বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত কিছু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
একদল এই ঘটনাকে একজন এমপির নৈতিক স্খলন হিসাবে দেখছেন। অন্যদিকে এসব ভিডিও ফাঁসের মাধ্যমে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে কি না সেই প্রশ্নও তুলছেন একদল মানুষ।
এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে নিয়ম মোতাবেক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
অন্তত তিনটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে একজন কম বয়েসী নারীর সঙ্গে অন্তত দুটি স্থানে দেখা গেছে।
এর মধ্যে একটি স্থানে ওই নারীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা গেছে এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে।
ওই এমপির পক্ষ থেকে প্রথমে ভিডিওটিকে এআই দিয়ে তৈরি বলে বর্ণনা করা হয়। পরে তিনি বিবৃতি দিয়ে দাবি করেন ওই নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী, যাকে তিনি প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে গত জুন মাসে বিয়ে করেছেন।
ভিডিওটি সোমবার থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। এটি গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয় বলে বিশ্লেষণে দেখা গেছে।
বাকি ভিডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ে মঙ্গলবার। এই ভিডিও দুটি একই ঘটনাপ্রবাহের পৃথক ক্লিপ। তৃতীয় একটি পক্ষ ভিডিওটি ধারণ করেছেন। এমপি নজরুল ইসলাম বারবার হাত দিয়ে ক্যামেরার লেন্স ঢেকে ফেলার চেষ্টা করছিলেন।
ভিডিওতে এমপি নজরুলকে ক্ষমা চাইতেও শোনা যায়। তিনি সেখানে বলছিলেন ওই নারীকে নিয়ে তিনি একবারই ওই স্থানে গিয়েছেন। তার গাড়িচালক কামরাটি ভাড়া করতে সাহায্য করেছেন।
ভিডিওতে এমপি নজরুলের সংসদের পরিচয়পত্রও দেখা যায়।
ওই নারীও জিজ্ঞাসাবাদে নিজের নাম প্রকাশ করেন এবং এক পর্যায়ে শর্ত দেন মোবাইলের ক্যামেরা থেকে ভিডিও ও ছবি মুছে ফেললে তিনি প্রশ্নের উত্তর দেবেন।
এমপি নজরুলের বক্তব্য
পরে ভাইরাল হওয়া ভিডিও দুটির সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অবশ্য এমপি নজরুল ইসলাম একটি বিবৃতি দিয়ে মঙ্গলবার জানান, গত ১৩ই জুলাই দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার মগবাজারে তিনি তার শ্বশুরের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন। এসময় তার গাড়িচালক এবং কিছু মানুষ তাদেরকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করেছিলো।
ফেইসবুকে এমপি নজরুল লেখেন, ওই সময়ই ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ করা হয়। যা পরে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের’ ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।”
গাজী নজরুল ইসলাম তার ফেইসবুক পোস্টে বলেন, গত ১৭ই জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়ম বেগমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে।
এদিকে তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামও এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এবং ভিডিওতে থাকা নারী মরিয়ম বেগমই তার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী।
যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যা বলছে
সোমবার ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি যাচাই করেছে বাংলাদেশের একাধিক ফ্যাক্টচেকার প্রতিষ্ঠান।
সোমবার ভাইরাল হওয়া ভিডিও আর মঙ্গলবার ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে যে নারীকে দেখা যায় তার পোশাক একই হলেও একটিতে তিনি কালো হিজাব পরিহিত ছিলেন, অন্যটিতে তিনি হিজাব পরে ছিলেন না।
সোমবারের ভিডিওর ঘটনাস্থল দেখে মনে হয়েছে এটি একটি শয়নকক্ষ। আর মঙ্গলবার ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির ঘটনাস্থল একটি অফিস কামরা বলে মনে হয়।
ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট এবং ফ্যাক্টচেকার প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার সোমবার ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করে মঙ্গলবার জানায়, এই ভিডিওটি এআই ব্যবহার করে তৈরির কোনো প্রমাণ তারা পায়নি।
দ্য ডিসেন্ট বলছে, ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াত-সমর্থক কয়েকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এটিকে এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে তাদের বিশ্লেষণে সেই দাবি অসত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অন্যদিকে রিউমার স্ক্যানারও জানায়, ভাইরাল হওয়া দীর্ঘ ভিডিওটিতে কোনো অসামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া অডিওতেও কোনো অসঙ্গতি নেই। কন্টেন্টের উপাদানগুলো পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানটি।
তবে দ্য ডিসেন্ট বলেছে, ভিডিওটি আসল হলেও এর কিছু স্থিরচিত্র (স্ক্রিনশট) ব্যবহার করে এআই-নির্মিত আলাদা কিছু ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া
জামায়াতের সংসদ সদস্যের ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
অনেকেই এই ঘটনাকে নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখছেন এবং জামায়াত যে আদর্শের রাজনীতি করে তার পরিপন্থি হিসেবে বর্ণনা করছেন।
তবে কেউ কেউ মনে করছেন ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ ও ফাঁস করে এমপি নজরুল ইসলামের গোপনীয়তার অধিকার খর্ব করা হয়েছে যে অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে।
“সমাজে নৈতিক বিষয়ের কোনো একক মানদণ্ড নেই” উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, “দু’জন সাবালক মানুষ নিজের সিদ্ধান্তে যে কোনো জায়গায় থাকতে পারেন।”
“এখানে কারও অধিকার নেই অবজেকশন দেওয়ার”।
তবে জামায়াত কিংবা যে কোনো ধর্মীয় নেতাদের এ ধরনের কাজে জড়ানোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়াকে স্বাভাবিক হিসাবে মনে করেন অধ্যাপক জোবাইদা।
এমপি নজরুল ইসলামের পুরনো একটি ভিডিও কেউ কেউ শেয়ার করছেন, যেখানে তিনি পর্দার উপর গুরুত্ব আরোপ করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন।
জোবাইদা নাসরীন বলছেন, “তারা তো বিভিন্ন সময়ে নারীদের নিয়ে বয়ান দেন। যে কাজগুলোকে তারা প্রকাশ্যে অবৈধ হিসাবে তুলে ধরেন, ঠিক ওই কাজগুলোই যদি তারা করেন, তখন সমাজ তো সেটা মানতে চাইবে না।”
তবে আইনগতভাবে এই সমাজের কেউ তার এই সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন না বলে মনে করেন জোবাইদা নাসরীন।
তিনি বলেন, এই প্রশ্ন একমাত্র তার স্ত্রীর করার অধিকার আছে। একইসঙ্গে স্ত্রী চাইলে আইনগতভাবে পদক্ষেপও নিতে পারেন বলে জানান তিনি।
জামায়াতের বিবৃতি
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মঙ্গলবার এক বিবৃতি দিয়ে জানান, ঘটনাপ্রবাহের দিকে দলের নজর আছে।
এ ব্যাপারে আরো খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে দলের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও বিবৃতিতে জানান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।



