এমবাপ্পে নাকি ইয়ামাল: ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে কে এগিয়ে?

ব্যালন ডি’অর কি শুধুই ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার, নাকি দলীয় সাফল্যও সেখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ? এবারের দৌড়ে সেই দুই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন লামিন ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। গোল, রেকর্ড ও ব্যক্তিগত কীর্তিতে এমবাপ্পে যেমন নিজের দাবি শক্ত করেছেন, তেমনি ট্রফি, সৃজনশীলতা ও বড় ম্যাচের প্রভাবে পিছিয়ে নেই ইয়ামালও। দুজনেরই ব্যালন ডি’অর জেতার মতো যথেষ্ট ক্যালিবার আছে। তাহলে শেষ হাসিটা কে হাসবেন?

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

খেলার আলাপ এখন খালি মাঠে না, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা চায়ের কাপে অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতেও থাকে জমজমাট। পাঁড় ফুটবল ভক্তদের জন্য ব্যালন ডি’অরের লড়াইটা তো আরও কয়েক কাঠি সরেস। মেসি-রোনালদো এখনো প্রাসঙ্গিক, তবে বলতেই হয়, তারকাদের ‘জেনারেশন শিফট’ হওয়ার সময় এখন। নতুনদের নিয়ে উত্তেজনার পারদটাই এখন তুঙ্গে। 

কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের দাবিটা রেখেছেন গোল, রেকর্ড আর ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ওপর। লামিন ইয়ামালের যুক্তি আবার ট্রফি, সৃজনশীলতা ও বড় ম্যাচে প্রভাবের ওপর। দুজনের দাবি প্রায় একই যে বিশ্বের সেরা হওয়ার দাবিদার তারা, আর এবারের ব্যালন ডি’অরও তাদের প্রাপ্য। কিন্তু ফুটবল যখন ব্যক্তিগত পুরস্কার আর দলীয় সাফল্যের মাঝখানে বাঁধ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্নটা আরও শাঁখের করাতের মতো বললে ভুল হয় না। কে তাহলে সেরা? মাঠের পারফরম্যান্সে সেরা, নাকি দল জেতার সংখ্যায় এগিয়ে যাওয়া?

আর মজার ব্যাপার হলো, এই দুই যুক্তির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছেন হ্যারি কেইন। এমবাপ্পের মতো তার গোল আছে, ইয়ামালের মতো তার হাতেও আছে ট্রফি। বিশ্বকাপেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ইংল্যান্ডকে নিয়ে গেছেন তৃতীয় স্থানে। তাই এমবাপ্পে ও ইয়ামালের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি যতই জোরালো হোক, তাদের বিতর্কের মাঝখানেই যেন দাঁড়িয়ে আছে আরও একটি প্রশ্ন, ব্যালন ডি’অর কি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার, দলীয় সাফল্যের পুরস্কার, নাকি দুটির নিখুঁত সমন্বয়ের?

এমবাপ্পে বলছেন, আমিই সেরা

নিজের দাবিটা লুকোছাপার দিকে যাননি এমবাপ্পে। নিজেকে নিয়ে তার সোজাসাপ্টা দাবি, “গত মৌসুমে আমার চেয়ে ভালো কেউ ছিলো না।”

শুধু আত্মবিশ্বাস নয়, সংখ্যাও তার পক্ষে। ২০২৫–২৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্সের হয়ে ৬০ ম্যাচে এমবাপ্পের গোল ৫৮টি, অ্যাসিস্ট ১৩টি মিলে মোট ৭১ গোল-অবদান। লা লিগায় ২৫ গোল, চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৫ এবং বিশ্বকাপে ১০ গোল করে তিন প্রতিযোগিতাতেই সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি।

বিশ্বকাপের ১০ গোল তাকে দিয়েছে গোল্ডেন বুট। আর বিশ্বকাপে তার মোট গোল এখন ২২, যেটি প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসেই সর্বোচ্চ। অর্থাৎ শুধু গোল বেশি করেছেন, এমন নয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় তিন মঞ্চেই গোলের রাজা এমবাপ্পে।  লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ, ফুটবলের তিন বড় মঞ্চেই গোলের দৌড়ে সবার ওপরে এমবাপ্পে।  

এটাই এমবাপ্পের তুরুপের তাস।

ব্যালন ডি’অর যদি ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার হয়, তাহলে এমবাপ্পেকে এড়ানো করা কঠিন।

কিন্তু সমস্যা ট্রফি নিয়ে। রেয়াল মাদ্রিদ গত মৌসুমে বড় কোনো শিরোপা জেতেনি। চ্যাম্পিয়নস লিগে থামতে হয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে, আর বিশ্বকাপেও ফ্রান্স উঠতে পারেনি ফাইনালে।

তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়, এত গোল করেও দলকে বড় ট্রফি এনে দিতে না পারার দায় কি ব্যালন ডি’অরের ভোটে পড়বে?

এমবাপ্পের দাবি গত মৌসুমে তার চেয়ে ভালো কেউ ছিলো না।

ইয়ামালের কথা, ট্রফি তারই প্রাপ্য

ইয়ামালের উত্তরটা আবার অন্যরকম। তার মতে, এমবাপ্পে আর তিনি বিশ্বের সেরা দুই খেলোয়াড়। কিন্তু এবারের পুরস্কার তার প্রাপ্য। 

এখানে সংখ্যায় এমবাপ্পের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবেন না ইয়ামাল। তবে তার গল্পটা গোলের চেয়ে বড়।

বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা, স্প্যানিশ সুপার কাপ। স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ। সঙ্গে লা লিগার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ২৫ গোলের সঙ্গে ২০ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে মোট ৪৫ গোল-অবদান। আর ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ওপেন প্লে থেকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করেছেন তিনিই।

অর্থাৎ এমবাপ্পে যেখানে গোলের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ইয়ামাল অনেক সময় সেই আক্রমণের শুরুটাও করেছেন।

আর এখানেই ইয়ামালের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি স্রেফ ফলাফল তৈরি করেননি, খেলাটাও তৈরি করেছেন। তারপর আছে বয়স। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইউরো, নেশনস লিগ ও বিশ্বকাপ জিতেছেন। টানা দুই বছর কোপা ট্রফি জিতেছেন এবং ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন।

তবে ইয়ামাল গোলের হিসেবে এখানে বেমানান।

স্পেন বিশ্বকাপ জিতেছে, কিন্তু ইয়ামালের ব্যক্তিগত গোল মাত্র একটি। বিপরীতে এমবাপ্পে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন। স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের সেরা ব্যক্তিগত পুরস্কারও পেয়েছেন রদ্রি। তারমানে বিশ্বকাপের দলীয় সাফল্য ইয়ামালের পক্ষে গেলেও, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাল্লা সেখানে এমবাপ্পের দিকেই ঝুঁকেছে।

ইয়ামালের মতে এমবাপ্পে আর তিনি বিশ্বের সেরা দুই খেলোয়াড়।

মুখোমুখি লড়াই

ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে ব্যক্তিগত সংখ্যার পাশাপাশি বড় ম্যাচের স্মৃতিও ভোটারদের মনে থাকে। আর সেখানেই এমবাপ্পে ও ইয়ামালের গল্পটা অদ্ভুতভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।

এখন পর্যন্ত ১১ বার একে অন্যের বিপক্ষে খেলেছেন দুজন। ফলাফল ইয়ামালের দল জিতেছে নয়বার, এমবাপ্পের দল মাত্র দুবার। কোনো ড্র নেই। চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে শুরু করে ইউরো, লা লিগা, স্প্যানিশ সুপার কাপ, কোপা দেল রে, নেশনস লিগ এমনকি সবশেষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও শেষ হাসি হেসেছে ইয়ামালের দল। 

এখন পর্যন্ত ১১ বার মুখোমুখি হয়েছে এমবাপ্পে ও ইয়ামাল।

প্রথম বড় সংঘর্ষে অবশ্য গল্পটা ছিলো এমবাপ্পের। ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালের সেকেন্ড লেগে পিএসজির হয়ে বার্সেলোনাকে ৪–১ গোলে হারিয়ে জোড়া গোল করেছিলেন ফরাসি তারকা। কিন্তু এরপর থেকেই যেন পাল্টে যায় গল্পের চিত্রনাট্য।

ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে স্পেন হারায় ফ্রান্সকে। এরপর বার্সেলোনার হয়ে ইয়ামাল রেয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে জেতেন লা লিগা, স্প্যানিশ সুপার কাপ ও কোপা দেল রের ম্যাচে। নেশনস লিগের সেমিফাইনালেও স্পেন হারায় ফ্রান্সকে ৫–৪ গোলে। সবশেষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও ফ্রান্সের সামনে দাঁড়িয়ে ২–০ ব্যবধানে জয় পায় স্পেন।

অর্থাৎ এমবাপ্পে ব্যক্তিগত সংখ্যায় যতই এগিয়ে থাকুন না কেন, ইয়ামালের পক্ষে আছে অন্যরকম এক গল্প। বড় মঞ্চে, বড় ম্যাচে, বারবার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ানো এমবাপ্পেকে হারানোর গল্প।

অবশ্য এই রেকর্ডের বেশিরভাগই দলীয় সাফল্য, প্রতিবারের জয়কে সরাসরি ইয়ামালের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব বলা যায় না। কিন্তু ব্যালন ডি’অরের মতো পুরস্কারে বড় ম্যাচের স্মৃতি, প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ধারাবাহিক সাফল্য এবং একজন খেলোয়াড়ের তৈরি করা বয়ান কতটা প্রভাব ফেলে, সেটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।

তাহলে ট্রফি নাকি ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব?

এখানেই বিতর্কটা জটিল হয়ে যায়। জোসে মরিনহো যেমন বলেছেন, শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগ বা বিশ্বকাপ জিতলেই ব্যালন ডি’অর দেওয়া উচিত নয়। কারণ এটি দলীয় সাফল্যের পুরস্কার নয়।

কিন্তু মরিনহোই আবার বলেছেন যে “৬০ গোলের চেয়ে শিরোপাসহ ৪০ গোলই আমি পছন্দ করি।”

মরিনহোর দুই বক্তব্যের মাঝেই যেন এবারের ব্যালন ডি’অরের আসল ধাঁধাটা লুকিয়ে আছে। শুধু ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বিচার করলে এমবাপ্পের যুক্তি শক্তিশালী। ট্রফিকে হিসাব আমলে নিলে ইয়ামাল এগিয়ে যান। কিন্তু দুটোকে একই পাল্লায় তুললে? সেখানে কিন্তু দুজনকেই সাইড করে দিয়ে সামনে চলে আসেন হ্যারি কেইন। 

কেইন কেন ‘অন্য লেভেলে’?

এমবাপ্পে ও ইয়ামালের বিতর্কটা যেন ব্যালন ডি’অরের দুই পুরোনো দর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বনাম দলীয় সাফল্য। কিন্তু হ্যারি কেইনের কেসটা অন্যরকম। তার মৌসুমে এই দুই যুক্তিই পাশাপাশি দাঁড়ানোর মতো উপাদান আছে।

বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৬১ গোল, বুন্দেসলিগা ও ডিএফবি-পোকালের শিরোপা, ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে ছয় গোল ও এক অ্যাসিস্ট এবং জাতীয় দলকে তৃতীয় স্থানে তোলার কীর্তি, কেইনের মৌসুমে ব্যক্তিগত সংখ্যা যেমন বিশাল, দলীয় সাফল্যের উপস্থিতিও তেমন স্পষ্ট। চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্ন শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে থামলেও গুরুত্বপূর্ণ গোলের মাধ্যমে সেখানে নিজের প্রভাব রেখেছেন কেইন।

অর্থাৎ এমবাপ্পের মতো তার হাতে ভয়ংকর ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান আছে, আবার ইয়ামালের মতো বড় ট্রফিও আছে। এই দুই যুক্তির মাঝখানে কেইন একেবারে পুরো একাই একশো। 

এমবাপ্পে-ইয়ামালের ব্যালন ডি’অর লড়াইয়ে দুজনের মাঝেই এগিয়ে কেইন।

শেষ হাসি কার?

তাই এবারের ব্যালন ডি’অরের লড়াইটা আসলে শুধু ইয়ামাল বনাম এমবাপ্পে নয়।

এটা ফুটবলের পুরোনো এক প্রশ্ন আবার সামনে তুলে এনেছে? যে সবচেয়ে বেশি করেছে, যে সবচেয়ে বেশি জিতেছে, নাকি যে দুটোই একসঙ্গে করেছে? এমবাপ্পের হাতে গোল, রেকর্ড আর বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট। ইয়ামালের হাতে ট্রফি, সৃজনশীলতা আর বড় ম্যাচে বারবার এমবাপ্পেকে হারানোর গল্প। আর দুজনের মাঝখানে কেইন দাঁড়িয়ে আছেন গোল, ট্রফি ও বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স, সব মিলিয়ে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এক মৌসুম নিয়ে।

শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন হিসাবকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন? ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব, বড় মঞ্চের প্রভাব, দলীয় সাফল্য, নাকি পুরো মৌসুমের পূর্ণতা?

উত্তর মিলবে ২৬ অক্টোবর, লন্ডনে।