একটি টেলিকম কোম্পানি গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় কীসের ভিত্তিতে? মিয়ানমারের মতো দেশে যখন চাপের মুখে টেলেনর তার গ্রাহকের তথ্য সরকারের হাতে তুলে দিচ্ছে তাহলে বাংলাদেশের নাগরিকদের তথ্য গ্রামীনফোনসহ অন্যান্য টেলিকম কোম্পানির কাছে কতটা নিরাপদ?
তানজিলা রহমান
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৮ পিএমআপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
একটি মোবাইল ফোনের নাম্বার। শুধু কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের পরিচয়, অবস্থান এবং ব্যক্তিগত তথ্য। এই তথ্যই যদি কোনো দেশের সামরিক বাহিনীর হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে কী হতে পারে? এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে নরওয়েভিত্তিক টেলিকম জায়ান্ট টেলেনরকে ঘিরে। টেলেনরের সাথে গ্রামীণফোনের সংশ্লিষ্টতা যেহেতু রয়েছে, কাজেই বিষয়টি বাংলাদেশের গ্রাহকদের প্রেক্ষিতেও ঝুঁকির প্রশ্ন তুলে আনে।
অভিযোগ, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ টেলেনরের কাছে বিভিন্ন গ্রাহকের তথ্য চাইতো। বিশেষ করে অভ্যুত্থানবিরোধী হিসেবে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের তথ্য চাওয়া হতো। মামলাকারীদের দাবি, অন্তত ১ হাজার ২৫৩টি ফোন নম্বরের তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া হয়েছিলো। এসব তথ্যের মধ্যে ছিলো গ্রাহকের নাম, ঠিকানা, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, অবস্থান এবং কল লগের মতো সংবেদনশীল তথ্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
২০২৬ সালের এপ্রিলে মিয়ানমারের গ্রাহকদের পক্ষে নরওয়ের আদালতে টেলেনরের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা হয়। মামলাটি করে সুইডেনভিত্তিক সংগঠন ‘জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইনিশিয়েটিভ’ (জেএআই)। আর ১৫ই সেপ্টেম্বর নরওয়ের পুলিশ টেলেনরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার সন্দেহে তদন্ত শুরু করে এবং ওই দিনই টেলেনরের ওসলো সদর দপ্তরে তল্লাশি চালানো হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টেলেনর এখনো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়নি। তদন্ত চলছে এবং কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়নি। উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে জানিয়েছে, সে সময়ে সরকারের চাপের কারণেই তারা তথ্য দিতে বাধ্য হয়েছিলো।
তবে টেলেনরের বয়ান বা একটি নির্দিষ্ট দেশের পরিস্থিতি এখানে কেবলই একটি উদাহরণ। কোনো সরকারের চাপ প্রয়োগে প্রতিষ্ঠান যদি গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য তাদের অজান্তেই কারো হাতে তুলে দেয়, সেটি গ্রাহকের জন্য খুবই শঙ্কার বিষয়। এই ঘটনা তাই শুধু মিয়ানমারে একটি টেলিকম কোম্পানির কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় একটি বিষয়। তা হলো, কোনো দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে পড়লে একটি টেলিকম কোম্পানি তার গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারে?
টেলেনর কারা?
বাংলাদেশের মানুষের কাছে টেলেনর নামটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত গ্রামীণফোনের মাধ্যমে। নরওয়েভিত্তিক টেলেনর একটি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। টেলেনরের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৫ সালে নরওয়েতে টেলিগ্রাফ সেবা চালু হয়। এরপর ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘টেলেনর’ রাখা হয়। ১৯৯০-এর শেষ দিকে ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যবসা শুরু করে টেলেনর।
বর্তমানে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে টেলিযোগাযোগ সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। টেলেনরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে তাদের গ্রাহকসংখ্যা ১১ কোটি ৪০ লাখের বেশি। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির বার্ষিক আয় ছিলো প্রায় ৭৭ বিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রোনার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য ১ লাখ ১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা।
টেলেনরের মালিকানার সঙ্গেও নরওয়ে সরকারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ২৭এ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, নরওয়ে সরকারের হাতে টেলেনরের ৫৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ শেয়ার।
বাংলাদেশে টেলেনরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে গ্রামীণফোনের মাধ্যমে। গ্রামীণফোনে টেলেনর মোবাইল কমিউনিকেশনসের মালিকানা ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ। গ্রামীণ টেলিকমের হাতে রয়েছে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং বাকি ১০ শতাংশ সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের।
অর্থাৎ, গ্রামীণফোন একটি বাংলাদেশি কোম্পানি হলেও এর সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার টেলেনর।
অভিযোগের শুরু কোথায়?
টেলেনরকে ঘিরে মিয়ানমারের বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ২০২১ সালে।
সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। এরপর শুরু হয় ব্যাপক দমন-পীড়ন। এই পরিস্থিতিতে টেলেনর মিয়ানমার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০২২ সালের মার্চে দেশটির কার্যক্রম বিক্রি করে বেরিয়ে যায়। তখন মিয়ানমারে টেলেনরের গ্রাহক ছিলো প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ।
কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াই নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
ডিজিটাল অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা ছিলো, টেলেনরের কাছে থাকা গ্রাহকদের সংবেদনশীল তথ্য নতুন মালিকের হাতে গেলে তা সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
এর মধ্যেই মিয়ানমারের ৪৭৪টি নাগরিক সমাজ সংগঠন টেলেনরের বিরুদ্ধে নরওয়ের ওইসিডি ন্যাশনাল কনট্যাক্ট পয়েন্ট-এর কাছে অভিযোগ করে। অভিযোগের মূল বিষয় ছিলো, মিয়ানমার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় টেলেনর তার গ্রাহকের মানবাধিকার ঝুঁকি মূল্যায়ন করেনি।
কোন তথ্য ছিলো টেলেনরের কাছে?
একজন মোবাইল গ্রাহক কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন, কতক্ষণ কথা বলেছেন কিংবা কোন এলাকায় ছিলেন– এসব তথ্য থেকেই একজন মানুষের চলাফেরা ও যোগাযোগের একটি চিত্র তৈরি করা সম্ভব।
মিয়ানমারের ঘটনায় অভিযোগ করা হয়েছে, টেলেনরের কাছে থাকা তথ্যের মধ্যে ছিলো নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয় নম্বর, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং কল লগ। কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ই-ওয়ালেটের তথ্যও সংরক্ষিত ছিলো বলে মামলাকারীরা দাবি করেছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। তা হলো ‘কল ডেটা রেকর্ড’ বা সিডিআর-এ সাধারণত ফোনে কী কথা বলা হয়েছে বা মেসেজের ভেতরে কী লেখা হয়েছে, তা থাকে না। বরং কলের সময়, নম্বর, সময়কাল এবং কোন নেটওয়ার্ক বা টাওয়ারের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এ ধরনের তথ্য থাকতে পারে।
এই তথ্যও অবশ্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, কার সঙ্গে একজন ব্যক্তি নিয়মিত যোগাযোগ করছেন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে তিনি কোন এলাকায় ছিলেন এসব তথ্য থেকেও সেই ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ ও চলাচল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
১ হাজার ২৫৩ নম্বরের তথ্য দেওয়ার অভিযোগ
২০২৬ সালের ৮ই এপ্রিল ‘জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘জেএআই’ নরওয়ের আদালতে টেলেনরের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা করে।
মামলাকারীদের দাবি, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে টেলেনর মিয়ানমার ছাড়ার আগ পর্যন্ত সামরিক কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট গ্রাহকের তথ্য চাইতো। বিশেষ করে অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করছে বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের তথ্য চাওয়া হতো।
জেএআই-এর দাবি, অন্তত ১ হাজার ২৫৩টি ফোন নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া হয়েছিলো। তবে ঠিক কতজন গ্রাহকের তথ্য সামরিক বাহিনীর কাছে গিয়েছিলো, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। মামলায় আরও বলা হয়েছে, টেলেনর জানতো যে এসব তথ্য প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অং থু ও ফিও জেয়া থওর ঘটনা
এই মামলায় সামনে এসেছে দুই ব্যক্তির ঘটনা। অং থু এবং ফিও জেয়া থও।
অং থু ছিলেন মিয়ানমারের একজন সিভিল সোসাইটি কর্মী। মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সামরিক কর্তৃপক্ষ তার ফোনের তথ্য চেয়েছিলো। মামলাকারীদের দাবি, টেলেনর জানতো এই তথ্য প্রকাশ করলে তার গ্রেপ্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরে অং থুকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তার গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে টেলেনরের দেওয়া তথ্য সরাসরি ব্যবহার হয়েছিলো কি না, সেটি আদালতে প্রমাণিত নয়।
আরেকটি ঘটনা মিয়ানমারের জনপ্রিয় হিপহপ শিল্পী ও সাবেক আইনপ্রণেতা ফিও জেয়া থওকে ঘিরে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩১এ অক্টোবর সামরিক কর্তৃপক্ষ তার ফোন নম্বরের কল লগ চায়। অভিযোগ উঠেছে টেলেনর সেই তথ্য দিয়ে দেয়। এরপর নভেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং জুলাইয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তার স্ত্রী থা জিনও টেলেনরের বিরুদ্ধে মামলায় একজন বাদী।
তবে এখানেও একই কথা প্রযোজ্য। ঘটনা দুটি অভিযোগ, সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।
সেপ্টেম্বরে তদন্ত, টেলেনরের সদর দপ্তরে তল্লাশি
এপ্রিলের মামলার কয়েক মাস পর, ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বিষয়টি আরও বড় আকার নেয়।
নরওয়ের পুলিশ টেলেনরের বিরুদ্ধে মিয়ানমারে গ্রাহকের তথ্য হস্তান্তরের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার সন্দেহে তদন্ত শুরু করে। একই সঙ্গে নরওয়ের ‘পিএসটি’ বা ‘পুলিশ সিকিউরিটি সার্ভিস’ নিষেধাজ্ঞা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও তদন্ত করছে। অভিযোগের একটি অংশ হলো, মিয়ানমার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সময় নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন নজরদারি সরঞ্জাম যথাযথ অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর করা হয়েছিলো কি না। অন্য অভিযোগ হলো, গ্রাহকদের পুরোনো তথ্য মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষকে দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে কোনোভাবে সহায়তা করেছিলো কি না।
সেদিন নরওয়ের ‘ফোরনেবু’-তে টেলেনরের সদর দপ্তরেও তল্লাশি চালানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়নি। তদন্তের আওতায় রয়েছে শুধু টেলেনর কোম্পানি।
কী বলছে টেলেনর?
টেলেনরের কথা হচ্ছে, বাধ্য হয়ে তারা কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খুবই চাপের মধ্যে এবং কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের সম্পর্ক বজায় রাখতে হতো। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে তাদের কর্মীরা ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলে কর্মীদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি ছিলো।
রয়টার্সকে -কে দেওয়া এক বক্তব্যে কোম্পানি বলেছে, “আমাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিলো না।”
টেলেনরের মতে, সামরিক বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করলে স্থানীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারত। তাই গ্রাহকের তথ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কর্মীদের জীবন ও নিরাপত্তাকেও বিবেচনায় নিতে হয়েছে।
টেলেনরের মিডিয়া রিলেশনস ডিরেক্টর ডেভিড ফিডজেল্যান্ডের ভাষায়, পরিস্থিতি এতটাই কঠিন ছিলো যে কোম্পানিটি মনে করেছিলো তাদের সামনে বাস্তবে কোনো বিকল্প ছিলো না।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলছে, তারা ইচ্ছামতো সামরিক বাহিনীর হাতে তথ্য তুলে দেয়নি। কর্তৃপক্ষের অনুরোধের আইনি ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য মানবাধিকার ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো বলে তাদের দাবি।
টেলেনরের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে থাকা অবস্থায় তারা ‘ল’ফুল ইন্টারসেপশন’ বা এলআই প্রযুক্তি সক্রিয় করেনি। কোম্পানিটি আরও বলেছে, তারা স্থানীয় আইনি কাঠামো, ডিজিটাল দক্ষতা এবং ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্টিং-এর মতো বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করেছিলো।
বর্তমান তদন্ত নিয়েও টেলেনর বলেছে, তারা নরওয়ের পুলিশের সঙ্গে পুরোপুরি সহযোগিতা করবে এবং ইতোমধ্যে তদন্তকারীদের বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য দিয়েছে।
মিয়ানমার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন?
টেলেনর ২০২১ সালে মিয়ানমার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও ব্যবসা বিক্রি করার প্রক্রিয়াটি নিয়েও সমালোচনা হয়।
কোম্পানির ভাষায়, এটি ছিলো একটি ‘ফোর্সড এক্সিট’, অর্থাৎ বাধ্য হয়ে বেরিয়ে যাওয়া।
টেলেনরের যুক্তি ছিলো, মিয়ানমারে থাকা অবস্থায় কর্মীদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে গিয়েছিলো। একই সঙ্গে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মোবাইল সেবা চালু রাখা এবং প্রায় ৭৫০ কর্মীর চাকরি ধরে রাখার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়েছিলো।
কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা ছিলো অন্য জায়গায়। তাদের ভয় ছিলো, টেলেনর মিয়ানমার ছেড়ে যাওয়ার সময় গ্রাহকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নতুন যে কোম্পানির হাতে যাবে, সেই কোম্পানির সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনীর ভালো সম্পর্ক থাকতে পারে।
গ্রাহকের তথ্য কতটা নিরাপদ?
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে একটি টেলিকম কোম্পানি গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় কীসের ভিত্তিতে? মিয়ানমারের মতো দেশে যখন চাপের মুখে টেলেনর তার গ্রাহকের তথ্য সরকারের হাতে তুলে দিচ্ছে তাহলে বাংলাদেশের নাগরিকদের তথ্য গ্রামীনফোনসহ অন্যান্য টেলিকম কোম্পানির কাছে কতটা নিরাপদ?
মিয়ানমারে টেলেনরের ঘটনা সম্পর্কে অবগত বাংলাদেশের গ্রামীণফোনের একজন গ্রাহক নুসরাত জাহান। তিনি ১০ বছর ধরে গ্রামীণফোন ব্যবহার করছেন। পেশায় তিনি একজন রিসার্চার। রিসার্চের কাজের জন্য তাকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয় এবং বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে হয়। এসব কাজ তিনি অফলাইন এবং অনলাইন- দুইভাবেই করে থাকেন।
আলাপকে তিনি জানান, একটি টেলিকম কোম্পানির কাছে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তিনি আশা করেন, প্রতিষ্ঠানটি সেই তথ্য সুরক্ষিত রাখবে। কিন্তু মিয়ানমারে গ্রাহকের তথ্য নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা যখন সিম কিনি, তখন নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ঠিকানাসহ অনেক ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি মোবাইল ব্যবহারের নানা তথ্যও কোম্পানির কাছে থাকে। এসব তথ্য যদি কোনোভাবে অন্য কারও হাতে চলে যায়, তাহলে সেটা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ঝুঁকির কারণ হতে পারে।”
২০২৩ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে কয়েক লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে। যেখানে তাদের নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ছিলো। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, কারিগরি ত্রুটির কারণে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিলো।
সাবেক তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছিলেন, “ওয়েবসাইটি থেকে কয়েক লাখ মানুষের তথ্য ফাঁস হয়েছে মূলত কারিগরি দুর্বলতার কারণে। ওয়েবসাইটটি কেউ হ্যাক করেনি। আমরা দেখেছি কারিগরি ত্রুটি ছিলো। যে কারণে তথ্যগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।”
নুসরাত আরও বলেন, “টেলেনর তো মিয়ানমারের সরকারের চাপে পড়ে তথ্য দিতে বাধ্য হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তো ‘তথ্যের সুরক্ষা’ই নেই। সরকারি ওয়েবসাইট থেকে তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, হ্যাকাররা তথ্য হ্যাক করে নিচ্ছে। আমার তো মনে হয় আমার ব্যক্তিগত সকল ইনফরমেশন ‘বাজারে খোলা অবস্থায়’ পড়ে আছে।”
এদিকে ১৩ই সেপ্টেম্বর সার্ভার হ্যাক করে এনআইডি, সিমের লোকেশন, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও এসএমএসসহ সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রির অভিযোগে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৫। আব্দুস সালাম সরকার নামে এই ব্যক্তি আগে নির্বাচন অফিসে অস্থায়ীভাবে কাজ করতেন। তার মোবাইলে একাধিক সিডিআর ও বিভিন্ন নম্বরের শেষ লোকেশনের তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। টেলেনরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং সম্প্রতি এনআইডি, সিমের লোকেশন ও কল ডিটেইলস বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোও দেখাচ্ছে, ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সংবেদনশীল এবং এর অপব্যবহার কতটা গুরুতর হতে পারে। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে থাকা গ্রাহকের সব ধরনের তথ্য আদৌ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসতে পারে।
টেলেনরের বিরুদ্ধে গ্রাহক তথ্য জান্তা সরকারকে দেয়ার অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে ব্যক্তির গোপনীয়তার সুরক্ষা
একটি টেলিকম কোম্পানি গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় কীসের ভিত্তিতে? মিয়ানমারের মতো দেশে যখন চাপের মুখে টেলেনর তার গ্রাহকের তথ্য সরকারের হাতে তুলে দিচ্ছে তাহলে বাংলাদেশের নাগরিকদের তথ্য গ্রামীনফোনসহ অন্যান্য টেলিকম কোম্পানির কাছে কতটা নিরাপদ?
একটি মোবাইল ফোনের নাম্বার। শুধু কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের পরিচয়, অবস্থান এবং ব্যক্তিগত তথ্য। এই তথ্যই যদি কোনো দেশের সামরিক বাহিনীর হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে কী হতে পারে? এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে নরওয়েভিত্তিক টেলিকম জায়ান্ট টেলেনরকে ঘিরে। টেলেনরের সাথে গ্রামীণফোনের সংশ্লিষ্টতা যেহেতু রয়েছে, কাজেই বিষয়টি বাংলাদেশের গ্রাহকদের প্রেক্ষিতেও ঝুঁকির প্রশ্ন তুলে আনে।
অভিযোগ, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ টেলেনরের কাছে বিভিন্ন গ্রাহকের তথ্য চাইতো। বিশেষ করে অভ্যুত্থানবিরোধী হিসেবে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের তথ্য চাওয়া হতো। মামলাকারীদের দাবি, অন্তত ১ হাজার ২৫৩টি ফোন নম্বরের তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া হয়েছিলো। এসব তথ্যের মধ্যে ছিলো গ্রাহকের নাম, ঠিকানা, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, অবস্থান এবং কল লগের মতো সংবেদনশীল তথ্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
২০২৬ সালের এপ্রিলে মিয়ানমারের গ্রাহকদের পক্ষে নরওয়ের আদালতে টেলেনরের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা হয়। মামলাটি করে সুইডেনভিত্তিক সংগঠন ‘জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইনিশিয়েটিভ’ (জেএআই)। আর ১৫ই সেপ্টেম্বর নরওয়ের পুলিশ টেলেনরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার সন্দেহে তদন্ত শুরু করে এবং ওই দিনই টেলেনরের ওসলো সদর দপ্তরে তল্লাশি চালানো হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টেলেনর এখনো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়নি। তদন্ত চলছে এবং কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়নি। উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে জানিয়েছে, সে সময়ে সরকারের চাপের কারণেই তারা তথ্য দিতে বাধ্য হয়েছিলো।
তবে টেলেনরের বয়ান বা একটি নির্দিষ্ট দেশের পরিস্থিতি এখানে কেবলই একটি উদাহরণ। কোনো সরকারের চাপ প্রয়োগে প্রতিষ্ঠান যদি গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য তাদের অজান্তেই কারো হাতে তুলে দেয়, সেটি গ্রাহকের জন্য খুবই শঙ্কার বিষয়। এই ঘটনা তাই শুধু মিয়ানমারে একটি টেলিকম কোম্পানির কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় একটি বিষয়। তা হলো, কোনো দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে পড়লে একটি টেলিকম কোম্পানি তার গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারে?
টেলেনর কারা?
বাংলাদেশের মানুষের কাছে টেলেনর নামটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত গ্রামীণফোনের মাধ্যমে। নরওয়েভিত্তিক টেলেনর একটি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। টেলেনরের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৫ সালে নরওয়েতে টেলিগ্রাফ সেবা চালু হয়। এরপর ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘টেলেনর’ রাখা হয়। ১৯৯০-এর শেষ দিকে ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যবসা শুরু করে টেলেনর।
বর্তমানে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে টেলিযোগাযোগ সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। টেলেনরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে তাদের গ্রাহকসংখ্যা ১১ কোটি ৪০ লাখের বেশি। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির বার্ষিক আয় ছিলো প্রায় ৭৭ বিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রোনার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য ১ লাখ ১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা।
টেলেনরের মালিকানার সঙ্গেও নরওয়ে সরকারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ২৭এ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, নরওয়ে সরকারের হাতে টেলেনরের ৫৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ শেয়ার।
বাংলাদেশে টেলেনরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে গ্রামীণফোনের মাধ্যমে। গ্রামীণফোনে টেলেনর মোবাইল কমিউনিকেশনসের মালিকানা ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ। গ্রামীণ টেলিকমের হাতে রয়েছে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং বাকি ১০ শতাংশ সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের।
অর্থাৎ, গ্রামীণফোন একটি বাংলাদেশি কোম্পানি হলেও এর সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার টেলেনর।
অভিযোগের শুরু কোথায়?
টেলেনরকে ঘিরে মিয়ানমারের বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ২০২১ সালে।
সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। এরপর শুরু হয় ব্যাপক দমন-পীড়ন। এই পরিস্থিতিতে টেলেনর মিয়ানমার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০২২ সালের মার্চে দেশটির কার্যক্রম বিক্রি করে বেরিয়ে যায়। তখন মিয়ানমারে টেলেনরের গ্রাহক ছিলো প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ।
কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াই নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
ডিজিটাল অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা ছিলো, টেলেনরের কাছে থাকা গ্রাহকদের সংবেদনশীল তথ্য নতুন মালিকের হাতে গেলে তা সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
এর মধ্যেই মিয়ানমারের ৪৭৪টি নাগরিক সমাজ সংগঠন টেলেনরের বিরুদ্ধে নরওয়ের ওইসিডি ন্যাশনাল কনট্যাক্ট পয়েন্ট-এর কাছে অভিযোগ করে। অভিযোগের মূল বিষয় ছিলো, মিয়ানমার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় টেলেনর তার গ্রাহকের মানবাধিকার ঝুঁকি মূল্যায়ন করেনি।
কোন তথ্য ছিলো টেলেনরের কাছে?
একজন মোবাইল গ্রাহক কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন, কতক্ষণ কথা বলেছেন কিংবা কোন এলাকায় ছিলেন– এসব তথ্য থেকেই একজন মানুষের চলাফেরা ও যোগাযোগের একটি চিত্র তৈরি করা সম্ভব।
মিয়ানমারের ঘটনায় অভিযোগ করা হয়েছে, টেলেনরের কাছে থাকা তথ্যের মধ্যে ছিলো নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয় নম্বর, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং কল লগ। কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ই-ওয়ালেটের তথ্যও সংরক্ষিত ছিলো বলে মামলাকারীরা দাবি করেছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। তা হলো ‘কল ডেটা রেকর্ড’ বা সিডিআর-এ সাধারণত ফোনে কী কথা বলা হয়েছে বা মেসেজের ভেতরে কী লেখা হয়েছে, তা থাকে না। বরং কলের সময়, নম্বর, সময়কাল এবং কোন নেটওয়ার্ক বা টাওয়ারের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এ ধরনের তথ্য থাকতে পারে।
এই তথ্যও অবশ্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, কার সঙ্গে একজন ব্যক্তি নিয়মিত যোগাযোগ করছেন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে তিনি কোন এলাকায় ছিলেন এসব তথ্য থেকেও সেই ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ ও চলাচল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
১ হাজার ২৫৩ নম্বরের তথ্য দেওয়ার অভিযোগ
২০২৬ সালের ৮ই এপ্রিল ‘জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘জেএআই’ নরওয়ের আদালতে টেলেনরের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা করে।
মামলাকারীদের দাবি, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে টেলেনর মিয়ানমার ছাড়ার আগ পর্যন্ত সামরিক কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট গ্রাহকের তথ্য চাইতো। বিশেষ করে অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করছে বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের তথ্য চাওয়া হতো।
জেএআই-এর দাবি, অন্তত ১ হাজার ২৫৩টি ফোন নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া হয়েছিলো। তবে ঠিক কতজন গ্রাহকের তথ্য সামরিক বাহিনীর কাছে গিয়েছিলো, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। মামলায় আরও বলা হয়েছে, টেলেনর জানতো যে এসব তথ্য প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অং থু ও ফিও জেয়া থওর ঘটনা
এই মামলায় সামনে এসেছে দুই ব্যক্তির ঘটনা। অং থু এবং ফিও জেয়া থও।
অং থু ছিলেন মিয়ানমারের একজন সিভিল সোসাইটি কর্মী। মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সামরিক কর্তৃপক্ষ তার ফোনের তথ্য চেয়েছিলো। মামলাকারীদের দাবি, টেলেনর জানতো এই তথ্য প্রকাশ করলে তার গ্রেপ্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরে অং থুকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তার গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে টেলেনরের দেওয়া তথ্য সরাসরি ব্যবহার হয়েছিলো কি না, সেটি আদালতে প্রমাণিত নয়।
আরেকটি ঘটনা মিয়ানমারের জনপ্রিয় হিপহপ শিল্পী ও সাবেক আইনপ্রণেতা ফিও জেয়া থওকে ঘিরে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩১এ অক্টোবর সামরিক কর্তৃপক্ষ তার ফোন নম্বরের কল লগ চায়। অভিযোগ উঠেছে টেলেনর সেই তথ্য দিয়ে দেয়। এরপর নভেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং জুলাইয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তার স্ত্রী থা জিনও টেলেনরের বিরুদ্ধে মামলায় একজন বাদী।
তবে এখানেও একই কথা প্রযোজ্য। ঘটনা দুটি অভিযোগ, সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।
সেপ্টেম্বরে তদন্ত, টেলেনরের সদর দপ্তরে তল্লাশি
এপ্রিলের মামলার কয়েক মাস পর, ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বিষয়টি আরও বড় আকার নেয়।
নরওয়ের পুলিশ টেলেনরের বিরুদ্ধে মিয়ানমারে গ্রাহকের তথ্য হস্তান্তরের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার সন্দেহে তদন্ত শুরু করে। একই সঙ্গে নরওয়ের ‘পিএসটি’ বা ‘পুলিশ সিকিউরিটি সার্ভিস’ নিষেধাজ্ঞা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও তদন্ত করছে। অভিযোগের একটি অংশ হলো, মিয়ানমার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সময় নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন নজরদারি সরঞ্জাম যথাযথ অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর করা হয়েছিলো কি না। অন্য অভিযোগ হলো, গ্রাহকদের পুরোনো তথ্য মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষকে দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে কোনোভাবে সহায়তা করেছিলো কি না।
সেদিন নরওয়ের ‘ফোরনেবু’-তে টেলেনরের সদর দপ্তরেও তল্লাশি চালানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়নি। তদন্তের আওতায় রয়েছে শুধু টেলেনর কোম্পানি।
কী বলছে টেলেনর?
টেলেনরের কথা হচ্ছে, বাধ্য হয়ে তারা কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খুবই চাপের মধ্যে এবং কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের সম্পর্ক বজায় রাখতে হতো। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে তাদের কর্মীরা ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলে কর্মীদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি ছিলো।
রয়টার্সকে -কে দেওয়া এক বক্তব্যে কোম্পানি বলেছে, “আমাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিলো না।”
টেলেনরের মতে, সামরিক বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করলে স্থানীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারত। তাই গ্রাহকের তথ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কর্মীদের জীবন ও নিরাপত্তাকেও বিবেচনায় নিতে হয়েছে।
টেলেনরের মিডিয়া রিলেশনস ডিরেক্টর ডেভিড ফিডজেল্যান্ডের ভাষায়, পরিস্থিতি এতটাই কঠিন ছিলো যে কোম্পানিটি মনে করেছিলো তাদের সামনে বাস্তবে কোনো বিকল্প ছিলো না।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলছে, তারা ইচ্ছামতো সামরিক বাহিনীর হাতে তথ্য তুলে দেয়নি। কর্তৃপক্ষের অনুরোধের আইনি ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য মানবাধিকার ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো বলে তাদের দাবি।
টেলেনরের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে থাকা অবস্থায় তারা ‘ল’ফুল ইন্টারসেপশন’ বা এলআই প্রযুক্তি সক্রিয় করেনি। কোম্পানিটি আরও বলেছে, তারা স্থানীয় আইনি কাঠামো, ডিজিটাল দক্ষতা এবং ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্টিং-এর মতো বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করেছিলো।
বর্তমান তদন্ত নিয়েও টেলেনর বলেছে, তারা নরওয়ের পুলিশের সঙ্গে পুরোপুরি সহযোগিতা করবে এবং ইতোমধ্যে তদন্তকারীদের বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য দিয়েছে।
মিয়ানমার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন?
টেলেনর ২০২১ সালে মিয়ানমার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও ব্যবসা বিক্রি করার প্রক্রিয়াটি নিয়েও সমালোচনা হয়।
কোম্পানির ভাষায়, এটি ছিলো একটি ‘ফোর্সড এক্সিট’, অর্থাৎ বাধ্য হয়ে বেরিয়ে যাওয়া।
টেলেনরের যুক্তি ছিলো, মিয়ানমারে থাকা অবস্থায় কর্মীদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে গিয়েছিলো। একই সঙ্গে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মোবাইল সেবা চালু রাখা এবং প্রায় ৭৫০ কর্মীর চাকরি ধরে রাখার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়েছিলো।
কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা ছিলো অন্য জায়গায়। তাদের ভয় ছিলো, টেলেনর মিয়ানমার ছেড়ে যাওয়ার সময় গ্রাহকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নতুন যে কোম্পানির হাতে যাবে, সেই কোম্পানির সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনীর ভালো সম্পর্ক থাকতে পারে।
গ্রাহকের তথ্য কতটা নিরাপদ?
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে একটি টেলিকম কোম্পানি গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় কীসের ভিত্তিতে? মিয়ানমারের মতো দেশে যখন চাপের মুখে টেলেনর তার গ্রাহকের তথ্য সরকারের হাতে তুলে দিচ্ছে তাহলে বাংলাদেশের নাগরিকদের তথ্য গ্রামীনফোনসহ অন্যান্য টেলিকম কোম্পানির কাছে কতটা নিরাপদ?
মিয়ানমারে টেলেনরের ঘটনা সম্পর্কে অবগত বাংলাদেশের গ্রামীণফোনের একজন গ্রাহক নুসরাত জাহান। তিনি ১০ বছর ধরে গ্রামীণফোন ব্যবহার করছেন। পেশায় তিনি একজন রিসার্চার। রিসার্চের কাজের জন্য তাকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয় এবং বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে হয়। এসব কাজ তিনি অফলাইন এবং অনলাইন- দুইভাবেই করে থাকেন।
আলাপকে তিনি জানান, একটি টেলিকম কোম্পানির কাছে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তিনি আশা করেন, প্রতিষ্ঠানটি সেই তথ্য সুরক্ষিত রাখবে। কিন্তু মিয়ানমারে গ্রাহকের তথ্য নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা যখন সিম কিনি, তখন নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ঠিকানাসহ অনেক ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি মোবাইল ব্যবহারের নানা তথ্যও কোম্পানির কাছে থাকে। এসব তথ্য যদি কোনোভাবে অন্য কারও হাতে চলে যায়, তাহলে সেটা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ঝুঁকির কারণ হতে পারে।”
২০২৩ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে কয়েক লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে। যেখানে তাদের নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ছিলো। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, কারিগরি ত্রুটির কারণে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিলো।
সাবেক তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছিলেন, “ওয়েবসাইটি থেকে কয়েক লাখ মানুষের তথ্য ফাঁস হয়েছে মূলত কারিগরি দুর্বলতার কারণে। ওয়েবসাইটটি কেউ হ্যাক করেনি। আমরা দেখেছি কারিগরি ত্রুটি ছিলো। যে কারণে তথ্যগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।”
নুসরাত আরও বলেন, “টেলেনর তো মিয়ানমারের সরকারের চাপে পড়ে তথ্য দিতে বাধ্য হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তো ‘তথ্যের সুরক্ষা’ই নেই। সরকারি ওয়েবসাইট থেকে তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, হ্যাকাররা তথ্য হ্যাক করে নিচ্ছে। আমার তো মনে হয় আমার ব্যক্তিগত সকল ইনফরমেশন ‘বাজারে খোলা অবস্থায়’ পড়ে আছে।”
এদিকে ১৩ই সেপ্টেম্বর সার্ভার হ্যাক করে এনআইডি, সিমের লোকেশন, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও এসএমএসসহ সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রির অভিযোগে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৫। আব্দুস সালাম সরকার নামে এই ব্যক্তি আগে নির্বাচন অফিসে অস্থায়ীভাবে কাজ করতেন। তার মোবাইলে একাধিক সিডিআর ও বিভিন্ন নম্বরের শেষ লোকেশনের তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। টেলেনরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং সম্প্রতি এনআইডি, সিমের লোকেশন ও কল ডিটেইলস বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোও দেখাচ্ছে, ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সংবেদনশীল এবং এর অপব্যবহার কতটা গুরুতর হতে পারে। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে থাকা গ্রাহকের সব ধরনের তথ্য আদৌ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসতে পারে।