গ্যাস সংকটে শিল্প, দীর্ঘ হচ্ছে সিএনজি স্টেশনের লাইন, জ্বলছে না চুলাও
একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। ঢাকার বহু বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা, শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ নেমেছে ১ থেকে ৪ পিএসআইয়ে। সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কমছে চালকদের আয়, বাড়ছে বিদ্যুত উৎপাদন ঘাটতিও। দীর্ঘদিনের ঘাটতির মধ্যে আমদানিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বন্ধ হওয়ায় সংকট ছড়িয়ে পড়েছে শিল্প থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৩ পিএমআপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
ধানমন্ডির নাজমুন নাহারকে রান্না করতে হচ্ছে গভীর রাতে, নয়তো ভোরে।
মোহাম্মদ হাতেমের কারখানায় তখন বয়লার বন্ধ। ক্যাপটিভ বিদ্যুত সংযোগও চলছে আসা-যাওয়ার ওপর।
অন্যদিকে দুই ঘণ্টা ধরে সিএনজি স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তানভির হোসেন।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও এগুলোর সবগুলোর পেছনে সংকট একই। গ্যাস সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ।
গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের চাপ এতটাই কমেছে যে তার প্রভাব একসঙ্গে পড়েছে শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুত উৎপাদন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
একটি জ্বালানির ঘাটতি কীভাবে একই সময়ে কারখানা থামিয়ে দিতে পারে, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি করতে পারে, কমিয়ে দিতে পারে বিদ্যুত উৎপাদন এবং বদলে দিতে পারে মানুষের রান্নার সময়—বাংলাদেশে এখন তারই বাস্তব উদাহরণ দেখা যাচ্ছে।
কেউ অপেক্ষা করছেন সিএনজি স্টেশনে। কেউ কারখানার বয়লারের সামনে। কেউবা বাসার চুলার পাশে।
দেশের এই তীব্র সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমেছে।
তবে সংকটের শিকড় আরও গভীরে। চাহিদার তুলনায় এমনিতেই দেশে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতা। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতেই দীর্ঘদিনের ঘাটতি সরাসরি আঘাত করেছে দেশের শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, বিদ্যুত ও জনজীবনে।
কমছে উৎপাদন, বাড়ছে শিল্পের ব্যয়
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে গত দুই দিনে গ্যাসের চাপ নেমে গেছে খুবই নিচে।
ফলে বয়লার, ক্যাপটিভ পাওয়ার ও গ্যাসচালিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পূর্ণক্ষমতায় চালাতে পারছে না অনেক কারখানা।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পে গ্যাসের প্রধান ব্যবহার তিনটি জায়গায়—ডায়িং কারখানার বয়লার, ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং ফ্যাক্টরির আয়রন বয়লার।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “এসব যন্ত্র চালাতে সাধারণত প্রায় ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত দুই দিনে বিভিন্ন কারখানায় গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ৪ পিএসআইয়ে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বয়লার চলছে না। অনেক ফ্যাক্টরি উৎপাদন করতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।”
তবে তার মতে, শিল্পে গ্যাসের সংকট গত দুই দিনে শুরু হয়নি। সাভার, আশুলিয়া, কাউন্দিয়া ও চন্দ্রা এলাকায় গত এক মাস ধরেই অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ ছিলো শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ পিএসআইয়ের মধ্যে।
অর্থাৎ, স্বাভাবিকভাবে কারখানা চালানোর জন্য যে চাপ প্রয়োজন, তার তুলনায় অনেক কম চাপেই কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের ডায়িং কারখানায় বয়লার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়লার থেকে উৎপন্ন বাষ্প ব্যবহার করে কাপড় ধোয়া, রং করা ও শুকানোর মতো বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হয়। গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেলে বয়লার স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না।
একইভাবে, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাসচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানার নিজস্ব বিদ্যুত উৎপাদন করা হয়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে এসব জেনারেটর পূর্ণক্ষমতায় চালানো যায় না। ফলে কারখানাকে কম উৎপাদনে যেতে হয়, অথবা বিকল্প বিদ্যুত ও জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “শিল্পে আমাদের সবচেয়ে বেশি গ্যাস লাগে ডায়িংয়ের বয়লার চালাতে। এরপর ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং ফ্যাক্টরি আয়রন বয়লার চালাতেও গ্যাস লাগে। এসব জায়গায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে।”
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় যন্ত্রপাতি চালু রাখা গেলেও তা পূর্ণক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদনের সময় কমিয়ে আনা হচ্ছে। কোথাও নির্দিষ্ট ইউনিট বন্ধ রাখা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কারখানায় বয়লার চালু করা সম্ভব না হওয়ায় পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়েও।
গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ পাওয়ারের পরিবর্তে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করলে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। আবার পর্যাপ্ত বিদ্যুত না থাকলে উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে গ্যাসের ঘাটতি শুধু উৎপাদন কমাচ্ছে না, একই সঙ্গে প্রতিটি ইউনিট পণ্য তৈরির খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গত এক মাস ধরেই আমরা গ্যাসের চাপ নিয়ে সমস্যায় আছি। কোথাও শূন্য দশমিক ৫ পিএসআই, কোথাও ১ বা ২ পিএসআই চাপ ছিলো। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এতে কারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছে না।”
গত কয়েক দিন ধরে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
শিল্প মালিকদের আশংকা, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সংকট ধীরে ধীরে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে। উৎপাদন কমবে। পণ্য তৈরিতে বেশি সময় লাগবে। বিকল্প জ্বালানির খরচ বাড়বে। সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ, গ্যাস সংকট এখন শুধু কোনো একটি কারখানার বয়লার বন্ধ থাকার সমস্যা নয়। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রতিটি ঘণ্টা শিল্প উৎপাদনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাসাবাড়িতে বদলে গেছে রান্নার সময়
সাধারণ মানুষের জীবনে গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রান্নাঘরে।
তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও গত কয়েক দিনে সরবরাহ নেমে এসেছে ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে। অর্থাৎ, শুধু তিতাসের আওতাধীন এলাকাতেই দৈনিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে ৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি।
ফলে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমেছে।
ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আদাবরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় সময় চুলা জ্বলছে না। অনেক পরিবারকে ভোরে রান্না শেষ করতে হচ্ছে। কেউ ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। কেউ বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনছেন।
ধানমন্ডি মধুবাজারের বাসিন্দা নাজমুন নাহার বলেন, “দুপুরে কিছু সময়ের জন্য থাকলেও মূলত গত কয়েক মাস ধরে সকাল ৮টার পর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। গত দুই দিন গ্যাস আসছে রাত ১১টায়। তাও কোনো চাপ নাই। রান্না করা যায় না। তাই ভোর রাতে উঠে রান্না করতে হচ্ছে।”
তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, “চাহিদার তুলনায় দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণে শুধু ঢাকা নয়, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও স্বল্পচাপের সমস্যা তৈরি হয়েছে।”
তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণেও কোনো কোনো এলাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকলে পাইপলাইনের বাইরের পানি বিভিন্ন ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। ফলে কোনো কোনো এলাকায় পানি সরানো না পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয় না।
দেশে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহক বা চুলার সংখ্যা প্রায় ৪৩ লাখ। এর মধ্যে শুধু তিতাস গ্যাসেরই গ্রাহক প্রায় ২৮ লাখ।
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পর পেট্রোবাংলা ছয়টি বিতরণ কোম্পানির জন্য সরবরাহ বরাদ্দও কমিয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে ১২৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, বাখরাবাদকে ১৯ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, জালালাবাদকে ৩১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, পশ্চিমাঞ্চলকে ১১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, কর্ণফুলীকে ২১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিকে ৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস বিতরণ করতে বলা হয়েছে।
এই সরবরাহের মধ্যে বিদ্যুত খাতে বরাদ্দ ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট, সার খাতে ১৭ কোটি ঘনফুট, শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট এবং অন্যান্য খাতে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
সিএনজি স্টেশনে বাড়ছে অপেক্ষা, কমছে আয়
গ্যাসের সংকট এখন রাস্তাতেও দৃশ্যমান। চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস ভরতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না অনেক চালক।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে বৃহস্পতিবার দুপুরে দেখা যায় অপেক্ষমাণ গাড়ির সারি। গ্যাস নিতে আসা তানভির হোসেন বলেন, “গাড়ির লাইন বেশি বড় না। কিন্তু আমি এসেছি প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেলো। কেন যেন এক একটি গাড়ির জন্য অনেক সময় লাগছে।”
হিমালয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হিমালয় ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “মঙ্গলবার থেকে গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে গেছে। এতে গাড়িতে গ্যাস ভরতে বেশি সময় লাগছে এবং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।”
গ্যাস সংগ্রহে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করা চালকদের জন্য শুধু সময় নষ্টের বিষয় নয়। এই সময় গাড়ি চালাতে না পারায় কমে যাচ্ছে দৈনিক আয়। বুধবার গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে ঢাকার খিলক্ষেতে বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা।
অবরোধে অংশ নেওয়া চালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাইনি। জমা ও অন্যান্য খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস নিতেই দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যাচ্ছে।”
গ্যাস সরবরাহের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিএনজি স্টেশন মালিকদের দীর্ঘদিনের কমিশন-সংক্রান্ত দাবি। বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়। এরপর বিদ্যুত, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক কমিশন, জমির ইজারা ও লাইসেন্সসহ প্রায় সব পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু কমিশন বাড়েনি বলে জানান স্টেশন মালিকেরা।
এ কারণে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, এটি অতিরিক্ত মুনাফা নয়; বরং গত এক দশকের মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে কমিশন সমন্বয়ের দাবি।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এতে আমাদের খরচ বেড়েছে। সরকার থেকে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়াও চলছে। সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। অথচ গত এক দশকে কমিশন বাড়ানো হয়নি। এসব বিষয় সমন্বয় করা দরকার।”
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, ২০১৭ সালে গঠিত একটি সরকারি কমিটি প্রতি ঘনমিটারে অতিরিক্ত ১ টাকা ৯৮ পয়সা মার্জিনের সুপারিশ করেছিল। মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি ও যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি হিসাব করলে ২০২৪ সালের শুরুতে অতিরিক্ত মার্জিনের প্রয়োজন দাঁড়ায় ৩ টাকা ৭০ পয়সা। এর সঙ্গে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আনুপাতিক সমন্বয় বাবদ ৩ টাকা ৩০ পয়সা এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে ২ টাকা ৪৬ পয়সা যোগ হওয়ার কথা ছিল বলে দাবি সংগঠনটির।
সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের শুরুতেই কমিশন ৫ টাকা ১০ পয়সা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করা হয়। এর পর গত জুনে বিদ্যুতের দাম ১৯ শতাংশ বাড়ায় প্রতি ঘনমিটারে পরিচালন ব্যয় আরও ৮৬ পয়সা বেড়েছে বলেও জানায় সংগঠনটি।
ফারহান নূর বলেন, “আমরা নতুন করে অতিরিক্ত মুনাফা চাইছি না। সরকারের আগের সুপারিশ, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুতের দাম এবং পরিচালন ব্যয়—সবকিছু বিবেচনা করেই কমিশন ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করার দাবি জানানো হয়েছে।”
কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ৩০এ জুলাই ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। দাবি পূরণ না হলে ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্টেশন বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
ফারহান নূর বলেন, “আমরা অনেক দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি। চিঠি দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কর্মসূচি দিতে হয়েছে।”
ফলে সিএনজি খাতে এখন তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী চাপ—একদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমে গাড়িতে গ্যাস দিতে সময় লাগছে বেশি, অন্যদিকে দীর্ঘদিন কমিশন না বাড়ায় পরিচালন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্টেশন মালিকেরা।
গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুত উৎপাদনেও চাপ
গ্যাসের সংকট এবার সরাসরি আঘাত করেছে বিদ্যুত উৎপাদনেও।
জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ কমেছে। আগে প্রতিদিন বিদ্যুত খাতে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও বুধবার সেই বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুটে।
অর্থাৎ, বিদ্যুত খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট।
এর প্রভাব দেখা গেছে জাতীয় গ্রিডে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, বুধবার বিকেল ৩টায় সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৫৬৩ মেগাওয়াট।
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় ওই সময়ে জাতীয় গ্রিডে এই ঘাটতি তৈরি হয়।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলো দেশের বিদ্যুত উৎপাদন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এসব কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদনও কমে যায়। আর উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান তৈরি হলে সেই ঘাটতি সামাল দিতে লোডশেডিং বাড়াতে হয়।
ফলে একই সময়ে দেশের মানুষকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার গ্যাসের ঘাটতির প্রভাবে বিদ্যুত সরবরাহেও তৈরি হচ্ছে চাপ।
একটি টার্মিনাল বন্ধেই কেন এত বড় সংকট?
একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়েছে। কিন্তু তার ধাক্কা পৌঁছে গেছে কারখানা, বিদ্যুতকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন থেকে বাসাবাড়ির রান্নাঘর পর্যন্ত।
প্রশ্ন হলো—একটি এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি হলেই কেন পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা এমন চাপে পড়ে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশের দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি, কমতে থাকা দেশীয় উৎপাদন এবং বাড়তে থাকা আমদানিনির্ভরতায়।
জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ, স্বাভাবিক সময়েই প্রতিদিন ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতি সামাল দিতে দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল।
এর মধ্যে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
গ্যাস সংকট নিয়ে বুধবার বিকেলে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, অনেক শিল্পকারখানা, বিদ্যুতকেন্দ্র এবং সিএনজি স্টেশন গ্যাস পাচ্ছে না। মূলত দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হওয়ায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে যেখানে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছিল, একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে।
অর্থাৎ, একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বড় ধাক্কা।
কারণ, দেশে আগে থেকেই দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি ঘাটতি রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপ বহুগুণ বেড়েছে।
তবে সমস্যা শুধু সরবরাহ কমে যাওয়ায় নয়। বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও কোনো কোনো এলাকায় সংকটকে আরও তীব্র করছে।
তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি টানা বৃষ্টিতে পুরোনো পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে কিছু এলাকায় সংকট আরও বেড়েছে।
তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে পাইপলাইনের চাপও বাড়বে। পাশাপাশি বৃষ্টি কমলে পাইপলাইনে ঢুকে পড়া পানি সরিয়ে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।
তিতাসের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির কেন্দ্রীয় জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে ৮ হাজার ৩৫৩টি অভিযোগ আসে।
এর মধ্যে গ্যাস লিকেজের অভিযোগ ছিল ৪ হাজার ৯০০টি। গ্যাস না থাকার অভিযোগ ছিল ২ হাজার ২৭৪টি এবং কম চাপের অভিযোগ ছিল ২৫২টি।
দেশীয় উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে আমদানিনির্ভরতা
বর্তমান সংকটকে শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
২০১৮-১৯ সালে শুধু দেশীয় উৎস থেকেই দৈনিক ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। এখন দেশীয় উৎপাদন কমেছে। একই সময়ে চাহিদা বেড়েছে।
ফলে সরবরাহের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে।
এই নির্ভরতার ঝুঁকিই এখন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ কমেছে ৪৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণের মতো অতিরিক্ত দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা এখন নেই।
ফলে গ্যাস বণ্টনের ক্ষেত্রে এক খাত থেকে অন্য খাতে সরবরাহ কমানো ছাড়া তাৎক্ষণিক কোনো সহজ সমাধানও থাকছে না।
এই পরিস্থিতিতে শিল্প, বিদ্যুত, সিএনজি এবং আবাসিক—সব খাতই একই সরবরাহ সংকটের প্রভাব অনুভব করছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি মেরামতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
তবে টার্মিনালটি কবে পুরোপুরি চালু হবে, তা নিশ্চিত নয়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টার্মিনালটি চালু করতে দুই-এক দিন সময় লাগতে পারে।
তবে বর্তমান সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ঝুঁকি কমাতেও কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার।
এর মধ্যে রয়েছে চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপন, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইন নির্মাণ, নতুন কূপ খনন এবং পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার।
এরই মধ্যে বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি কূপ খননের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে।
আর সেই সময়ের মধ্যেই দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থাকে সামলাতে হচ্ছে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, কমতে থাকা দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটিই বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ। কিন্তু সংকটের গভীরতা তৈরি হয়েছে আরও আগে।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে। চাহিদা বেড়েছে। নতুন অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের ফল আসতে সময় লাগছে। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এখন একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে এসেছে।
শিল্পে কমেছে উৎপাদন। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ হয়েছে লাইন। বিদ্যুত উৎপাদনে তৈরি হয়েছে ঘাটতি। আর সাধারণ মানুষকে ভোরে কিংবা গভীর রাতে রান্না করতে হচ্ছে।
একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি তাই শুধু একটি সাময়িক সরবরাহ সংকট তৈরি করেনি। এটি দেশের পুরো জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে, একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতিকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। সংকটটি হয়তো শুরু হয়েছে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে, কিন্তু এর ধাক্কা এখন পৌঁছে গেছে দেশের কারখানা, সড়ক, বিদ্যুতকেন্দ্র এবং প্রতিটি রান্নাঘরে।
গ্যাস সংকটে শিল্প, দীর্ঘ হচ্ছে সিএনজি স্টেশনের লাইন, জ্বলছে না চুলাও
একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। ঢাকার বহু বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা, শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ নেমেছে ১ থেকে ৪ পিএসআইয়ে। সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কমছে চালকদের আয়, বাড়ছে বিদ্যুত উৎপাদন ঘাটতিও। দীর্ঘদিনের ঘাটতির মধ্যে আমদানিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বন্ধ হওয়ায় সংকট ছড়িয়ে পড়েছে শিল্প থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত।
ধানমন্ডির নাজমুন নাহারকে রান্না করতে হচ্ছে গভীর রাতে, নয়তো ভোরে।
মোহাম্মদ হাতেমের কারখানায় তখন বয়লার বন্ধ। ক্যাপটিভ বিদ্যুত সংযোগও চলছে আসা-যাওয়ার ওপর।
অন্যদিকে দুই ঘণ্টা ধরে সিএনজি স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তানভির হোসেন।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও এগুলোর সবগুলোর পেছনে সংকট একই। গ্যাস সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ।
গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের চাপ এতটাই কমেছে যে তার প্রভাব একসঙ্গে পড়েছে শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুত উৎপাদন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
একটি জ্বালানির ঘাটতি কীভাবে একই সময়ে কারখানা থামিয়ে দিতে পারে, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি করতে পারে, কমিয়ে দিতে পারে বিদ্যুত উৎপাদন এবং বদলে দিতে পারে মানুষের রান্নার সময়—বাংলাদেশে এখন তারই বাস্তব উদাহরণ দেখা যাচ্ছে।
কেউ অপেক্ষা করছেন সিএনজি স্টেশনে। কেউ কারখানার বয়লারের সামনে। কেউবা বাসার চুলার পাশে।
দেশের এই তীব্র সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমেছে।
তবে সংকটের শিকড় আরও গভীরে। চাহিদার তুলনায় এমনিতেই দেশে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতা। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতেই দীর্ঘদিনের ঘাটতি সরাসরি আঘাত করেছে দেশের শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, বিদ্যুত ও জনজীবনে।
কমছে উৎপাদন, বাড়ছে শিল্পের ব্যয়
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে গত দুই দিনে গ্যাসের চাপ নেমে গেছে খুবই নিচে।
ফলে বয়লার, ক্যাপটিভ পাওয়ার ও গ্যাসচালিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পূর্ণক্ষমতায় চালাতে পারছে না অনেক কারখানা।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পে গ্যাসের প্রধান ব্যবহার তিনটি জায়গায়—ডায়িং কারখানার বয়লার, ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং ফ্যাক্টরির আয়রন বয়লার।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “এসব যন্ত্র চালাতে সাধারণত প্রায় ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত দুই দিনে বিভিন্ন কারখানায় গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ৪ পিএসআইয়ে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বয়লার চলছে না। অনেক ফ্যাক্টরি উৎপাদন করতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।”
তবে তার মতে, শিল্পে গ্যাসের সংকট গত দুই দিনে শুরু হয়নি। সাভার, আশুলিয়া, কাউন্দিয়া ও চন্দ্রা এলাকায় গত এক মাস ধরেই অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ ছিলো শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ পিএসআইয়ের মধ্যে।
অর্থাৎ, স্বাভাবিকভাবে কারখানা চালানোর জন্য যে চাপ প্রয়োজন, তার তুলনায় অনেক কম চাপেই কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের ডায়িং কারখানায় বয়লার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়লার থেকে উৎপন্ন বাষ্প ব্যবহার করে কাপড় ধোয়া, রং করা ও শুকানোর মতো বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হয়। গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেলে বয়লার স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না।
একইভাবে, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাসচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানার নিজস্ব বিদ্যুত উৎপাদন করা হয়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে এসব জেনারেটর পূর্ণক্ষমতায় চালানো যায় না। ফলে কারখানাকে কম উৎপাদনে যেতে হয়, অথবা বিকল্প বিদ্যুত ও জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “শিল্পে আমাদের সবচেয়ে বেশি গ্যাস লাগে ডায়িংয়ের বয়লার চালাতে। এরপর ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং ফ্যাক্টরি আয়রন বয়লার চালাতেও গ্যাস লাগে। এসব জায়গায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে।”
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় যন্ত্রপাতি চালু রাখা গেলেও তা পূর্ণক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদনের সময় কমিয়ে আনা হচ্ছে। কোথাও নির্দিষ্ট ইউনিট বন্ধ রাখা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কারখানায় বয়লার চালু করা সম্ভব না হওয়ায় পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়েও।
গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ পাওয়ারের পরিবর্তে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করলে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। আবার পর্যাপ্ত বিদ্যুত না থাকলে উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে গ্যাসের ঘাটতি শুধু উৎপাদন কমাচ্ছে না, একই সঙ্গে প্রতিটি ইউনিট পণ্য তৈরির খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গত এক মাস ধরেই আমরা গ্যাসের চাপ নিয়ে সমস্যায় আছি। কোথাও শূন্য দশমিক ৫ পিএসআই, কোথাও ১ বা ২ পিএসআই চাপ ছিলো। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এতে কারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছে না।”
গত কয়েক দিন ধরে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
শিল্প মালিকদের আশংকা, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সংকট ধীরে ধীরে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে। উৎপাদন কমবে। পণ্য তৈরিতে বেশি সময় লাগবে। বিকল্প জ্বালানির খরচ বাড়বে। সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ, গ্যাস সংকট এখন শুধু কোনো একটি কারখানার বয়লার বন্ধ থাকার সমস্যা নয়। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রতিটি ঘণ্টা শিল্প উৎপাদনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাসাবাড়িতে বদলে গেছে রান্নার সময়
সাধারণ মানুষের জীবনে গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রান্নাঘরে।
তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও গত কয়েক দিনে সরবরাহ নেমে এসেছে ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে। অর্থাৎ, শুধু তিতাসের আওতাধীন এলাকাতেই দৈনিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে ৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি।
ফলে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমেছে।
ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আদাবরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় সময় চুলা জ্বলছে না। অনেক পরিবারকে ভোরে রান্না শেষ করতে হচ্ছে। কেউ ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। কেউ বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনছেন।
ধানমন্ডি মধুবাজারের বাসিন্দা নাজমুন নাহার বলেন, “দুপুরে কিছু সময়ের জন্য থাকলেও মূলত গত কয়েক মাস ধরে সকাল ৮টার পর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। গত দুই দিন গ্যাস আসছে রাত ১১টায়। তাও কোনো চাপ নাই। রান্না করা যায় না। তাই ভোর রাতে উঠে রান্না করতে হচ্ছে।”
তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, “চাহিদার তুলনায় দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণে শুধু ঢাকা নয়, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও স্বল্পচাপের সমস্যা তৈরি হয়েছে।”
তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণেও কোনো কোনো এলাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকলে পাইপলাইনের বাইরের পানি বিভিন্ন ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। ফলে কোনো কোনো এলাকায় পানি সরানো না পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয় না।
দেশে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহক বা চুলার সংখ্যা প্রায় ৪৩ লাখ। এর মধ্যে শুধু তিতাস গ্যাসেরই গ্রাহক প্রায় ২৮ লাখ।
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পর পেট্রোবাংলা ছয়টি বিতরণ কোম্পানির জন্য সরবরাহ বরাদ্দও কমিয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে ১২৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, বাখরাবাদকে ১৯ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, জালালাবাদকে ৩১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, পশ্চিমাঞ্চলকে ১১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, কর্ণফুলীকে ২১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিকে ৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস বিতরণ করতে বলা হয়েছে।
এই সরবরাহের মধ্যে বিদ্যুত খাতে বরাদ্দ ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট, সার খাতে ১৭ কোটি ঘনফুট, শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট এবং অন্যান্য খাতে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
সিএনজি স্টেশনে বাড়ছে অপেক্ষা, কমছে আয়
গ্যাসের সংকট এখন রাস্তাতেও দৃশ্যমান। চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস ভরতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না অনেক চালক।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে বৃহস্পতিবার দুপুরে দেখা যায় অপেক্ষমাণ গাড়ির সারি। গ্যাস নিতে আসা তানভির হোসেন বলেন, “গাড়ির লাইন বেশি বড় না। কিন্তু আমি এসেছি প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেলো। কেন যেন এক একটি গাড়ির জন্য অনেক সময় লাগছে।”
হিমালয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হিমালয় ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “মঙ্গলবার থেকে গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে গেছে। এতে গাড়িতে গ্যাস ভরতে বেশি সময় লাগছে এবং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।”
গ্যাস সংগ্রহে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করা চালকদের জন্য শুধু সময় নষ্টের বিষয় নয়। এই সময় গাড়ি চালাতে না পারায় কমে যাচ্ছে দৈনিক আয়। বুধবার গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে ঢাকার খিলক্ষেতে বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা।
অবরোধে অংশ নেওয়া চালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাইনি। জমা ও অন্যান্য খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস নিতেই দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যাচ্ছে।”
গ্যাস সরবরাহের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিএনজি স্টেশন মালিকদের দীর্ঘদিনের কমিশন-সংক্রান্ত দাবি। বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়। এরপর বিদ্যুত, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক কমিশন, জমির ইজারা ও লাইসেন্সসহ প্রায় সব পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু কমিশন বাড়েনি বলে জানান স্টেশন মালিকেরা।
এ কারণে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, এটি অতিরিক্ত মুনাফা নয়; বরং গত এক দশকের মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে কমিশন সমন্বয়ের দাবি।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এতে আমাদের খরচ বেড়েছে। সরকার থেকে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়াও চলছে। সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। অথচ গত এক দশকে কমিশন বাড়ানো হয়নি। এসব বিষয় সমন্বয় করা দরকার।”
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, ২০১৭ সালে গঠিত একটি সরকারি কমিটি প্রতি ঘনমিটারে অতিরিক্ত ১ টাকা ৯৮ পয়সা মার্জিনের সুপারিশ করেছিল। মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি ও যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি হিসাব করলে ২০২৪ সালের শুরুতে অতিরিক্ত মার্জিনের প্রয়োজন দাঁড়ায় ৩ টাকা ৭০ পয়সা। এর সঙ্গে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আনুপাতিক সমন্বয় বাবদ ৩ টাকা ৩০ পয়সা এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে ২ টাকা ৪৬ পয়সা যোগ হওয়ার কথা ছিল বলে দাবি সংগঠনটির।
সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের শুরুতেই কমিশন ৫ টাকা ১০ পয়সা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করা হয়। এর পর গত জুনে বিদ্যুতের দাম ১৯ শতাংশ বাড়ায় প্রতি ঘনমিটারে পরিচালন ব্যয় আরও ৮৬ পয়সা বেড়েছে বলেও জানায় সংগঠনটি।
ফারহান নূর বলেন, “আমরা নতুন করে অতিরিক্ত মুনাফা চাইছি না। সরকারের আগের সুপারিশ, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুতের দাম এবং পরিচালন ব্যয়—সবকিছু বিবেচনা করেই কমিশন ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করার দাবি জানানো হয়েছে।”
কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ৩০এ জুলাই ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। দাবি পূরণ না হলে ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্টেশন বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
ফারহান নূর বলেন, “আমরা অনেক দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি। চিঠি দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কর্মসূচি দিতে হয়েছে।”
ফলে সিএনজি খাতে এখন তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী চাপ—একদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমে গাড়িতে গ্যাস দিতে সময় লাগছে বেশি, অন্যদিকে দীর্ঘদিন কমিশন না বাড়ায় পরিচালন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্টেশন মালিকেরা।
গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুত উৎপাদনেও চাপ
গ্যাসের সংকট এবার সরাসরি আঘাত করেছে বিদ্যুত উৎপাদনেও।
জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ কমেছে। আগে প্রতিদিন বিদ্যুত খাতে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও বুধবার সেই বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুটে।
অর্থাৎ, বিদ্যুত খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট।
এর প্রভাব দেখা গেছে জাতীয় গ্রিডে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, বুধবার বিকেল ৩টায় সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৫৬৩ মেগাওয়াট।
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় ওই সময়ে জাতীয় গ্রিডে এই ঘাটতি তৈরি হয়।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলো দেশের বিদ্যুত উৎপাদন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এসব কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদনও কমে যায়। আর উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান তৈরি হলে সেই ঘাটতি সামাল দিতে লোডশেডিং বাড়াতে হয়।
ফলে একই সময়ে দেশের মানুষকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার গ্যাসের ঘাটতির প্রভাবে বিদ্যুত সরবরাহেও তৈরি হচ্ছে চাপ।
একটি টার্মিনাল বন্ধেই কেন এত বড় সংকট?
একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়েছে। কিন্তু তার ধাক্কা পৌঁছে গেছে কারখানা, বিদ্যুতকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন থেকে বাসাবাড়ির রান্নাঘর পর্যন্ত।
প্রশ্ন হলো—একটি এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি হলেই কেন পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা এমন চাপে পড়ে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশের দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি, কমতে থাকা দেশীয় উৎপাদন এবং বাড়তে থাকা আমদানিনির্ভরতায়।
জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ, স্বাভাবিক সময়েই প্রতিদিন ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতি সামাল দিতে দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল।
এর মধ্যে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
গ্যাস সংকট নিয়ে বুধবার বিকেলে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, অনেক শিল্পকারখানা, বিদ্যুতকেন্দ্র এবং সিএনজি স্টেশন গ্যাস পাচ্ছে না। মূলত দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হওয়ায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে যেখানে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছিল, একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে।
অর্থাৎ, একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বড় ধাক্কা।
কারণ, দেশে আগে থেকেই দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি ঘাটতি রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপ বহুগুণ বেড়েছে।
তবে সমস্যা শুধু সরবরাহ কমে যাওয়ায় নয়। বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও কোনো কোনো এলাকায় সংকটকে আরও তীব্র করছে।
তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি টানা বৃষ্টিতে পুরোনো পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে কিছু এলাকায় সংকট আরও বেড়েছে।
তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে পাইপলাইনের চাপও বাড়বে। পাশাপাশি বৃষ্টি কমলে পাইপলাইনে ঢুকে পড়া পানি সরিয়ে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।
তিতাসের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির কেন্দ্রীয় জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে ৮ হাজার ৩৫৩টি অভিযোগ আসে।
এর মধ্যে গ্যাস লিকেজের অভিযোগ ছিল ৪ হাজার ৯০০টি। গ্যাস না থাকার অভিযোগ ছিল ২ হাজার ২৭৪টি এবং কম চাপের অভিযোগ ছিল ২৫২টি।
দেশীয় উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে আমদানিনির্ভরতা
বর্তমান সংকটকে শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
২০১৮-১৯ সালে শুধু দেশীয় উৎস থেকেই দৈনিক ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। এখন দেশীয় উৎপাদন কমেছে। একই সময়ে চাহিদা বেড়েছে।
ফলে সরবরাহের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে।
এই নির্ভরতার ঝুঁকিই এখন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ কমেছে ৪৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণের মতো অতিরিক্ত দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা এখন নেই।
ফলে গ্যাস বণ্টনের ক্ষেত্রে এক খাত থেকে অন্য খাতে সরবরাহ কমানো ছাড়া তাৎক্ষণিক কোনো সহজ সমাধানও থাকছে না।
এই পরিস্থিতিতে শিল্প, বিদ্যুত, সিএনজি এবং আবাসিক—সব খাতই একই সরবরাহ সংকটের প্রভাব অনুভব করছে।
কবে স্বাভাবিক হবে পরিস্থিতি?
কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি মেরামতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
তবে টার্মিনালটি কবে পুরোপুরি চালু হবে, তা নিশ্চিত নয়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টার্মিনালটি চালু করতে দুই-এক দিন সময় লাগতে পারে।
তবে বর্তমান সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ঝুঁকি কমাতেও কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার।
এর মধ্যে রয়েছে চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপন, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইন নির্মাণ, নতুন কূপ খনন এবং পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার।
পর্যায়ক্রমে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি কূপ খননের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে।
আর সেই সময়ের মধ্যেই দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থাকে সামলাতে হচ্ছে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, কমতে থাকা দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটিই বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ। কিন্তু সংকটের গভীরতা তৈরি হয়েছে আরও আগে।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে। চাহিদা বেড়েছে। নতুন অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের ফল আসতে সময় লাগছে। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এখন একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে এসেছে।
শিল্পে কমেছে উৎপাদন। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ হয়েছে লাইন। বিদ্যুত উৎপাদনে তৈরি হয়েছে ঘাটতি। আর সাধারণ মানুষকে ভোরে কিংবা গভীর রাতে রান্না করতে হচ্ছে।
একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি তাই শুধু একটি সাময়িক সরবরাহ সংকট তৈরি করেনি। এটি দেশের পুরো জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে, একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতিকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। সংকটটি হয়তো শুরু হয়েছে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে, কিন্তু এর ধাক্কা এখন পৌঁছে গেছে দেশের কারখানা, সড়ক, বিদ্যুতকেন্দ্র এবং প্রতিটি রান্নাঘরে।