জামিন নিয়ে বের হওয়া এক আল-কায়েদা নেতাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে গোয়েন্দারা

প্রায় ২২ মাস আগে জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। পাঁচটি ছদ্মনাম, ভুয়া পরিচয়ে পাসপোর্ট, ভারতে সন্ত্রাসবিরোধী মামলার তথ্য – আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মাওলানা ইকরামুল হকের উধাও হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে কী? বাংলাদেশে আল-কায়েদার নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার যোগসূত্র কতটা গভীর?

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

আল–কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ (একিউআইএস) শাখার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মাওলানা ইকরামুল হককে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রায় ২২ মাস আগে জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন তিনি।

সবশেষ প্রায় একমাস আগে ইকরামুলের সন্ধানে ময়মনসিংহের সদর উপজেলার বোরোরচরে তাদের বাড়িতে যান গোয়েন্দারা। কিন্তু সেখানেও খোঁজ মেলেনি। 

ইকরামুলের বাবা মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন আলাপ-কে বলেন, “প্রায় একমাস আগে ইকরামুলের সন্ধানে গ্রামে যায় গোয়েন্দারা। ইউপি মেম্বারসহ লোকজনের সাথে কথা বলে তারা। পরে আমার সাথেও তাদের কথা হয়েছে।”

৩৩ বছর বয়সি ইকরামুল তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়।

জয়নালের দাবি, “২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে জামিনে বেরিয়ে আসার পর ইকরামুল নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকার একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন।” 

ইকরামুল কোন মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন, তা অবশ্য জানাতে পারেননি তার বাবা জয়নাল।

ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান আলাপ-কে বলেন, “শুনেছি ইকরামুল হক একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন। তবে কোথায় করছেন জানি না। তিনি ময়মনসিংহে নেই। তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।”

সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী আল-কায়েদা সক্রিয় সেল গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের ‘নেটওয়ার্ক’ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে- জাতিসংঘের এমন সতর্কতার মধ্যেই ইকরামুলের উধাও হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। 

গত ১০ই অগাস্ট নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর প্রতিবেদনে এই সতর্কতার কথা বলে জাতিসংঘ।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০এ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একিউআইএস-কে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। একিউআইএস-এর কথিত বাংলাদেশ শাখা হলো আনসার আল-ইসলাম।

ইকরামুলের পাঁচ ছদ্মনাম

দেশ ও দেশের বাইরে অন্তত পাঁচটি নামে ছদ্মনামে পরিচিত একিউআইএস-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মাওলানা ইকরামুল হক পরিচিত বলে পুলিশের একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। 

প্রকৃত নামের আড়ালে আবু তালহা, মাওলানা সাবেত, নূর হোসেন, মনসুর ও মিলন নামে তিনি কাজ করতেন বলে অভিযোগ। এমনকি বাংলাদেশেও প্রকৃত নাম ইকরামুল হক নয়; একিউআইএস-নেতা হিসাবে মাওলানা সাবেত নামে তার একটি ছদ্মনাম শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। 

২০২৩ সালের ৩০এ মে ঢাকার মাদারটেক থেকে গ্রেপ্তার হন ইকরামুল। গ্রেপ্তার করা হয় তার স্ত্রী ফারিয়া আফরিনকেও। 

১৬ দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পাঠানো হয় গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে।

ওই কারাগারের এক কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, ইকরামুলের হাজতি নম্বর ছিলো ৩৩৯/২৩। ঢাকার সবুজবাগ থানায় দায়ের হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি ছিলেন তিনি।

“জামিন পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ১০ই অক্টোবর কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি,” নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন ওই কর্মকর্তা। 

আর ইকরামুলের স্ত্রী ফারিয়া আফরিন গ্রেপ্তার হওয়ার একমাস পরেই মুক্তি পেয়েছিলেন বলে জানান জয়নাল আবেদীন।  

আল-কায়েদার পথে যাত্রা

পুলিশ জানাচ্ছে, ময়মনসিংহে জন্ম হলেও মাদরাসায় পড়াশোনার সূত্রে ঢাকার ধানমন্ডি ও গেন্ডারিয়ার ফরিদাবাদ এলাকায় বেড়ে উঠেছেন ইকরামুল।

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে ২০১৭ সালে দাওরা-ই-হাদিস পাস করেন ইকরামুল। পরের বছর ভারতে পাড়ি জমান। ভর্তি হন উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায়।

সেখানেই তিনি একিউআইএসের নেটওয়ার্কে যুক্ত হন বলে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। 

সিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ ইকরামুলের নামে সেদেশের বিভিন্ন থানায় ১০টি মামলা রয়েছে। আবু তালহা নামে ছদ্মনামে ভারতে পরিচিত ছিলেন তিনি। 

“ইকরামুল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অবৈধ পথে দেশে আসেন। ২০২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত ময়মনসিংহ থেকে সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করছিলেন তিনি,” বলেন ওই কর্মকর্তা।   

প্রযুক্তিতে দক্ষ, পাসপোর্টে মিথ্যা পরিচয়

সিটিটিসি’র একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০০৭ সালে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের (বেফাকুল মাদারিসিল অ্যারাবিয়া) অধীনে হিফজ পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।

বাংলার পাশাপাশি উর্দু, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা আছে তার। তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ায় একিউআইএসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দাওয়াতি বা দাওয়াহ শাখার শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি মনোনীত হন বলে জানাচ্ছেন ওই কর্মকর্তা।

তার এই দক্ষতা ব্যবহার করে একিউআইএসের সদস্যদের নিয়মিত অনলাইনে দাওয়াহ বিষয়ে ক্লাস তিনি নিতেন বলেও সিটিটিসি ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। 

সিটিটিসি’র আরেক কর্মকর্তা জানান, নূর হোসেন নামে মিথ্যা পরিচয়ে ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়েছিলেন ইকরামুল। সেখানে তার বাবার নাম সাবু মিয়া ও মা নাবিয়া বিবি। ঠিকানা–পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের দিনহাটা।

ইকরামুল স্ত্রী ফারিয়া আফরিনও নাম-পরিচয় বদলে মরিয়ম খাতুন নামে ভারতের আধার কার্ড তৈরি করেন বলে ওই কর্মকর্তা জানান। 

আল-কায়েদার বাংলাদেশ সংযোগ

বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়েদার সঙ্গে বাংলাদেশের ‘জিহাদী’দের পরিচয় নতুন নয়, এর সূচনা গত শতাব্দীর আশির দশকে। 

হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) শাখার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শেখ আবদুস সালাম। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়া জেলার ধুনট থানার পেচিবাড়ী। 

১৯৮৪ সালে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে পড়াশুনা করার সময় পাকিস্তান যান তিনি।

আফগানিস্তানে তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতেই সেখানে যান মাওলানা সালাম। ওই যুদ্ধে কমান্ডার হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন আবদুস সালাম। 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ি, আফগান রণাঙ্গনেই মাওলানা সালাম ও তার সঙ্গীদের সাথে আল-কায়েদার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের পরিচয় হয়। ১৯৮৮ সালের অগাস্ট মাসে প্রতিষ্ঠা হয় আল-কায়েদা। এর আগে ১৯৮৭ সালে আফগানিস্তানের খোস্ত শহরে ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে সালামের সাক্ষাৎ ও বৈঠক হয়। 

২০২১ সালের ৫ই নভেম্বর কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান হুজিবির সাবেক আমির ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক সালাম। তখন তিনি ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। 

শায়খ রহমানের সাথে আল-কায়েদা সংযোগ

২০১৭ সালের এপ্রিলে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো “আল কায়েদার বাংলাদেশ প্রধান আফগানিস্তানে নিহত।” 

ইন্টারনেট নির্ভর যোগাযোগ অ্যাপ ‘টেলিগ্রামে’ প্রচার হওয়া একটি অডিওবার্তার সূত্র ধরে বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরই মূলত বাংলা ট্রিবিউনের শিরোনাম হয়েছিল। অডিও বার্তাটি ছিলো একিউআইএস প্রধান অসীম উমরের বিবৃতি।

বিবৃতিতে বলা হয়, আফগানিস্তানের কান্দাহারে আল কায়েদার হয়ে লড়াই করার সময় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জিহাদি তারিক ওরফে সোহেল নিহত হয়েছেন। 

তারিকের সাথে জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানের যোগাযোগের তথ্য তুলে ধরা হয় বাংলাা ট্রিবিউনের আরেক প্রতিবেদনে। 

২০০৬ সালের ২রা মার্চ সিলেটের পূর্ব শাপলাবাগের ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ থেকে গ্রেপ্তার হন শায়খ রহমান।

২০০৫ সালের ১৪ই নভেম্বর ঝালকাঠিতে সংঘটিত সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহম্মেদ ও জগন্নাথ পাঁড়ে হত্যা মামলার আসমি ছিলেন রহমান তিনি।

ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তার ফাঁসি কার্যকর হয় ২০০৭ সালের ২৯এ মার্চ।

গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে শায়খ রহমান বলেন, “১৯৯৮ সালে ঢাকার মাদারটেকে আল-কায়েদার দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সমন্বয়কারী তারিকের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তারিকের গ্রামের বাড়ি ফেনী।”

জিজ্ঞাসাবাদে শায়খ রহমান বলেন, “ওই আলোচনায় আমি আমার সংগঠনের উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাকে বিস্তারিত অবগত করি। আমরা তার কাছে আল কায়েদার বর্তমান কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি জানান, উসামা বিন লাদেন বর্তমানে সৌদি আরবভিত্তিক জিহাদ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ কথা শুনে ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি। তখন তারিক জানান, তিনি শিগগিরই সৌদি আরব সফর করবেন। এরপর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”