ভেনিস ভিটাস্কোপ; প্রেম ও বিয়ের বৃত্তে আটকে পড়া মানুষেরা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম

"Many a time and oft, in the Rialto you have rated me." উইলিয়াম শেক্সপিয়ার রচিত ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকের প্রথম অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে শাইলক কথাগুলো বলছিলো এন্টোনিওকে। এখানে রিয়ালতো ব্রিজের কথা বলা হয়েছে। ইতালীয়রা একে চেনে ‘পন্টে ডি রিয়ালতো’ নামে। সাহিত্যামোদীরা বলেন ‘শাইলকের সেতু’।

কেন এই অত্যন্ত পুরোনো ও সুষমামণ্ডিত সেতুর কথা বলছি? প্রথম কারণ এটি ভেনিসের গ্র্যান্ড ক্যানালের উপরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় চারটি সেতুর একটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এর উপর উঠে ছবি তোলেন। আর আমি প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখতে দেখতে সেতুর নিচ দিয়ে এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাই। আর দ্বিতীয় কারণ, এই সেতু নিয়ে কথা বলার, আজ উৎসবের চতুর্থ দিন, ফার্মগেটের লোকাল বাসের মতো হঠাৎ করেই পানির বাস আমাদের রিয়ালতোতে, এই সেতুর কাছে নামিয়ে দেয়। কারণ জিজ্ঞেস করলে খালি বলে, এখানে অপেক্ষা করো, লঞ্চ আরেকটা আসছে। তো সবাই বাধ্য ছাত্রের মতো নেমে অন্য পল্টুনে চলে গেলো আরেকটি জলযানে উঠে যাবে বলে। আমার হাতে একটু সময় আছে বৈকি। আমি পল্টুনে একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন ভরে কিছুক্ষণ শাইলক সেতুর ছবি তুললাম।

রিয়ালতো ব্রিজটি প্রথম তৈরি হয় ১১৭৩ সালে। তখন ওটি স্রেফ অনেকগুলো পল্টুন জোড়া লাগানো সেতু ছিল। এখনকার সেতুটি নকশা করেছিলেন আন্তোনিও দা পন্তে (১৫১২-১৫৯৭)। সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৫৮৮ সালে, শেষ হয় ১৫৯১ সালে। বর্তমান বিশ্বে পন্তে সাহেবের এই সেতুটি পরিণত হয়েছে স্থাপত্যশিল্পের আইকনে। তো আইকনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখি কিছু সময় পরই একটি এক নম্বর ওয়াটার বাস আসছে এদিকে। ওটাতে চেপে লিডো দ্বীপের দিকে রওনা দিলাম।

আজ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হলো লিডো দ্বীপে নামার ঠিক আগে। আমি শুরুর দিন থেকেই লক্ষ্য করছিলাম এখানকার বাস ও লঞ্চে টিকিট নিয়ে খুব কড়াকড়ি। যেখানে সেখানে পুলিশ বা কর্তৃপক্ষ উঠে যায় ও টিকিট চেক করে। টিকিট না কাটলে তিনগুণ জরিমানা করে। তো আমার পাশে সহযাত্রী হিসেবে বসেছিলেন এক ভদ্রমহিলা। টিকিট চেকার এসে টিকিট চাইলে তিনি মোবাইলে একটি মেইল বের করতে দেখালেন। আমি বুঝেছি উনি কী দেখাচ্ছেন। এই ভাউচার আমাকেও পাঠানো হয়েছিল দেশে থাকতেই। উৎসব উপলক্ষ্যে ছাড়কৃত মূল্যে ১২ দিনের জন্য এই পিডিএফ ভাউচার দেওয়া হয়। এবং সেখানে বলা ছিল এটা যেন আমি পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ভেন্ডিং মেশিনে গিয়ে নির্দিষ্ট পিনকোড দিয়ে ফিজিকাল টিকিট সংগ্রহ করে নিই। আমি প্রথম দিন বিমান বন্দরে নেমেই এই কাজটি সম্পন্ন করেছিলাম। কিন্তু পাশের ভদ্রমহিলা সেটি করেননি। তিনি বারবার বলছেন, ফ্রান্সে তো এমন নিয়ম নেই। তাছাড়া তিনি বুঝতে পারেননি ইত্যাদি।

তখন চেকার বললো, লঞ্চের সবাই টিকিট দেখাতে পারলো, তুমি পারছো না। জরিমানা দিতে হবে। গলায় দেখি ঝুলছে উৎসবের পরিচয়পত্র। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ভদ্রমহিলা চ-বর্গীয় শব্দের গালাগালি শুরু করে দিলেন। চেকার বললো, আমরা পুলিশ ডাকছি। ভদ্রমহিলা মনে হয় একটু ঘাবড়ে গেলেন। গজগজ করতে করতে সাড়ে ৫৯ ইউরো জরিমানা দিলেন। বেচারা! পরে আমার কাছে নিজের হতাশা প্রকাশ করতে লাগলেন। বললেন, দেখো সিনেমা দেখতে এসেছি, মেজাজটাই এরা বিগড়ে দিলো। আমি বললাম, যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। এখন তোমাকে যে জরিমানা করেছে সেটার রিসিট যত্ন করে রাখো। আর ফিরতি পথে রোমা স্টেশন থেকে অবশ্যই ভাউচার ভাঙিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে নিও। নয়তো আবার ধরা পড়লে এই জরিমানার দ্বিগুণ জরিমানা দিতে হবে। বিদায় দিয়ে আমি উৎসবের বাসে উঠে পড়লাম।

আজ দেখতে যাচ্ছি বর্তমান সময়ের সমাদর পাওয়া মেধাবী পরিচালক ও অভিনেতা, ইতালির জোভান্নি মরেত্তি পরিচালিত নতুন ছবি ‘ইট উইল হ্যাপেন টুনাইট’। ‘ভেনেজিয়া ৮৩’ মূল প্রতিযোগিতায় থাকা ছবিটির স্ক্রিনিং হয় ‘সালা দারসেনা’তে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হা করে দেখলাম ছবিটি। “আমি কাঁদলাম, বহু হাসলাম, এই জীবন জোয়ারে ভাসলাম, আমি বন্যার কাছে ঘূর্ণির কাছে রাখলাম নিশানা…” অবস্থা আমার। মানে সাম্প্রতিক সময়ে এতোটা ঝরঝরে ভাষায়, এত সাবলীল ভঙ্গিতে, এত জটিল ছবি কাউকে করতে দেখেনি। সবাই কঠিন ঘটনাকে কঠিন করেই বলতে চান। নয় তো হালকা জিনিসকে হালকা করে। কিন্তু জোভান্নি ওরফে আন্নির ছবি জীবনের কোনো মুদ্রাই বাদ রাখেননি। সকল মুদ্রা ব্যবহার করে তিনি আদায় করে নিয়েছেন দর্শকের সর্বোচ্চ মনোযোগ ও ভালোবাসা। ছবি শেষের করতালিই সেটার প্রমাণ দিলো।

ছবিটি মূলত ম্যাতিও আর গ্রেটার গল্প। এক অদ্ভুত ঘোরলাগা প্রেমের আখ্যান। কাকতালীয় সংযোগ আর নিয়তির বয়ান। ম্যাতিওর প্রথম ঘরের এক ছেলে সন্তান রয়েছে, কিশোর। সন্তান ছোট থাকতেই স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ হলে বাবা ও পরিবারের চাপে এক চিকিৎসক নারীকে বিয়ে করে সে। ওদিকে গ্রেটা যাকে ভালোবাসে তাকেই বিয়ে করে, কিন্তু সে বুঝতে পারে না দাম্পত্য জীবনের কোথায় যেন সুর কেটে গেছে। স্ফূলিঙ্গ নেই, রক্তে নাচন নেই, মনে উচাটন ভাব নেই। ওদিকে একাকী ম্যাতিওর সময় কেটে যাচ্ছিল একভাবে। এরই ভেতর এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ম্যাতিওর সঙ্গে পরিচয় হয় গ্রেটার। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে ম্যাতিও। এরপর নানা পর্যায়ে আরো তিনবার দেখা হয় তাদের। প্রেম নিবেদন করে ম্যাতিও। উড়তে শুরু করে গ্রেটা। সূচনা হয় ঝড়ো অধ্যায়ের। পরাণসখার সাথে চলতে থাকে গোপন অভিসার। গ্রেটা হয়ে পড়ে আনমনা। ম্যাতিও যেন উতলা বৃন্দাবনের কৃষ্ণ। একে অপরের জন্য উন্মাতাল হয়ে ওঠে। “হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে। পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বান্ধে”— অবস্থা দুজনের। কিন্তু দুজনেরই তো ডানা বাঁধা। সন্তান ও সংসার ফেলে কেমন করে মিলিত হবে এই অধীর দুই প্রাণ? সিদ্ধান্ত নেয় তারা দূরে সরে যাবে। আর যোগাযোগ করবে না একে অপরের সাথে। দুজনই দুজনকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। এরপর শেষবারের মতো আবারো কাকতালীয়ভাবে তাদের যখন দেখা হয়, তখন তারা নির্ভুলভাবে বুঝে নেয়, এই বারবার মুখোমুখি হওয়া, এটা কোনো দৈব ঘটনা নয়, এটি অনিবার্য ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আজ রাতেই হোক সব। পালিয়ে যাবে দুজন। “সমাজ সংসার মিছে সব,/ মিছে এ জীবনের কলরব।/ কেবল আঁখি দিয়ে, আঁখির সুধা পিয়ে/ হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব।” ছবিটি এখানেই শেষ হয়।

ইসরাইলি লেখক এশকল নেভো রচিত ‘ক্ষুধিত হৃদয়’ (Lev Raev) ছোটগল্পের ছায়া অবলম্বনে জোভান্নি মরেত্তি তৈরি করেছেন ছবিটি, যা প্রথমবারের মতো দেখানো হচ্ছে এই লিডো দ্বীপে। আমি সৌভাগ্যবান। আরো একটা কারণে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি, কারণ এবার যখন ভেনিসে আসবো বলে ঠিক করেছি তখনো আমি জানতাম না বাংলাদেশের পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি এখানে নির্বাচিত হবে। আমার আসার সকল প্রস্তুতি যখন সম্পন্ন হয়, তখন জানতে পারি ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ প্রতিযোগিতা করবে ‘ওরিৎজন্তি’ বিভাগে।

রুবাইয়াত হোসেনের ছবিটি শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টায়। আজই এটার প্রথম শো, তবে প্রেসের জন্য শুধু। ৬ তারিখ ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। তো ছবি শুরুর আগে কিছুক্ষণ লেখালেখি করলাম এবং আলাপ ডট নিউজের জন্য সাক্ষাৎকার নিলাম ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইডে’র অভিনয়শিল্পী আজমেরি হক বাঁধন ও সুনেরাহ বিনতে কামালের। দুজন শিল্পীই ঘড়ি ধরে ঠিক চারটায় উপস্থিত হন ভেন্যুতে। প্রাণবন্ত আর উচ্ছল লাগছিলো তাদের। পালাৎজো ডেল ক্যাসিনোর তিনতলায় তাদের ছোট্ট ভিডিও ইন্টারভিউ করা হলো। এরপর কিছুক্ষণ তাদের সাথে ভেনুতে একটু ঘোরাঘুরি আর গল্প হলো। দুজন চলে গেলেন স্যুভেনির শপে। আমি চলে এলাম প্রেস এরিয়াতে। আবারো অপেক্ষা। তো শো শুরুর আগে, চিন্তা করলাম ডিনারের জন্য সালাদ কিনে রাখি, নয় তো অতো রাতে দোকান খোলা পাওয়া যায় না, ঝামেলা হয়। দ্রুত পায়ে নিচে গেলাম। রেডকার্পেট এলাকা পেরিয়ে খাবারের দোকানে গিয়ে দেখি তখনো বিশাল লাইন, সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা বাজে তখন। আর তারই সামনে একাকী দাঁড়িয়ে আছেন অনুরাগ কশ্যপ।

আমাকে দেখে হেসে হাত নাড়লেন। কাছে যেতেই বললেন, তিনি ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ দেখবেন সন্ধ্যায়। আমিও তো দেখব, বললাম। একসাথে দেখা যাবে। জিজ্ঞেস করলাম, ছবি করছেন না কেন আর? উত্তরে হতাশা আর প্রত্যাশা দুই সুরই পেলাম। প্রথমে বললেন, দেখুন যে টাকা পয়সা নিয়ে ছবি করতে এসেছিলাম সব লুট হয়ে গেছে। ভারতে সিনেমা একটা ইন্ডাস্ট্রি। ওখানে সবাই শুধু টাকা খোঁজে। তবে তিনি আবার নতুন করে শুরু করতে চান। এখন কিছুটা বিরতি নিচ্ছেন। উৎসবগুলোতে ঘুরছেন, কিন্তু এটা নতুন যাত্রা শুরু করার প্রস্তুতি। কথায় কথায় এলো বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। বললেন, বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রি নেই বলেই সেখানে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। আর পরবর্তী নিউওয়েভ আসবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে। ভারতের চলচ্চিত্র শেষ। ওখানে আর কিছু হবে না। উনি বাংলাদেশী ছবি ‘দেলুপি’র কথা বললেন। আমি জানালাম, এরকম আরো কিছু ছবি ও তরুণ নির্মাতাদের কথা। অনুরাগ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তো একফাঁকে দেখি ঘড়ি সাড়ে ছয়টার উপরে বাজে। আমি বললাম, চলুন যাই। অনুরাগ বললেন, তিনি একজনের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাকে বিদায় জানিয়ে চললাম বাংলাদেশের ছবি দেখার জন্য।

লেখকের সাথে অনুরাগ কশ্যপ

ক্যাসিনো ভবনের উপরের তলার হলে ঢুকে বসেছি, দেখি আমার পরিচিত পাওলা ক্যাসেলা এসেছেন। ইতালির চলচ্চিত্র সমালোচক। বাংলাদেশের এই ছবি দেখবেন বলে অন্য একটি ছবির শিডিউল বাতিল করেছেন। আমার পাশে বসলেন। একটু পর অনুরাগও ঢুকলেন। শুরু হলো ছবি। লিখিত হতে চলেছে ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ভেনিস উৎসবে।

গোটা ছবিটাই একজন নারীর বিয়ের প্রস্তুতি, বউ হয়ে অন্যের ঘরে যাওয়ার আয়োজন নিয়ে। আমরা দেখি একজন নারীর শরীরের খুঁত বের করে সেগুলো ঠিকঠাক করা হচ্ছে, অনবরত বলা হচ্ছে খেয়ালখুশি মতো না চলতে, শরীর ফিট রাখতে ইত্যাদি। কিন্তু বরকে এসব করতে হচ্ছে না। বিয়ের প্রস্তুতি যেন নয়, এ যেন নারীর জন্য সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নানাবিধ বিধিনিষেধ, সংস্কারের বেড়াজাল আর নিজের স্বাধীনতাকে খর্ব করা। তো কনে এসব জিনিসে হাপিয়ে উঠছে। দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে সে বেরুতে চায়। শেষ পর্যন্ত সে বেরুতে পারে। ছবির মজার দিকটি হলো সমাজে যেসব জিনিস নেতিবাচক বলে প্রচলিত, পরিচালক সেগুলোকেই উল্টো রূপে দেখিয়েছেন। যেমন পেত্নি, সাপ, টিকটিকির খসে পড়া লেজ ইত্যাদি। এসব নেতিবাচক জিনিসকে পরিচালক নারীর মুক্তির সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন। প্রেতাত্মা নারীটিই যেন এই হবুবধূকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় শৃঙ্খলমুক্তির দিকে। এতসব আয়োজন, পদে পদে বাধা, কাচের দেয়াল সব ভেঙেচুড়ে বধূটি বেরিয়ে আসে বাইরের বিশ্বে, মিশে যায় সাধারণ মানুষদের সাথে। চিন্তার জায়গা থেকে চমৎকার ছবি। বিশেষ করে নারীবাদকে যদি ধর্তব্যে নিই তাহলে এই ছবিটি হয়ে উঠতে পারে নারীবাদী পাঠের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তবে চলচ্চিত্র হিসেবে এই ছবির কোথাও কোথাও আরো কাজ করার জায়গা ছিলো। সিনেমাটোগ্রাফি খুবই ভালো। সম্পাদনাও চমৎকার হয়েছে। কালার প্যালেট এক কথায় মুগ্ধকর। কিন্তু সংলাপ ও কারো কারো অভিনয় কিছুটা হতাশ করেছে। তাছাড়া শুরু থেকে গল্পটি যেরকম প্লট ধরে এগোয়, সেই জায়গাগুলোকে কোথাও কোথাও আরোপিত মনে হয়েছে। আবার ঢাকা শহরের কিছু ঘটনা দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবে দেখা যায় না, যেমন জনশূন্য রাস্তায় কখনো কেউ বানরের খেলা দেখায় না। ট্রাফিক সিগনালেও কোনো বেদেনি সাপের খেলা দেখাতে চায় না, তারা সাপ দেখিয়ে টাকা চায়।

যাহোক শুরুতেই আমরা শুনি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের “ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত’ গান বাজছে বিউটি পার্লারে। গোটা ছবিতেই এই গান ঘুরেফিরে আসে। বিশেষ করে যখনই বিউটি পার্লারের দৃশ্য আসে তখন। আরেকটি ইংরেজি গানও ঘুরেফিরে আসে, সব উদযাপনের দৃশ্যে: ফিজিক্যালি আই অ্যাম হোর, মেন্টালি আই লাভ গার্ল। দ্বিতীয় গানটি হয় তো প্রয়োগ ঠিকই ছিল, কিন্তু সন্ধ্যা মুখার্জির গানটি আসলে পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে যায় কি না সেটা আরো কয়েকবার ভেবে দেখা যেতে পারে। তাছাড়া ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সংলাপের ভেতর দিয়ে যেভাবে আগেভাগে বলে দেওয়া হচ্ছিল অশরীরি আত্মার কথা, সেটিও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছে।

ছবিতে চব্বিশের জুলাই আন্দোলন ও হবুবধূর অন্ধকারে বসে মশা মারার যে দৃশ্য দেখানো হচ্ছে সেটিকে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত মনে হয়েছে। মাঝে মাঝে অবরুদ্ধ নারীদের সচিত্র উদাহরণ, যেমন রাস্তাঘাটে মেয়েদের অবস্থা, ধর্ষণ-খুনের তথ্য প্রদান, সমকামী দুই মেয়ের বিয়ে নিয়ে সমাজের হিংস্রতার খবর দেখানো, এসবই যথাযথ হয়েছে। মিনতির বোরখা পরে চলা। মেয়ে হয়ে সিগারেট কিনতে যাওয়ার ‘অপরাধে’ হেনস্থা ও মারধরের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাগুলো ছবির গতিমুখ নির্ধারণ করেছে। তাছাড়া, কনের ব্রণ থেকে পুঁজ বের করে দেয়ার দৃশ্যটিও চিন্তার ফল। অর্থাৎ মেয়েটি শরীর থেকে বিষ বের করে দিচ্ছে। তবে টিকটিকির অতিরিক্ত ব্যবহার ছবিটির ভিত কিছুটা নড়বড়ে করে দেয়। বিশেষ করে বারংবার টিকটিকির লেজ খসে পড়া। এই ঘটনাটি বাঙালি ঘরে অশুভ কিছুর লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু সেটা একবার দেখালেই চলতো বলে আমার ধারণা। আবার হঠাৎ গরুর চামড়া ছাড়ানো মাথা এবং বারবার শামুক দেখানোর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। বউ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকা মেয়েটি মানসিক রোগাক্রান্ত সেটি আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু ঘনঘন রূপকের ব্যবহার ছবিটিকে কোথাও কোথাও ভারাক্রান্ত করে তোলে।

ছবির শেষে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলাম। একটি বিষয় ঘুরেফিরে এসেছে— ছবিটি দেখতে একদম পশ্চিমা ধাঁচের হয়েছে, কিন্তু ভেতরের সাংস্কৃতিক যে রূপক সেটা তারা ধরতে পারেননি। আবার আমার কাছে মনে হয়েছে, আমরা যদি আমাদের সংস্কৃতির সবকিছুকেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেই তাহলে সেখানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কথায় কথায় লোকে বলে— জন্ম নেওয়া শিশুর পানি ফেলতে গিয়ে শিশুটাকেও ফেলে দিও না। কাজেই বিয়ের কিছু সংস্কৃতি, যেমন গায়ে হলুদ। এখানে দেখানো হয় গায়ে হলুদের সময় বধূর চামড়ার ভেতরে কিছু নড়েচড়ে উঠছে। প্রেতাত্মা উপস্থিত হয়। বধূটি আসন ছেড়ে উঠে যায়। সবাই বেশ উদযাপন করে সন্ধ্যাটি। এরপর তছনছ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় গায়ে হলুদের পুরো আয়োজন। কিন্তু গায়ে হলুদের বিষয়টি বাঙালি সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরেই চলে আসছে। বধূ ঘরে তোলার আগে হলুদ মেখে তাকে জীবাণুমুক্ত করা হয়। বরের বেলাতেও তাই। দুজনকেই জীবাণুমুক্ত করে নেওয়া হয় একসাথে থাকার প্রস্তুতি হিসেবে। এখন অবশ্য এটি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। তবে মনে রাখা জরুরি, যে কোনো আনুষ্ঠানিকতারই একটি ইতিহাস থাকে। সময়ের দাবি মেনে কিছু আনুষ্ঠানিকতা আমরা বর্জন করি, আবার কিছু রয়ে যায়। ছবিটি দেখার রেশ আমাদের ভেতর রয়ে গিয়েছিল বলেই, লঞ্চে সহযাত্রীদের সাথে আলাপ করতে করতে এসেছি।

লঞ্চ থেকে নেমে শেষ বাস ধরে যখন আমার পাড়ায় পৌঁছেছি, তখন ঘড়িতে সোয়া এগারোটা বেজে গেছে। আজো সেই আগের দোকানটিতে গেলাম। দক্ষিণ ইরাক থেকে আসা কুর্দিস্তানি মানুষদের দোকান। কাবার রুটি বিক্রি করে। আবার ওরা পিৎজাও বানায়। এই মাঝরাতে কাবাব রুটি কিনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবলাম, মানুষ এই যে বিয়ের বিষয়টিকে এতো চাপ হিসেবে নেয়, আবার এই মানুষগুলোই বিয়েটা করতে চায়। বিয়ে এক সামাজিক রীতি। তবে এটি যদি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তিত না হয়, তাহলে বিয়ে জিনিসটা বইয়ের পাতায় ঢুকে যাবে। কোথাও কোথাও ঢুকে গেছে এরইমধ্যে। মানুষ সামাজিক জীব। সে সঙ্গী চায়। আবার নিঃসঙ্গও হতে চায়। কাজেই মানুষ বিচিত্র ও আজব প্রাণীও বটে।