ধরন দেখে সেগুলোও মূলত কওমি বা কওমি-ঘনিষ্ঠ ধর্মীয় শিক্ষা-পরিসরের।

মাদ্রাসার বাইরের ৬৬টি ঘটনা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক ক্ষেত্রের নয়। সেখানে অভিযুক্ত হিসেবে পাওয়া গেছে প্রতিবেশী, আত্মীয়, সৎবাবা, স্থানীয় ব্যক্তি, কিশোর, পরিবহনচালক, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষকে।

এই ৬৬টির মধ্যে সরাসরি স্কুলের ভেতরে সংঘটিত ঘটনা পাওয়া গেছে মাত্র তিনটি। একটি ঘটনায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, আরেকটিতে সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং তৃতীয় ঘটনায় একজন সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৩৭ শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ আছে।

অর্থাৎ একই দুই মাসে মাদ্রাসার ভেতরে বা আবাসিক ব্যবস্থায় পাওয়া গেছে ২৬টি ঘটনা, আর সরাসরি স্কুলের ভেতরে তিনটি।

 সংখ্যাটা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের নিজের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের হিসাবে তাদের আওতায় ২৯,৩২৭টি মাদ্রাসার কথা বলা হয়েছে। একই হিসাবে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ৩,৮৯,৯৬১ জন এবং অন্তর্ভুক্ত পরীক্ষার্থী ৩,৪৯,৭৯১ জন।

এখানে একটা সমস্যা আছে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা মানেই মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়। ফলে এই সংখ্যা দিয়ে কওমি মাদ্রাসায় মোট কত শিক্ষার্থী পড়ে, সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আর মোট শিক্ষার্থী না জানলে স্কুলের তুলনায় কওমি মাদ্রাসায় নিপীড়নের হার ঠিক কত গুণ বেশি, সেই হিসাবও করা যাবে না।

অন্যদিকে সরকারি শিক্ষা-উপাত্ত মিলিয়ে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাংলাদেশে শিক্ষার্থী আছে প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ। এই সংখ্যার মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও আছে। কারণ আলিয়া মাদ্রাসা সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ। কওমি মাদ্রাসা আলাদা ব্যবস্থায় চলে।

তাই আমরা এখানে স্কুল আর কওমি মাদ্রাসার নিপীড়নের সঠিক হার বের করছি না। সেই হিসাব করার মতো তথ্য আমাদের হাতে নেই। কিন্তু মোটামুটি সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলেই একটা খুব অস্বাভাবিক চিত্র দেখা যায়।

বেফাকের নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী প্রায় চার লাখ। ধরে নিলাম, পরীক্ষার বাইরে আরও অনেক শিক্ষার্থী আছে। এমনকি খুব উদারভাবে ধরে নিলাম, এই কওমি শিক্ষা-পরিসরে মোট শিক্ষার্থী পাঁচ লাখের কাছাকাছি। সেই কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা-পরিসর থেকে গত দুই মাসে সংবাদে ২৬টি শিশু নিপীড়নের ঘটনা পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর রাষ্ট্রীয় শিক্ষা-পরিসরের স্কুলগুলোর ভেতরে একই সময়ে পাওয়া গেছে তিনটি ঘটনা। এর মধ্যে দুটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং একটি গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা।

মাদ্রাসার ২৬টিও একই নিয়মে নেওয়া হয়েছে। ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি, গুরুতর শারীরিক নির্যাতন এবং নির্যাতনের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত শিশুমৃত্যু, সব মিলিয়ে।

আমরা বলছি না, কওমি মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন স্কুলের চেয়ে ঠিক ২০ গুণ, ৩০ গুণ বা ৪০ গুণ বেশি। সেই হিসাব করার মতো নির্ভুল তথ্য আমাদের হাতে নেই।

কিন্তু কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষা-পরিসর থেকে দুই মাসে ২৬টি ঘটনা, আর কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা-পরিসরের স্কুলগুলো থেকে তিনটি, এই ব্যবধানকে স্বাভাবিক বলা কঠিন। সংখ্যাগুলো খুব স্পষ্টভাবেই একদিকে ঝুঁকে আছে। আর সেটি এমন এক শিক্ষা-পরিসরের দিকে, যারা নিজেদের শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে না; নিজেদের ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার দায়িত্বেও দেখে।

এখানেই আরেকটা কঠিন প্রশ্ন আসে: সংবাদে যে ২৬টি ঘটনা এসেছে, সেটাই কি পুরো চিত্র? উত্তর হলো- না।

কওমি মাদ্রাসার বড় একটি অংশ আবাসিক। সেখানে একটি শিশু শুধু ক্লাস করে বাড়ি ফিরে যায় না। সে সেখানেই থাকে, খায়, ঘুমায়। তার দিনের বড় অংশ একই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কাটে। শিক্ষক বা মুহতামিমও সেখানে শুধু শিক্ষক নন। অনেক সময় তিনিই অভিভাবকের জায়গায় থাকেন, তিনিই শাস্তি দেন, আবার তিনিই ধর্মীয় কর্তৃত্বের জায়গাতেও থাকেন। এমন একজন মানুষের হাতেই যদি একটি শিশু নিপীড়নের শিকার হয়, তাহলে তার পক্ষে অভিযোগ করা সহজ নয়।

এর সঙ্গে ধর্মীয় ভয় ব্যবহার করার নজিরও আছে। ২০১৯ সালে নেত্রকোনার একটি কওমি মহিলা মাদ্রাসার ঘটনায় অভিযোগ ছিল, মুহতামিম শিশুদের ধর্ষণের পর কোরআন ছুঁইয়ে কাউকে কিছু না বলার শপথ করাতেন এবং বলতেন, কথা বললে আল্লাহ দোজখের আগুনে পোড়াবেন। ২০২৬ সালের সাভারের একটি ঘটনায় শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে বলেছিলেন ঘটনা কাউকে জানালে সে হেফজখানায় উঠতে পারবে না, পরীক্ষায় পাস করবে না, এমনকি কোরআনের হাফেজও হতে পারবে না।

অর্থাৎ এখানে শুধু একজন শিক্ষকের ক্ষমতা কাজ করে না। শিশুর ধর্মীয় বিশ্বাস, জান্নাত-জাহান্নামের ভয়, হাফেজ হওয়ার স্বপ্ন, এসবও তাকে চুপ করিয়ে রাখার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

স্কুলে কোনো ঘটনা ঘটলে শিশুটি অন্তত বাড়ি ফিরে পরিবারকে বলতে পারে। পরিবার স্কুলে যেতে পারে, প্রশাসনের কাছে যেতে পারে, সাংবাদিকের কাছে যেতে পারে। আবাসিক মাদ্রাসায় অনেক শিশুর জন্য এই পথটা এতটা সহজ নয়। সে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই থাকে, আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার কর্তৃত্বের মধ্যেই থাকে।

এর সঙ্গে যদি যোগ হয় মাদ্রাসার বদনাম হওয়ার ভয়, আলেমের সম্মান রক্ষার চাপ, কিংবা ‘মুসলমানের দোষ গোপন করতে হবে’- এই ধরনের ধর্মীয় যুক্তি, তাহলে ঘটনা বাইরে আসা আরও কঠিন হয়ে যায়।

সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো, যে জায়গা থেকে ঘটনা বাইরে আসা তুলনামূলকভাবে কঠিন, সংবাদে সবচেয়ে বেশি ঘটনা আবার সেখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ২৬টিকে মোট ঘটনা ভাবার কোনো কারণ নেই। এগুলো শুধু সেই ঘটনাগুলো, যেগুলো কোনোভাবে মাদ্রাসার দেয়ালের বাইরে এসেছে। কত ঘটনা ভেতরেই থেকে গেছে, আমরা জানি না।

এখানে আমার দাবি এই নয় যে ধর্মীয় শিক্ষা নিজেই যৌন নিপীড়ন তৈরি করে। সমস্যা হলো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোতে। আবাসিকতা, শিক্ষক ও মুহতামিমের বিপুল কর্তৃত্ব, বাইরের নজরদারির ঘাটতি, দুর্বল অভিযোগ ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার জন্য ঘটনা গোপন করার প্রবণতা, এসব একসঙ্গে থাকলে নিপীড়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে, আবার ঘটার পর সেটি চাপা দেওয়াও সহজ হয়।

এ কারণেই ২০১৯ সালে আমি সমস্যাটিকে ‘মহামারী’ বলেছিলাম। সাত বছর পরের এই ছোট অনুসন্ধান দিয়ে সেই শব্দের নির্ভুল পরিসংখ্যানগত প্রমাণ আমি দাবি করছি না। কিন্তু এটুকু এখন অনেক বেশি জোর দিয়ে বলা যায়: এটি শুধু কয়েকজন ‘খারাপ হুজুরের’ সমস্যা নয়।

সমস্যা প্রতিষ্ঠানেরও।

মানুষের টাকায় চলবেন, কিন্তু মানুষকে হিসাব দেবেন না?

এখানে আরেকটা বড় অসঙ্গতি রয়েছে। কওমি মাদ্রাসার ঐতিহাসিক মডেলই দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের অর্থের ওপর। দেওবন্দ রাষ্ট্রীয় স্থায়ী অর্থায়নের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মুসলমানের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠান চালানোর পথ বেছে নিয়েছিল। এর ফলে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটা স্বাধীনতা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান মানুষের অর্থের ওপরও নির্ভরশীল ছিলো। বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার বড় অংশ এখনও মানুষের দান, সদকা, যাকাত ও সহযোগিতায় চলে। কিন্তু মানুষের টাকা নেওয়া আর মানুষের কাছে জবাবদিহি না করা–দুইটা একসঙ্গে চলতে পারে না।

মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা খুঁজতে গিয়ে আমি বারবার একটা জায়গায় আটকে গেছি। কোথাও শিক্ষককে বের করে দেওয়া হয়েছে, কোথাও শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন বের করা হলো, তার কোনো প্রকাশ্য নথি নেই। যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গত পাঁচ বা দশ বছরে কত শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়েছে, তার কোনো তালিকা নেই। কেউ এক মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে আরেক মাদ্রাসায় শিক্ষক হয়েছেন কি না, সেটাও জানার উপায় নেই। কত শিক্ষার্থী আছে, কারা শিক্ষক, শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা কী, কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ উঠেছে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসবের কোনো প্রকাশ্য হিসাব নেই। কওম টাকা দেয়। কিন্তু কওম জানে না, তার টাকায় চলা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কী হচ্ছে।

অথচ জবাবদিহির কথাই এ ধারার ঐতিহাসিক নৈতিকতার অংশ হওয়া উচিত ছিলো।

এই অনুসন্ধানের সীমাবদ্ধতা

এই ৯২টি ঘটনা কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব নয়। এগুলো দুই মাসে অনলাইন সংবাদে পাওয়া ঘটনা। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা বা স্কুল-মাদ্রাসায় নিপীড়নের নির্ভুল হার এখান থেকে বের করা যাবে না। আর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, কওমি মাদ্রাসার কত ঘটনা কখনো সংবাদেই আসে না, তা আমরা জানি না।

মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসায় এক শিক্ষার্থী আরেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধর্ষণ করতো, এমন একটি ঘটনার কথা আমি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জেনেছি। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় ভুক্তভোগী তার বন্ধুদের জানায়। পরে অভিযুক্ত আবার তার কাছে গেলে সে চিৎকার করে। অন্য শিক্ষার্থীরা এসে অভিযুক্তকে ধরে মারধর করে। এরপর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে বের করে দেয়, কিন্তু পুলিশে দেয়নি বলে আমাকে জানানো হয়েছে।

আমি ঘটনাটি নিজে প্রত্যক্ষ করিনি। কোনো লিখিত অভিযোগ বা শাস্তির নথিও আমার হাতে নেই। ফলে ঘটনাটি স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করার অবস্থায় আমি নেই। এই লেখায় বলার কারণেই ঘটনার কিছু অংশ প্রথমবার প্রকাশ্যে আসছে।

রাকিবুল হাসান নামে একজন ফেইসবুকে আরেকটি ঘটনা লিখেছেন। তার দাবি, তার পরিচিত এক ব্যক্তি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে একাধিক মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। কিন্তু কোনো মামলায় জেলে না গিয়ে পরে ঢাকায় নিজেই একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই দাবিটিও আমি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারিনি।

কিন্তু এই দুই বর্ণনা একটি বড় সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। কোনো ঘটনা যদি পুলিশ পর্যন্ত না যায়, লিখিত অভিযোগ না থাকে, আর প্রতিষ্ঠান অভিযুক্তকে শুধু বের করে দিয়ে বিষয়টা শেষ করে দেয়, তাহলে কয়েক বছর পরে সেই ঘটনার প্রমাণই থাকবে না। একই ব্যক্তি অন্য মাদ্রাসায় গিয়ে আবার শিক্ষকও হতে পারেন।

এ কারণেই সংবাদে পাওয়া ২৬টিকে পুরো সমস্যার সবটুকু ধরে নেওয়া যায় না।

স্বাধীনতা মানে আইনের বাইরে থাকা নয়

কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্রতার একটা ইতিহাস আছে। ঔপনিবেশিক সময়ে এই ধারার প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অর্থ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে ধর্মীয় শিক্ষা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। সেই ইতিহাস বোঝা যায়। কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশ ঔপনিবেশিক ভারত নয়।

এখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্রতার অর্থ এই হতে পারে না যে তার ভেতরে কী হচ্ছে, রাষ্ট্র জানবে না। একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হলে সেটি ‘মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিষয়’ নয়। শিশুটি প্রথমে বাংলাদেশের নাগরিক। তার শরীর, নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার রাষ্ট্রের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।

কওমি মাদ্রাসা তার ধর্মীয় পাঠ্যক্রমে কতটা স্বাধীন থাকবে, সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু শিশু সুরক্ষা, যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন এবং অপরাধের প্রশ্নে কোনো প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের বাইরে থাকতে পারে না। এই জায়গাটাই এখন কওমি নেতৃত্বকে বুঝতে হবে।

ধর্ম রক্ষার দাবি, শিশু রক্ষায় নীরবতা

এই পুরো ব্যাপারটা আরও বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে অন্য জায়গায়। কওমি মাদ্রাসার বড় একটি অংশ নিজেদের শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দেখে।

তখন খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন আসে: যে প্রতিষ্ঠান নিজেকে ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব দিচ্ছে, সে তার কাছে ধর্ম শিখতে আসা শিশুদেরই যদি নিরাপদ রাখতে না পারে, তাহলে সেই ধর্মরক্ষার দাবির মানে কী?

আপনি বলছেন, আপনি ধর্মকে রক্ষা করছেন। কিন্তু আপনার প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, ভয় পাচ্ছে, অভিযোগ করতে পারছে না, আর প্রতিষ্ঠান শিশুটিকে রক্ষা করার আগে নিজের সুনাম রক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছে। এ জায়গায় নৈতিক দাবি নিজেই ভেঙে পড়ে। এখানেই হেফাজতে ইসলাম ও কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইসলামি সংগঠনগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

গত দুই বছরে তারা নারী কীভাবে চলবে, পরিবার কেমন হবে, সংবিধানে কী থাকবে, কে মুসলমান আর কে নয়, কোন সংগঠন নিষিদ্ধ হবে, সমাজে কোন পরিচয় স্বীকৃতি পাবে– এমন প্রায় সব প্রশ্নেই রাস্তায় নেমেছে। রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিকতা ঠিক করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহের কোনো ঘাটতি নেই।

কিন্তু নিজেদের মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ ও নিপীড়নের অভিযোগ যখন একের পর এক সামনে আসে, তখন সেই তৎপরতা দেখা যায় না। শিশু সুরক্ষার বাধ্যতামূলক নীতি কোথায়? স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থা কোথায়? যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ পুলিশে জানানোর বাধ্যবাধকতা কোথায়? এক মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত একজন অভিযুক্ত শিক্ষক যেন আরেক মাদ্রাসায় গিয়ে আবার শিশুদের ওপর কর্তৃত্ব না পান, সেই ব্যবস্থা কোথায়?

অন্যের পোশাক, পরিবার, বিশ্বাস ও পরিচয় নিয়ে নৈতিক পাহারাদারি করা সহজ। নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি শিশুকে নিরাপদ রাখা কঠিন। আপনি যদি পুরো সমাজকে ইসলাম ও নৈতিকতার পাঠ দিতে চান, তাহলে আগে জবাব দিন, আপনার নিজের মাদ্রাসায় পড়তে আসা শিশুটি নিরাপদ কি না।

এখন কী করা উচিত

আমার মনে হয়, কওমি নেতৃত্বের এখন নিজেদের স্বার্থেও নড়েচড়ে বসা উচিত। কওমি মাদ্রাসার বড় অংশ সাধারণ মানুষের টাকায় চলে। মানুষ যদি একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের সংবাদ দেখে, আর দেখে প্রতিষ্ঠানগুলো ঘটনা ঠেকানোর বদলে গোপন করছে, তাহলে একসময় আস্থা কমবে। আস্থা কমলে অনুদানও কমবে। ফলে এটা শুধু শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা। কোথায় মাদ্রাসা, কে চালায়, কত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, আবাসিক ব্যবস্থা আছে কি না, এই ন্যূনতম তথ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কওমি বোর্ডের কাছে থাকতে হবে। নতুন মাদ্রাসা খোলার ক্ষেত্রেও অন্তত নিবন্ধন এবং কিছু ন্যূনতম শর্ত মানা বাধ্যতামূলক করারও দরকার।

বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসার জন্য আলাদা শিশু-সুরক্ষা নীতি দরকার। রাতে দায়িত্বে কে থাকবেন, কোন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষক শিশুর সঙ্গে একা থাকতে পারবেন, শিশুরা পরিবারের সঙ্গে কতো নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারবে, শারীরিক শাস্তির সীমা কী, এসবের লিখিত নিয়ম থাকতে হবে। নিয়মগুলো শুধু কাগজে থাকলে হবে না; কওমি বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সময়ে সময়ে পরিদর্শনও করতে হবে।

প্রতিটি মাদ্রাসায় একজন নির্দিষ্ট শিশু-সুরক্ষা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ শুধু তার বা মুহতামিমের কাছেই আটকে থাকবে না। শিক্ষার্থী ও পরিবার যেন সরাসরি একটি বাইরের অভিযোগ ব্যবস্থায় যোগাযোগ করতে পারে, ফোন, হেল্পলাইন বা স্থানীয় প্রশাসনের নির্দিষ্ট কর্মকর্তার মাধ্যমে, সেই পথও রাখতে হবে।

সব অভিযোগ সরাসরি ফৌজদারি মামলা হবে, এমন নয়। কিন্তু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, গুরুতর শারীরিক নির্যাতন বা শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর ঝুঁকির অভিযোগ মাদ্রাসা নিজেরা ‘মীমাংসা’ করতে পারবে না। সেগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

আরেকটা খুব সাধারণ ব্যবস্থা করা যায়: কোনো শিক্ষক বা কর্মী এক মাদ্রাসা থেকে আরেক মাদ্রাসায় চাকরি নিতে গেলে আগের প্রতিষ্ঠানের লিখিত সুপারিশ লাগবে। কেউ কেন চাকরি ছেড়েছেন বা কেন বহিষ্কৃত হয়েছেন, সেটার ন্যূনতম রেকর্ড থাকবে। এতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক জায়গা থেকে বের হওয়া কেউ চুপচাপ আরেক জায়গায় গিয়ে আবার শিক্ষক হয়ে যাওয়ার সুযোগ কমবে।

এ জায়গায় কওমি বোর্ডগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সরকার একা দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসা প্রতিদিন নজরদারি করতে পারবে না। কিন্তু বেফাকসহ বড় বোর্ডগুলো চাইলে শিশু-সুরক্ষার একটি অভিন্ন নীতিমালা করতে পারে, অধিভুক্ত মাদ্রাসাকে সেটা মানতে বাধ্য করতে পারে এবং গুরুতর অভিযোগ গোপন করলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার অধিভুক্তি স্থগিত করতে পারে।

শিশুদেরও খুব সাধারণ ভাষায় শেখাতে হবে, কোন স্পর্শ ঠিক নয়, কোনো শিক্ষক তাকে গোপন রাখতে বাধ্য করতে পারেন না, ভয় দেখালে কী করবে, আর কার কাছে অভিযোগ করবে। এর জন্য বড় কোনো নতুন সিলেবাস দরকার নেই; বয়স অনুযায়ী ছোট একটি বাধ্যতামূলক শিশু-সুরক্ষা পাঠই শুরু হতে পারে।

এগুলো অসম্ভব কোনো সংস্কার নয়। এর জন্য কওমি শিক্ষার ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ারও দরকার নেই। দরকার শুধু এই নীতিটা মানা: ধর্মীয় শিক্ষা কীভাবে দেবেন, সেটা নিয়ে আপনার স্বাধীনতা থাকতে পারে; কিন্তু একটি শিশুর শরীর, নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার আপনার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।

হেফাজত, বেফাক এবং বড় কওমি সংগঠনগুলোরই এখন এই সংস্কারের দাবি নিয়ে সামনে আসা উচিত। কারণ আপনি পুরো সমাজকে কীভাবে চলতে হবে শেখাতে চাইবেন, কিন্তু আপনার নিজের মাদ্রাসায় একটি শিশু নিরাপদে ঘুমাতে পারবে কি না, তার নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না, এই দ্বৈততা আর বেশিদিন টেকসই হবে না।

ধর্ম রক্ষার দাবি করার আগে তাই সবচেয়ে বাস্তব কাজটা করা দরকার: নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করা।

মীর হুযাইফা আল মামদূহ ধর্ম, গণমাধ্যম, পরিচয় ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে কাজ করা একজন গবেষক ও সাংবাদিক। তার গবেষণার আগ্রহের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজ, ধর্মীয় ডিসকোর্স এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব।

[মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব]