কৈলাশের পথে মৃত্যুর মিছিল, বেশিরভাগই বিদেশি পর্যটক
কৈলাশ মানসসরোবরের পথে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসে ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে ৫৭৯ পর্যটক। যাদের মধ্যে ৪০০-এর বেশি বিদেশি। এদের অধিকাংশই ভারতীয় তীর্থযাত্রী।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৫ এএমআপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
তেরো বছরের কিশোরি মেয়েটি বাবা-মায়ের সঙ্গে বের হয়েছিল কৈলাশ ভ্রমণে। হিমালয়ের পথ ধরে তাদের যাওয়ার কথা ছিল তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতের দিকে। কিন্তু বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ নেমে এলো পানি, কাদা আর পাথরের ভয়ংকর স্রোত। যা হার মানিয়ে যায় যে কোনো হলিউডি সিনেমার ভিএফএক্সকেও। তারপর থেকেই নিখোঁজ মেয়েটি।
দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ১৩ বছরের ব্রিটিশ মেয়েটিসহ ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিকের খোঁজ মিলছে না। তারা নেপাল থেকে তিব্বতের দিকে যাচ্ছিলেন। তাদের দলের নেতৃত্বে ছিল ট্যুর অপারেটর কোম্পানি আলপাইন ইকো ট্রেক। নয় দিনের কৈলাশ ভ্রমণে বের হওয়া এই দলের সঙ্গে থাকা চার নেপালি গাইডও নিখোঁজ।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, বুধবার সকাল প্রায় ৮টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত দলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তারা তখন সীমান্তের একটি অভিবাসন কেন্দ্রের কাছে ছিলেন। এরপর হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভুটে কোশি নদীতে আচমকা ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে।
পরে চীনের দিক থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাদা, পাথর আর পানির বিশাল স্রোত পুরো এলাকাকে গ্রাস করছে।
নেপালের এই ভয়াবহ ঘটনা পর্যটক-তীর্থযাত্রী থেকে স্থানীয় বাসিন্দা কাউকেই ছাড়েনি।
রয়টার্সের ২৭এ অগাস্টের প্রতিবেদনে নেপালে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে আরও ৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম।
তাই আলাদা দুই দেশের হিসাব ধরলে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬৫।
তবে এই ১৬৫-কে চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাবে না। কারণ নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় একই ব্যক্তি থাকতে পারেন কি না, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত তথ্য নেই।
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে মোট ৮২৬ জন নিখোঁজ, যার মধ্যে ৫৭৯ জন পর্যটক। অর্থাৎ, স্থানীয়দের চেয়ে পর্যটক ও ভ্রমণকারীরাই নিখোঁজের তালিকায় বড় অংশজুড়ে আছেন।
বেশিরভাগই পর্যটক, সবচেয়ে বেশি ভারতীয়
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের ২৬এ আগাস্টের সিচুয়েশন আপডেট-২ অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যটন ও ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে তখন ৩৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারীকে নিখোঁজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি।
তথ্যগুলো চূড়ান্ত নয়। নিখোঁজদের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এজেন্সি, গাইড, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড।
তবে পরবর্তী আপডেটে নিখোঁজের সংখ্যা ৪০৩ জনে ওঠে। এর মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের মুখপাত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়ই সবচেয়ে বেশি, ১৩৩ জন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৪ জন।
অর্থাৎ, এই বিপর্যয়ে শুধু স্থানীয় মানুষ নন বরং কৈলাশের তীর্থযাত্রী, ট্রেকার ও বিদেশি পর্যটকরাই নিখোঁজের তালিকায় বড় অংশজুড়ে আছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রাথমিক এজেন্সিভিত্তিক তালিকাতেও সেই চিত্র স্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় তালিকা ট্রেকার্স সোসাইটির ৯২ জন। এর মধ্যে ৭৭ জন বিদেশি, ১৫ জন নেপালি।
সামরাট টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ৭১ জনের মধ্যে ৫৯ জন ভারতীয়। লিফ হলিডে-র ৫৫ জনের মধ্যে ৪৬ জন ভারতীয়। অর্থাৎ শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠানের তালিকাতেই ১০৫ জন ভারতীয়।
হিমালয়ান গ্লেসিয়ার-এর ৫২ জনের মধ্যে ৩৭ জন বিদেশি। কৈলাশ জার্নি-র ৩১ জনের মধ্যে ২৬ জন বিদেশি, যদিও তখন তাদের জাতীয়তা নিশ্চিত হয়নি।
ফিশটেইল টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ২৭ জনের মধ্যে ২০ জন বিদেশি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩ এবং মালয়েশিয়ার ১৭ জন।
আর আলপাইন ইকো ট্রেক-এর ২০ জনের মধ্যে ১৬ জন বিদেশি। এই তালিকায় যুক্তরাজ্যের ১২ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ৪ জনের তথ্য ছিল।
এছাড়া কাঠমান্ডু হলিডে টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ১৭, রিচা টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ১২ এবং এক্সপ্লোর ভ্যাকেশন-এর ৭ জনও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।
যেভাবে বদলে গেল কৈলাশের পথ, আগের ইতিহাস
হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের কাছে কৈলাশ অত্যন্ত পবিত্র। তাই বর্ষাকালেও তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের চলাচল থাকে। এবার সেই পর্যটন ও তীর্থযাত্রার পথই পরিণত হয়েছে নিখোঁজ মানুষদের খোঁজার এলাকায়।
নেপালের রাসুয়া জেলার রসুওয়াগাধি সীমান্ত দিয়ে তিব্বতের কেরুং হয়ে কৈলাশ মানসসরোবরের দিকে যান তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের একটি বড় অংশ। এই পথটি এমনিতেই সাধারণ কোনো পাহাড়ি রাস্তা নয়। কৈলাশ মানসসরোবরের পথে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট এটি।
ফলে কৈলাশযাত্রায় থাকা বহু মানুষ আটকা পড়েছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।
বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভুটে কোশি নদীতে আচমকা ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে। সেই পানি শুধু নদীর গতিপথেই থাকেনি—বাড়ি, সড়ক, সেতু, বাজার, বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনকি সীমান্ত এলাকার স্থাপনাগুলোও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইমিগ্রেশন ও আশপাশের সড়ক যোগাযোগও।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ এই বন্যার পেছনে ছিল হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে নদীতে পড়ে যাওয়া।
প্রাথমিকভাবে এটিকে ভূমিকম্প মনে করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, সেটি আসলে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ ছিল। সেই ধস নদীর প্রবাহ আটকে দেয়, পরে পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল নিচের দিকে ছুটে যায়।
কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, নেপালের হাইড্রোলজি ও মেটেওরোলজি বিভাগের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
সংস্থাটির বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পারাজুলি বলেছেন, “চীনের দেওয়া স্যাটেলাইটের ছবিতে তারা দেখতে পেয়েছেন, স্থানীয় মিতেরি সেতু থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নদীর উপরিভাগ বা উজানে রাবিশ জমেছিল। যা নদীটির পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে সেখানে একটি অস্থায়ী লেক তৈরি হয়। যা পরবর্তীতে বিস্ফোরিত হয়।”
তিনি আরও বলেছেন, “তারা অস্থায়ী লেক তৈরি হওয়ার আগে ও পরের ছবি দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে বরফধস এবং ভূমিধসও দেখা গেছে। বরফ এবং রাবিশের একটি লেক তৈরি হয়। যা পরে বিস্ফোরিত হয়। সেখানে একটি বাধ তৈরি হয়েছিল।’”
তবে এটা কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কারণ কয়েক বছরের ব্যবধানে একই অঞ্চলে বারবার প্রাণঘাতী দুর্যোগ দেখাচ্ছে হিমালয়ের বাড়তে থাকা ঝুঁকির ছবি।
২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডে হিমবাহ-সম্পর্কিত বন্যায় ২০০-এর বেশি মানুষ মারা যান, ২০২৩ সালে সিকিমে হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যায় ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়, ২০২৪ সালে নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৯২ জন প্রাণ হারান, আর ২০২৫ সালে নেপালের রাসুয়া অঞ্চলে বন্যায় ৯ জন নিহত ও ১৯ জন নিখোঁজ হন।
এবার ২০২৬ সালে সেই রাসুয়াতেই মৃতের সংখ্যা ১৬২ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, কয়েক বছরের ব্যবধানে একই অঞ্চলে বারবার প্রাণঘাতী দুর্যোগ দেখাচ্ছে।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি আকস্মিক বন্যার গল্প নয়। হিমালয়ের বরফও যেন সেই গল্প বলছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, গত তিন দশকে নেপালের পাহাড়গুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে।
আর গত এক দশকে হিমবাহ গলার গতি আগের দশকের তুলনায় বেড়েছে ৬৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বরফের এই দ্রুত পরিবর্তন পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ ধস, আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, চলছে উদ্ধার অভিযান
২৭ আগস্ট রয়টার্স প্রতিবেদনে নেপালে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
চীনের তিব্বত অংশে আরও ৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম। তাই আলাদা দুই দেশের হিসাব ধরলে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬৫।
তবে এই ১৬৫-কে চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাবে না। কারণ নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় একই ব্যক্তি থাকতে পারেন কি না, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত তথ্য নেই।
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ দুঃখ প্রকাশ ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি এ শোক ও সহযোগিতার কথা জানান।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, উদ্ধার অভিযান চললেও পাহাড়ি পথ, কাদা, ধ্বংসাবশেষ আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
আর তাই এখন কৈলাশের সেই পথের দিকে তাকিয়ে আছে শত শত পরিবার।
যে পথ মানুষকে বিশ্বাসের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই পথই এবার শত শত পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
কেউ অপেক্ষা করছে ১৩ বছরের মেয়েটির জন্য। কেউ ৩৩ ব্রিটিশের জন্য। কেউ ১৩৩ ভারতীয় তীর্থযাত্রীর জন্য।
আর কেউ হয়তো এখনো জানেই না তার প্রিয় মানুষটি বেঁচে আছেন, নাকি সেই ভয়ংকর স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে গেছে।
পাহাড়ের নিচে বসবাস করা মানুষ কিংবা কৈলাশের পথে যাওয়া পর্যটকদের জন্য প্রতিটি নতুন মৌসুম নিয়ে আসছে নতুন অনিশ্চয়তা। প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলার পেছনে মনুষ্য কারণগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে এখনই।
নয়তো হিমালয়ের ওপরের এই পরিবর্তনের জন্য নিচে থাকা মানুষকে মূল্য দিতে হবে বারবার।
কৈলাশের পথে মৃত্যুর মিছিল, বেশিরভাগই বিদেশি পর্যটক
কৈলাশ মানসসরোবরের পথে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসে ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে ৫৭৯ পর্যটক। যাদের মধ্যে ৪০০-এর বেশি বিদেশি। এদের অধিকাংশই ভারতীয় তীর্থযাত্রী।
তেরো বছরের কিশোরি মেয়েটি বাবা-মায়ের সঙ্গে বের হয়েছিল কৈলাশ ভ্রমণে। হিমালয়ের পথ ধরে তাদের যাওয়ার কথা ছিল তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতের দিকে। কিন্তু বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ নেমে এলো পানি, কাদা আর পাথরের ভয়ংকর স্রোত। যা হার মানিয়ে যায় যে কোনো হলিউডি সিনেমার ভিএফএক্সকেও। তারপর থেকেই নিখোঁজ মেয়েটি।
দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ১৩ বছরের ব্রিটিশ মেয়েটিসহ ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিকের খোঁজ মিলছে না। তারা নেপাল থেকে তিব্বতের দিকে যাচ্ছিলেন। তাদের দলের নেতৃত্বে ছিল ট্যুর অপারেটর কোম্পানি আলপাইন ইকো ট্রেক। নয় দিনের কৈলাশ ভ্রমণে বের হওয়া এই দলের সঙ্গে থাকা চার নেপালি গাইডও নিখোঁজ।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, বুধবার সকাল প্রায় ৮টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত দলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তারা তখন সীমান্তের একটি অভিবাসন কেন্দ্রের কাছে ছিলেন। এরপর হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভুটে কোশি নদীতে আচমকা ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে।
পরে চীনের দিক থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাদা, পাথর আর পানির বিশাল স্রোত পুরো এলাকাকে গ্রাস করছে।
নেপালের এই ভয়াবহ ঘটনা পর্যটক-তীর্থযাত্রী থেকে স্থানীয় বাসিন্দা কাউকেই ছাড়েনি।
রয়টার্সের ২৭এ অগাস্টের প্রতিবেদনে নেপালে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে আরও ৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম।
তাই আলাদা দুই দেশের হিসাব ধরলে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬৫।
তবে এই ১৬৫-কে চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাবে না। কারণ নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় একই ব্যক্তি থাকতে পারেন কি না, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত তথ্য নেই।
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে মোট ৮২৬ জন নিখোঁজ, যার মধ্যে ৫৭৯ জন পর্যটক। অর্থাৎ, স্থানীয়দের চেয়ে পর্যটক ও ভ্রমণকারীরাই নিখোঁজের তালিকায় বড় অংশজুড়ে আছেন।
বেশিরভাগই পর্যটক, সবচেয়ে বেশি ভারতীয়
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের ২৬এ আগাস্টের সিচুয়েশন আপডেট-২ অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যটন ও ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে তখন ৩৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারীকে নিখোঁজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি।
তথ্যগুলো চূড়ান্ত নয়। নিখোঁজদের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এজেন্সি, গাইড, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড।
তবে পরবর্তী আপডেটে নিখোঁজের সংখ্যা ৪০৩ জনে ওঠে। এর মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের মুখপাত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়ই সবচেয়ে বেশি, ১৩৩ জন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৪ জন।
অর্থাৎ, এই বিপর্যয়ে শুধু স্থানীয় মানুষ নন বরং কৈলাশের তীর্থযাত্রী, ট্রেকার ও বিদেশি পর্যটকরাই নিখোঁজের তালিকায় বড় অংশজুড়ে আছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রাথমিক এজেন্সিভিত্তিক তালিকাতেও সেই চিত্র স্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় তালিকা ট্রেকার্স সোসাইটির ৯২ জন। এর মধ্যে ৭৭ জন বিদেশি, ১৫ জন নেপালি।
সামরাট টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ৭১ জনের মধ্যে ৫৯ জন ভারতীয়। লিফ হলিডে-র ৫৫ জনের মধ্যে ৪৬ জন ভারতীয়। অর্থাৎ শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠানের তালিকাতেই ১০৫ জন ভারতীয়।
হিমালয়ান গ্লেসিয়ার-এর ৫২ জনের মধ্যে ৩৭ জন বিদেশি। কৈলাশ জার্নি-র ৩১ জনের মধ্যে ২৬ জন বিদেশি, যদিও তখন তাদের জাতীয়তা নিশ্চিত হয়নি।
ফিশটেইল টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ২৭ জনের মধ্যে ২০ জন বিদেশি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩ এবং মালয়েশিয়ার ১৭ জন।
আর আলপাইন ইকো ট্রেক-এর ২০ জনের মধ্যে ১৬ জন বিদেশি। এই তালিকায় যুক্তরাজ্যের ১২ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ৪ জনের তথ্য ছিল।
এছাড়া কাঠমান্ডু হলিডে টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ১৭, রিচা টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর ১২ এবং এক্সপ্লোর ভ্যাকেশন-এর ৭ জনও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।
যেভাবে বদলে গেল কৈলাশের পথ, আগের ইতিহাস
হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের কাছে কৈলাশ অত্যন্ত পবিত্র। তাই বর্ষাকালেও তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের চলাচল থাকে। এবার সেই পর্যটন ও তীর্থযাত্রার পথই পরিণত হয়েছে নিখোঁজ মানুষদের খোঁজার এলাকায়।
নেপালের রাসুয়া জেলার রসুওয়াগাধি সীমান্ত দিয়ে তিব্বতের কেরুং হয়ে কৈলাশ মানসসরোবরের দিকে যান তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের একটি বড় অংশ। এই পথটি এমনিতেই সাধারণ কোনো পাহাড়ি রাস্তা নয়। কৈলাশ মানসসরোবরের পথে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট এটি।
ফলে কৈলাশযাত্রায় থাকা বহু মানুষ আটকা পড়েছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।
বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভুটে কোশি নদীতে আচমকা ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে। সেই পানি শুধু নদীর গতিপথেই থাকেনি—বাড়ি, সড়ক, সেতু, বাজার, বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনকি সীমান্ত এলাকার স্থাপনাগুলোও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইমিগ্রেশন ও আশপাশের সড়ক যোগাযোগও।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ এই বন্যার পেছনে ছিল হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে নদীতে পড়ে যাওয়া।
প্রাথমিকভাবে এটিকে ভূমিকম্প মনে করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, সেটি আসলে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ ছিল। সেই ধস নদীর প্রবাহ আটকে দেয়, পরে পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল নিচের দিকে ছুটে যায়।
কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, নেপালের হাইড্রোলজি ও মেটেওরোলজি বিভাগের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
সংস্থাটির বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পারাজুলি বলেছেন, “চীনের দেওয়া স্যাটেলাইটের ছবিতে তারা দেখতে পেয়েছেন, স্থানীয় মিতেরি সেতু থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নদীর উপরিভাগ বা উজানে রাবিশ জমেছিল। যা নদীটির পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে সেখানে একটি অস্থায়ী লেক তৈরি হয়। যা পরবর্তীতে বিস্ফোরিত হয়।”
তিনি আরও বলেছেন, “তারা অস্থায়ী লেক তৈরি হওয়ার আগে ও পরের ছবি দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে বরফধস এবং ভূমিধসও দেখা গেছে। বরফ এবং রাবিশের একটি লেক তৈরি হয়। যা পরে বিস্ফোরিত হয়। সেখানে একটি বাধ তৈরি হয়েছিল।’”
তবে এটা কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কারণ কয়েক বছরের ব্যবধানে একই অঞ্চলে বারবার প্রাণঘাতী দুর্যোগ দেখাচ্ছে হিমালয়ের বাড়তে থাকা ঝুঁকির ছবি।
২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডে হিমবাহ-সম্পর্কিত বন্যায় ২০০-এর বেশি মানুষ মারা যান, ২০২৩ সালে সিকিমে হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যায় ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়, ২০২৪ সালে নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৯২ জন প্রাণ হারান, আর ২০২৫ সালে নেপালের রাসুয়া অঞ্চলে বন্যায় ৯ জন নিহত ও ১৯ জন নিখোঁজ হন।
এবার ২০২৬ সালে সেই রাসুয়াতেই মৃতের সংখ্যা ১৬২ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, কয়েক বছরের ব্যবধানে একই অঞ্চলে বারবার প্রাণঘাতী দুর্যোগ দেখাচ্ছে।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি আকস্মিক বন্যার গল্প নয়। হিমালয়ের বরফও যেন সেই গল্প বলছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, গত তিন দশকে নেপালের পাহাড়গুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে।
আর গত এক দশকে হিমবাহ গলার গতি আগের দশকের তুলনায় বেড়েছে ৬৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বরফের এই দ্রুত পরিবর্তন পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ ধস, আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, চলছে উদ্ধার অভিযান
২৭ আগস্ট রয়টার্স প্রতিবেদনে নেপালে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
চীনের তিব্বত অংশে আরও ৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম। তাই আলাদা দুই দেশের হিসাব ধরলে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬৫।
তবে এই ১৬৫-কে চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাবে না। কারণ নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় একই ব্যক্তি থাকতে পারেন কি না, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত তথ্য নেই।
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ দুঃখ প্রকাশ ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি এ শোক ও সহযোগিতার কথা জানান।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, উদ্ধার অভিযান চললেও পাহাড়ি পথ, কাদা, ধ্বংসাবশেষ আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
আর তাই এখন কৈলাশের সেই পথের দিকে তাকিয়ে আছে শত শত পরিবার।
যে পথ মানুষকে বিশ্বাসের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই পথই এবার শত শত পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
কেউ অপেক্ষা করছে ১৩ বছরের মেয়েটির জন্য। কেউ ৩৩ ব্রিটিশের জন্য। কেউ ১৩৩ ভারতীয় তীর্থযাত্রীর জন্য।
আর কেউ হয়তো এখনো জানেই না তার প্রিয় মানুষটি বেঁচে আছেন, নাকি সেই ভয়ংকর স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে গেছে।
পাহাড়ের নিচে বসবাস করা মানুষ কিংবা কৈলাশের পথে যাওয়া পর্যটকদের জন্য প্রতিটি নতুন মৌসুম নিয়ে আসছে নতুন অনিশ্চয়তা। প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলার পেছনে মনুষ্য কারণগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে এখনই।
নয়তো হিমালয়ের ওপরের এই পরিবর্তনের জন্য নিচে থাকা মানুষকে মূল্য দিতে হবে বারবার।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড।