নেতানিয়াহু ভোটে হারলে ইসরায়েল কি যুদ্ধ থেকে সরতে পারবে

নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসন কি এবার শেষের পথে? গাজা, ইরান ও লেবাননে একের পর এক যুদ্ধের চাপ, বাড়তে থাকা জনঅসন্তোষ আর ভোটের মাঠে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের উত্থান– সব মিলিয়ে কঠিন সমীকরণে ইসরায়েলের নির্বাচন। কিন্তু নেতানিয়াহু হারলেই কি থামবে ইসরায়েলের যুদ্ধ?

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ এএম

ইসরায়েলে অতিরক্ষণশীল একটি গোষ্ঠী আছে, যারা হারেদি নামে পরিচিত। সংখ্যায় এরা বেশি না হলেও, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবে এদের ধারেকাছেও কেউ নেই। 

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ১৯ বছর ক্ষমতায় রয়েছে, এর পেছনেও রয়েছে হারেদিদের সমর্থন। 

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিদিনে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সামনে এবার জ্বলন্ত সমস্যা হিসেবে হাজির সেই হারেদিরা।

গাজায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত। লেবানন, সিরিয়া ও ইরানসহ বহুমুখী ফ্রন্টে যুদ্ধ। ইসরায়েল যেন এক অনন্ত সংকটে। বিশ্বজুড়ে ধিক্কার। আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে নেতানিয়াহু। দেশের ভেতরে বাড়ছে ক্ষোভের আগুন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে সমর্থন হারানো। সবকিছু মিলিয়েই নেতানিয়াহুর সামনে জটিল এক হিসাবনিকাশ এসেছে জুটেছে।  

সাধারণ ইসরায়েলিদেরও এখন একটাই প্রশ্ন—এই অবিরাম যুদ্ধের শেষ কোথায়? কিন্তু স্পষ্ট কোনো জবাব নেই নেতানিয়াহুর কাছে।

এই সংকটের মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে দেশটির সাধারণ নির্বাচন। সামনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান।

তাই প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের আসন্ন ভোটেই কি সমাপ্ত হবে নেতানিয়াহু যুগের? তার পতন কি আসন্ন?

যুদ্ধের ময়দানে ব্যস্ত নেতানিয়াহু এবার কি টিকতে পারবেন রাজনীতির ময়দানে? নেতানিয়াহু বিদায় নিলে কার হাতে যাচ্ছে ইসরায়েলের নেতৃত্ব?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- নেতানিয়াহুর বিদায় নিলে কি যুদ্ধ থামবে মধ্যপ্রাচ্যে? 

সাবেক সেনাপ্রধান ও ইসরায়েলের ভোটের হিসাবনিকাশ

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন- প্রশ্ন শুধুই এটা নয়। কারণ, এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে পারে গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পরবর্তী অধ্যায়, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নীতি, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী ভূরাজনৈতিক সমীকরণও।

ভোটের মাঠের সব হিসাবনিশকাশ উলোটপালট করে দিয়েছেন গাদি আইজেনকট। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের ২১তম প্রধান ছিলেন তিনি। সামরিক ক্ষেত্রে তার রয়েছে প্রায় চার দশকের বেশি বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। 

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর দেশটির যুদ্ধকালীন জরুরি বিশেষ ক্যাবিনেটে মন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন আইজেনকট। 

যদিও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করাসহ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে সেই ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। 

আরো একটি ঘটনা ঘটটা রয়েছে তাকে ঘিরে। গাজা যুদ্ধে সামরিক অভিযানে ইসরায়েলি বাহিনীর হয়ে অংশ নেন তার ছোটো ছেলে গাল আইজেনকট এবং গাজাতেই নিহত হন তিনি। 

ওই ঘটনা ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে আইজেনকোটের প্রতি তৈরি করেছে গভীর সহানুভূতি ও গ্রহণযোগ্যতা। এবং তিনিই এখন হয়ে উঠেছেন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

কোন পরিস্থিতির মধ্যে হচ্ছে ইসরায়েলের ভোট 

২৭এ অক্টোবর অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে ইসরায়েলের নির্বাচন। এটিই হবে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। অর্থাৎ, গাজা যুদ্ধ শুরু তিন বছর পর ইসরায়েলিরা ভোট দিচ্ছেন। 

২০২৩ সালে ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহু যেসব যুদ্ধ শুরু করেছেন তার একটিও শেষ হয়নি এখনো। নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা নীতি, যুদ্ধ পরিচালনা এবং তার নেতৃত্বের ওপর এই নির্বাচন কার্যত একটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ তৈরি করবে বলে ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে। 

ইসরায়েল এমন একটি রাষ্ট্র, যারা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে, কিন্তু এড়িয়ে যায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। ব্যতিক্রম ২০২৩ সালের অক্টোবর। 

গাজার যুদ্ধ যেন অনন্তকালের দিকে যাচ্ছে। লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের সঙ্গে চলছে যুদ্ধ। ইসরায়েল নিজেই এখন ক্লান্ত। অনন্ত যুদ্ধ ভাবিয়ে তুলেছে দেশটির সাধারণ মানুষদেরও। 

এর ওপর ইসরায়েলের জন্য ‘অস্বস্তিকর এবং অপর্যাপ্ত’ যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দিয়েছে অ্যামেরিকা। 

গাজা, দক্ষিণ লেবানন এবং সিরিয়ায় নিয়োজিত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বর্তমানে অতিরিক্ত চাপে রয়েছে।

ইসরায়েল তার শত্রুদের ওপর তীব্র আঘাত হানলেও, গাজায় হামাস ও লেবাননে হিজবুল্লাহ উভয়ই এখনো শক্ত অবস্থানে টিকে আছে এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে পুনরায়। 

এমনকি আমেরিকার সামরিক শক্তির সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, দুই দফায় যুদ্ধের পরও, ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে অথবা দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরায়েল। 

এসব যুদ্ধের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়েছে ইসরায়েলকে। গাজায় তাদের নির্মমতার কারণে দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি অ্যামেরিকাসহ পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন কমে যাওয়া। 

পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে ইসরায়েলের সরকারকে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৪৩ শতাংশ। 

ডনাল্ড ট্রাম্প একসময় নেতানিয়াহুকে বর্ণনা করতেন "হোয়াইট হাউজে ইসরায়েল রাষ্ট্রের দেখা সবচেয়ে বড় বন্ধু" হিসাবে। 

সেই ট্রাম্পই অ্যামিরকান-ইরানের আলোচনায় থেকে বাদ রেখেছেন ইসরায়েলকে। এমনকি লেবাননে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করার জন্য নেতানিয়াহুকে "চরম পাগল" বলেও আখ্যায়িত করেন ট্রাম্প। 

আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- নেতানিয়াহু কি এবার সত্যিই হেরে যাচ্ছেন?

ভোটে সমীকরণে কে কোন অবস্থানে 

একাধিক ফ্রন্টে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন গাদি আইজেনকট। মধ্যপন্থি দলটির নাম- ইয়াশার পার্টি। মানে সত্যবাদী বা সৎ দল। 

সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, এই দলই এখন এগিয়ে রয়েছে। 

রয়টার্সের ১৬ই সেপ্টেম্বরের পোলিং এভারেজে দেখা যাচ্ছে, ভোটের মাঠে এগিয়ে রয়েছেন গাদি আইজেনকট। আর পিছিয়ে পড়েছেন নেতানিয়াহু। আইজেনকোটের ইয়াশার দল অনেকটাই এগিয়ে গেছে কট্টর ডানপন্থি লিকুদ পার্টির তুলনায়।

অন্যান্য জরিপেও দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর বিরোধী দলগুলোরই সম্মিলিতভাবে বেশি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। 

কিন্তু এখানেও আছে একটা জটিলতা আছে। ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন সরাসরি হয় না। ইসরায়েলের পার্লামেন্টকে বলা হয় নেসেট। মোট আসন সংখ্যা ১২০টি। 

নির্বাচনের নিয়ম হলো, কোনো দল যদি মোট কাস্টিং ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ না পায়, তবে তারা পার্লামেন্টে কোনো আসনই পাবে না। একে বলা হয় 'ইলেকটোরাল থ্রেশহোল্ড'।

আর যে দলগুলো এই ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পার করতে পারে, তারা প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী ১২০টি আসনের মধ্যে নিজেদের আসন ভাগ করে নেয়। 

আবার সরকার গঠন করতে হলে ১২০ আসনের নেসেট-এ অন্তত ৬১ জন এমপির সমর্থন দরকার। তাই কোনো একটি দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই, সেই দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

আর সর্বশেষ জরিপগুলোতেই এই পার্থক্যটা স্পষ্ট। 

১৬ই সেপ্টেম্বরের চ্যানেল থারটিন-এর জরিপে দেখা যাচ্ছে, আইজেনকটের ইয়াশার দল পেয়েছে ২২টি আসন। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ১৮টি আসন। 

কিন্তু পুরো ব্লক হিসেবে নেতানিয়াহুর সমর্থক দলগুলো পেয়েছে ৫৪টি আসন। বিরোধী ব্লক ৫২টি। আবার যেসব আরব দল রয়েছে, তারা পেয়েছে ১৪টি আসন।

তার মানে- এই আরব জনগোষ্ঠীর আসনগুলো যে জোটের দিকে যাবে, ক্ষমতাই আসতে পারে সেই জোটই। আর এদিক থেকে এগিয়ে আছেন গাদি আইজেনকোট। 

তবে এটাও পরিষ্কার যে, লিকুদ পার্টি দুর্বল হলেও এখনো নির্বাচনি লড়াই থেকে ছিটকে পড়েনি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শিবির। 

তবে এখানে অনেক জড়ো হয়েছে আরো হিসাবনিকাশ। গাদি আইজেনকট নিজেকে তুলে ধরছেন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ হিসেবে। তার সঙ্গে রয়েছে সাবেক ইসরায়েলের সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী। 

এবছরই নতুন দল খুলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত। তার নতুন দল হলো- বেনেত ২০২৬।

বেনেতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের মধ্যপন্থি দল ইয়েশ আতিদ। এবং আইজেনকটের 'ইয়াশার'-এর সঙ্গে গঠন করেছে যৌথ নির্বাচনি জোট। 

শক্তিশালী এই ত্রয়ীর মুখোমুখি এখন নেতাহিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও রক্ষণশীল কয়েকটি দল।    

তাহলে কে হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী? জরিপের ভিত্তিতে নিশ্চিত করে কারও নাম বলা সম্ভব নয়। 

তবে আইজেনকট, বেনেত ও লাপিদের জোট সম্ভাব্য সরকার গঠনের কেন্দ্রে রয়েছেন বলে বেশিরভাগ জরিপে উঠে আসছে।  

যুদ্ধ কি থামবে? ইসরায়েলে হারেদি ও আবর ভোটার সমীকরণ

কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন। আইজেনকটের এই জোট আরব দলগুলোর সমর্থন পাবে কিনা, তার ওপর নির্ভর করছে অনেককিছু। 

আরব দলগুলোর বিষয়ে আলোচনা উঠলেই প্রসঙ্গ আগে যুদ্ধের। প্রশ্ন হলো- নেতানিয়াহু হারলেই কি গাজা যুদ্ধ থেমে যাবে? 

এমন সরল সমীকরণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কারণ, নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবিরের অনেক নেতাই ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্নে রয়েছেন খুবই কঠোর অবস্থানে। 

আইজেনকট নিজেই সাবেক সেনাপ্রধান। ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরে রয়েছে বিস্তৃত সম্মতি। 

বিরোধীদের পার্থক্য কেবলমাত্র কৌশল, সময় এবং কূটনীতির জায়গায়।

তার মানে নেতানিয়াহুর বদলে নতুন সরকারপ্রধান এলে বদলে যেতে পারে যুদ্ধের লক্ষ্য, পদ্ধতি এবং কূটনৈতিক কৌশল। কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিতে রাতারাতি আমূল পরিবর্তন হবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থেমে যাবে- এমনটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে যুদ্ধের মেয়াদ, বন্দি বিনিময়, মানবিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতের প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষেত্রে। পশ্চিম তীরের ক্ষেত্রেও একই কথা। 

কারণ, ইসরায়েলের ধর্মীয় ও ডানপন্থি রাজনৈতিক পরিসরের বড় অংশই পশ্চিম তীরের বিষয়ে রয়েছে কঠোর অবস্থানে। ফলে নেতানিয়াহুর বিদায় মানেই, বসতি স্থাপন ও জমি দখল নিয়ে ইসরায়েল উলটো পথে হাঁটবে, এটাও মনে করার কারণ নেই। 

তাহলে ইসরায়েল কি আরো ডানদিকে ঝুঁকবে? এই প্রশ্নের পুরো উত্তর পাওয়া বেশ জটিল।

একদিকে নেতানিয়াহুর সঙ্গে রয়েছে ডানপন্থি দলগুলোর ঘনিষ্ঠতা। অন্যদিকে আইজেনকটের জোট বিভিন্ন মাত্রায় মধ্যপন্থি, উদারপন্থি বা ধর্মনিরপেক্ষ ভোটকে সংগঠিত করছে।

অর্থাৎ ইসরায়েলি রাজনীতি একদিকে আরও ডানপন্থি হয়েছে, আবার অন্যদিকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মধ্যপন্থি ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক একটি বড় ভোট ব্যাংকও তৈরি হয়েছে।

তবে এটা ডান বনাম বামের লড়াই নয়। এটা হতে পারে- নেতানিয়াহু বনাম নেতানিয়াহু উত্তর ইসরায়েলের লড়াইl

আর এখানেই আসে ইসরায়েলের মুসলিম বা আরব ভোটারদের ভূমিকা।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হলেন আরব জনগোষ্ঠী। ২০ লাখের মতো। ভোটের মাঠে তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। কিন্তু অগ্রাধিকার বিষয়টি সবসময়ই ইহুদি ভোটারদের সমমানের নয়।

ইহুদি ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা। কিন্তু আরব ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো- আরব সমাজের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার বিষয়। তবে আরব দলগুলো সরকার গঠনের অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

সাম্প্রতিক একটি জরিপে, ধারণা করা হচ্ছে, আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে পাবে ১৪টির মতো আসন। সরকার গঠনের জন্য এই সংখ্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকাশ্যে আরবদের সমর্থন নিতে দ্বিধা রয়েছে বিরোধী জোটের মধ্যে। 

অর্থাৎ আরব দলগুলোর ভোটব্যাংক থাকলেও তাদেরকে জোটে নেওয়ার সমস্যা আছে। কারণ, এতে খেপে যেতে পারে রক্ষণশীল ইহুদিরা। মানে আরব দলগুলোর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

এখানেই আসছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর বিষয়। তারা হলো হারেদি। ইসরায়েলের রাজনীতিতের অতি রক্ষণশীল এই গোষ্ঠী অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। সংখ্যায় তারা বিশাল রাজনৈতিক শক্তি না হলেও, নেতানিয়াহুর সরকার টিকিয়ে রাখতে বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে হ্যারেদিরা। এর বিনিময়ে নানা ধরনের সুবিধাও পাচ্ছে রক্ষণশীল ওই গোষ্ঠী।

কিন্তু এখন হ্যারেদিদের সামনেই বড় সংকট। পুরো ইসরায়েল জুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে তাদের বিরুদ্ধে এবং সামরিক বাহিনীতে হারেদি তরুণদের নিয়োগ করা হয়েছে বাধ্যতামূলক। 

হ্যারেদিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রধান কারণ হলো, তারা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বরাবরই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালে যখন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়, তখন ৪০০ জন ধর্মীয় হ্যারেদি পণ্ডিতকে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। আজ এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ হাজারে। 

বর্তমানে ইসরায়েলের জনসংখ্যা ১ কোটি। এদের প্রায় ১৪ শতাংশ হ্যারেদি। কিন্তু উচ্চ জন্মহারের কারণে তারাই এখন দেশের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠী। 

বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত বাড়তে থাকা নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা এবং সরকারি অনুদান পেয়ে থাকে তারা। তাদের অনেক পুরুষ পুরোটা জীবন কাটিয়ে দেন শুধু ধর্মগ্রন্থ তোরাহ পাঠ করেই। তাদের প্রায় অর্ধেকই কোনো কাজ করেন না।

কিন্তু ইসরায়েল ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পুরুষদের বাধ্যতামূলকভাবে সেবা দিতে হয় সেনাবাহিনীতে। যোগ দিতে হয় নারীদেরও। 

বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে ইসরায়েল হলো একটি দেশ, যেখানে নারীদের জন্যও সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। 

কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটছে হ্যারেদিদের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধে যখন অনেক ইসরায়েলি সেনা প্রাণ হারাচ্ছে, তখন হ্যারেদিরা বাড়িতে বসে বসে সরকারি সুযোগ ভোগ করায় তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দিনদিন বেড়েই চলেছে।   

আর এবারের ভোটে শক্তভাবেই ফিরে এসেছে এই ইস্যু। অতি-অর্থোডক্সরা যাতে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিটি চাঙ্গা করে তুলছে সব বিরোধী দলের নির্বাচনি প্রচারণাকে। 

ইসরায়েলে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন কেন একটি বড় জনগোষ্ঠী সামরিক সেবা থেকে ছাড় পাবে? এই প্রশ্ন নিয়ে সমাজে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং বেশিরভাগ মানুষই এখন এই হ্যারেদিদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। 

তার মানে হ্যারেদিদের ভোট নেতানিয়াহুর জন্য দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পদ হলেও, এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক সমস্যাও।

এবার সব হিসাব মিলিয়ে দেখলে কী পাওয়া যাবে? প্রথমত, নেতানিয়াহু দুর্বল হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গাদি আইজেনকটের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। তৃতীয়ত, নেতানিয়াহুবিরোধী ভোটের সংখ্যা বেশি হলেও তারা একক রাজনৈতিক শিবির নয়। চতুর্থত, আরব ও হ্যারেদি দলগুলো উভয়েই সরকার গঠনের ৬১ আসনের অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ। 

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- নেতানিয়াহু হারলেই যে ইসরায়েলের যুদ্ধনীতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বরং পরিবর্তন হতে পারে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিতে, কূটনীতির গুরুত্বে, জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ের কৌশলে, গাজা-পরবর্তী পরিকল্পনায় এবং পশ্চিম তীরের নীতিতে।

মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এর অর্থ কী?

নেতানিয়াহুর বদলে যদি আইজেনকট বা অন্য কোনো মধ্যপন্থি সরকার আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ভাষা বদলাতে পারে। 

ইরান, সৌদি আরব, মিশর, জর্ডান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সমীকরণেও পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু যদি ডানপন্থি জোট আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে ইসরায়েলের বর্তমানের নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণবাদী বহাল থাকতে পারে নীতির ধারাবাহিকতাই। 

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- নেতানিয়াহু পরবর্তী ইসরায়েল কি সত্যিই নতুন কোনো রাজনৈতিক যুগে ঢুকবে? নাকি পুরোনো জোটই নতুন মুখ নিয়ে ফিরে আসবে?