রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে বিপুল উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে মঙ্গলবার শেষ হলো দুই দিনব্যাপী ‘বায়লা ফিউচার সামিট ২০২৬’।
সম্মেলনের সমাপনী দিনে বিভিন্ন সেশনে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, নীতিগত সংস্কার এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে আগামীর অর্থনৈতিক রূপান্তরের কৌশল নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা করা হয়।
পুরো সম্মেলন জুড়ে মূল সুর হয়ে উঠেছিলো ব্যবসা পরিচালনাকে সহজ ও কস্ট-ইফেক্টিভ করা এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের উদীয়মান নেতৃত্বকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং তরুণদের জন্য সরকারের ভাবনার সার্বিক রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তরুণ উদ্যোক্তাদের আকাঙ্ক্ষা, বিগত দিনের ভুল নীতি এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইউথ পপুলেশন কী চায়? সবচেয়ে আগে চায় এমন একটা এনভায়রনমেন্ট, যেখানে তাদের যে ক্রিয়েটিভিটি আছে, যে ট্যালেন্ট আছে কিংবা যার যে অ্যাম্বিশন আছে সেটার জন্য ফ্যাসিলিটেট করার মতো পলিসি থাকবে।”
সেই সুযোগ তৈরি করতে সরকার বাজেটে কর্মসংস্থানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে তিনি জানান।
পুরনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ব্যবসা পরিচালনায় অতীতে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিলো, তার কড়া সমালোচনা করে মাহদী আমিন তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে ওয়াদা করে বলেন, “আপনারা অনেকেই আছেন যারা সেকেন্ড জেনারেশন বিজনেসম্যান। আপনাদের ডেফিনেটলি একটা কমন রিকোয়ারমেন্ট হচ্ছে এমন একটা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে আমরা নতুন ইন্ডাস্ট্রি পার্ক করবো। যেখানে আমাদের যাদের বন্ডেড ফ্যাসিলিটি প্রয়োজন, সেটা আরও ইজিয়ার হবে; যেখানে রেড টেপ নেমে আসবে; যেখানে সবার জন্য ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ বাড়বে এবং ‘কস্ট অফ ডুইং বিজনেস’ কমবে।”
“অ্যান্ড আনফরচুনেটলি, লাস্ট মেনি মেনি ইয়ার্সে আমরা এই জিনিসগুলো পাই নাই। সো, অ্যাজ আ নিউ গভর্নমেন্ট, আমি প্রমিস করছি যে ফ্রম আওয়ার সাইড উই উইল মেক এভরি পসিবল এফোর্ট, এই চেঞ্জগুলো যেন আমরা আনতে পারি”, বলেন মাহদী আমিন।
এছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি গ্রহণের প্রেক্ষাপটে ভারসাম্য রক্ষা করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “টেকনোলজি এমনভাবে আমরা নেব যেন আমাদের আনএমপ্লয়মেন্ট জেনারেট না হয়। সো বেসিক্যালি, আমরা যখন নতুন টেকনোলজি আনছি, আমাদের একদিকে যেমন মেইন গোল হচ্ছে এফিসিয়েন্সিটা বাড়ানো, বিশ্বের উন্নত দেশের সাথে কম্পিট করে যেন আমাদের প্রোডাক্টিভিটি সেই জায়গায় যায়।”
তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে ছয় দফা কৌশল তুলে ধরেছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম. মাসরুর রিয়াজ।
অনুষ্ঠানে ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, “বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সাফল্যের গল্প হলেও সীমিত পণ্য ও বাজারের ওপর অতিনির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এ খাতকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিতে নিতে তিনি ছয় দফা রোডম্যাপ তুলে ধরেন।”
সম্মেলনে শেয়ারবাজার থেকে ইক্যুইটি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা ও সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতি সহজীকরণের বিষয় তুলে ধরেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার।
আইপিও বা ইক্যুইটি অর্থায়নের সুযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে ফান্ড তুললে আপনি আপনার ইক্যুইটি হোল্ডারদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য কিছুটা শ্বাস নেওয়ার মতো সময় পান। ব্যাংকিং খাত থেকে যা পান তার চেয়ে এটি নিশ্চিতভাবেই সস্তা হতে যাচ্ছে।”
আইপিও অনুমোদনের নতুন সময়সীমা প্রসঙ্গে তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, “আগে একটি আইপিও অনুমোদন পেতে গড়ে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগতো। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারি থেকে নতুন বিধিমালার কারণে এটি এখন মাত্র ৫০ দিন।”
একই সম্মেলনে পারিবারিক ব্যবসার নতুন রূপান্তর ও বিনিয়োগ কৌশলের মডেল নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন অ্যাংকরলেস বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাহাত আহমেদ।
“বেশিরভাগ গার্মেন্টস ব্যবসা শুধু গার্মেন্টসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা হয়তো অন্যান্য খাতেও ব্যবসা সম্প্রসারিত করেছে। কিন্তু বিশ্ব আজ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের জন্য এবং এখানকার ব্যবসাগুলোর জন্য। আপনারা যদি আপনাদের অর্থের অন্তত ৫ শতাংশ এমন কোনো জায়গায় না খাটান, তবে তা স্রেফ বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে পারে।”
ইন-হাউস সাবসিডিয়ারি গড়ে তোলার প্রথাগত ‘টাইপ-এক্স’ ধারণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে রাহাত আহমেদ সতর্ক করেন, “আমাদের দেশে কিন্তু সেই মানের মেধা বা ট্যালেন্ট নেই যা দিয়ে এই শিল্পগুলোতে ৩০টি নতুন সফল কোম্পানি তৈরি করা যায়।”
“ফলে যা হচ্ছে, একদম ওপরের সারিতে আমরা শক্তি হারিয়ে ফেলছি। সেরা উদ্যোক্তা বা দক্ষ বিল্ডাররা আর করপোরেট সাবসিডিয়ারিতে যোগ দিচ্ছেন না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আপনারা হয়তো বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাবেন। বলতে পারবেন যে ‘এটি আমার কোম্পানি’। কিন্তু আপনারা আসলে কোনো বড় মুনাফা তৈরি করতে পারছেন না। নতুন কোনো মূলধন সৃষ্টি হচ্ছে না।”
এর পরিবর্তে পেশাদার ‘টাইপ-ওয়াই’ বা ইনভেস্টমেন্ট মডেল গড়ে তোলার গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈশ্বিক মূলধন আকর্ষণের কৌশল বাতলে দিয়ে তিনি বক্তব্যের শেষে যুক্ত করেন, “প্রাইভেট ইকুইটি একাধিক পরিবারকে একসাথে এসে কোনো সম্ভাবনাময় অথচ সংকটাপন্ন ব্যবসাকে অধিগ্রহণ করা, ফান্ড ম্যানেজারদের মাধ্যমে সেটিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করানো এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই মুনাফা থেকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।”
দুই দিন ধরে চলা এই সামিটের প্রতিটি সেশনেই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, ইক্যুইটি নির্ভর ক্যাপিটাল গঠন, ব্যালেন্স শিট অপ্টিমাইজেশন এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার দিকগুলো জোরালোভাবে উঠে আসে।
তরুণের নেতৃত্ব ও সরকারের দূরদর্শী সহায়তায় একটি স্বচ্ছ, আধুনিক এবং শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলাই যে ‘বায়লা ফিউচার সামিট ২০২৬’-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য, সে বার্তাই ফুটে উঠেছে পুরো আয়োজনে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডারস অ্যালায়েন্স (বায়লা)-এর উদ্যোগে ‘থিংক বিয়ন্ড টুডে’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই বৃহৎ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী, ৫০০-এর বেশি চিফ এক্সপেরিয়েন্স অফিসার (সিএক্সও) এবং ২০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক বক্তা অংশ নেন।
এবারই প্রথম 'বায়লা ফিউচার লিডারস’ নামে বাস্তবধর্মী ব্যবসায়িক সমস্যা সমাধান প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বায়লা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০টির বেশি দল এতে অংশ নেয়। চূড়ান্ত পর্বে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ)-এর দল স্থান পায়। প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান।



