১০ লাখ টাকা ঘোষণায় এলো ৭ কোটি টাকার বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার, টয়োটা

মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণার আড়ালে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির বড় বড় অংশ শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা। গাড়িগুলোর সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি। অথচ পুরো চালানের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছিল মাত্র ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম

গাড়ি নয়, কাগজে ছিল ‘ইউজড কার পার্টস’ বা গাড়ির পুরনো যন্ত্রাংশ। কিন্তু মোংলা বন্দরে কনটেইনার খুলে পরীক্ষা করতেই মিলল অন্য চিত্র। একটি-দুটি নয়, চারটি বিলাসবহুল গাড়ির বড় বড় অংশ।

যার মধ্যে রয়েছে, রেঞ্জ রোভার ভোগ এল৪০৫, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট জিএসআর২০৪।

কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক হিসাবে, চারটি গাড়ির সম্মিলিত সম্ভাব্য বাজারমূল্য সাড়ে ৪ কোটি থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি।

অথচ পুরো চালানটির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছিল মাত্র প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। আরও সঠিক করে বললে, ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার।

এই ঘোষণার ভিত্তিতে শুল্ক-কর ধরা হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার টাকা।

ঘটনাটি ধরা পড়ে কাস্টমস গোয়েন্দার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে। চালানটির খালাস বন্ধ করে গত ১৯ জুলাই শতভাগ কায়িক পরীক্ষা বা কনটেইনার খুলে সরাসরি পরীক্ষা করা করা হয়। সঙ্গে ছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—কুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল।

তখন গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা স্টিকার, নম্বর, চিহ্ন ও অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করা হয়। এমনকি এই ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

পরীক্ষায় পাওয়া যায় গাড়ির ফ্রন্ট কাট, রিয়ার বা টেইল কাট, বডি কাট এবং রুফ কাট প্যানেল। এসব অংশের সঙ্গে আবার ওয়্যারিং হারনেস, সেন্সরসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও যুক্ত ছিল।

অর্থাৎ গাড়িগুলোকে ছোট ছোট আলাদা পার্টস হিসেবে না এনে মাত্র কয়েকটি বড় অংশে কেটে আনা হয়েছে বলে কাস্টমসের অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে।

আর তাতেই পরিষ্কার হয়—এগুলো আসলে সাধারণ কোনো গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ নয়।

এনবিআরের প্রেস নোটে বলা হয়েছে, চালানটিতে মোট ১৪ ধরনের পণ্য এবং ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল।

আর ঘোষণায় ছিল গাড়ির দরজা, ইঞ্জিন, গিয়ার, সাসপেনশন, শক অ্যাবজরবার, নোজ কাট, হেডলাইট, বাম্পারসহ বিভিন্ন ‘ইউজড কার পার্টস’। কিন্তু সেই পার্টসের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল কোটি টাকার গাড়ির কাঠামো।

২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগের সম্ভাব্য দাম ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

চারটি গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে দামি লেক্সাস এলএক্স৫৭০। ২০১৬ সালের এই গাড়িটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা বা তারও বেশি।

২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগের সম্ভাব্য দাম ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

বিএমডব্লিউ ৬৫০আই—প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।

আর টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।

কাস্টমস এখনো বলেনি যে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ঠিক কত।

কারণ গাড়িগুলোকে যদি সাধারণ ‘ইউজড কার পার্টস’ না ধরে এসকেডি অবস্থায় সম্পূর্ণ গাড়ি হিসেবে শুল্কায়ন করা হয়, তাহলে নতুন করে প্রতিটি গাড়ির মূল্য ও শুল্ক-কর হিসাব করতে হবে। তখনই জানা যাবে প্রকৃত রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ।

সহজ করে বললে, গাড়িকে পুরোপুরি তৈরি অবস্থায় না এনে কয়েকটি বড় অংশে খুলে বা কেটে আমদানি করাকেই এসকেডি বলা হয়।

তাই এগুলোকে শুধু আলাদা গাড়ির পার্টস হিসেবে নয়, এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের বিষয়টি সামনে এসেছে।

এ ঘটনায় আমদানি নীতি, কাস্টমস আইনসহ সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘনের বিষয়ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা।