কানাডার সামনে দুই পথ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাইছে, দেশটি তাদের দলে ভিড়ুক। ওদিকে আমেরিকার কথা, কানাডার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়াকে মোটেই ভালো চোখে দেখবে না তারা। একদিকে ইউরোপের সাথে জুড়ে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি, অন্যদিকে আমেরিকার সাথে টানাপোড়েনের সম্পর্ক আর চাপ। কোনদিকে ঝুঁকবে কানাডা?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কানাডাকে পূর্ণাঙ্গ নয়, সহযোগী সদস্য করে পেতে চাইছে। যদিও সহযোগী সদস্য বা অ্যাসোসিয়েট সদস্য নামের কোনো আক্ষরিক পদ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নে নেই। কানাডা যদি যোগ দেয়, তারাই হবে ইইউর প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’।
কিছু দেশ অবশ্য রয়েছে, যেগুলো ঠিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, আবার পুরোপুরি বাইরেও নয়। এরা ইইউর কিছু নিয়ম মেনে চলে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইইউর বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়, শেনজেন ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত থাকে। আবার ইউরোপের বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা কর্মসূচিতেও অংশ নেয়। তবে তাদের জন্য আলাদা কোনো ধরনের সদস্যপদের কথা বলা নেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিক থেকে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।
এই প্রশ্নগুলো এখন নতুন করে সামনে এসেছে কানাডাকে ঘিরে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য ও নীতিগত টানাপোড়েনের মধ্যে কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ১৬ই সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ করার সম্ভাবনার কথা বলেন।
কানাডাকে কেন কাছে টানছে ইইউ?

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন ১৬ই সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তার বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দেন। এ সময় তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইউরোপকে নিজেদের অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
এরপর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “কানাডাকে ইইউর প্রথম অ্যাসোসিয়েট মেম্বার করার দরজা খুলতে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই।”
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কানাডার সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, আর্কটিক অঞ্চল, এআই, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো বিষয় গুরুত্ব পাবে।
অর্থাৎ, শুধু পণ্য কেনাবেচা নয়, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে ইউরোপ।
‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ মানে কী?

ইউরোপীয় ইউনিয়নে এখন ২৭টি পূর্ণ সদস্য দেশ রয়েছে। এসব দেশ ইইউর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয়। কানাডার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ ব্যবস্থা হলে দেশটি ইইউর পূর্ণ সদস্য হবে না। তবে পূর্ণ সদস্য না হয়েও জোটটির সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। অ্যাসোসিয়েট মেম্বার নামে ইইউর কোনো নির্দিষ্ট আইনি মর্যাদা নেই। তাই কানাডার জন্য প্রস্তাবিত ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ ব্যবস্থা আগের কোনো কাঠামোর মতো হবে, নাকি একেবারেই নতুন কিছু হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের জার্মান সদস্য ও ইইউ-কানাডা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাবের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক টোবিয়াস ক্রেমারও বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন। তার বক্তব্য, “এর প্রকৃত অর্থ কী হবে, তা আমরা এখনো সত্যিকার অর্থে জানি না।”
বিষয়টি সহজ করে বোঝাতে একটি ক্লাবের উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরা যাক, একটি ক্লাবে ২৭ জন পূর্ণ সদস্য আছে। তারা ক্লাবের সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এখন ক্লাবের বাইরে থাকা একজনকে বিশেষ অংশীদার করা হলো। সে ক্লাবের সব সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, কিন্তু ক্লাবের কিছু কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে এবং বিশেষ কিছু সুবিধা পেতে পারে।
কানাডার ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমন হতে পারে। দেশটি ইইউর পূর্ণ সদস্য না হয়েও বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, এআই, মহাকাশ ও নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইইউর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারবে।
কানাডা কী চাইছে?

কানাডার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দুই দেশের মধ্যে বিপুল বাণিজ্য রয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ও বাণিজ্যনীতির কারণে সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এ কারণে কানাডা এখন ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাড়তি নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে কার্নি বলেন, “কানাডা ও ইউরোপের শক্তি একে অন্যের পরিপূরক। লক্ষ্য স্বনির্ভরতা নয়। লক্ষ্য হলো সম্মিলিতভাবে আরও শক্তিশালী হওয়া।”
তবে কার্নি একটি বিষয় পরিষ্কার করেছেন, কানাডা ইইউর পূর্ণ সদস্য হতে চাইছে না।
আল জাজিরার প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, কানাডা একটি নতুন ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়, কিন্তু পূর্ণ সদস্য হওয়ার লক্ষ্য তার নেই।
এখানে ইউরোপেরও স্বার্থ রয়েছে। কানাডার রয়েছে বিপুল জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ। আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যাটারি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এসব সম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে।
আবার কানাডার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আর্কটিক অঞ্চল নিয়েও ইউরোপের আগ্রহ রয়েছে। চ্যাটহাম হাউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কানাডা-ইইউ সম্পর্ক এখন শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে?

কানাডা ও ইইউর এই ঘনিষ্ঠ হওয়ার উদ্যোগে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এপি ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ, কানাডাকে ইইউর ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ করার উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্র ‘শত্রুভাবাপন্ন পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখতে পারে- এমনটাই বলেছেন ট্রাম্প। এমন হলে ইউরোপের ওপর আরও শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে “হাস্যকর” বলেও মন্তব্য করেছেন।
তবে ইউরোপীয় কমিশন বলছে, কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র ওলফ গিল বলেন, “কানাডার সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্ব শক্তিশালী করার প্রস্তাবটি অন্য কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং আমাদের যৌথ শক্তির জন্য।” কানাডার পক্ষ থেকেও একই ধরনের বক্তব্য এসেছে।
কানাডার ইইউ রাষ্ট্রদূত-মনোনীত জোনাথন উইলকিনসন বলেন, “এটি ট্রাম্পবিরোধী বা আমেরিকাবিরোধী নয়, চীনবিরোধীও নয়।” তার মতে, একই মূল্যবোধের দেশগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করাই এর উদ্দেশ্য।
ইইউর সদস্য দেশগুলো কি রাজি?
এটি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি। কারণ ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট প্রস্তাব দিলেই বিষয়টি কার্যকর হয়ে যাবে না।নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক তৈরি করতে হলে ইইউর ২৭টি সদস্য দেশের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
এপি’র তথ্যানুযায়ী, এরই মধ্যে জার্মানি জানিয়েছে, তারা কানাডার সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ নামটি নিয়েই তাদের কিছু আপত্তি রয়েছে।
অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলেন ম্যাকএন্টি বলেছেন, আয়ারল্যান্ড কানাডার জন্য অ্যাসোসিয়েট মেম্বারশিপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।
অর্থাৎ সব দেশ এখনো একমত নয়। বিষয়টি নিয়ে সামনে আরও আলোচনা হবে।
তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কানাডার ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ হওয়া এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
কানাডা ও ইইউকে ঠিক করতে হবে, এই সম্পর্কের আওতায় কী কী থাকবে।
কার্নি বলেছেন, “বিষয়টি আসলে কী নাম দেওয়া হচ্ছে, তা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা একসঙ্গে কী তৈরি করছি।” চ্যাটহাম হাউজের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ নামের চেয়ে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে এর ভেতরে কী ধরনের বাস্তব সহযোগিতা থাকে।
অর্থাৎ, কানাডা এখনই ইইউর ২৮তম সদস্য হতে যাচ্ছে না। বরং দুই পক্ষ এমন একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে, যেখানে সদস্যপদ ছাড়াই যতটা সম্ভব কাছাকাছি আসা যায়।
তবে সেই সম্পর্ক কতটা গভীর হবে, কানাডা কতটা সুবিধা পাবে এবং ইইউর ২৭ সদস্য দেশ শেষ পর্যন্ত এতে কতটা সম্মতি দেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



