সরকারের প্রাথমিক হিসাব বলছে, সম্প্রতি অতি বৃষ্টি ও বন্যায় তলিয়ে গেছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। এছাড়াও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট এমনকি আমদানি-রপ্তানি পণ্যও। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন- সব মিলে ক্ষতির পরিমাণ ছাপিয়ে যেতে পারে দুই হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন এখন পানি তো নামছে কিন্তু ঘর, ফসল ও জীবিকা হারানো মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তো?
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৩ পিএমআপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম
শুধু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা।
এই তো কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে ছিলো ঘর-উঠান, মাঠজুড়ে ছিলো ফসল- সেখানে এখন শুধু কাদামাটি আর ধ্বংসের চিহ্ন। অনেকেই চোখের সামনে পানির তোড়ে হারিয়ে যেতে দেখেছেন আপন জন।
অতি বৃষ্টি আর বন্যার পানিতে কারও ঘর ভেসে গেছে, কারও ভেসে গেছে পুকুরের সব মাছ। কারও বাৎসরিক আয়ের অন্যতম উৎস প্রিয় গবাদিপশুটাও মারা গেছে অসহায় হয়ে।
এদের মন-মগজে বেঁচে থাকার চিন্তায় একটাই প্রশ্ন- পানি তো নামবে কিন্তু তারা ফিরবেন কোথায়? ঘরই তো আর নেই। পরের প্রশ্ন- সরকার না হয় কিছু দিন খাবার দিবে কিন্তু এরপর পেটের জ্বালা মিটবে কী করে?
সরকারি-বেসরকারি হিসাব বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তৈরি হওয়া বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে পানি। কিন্তু পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
এতে মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতিতে শুধু ঘরবাড়ি নয়, বড় ক্ষতি হয়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে।
প্রাথমিক হিসাবে শুধু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা। তবে পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
যা সব মিলে ২ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে যাবে বলেই মনে করছেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান।
“কৃষি, মৎস্য, প্রাণি, ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাট সবমিলে এবারের অতি বৃষ্টি ও বন্যার ক্ষতি দুই হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে যাবে। যদিও এভাবে বলা ঠিক হচ্ছে না। তবে আমার মনে হয় এর চেয়ে কম হবে না,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
তবে সরকারের প্রাথমিক হিসাব বলছে, যে ৪৮৮ কোটি টাকার হিসাব করা হয়েছে- তার মধ্যে শুধু মৎস্য খাতেই ক্ষতি হয়েছে ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং প্রাণিসম্পদ খাতে আরও ৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের হিসাব টাকার অংকে পাওয়া গেলেও তলিয়ে যাওয়া ফসলি জমিতে কতো টাকা, তার চূড়ান্ত হিসাব এখনো হয়নি।
টানা বৃষ্টিতে একসময় প্রায় ১ লাখ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। বৃষ্টিপাত কমায় পানি নামতে শুরু করলেও এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষতির হিসাব এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির এ হিসাব প্রাথমিক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১৭ই জুলাইয়ের হিসাব বলছে, বন্যায় ৫৬টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে এবং ৫১ হাজার ৮৮০টি পরিবার এখনো পানিবন্দি রয়েছে।
তবে আশার কথা গত কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন জায়গার পানি নামতে শুরু করেছে।
তবে জীবন কি ঘরে ফিরতে শুরু করেছে? ক্ষতি সামলে দুর্গত মানুষ, কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে কতোটা সহায়তা করতে পারছে সরকার?
এমন প্রশ্ন যখন ঘুরছে তখন চলুন জানি, বন্যায় কোন খাতে কত ক্ষতি, কোথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের জীবনের প্রভাব কতোটা।
পানির নিচে ফসলি জমি, মূল্যস্ফীতিতে চাপ
টানা বৃষ্টিতে একসময় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে সাড়ে ৬২ হাজার হেক্টর জমির আউশ ও আমনের বীজতলা প্লাবিত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে সবজির খেতও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫ লাখের বেশি কৃষক।
বৃষ্টিপাত কমায় পানি নামতে শুরু করলেও এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে।
যদিও ক্ষতির হিসাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ের প্রাথমিক মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া এ খাতে আর্থিক ক্ষতির হিসাব এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
নিশ্চিতভাবেই কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে আউশ ধান। প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর আউশের জমি পানিতে তলিয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির জমিও।
এ নিয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। অনেক এলাকায় ধানের চারা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে কৃষকদের নতুন করে রোপণের প্রস্তুতি নিতে হবে।”
তবে এখনো ব্যাপক পরিসরে আমন রোপণ না হওয়ায় বড় ধরনের ফসলহানির আশংকা তুলনামূলক কম রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
পানি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল।
“বর্তমানে ফসলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব তৈরি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে,” বলেছেন তিনি।
এ দিকে কৃষি অর্থনীতিবিদদের আশংকা, আউশ ধানের ক্ষতি হলে চালের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান আলাপ-কে বলেন, “এর আগে হাওরে এবং এবারের বন্য মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ টন চালের উৎপাদন কমতে পারে। কারণ এবার প্রায় ১৫ শতাংশ বা সাড়ে ৪ লাখ টন আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর আগে বোরো ক্ষতি হয়ে ছিলো প্রায় আড়াই লাখ টন। এতে খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশংকা রয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চাল ও গম আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে সবজি উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে। যা শীতের সবজি না আসা পর্যন্ত থাকতে পারে।”
সরকারের সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষমাত্রা পূরণ কঠিন সম্ভব নাও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এ জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত আর্থিক ও নগদ সহায়তার ওপর জোর দিচ্ছেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক এই মহাপরিচালক।
মাছের সঙ্গে ভেসে গেছে বহু পরিবারের আয়
বন্যায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মৎস্য খাতে। পুকুর, ঘের ও মাছের খামার ভেসে যাওয়ায় প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
প্রায় ৩৪ হাজার মাছের খামার ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ হাজার ৮৮৯টি মাছের ঘের এবং ৪৬টি মাছ ধরার নৌযান। পাঁচজন জেলের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
কিন্তু এই ক্ষতির অর্থ শুধু কয়েকশ কোটি টাকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার পরিবারের আয়।
অনেক ছোট চাষি ঋণ নিয়ে পুকুরে মাছ ছাড়েন। বন্যার পানিতে মাছ ভেসে যাওয়ার পর তাদের সামনে এখন নতুন করে পুকুর প্রস্তুত করা, পোনা কেনা এবং খাবারের ব্যবস্থা করার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
চট্টগ্রাম বিভাগে মৎস্য খাতে ক্ষতি ২০০ কোটি টাকার বেশি বলে প্রাথমিক হিসাব দিয়েছে সরকার। পাঁচ জেলার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ক্ষতি ২৮৭ কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম জেলায় মৎস্য খাতে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ছিলো ৯১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা।
উখিয়ার রাজাপালং এলাকার মাছচাষি মোহাম্মদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, “ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যার এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে। মাছ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিলো, এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের জরুরি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।”
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের সরকারি সহায়তার কথা জানিয়ে কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।”
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতেও বড় ক্ষতি
ফসল, মাছের সঙ্গে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গবাদিপশুর খামারও।
এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে- প্রায় ৪ হাজার ৮১৯টি গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৬ হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে আড়াই হাজারের বেশি।
প্রায় ১২ হাজার টন দানাদার পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খড় ও ঘাসের খেতও। সব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি ৩০ লাখ হাঁস-মুরগি আক্রান্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটির বেশি।
চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় বন্যায় ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ৩০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শুধু হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাই সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপপরিচালক (ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ) ডা. মুহাম্মদ ইজমাল হাসান বলেন, “বন্যার কারণে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় পানি এখনো নামেনি। তবে মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী সব মিলিয়ে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার চূড়ান্ত ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে।”
এখনো বিভিন্ন জায়গায় ক্ষয়ক্ষতির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বন্যায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও বাড়ছে ক্ষতির ঝুঁকি
বন্যার ক্ষতি শুধু কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিভিন্ন ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে পানি ঢুকে আমদানি করা কাঁচামাল, রাসায়নিক, খাদ্যপণ্য ও প্যাকেজিং সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণে বিলম্ব হলে অর্ডার বাতিল, মূল্যছাড়, জরিমানা ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
“ক্ষতির হিসাব শুধু পানিতে নষ্ট হওয়া পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ডেমারেজ-ডিটেনশন, স্টোরেজ ব্যয় এবং নগদ অর্থপ্রবাহের সংকট,” আলাপ-কে বলেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
ইতোমধ্যেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন দেশের শীর্ষ চার ব্যবসায়ী সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতারা।
নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া সেই চিঠিতে বলা হয়েছে- আমদানি করা তুলা, সুতা, কাপড়, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক, প্যাকেজিং সামগ্রী ও খাদ্যপণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রপ্তানির অপেক্ষায় থাকা তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত ও কৃষিপণ্য সময়মতো জাহাজীকরণ না হলে অর্ডার বাতিল, মূল্যছাড় ও বিলম্বজনিত জরিমানার আশংকাও রয়েছে।
ফলে বন্যার ক্ষতি শুধু নষ্ট হয়ে যাওয়া পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
জীবিকা হারানোর ভয়
বন্যার ক্ষতি হিসাব করার সময় সাধারণত জমির পরিমাণ, মাছের খামার কিংবা গবাদিপশুর সংখ্যা হিসাব করা হয়। কিন্তু এর পেছনে থাকা মানুষের গল্পটি আরও বড়।
একজন কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়া মানে শুধু একটি মৌসুমের আয় হারানো নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এর অর্থ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারা। আবার একজন মৎস্যচাষির পুকুর ভেসে যাওয়া মানে পরবর্তী কয়েক মাসের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল আলাপ-কে বলেন, “অনেক কৃষক বিক্রির উদ্দেশ্যেও ধান ও সবজির বীজতলা তৈরি করেন। তাই বীজতলা নষ্ট হওয়া মানে শুধু উৎপাদন নয়, সরাসরি আয় হারানোও।”
গবাদিপশু হারানো পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতি আরও দীর্ঘমেয়াদি। কারণ একটি গরু বা খামার অনেক পরিবারের সঞ্চয় ও ভবিষ্যত আয়ের প্রধান উৎস।
এ কারণে বন্যার পর শুধু ত্রাণ দিলেই সংকট শেষ হয় না। প্রয়োজন হয় পুনর্বাসন। কৃষকের জন্য বীজ ও সার। মৎস্যচাষির জন্য পোনা ও মাছের খাবার। খামারির জন্য পশুখাদ্য ও চিকিৎসা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তাও জরুরি।
নামছে পানি, বাড়ছে দুর্ভোগ
বন্যার সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। কিন্তু পানি নামতে থাকায় এখন সামনে এসেছে নতুন সংকট।
অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেছে। কোথাও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মানুষ ঘরে ফিরতে পারলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না।
চট্টগ্রামে পানি নামার পর ১৫ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি, ৩৮৭টি স্কুল ও ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। এখন সেখানে ত্রাণের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় বন্যার পানি কমছে তবে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বানভাসিদের দুর্ভোগ ও দুর্দশা লাঘবে পর্যাপ্ত ত্রাণ তৎপরতা নেই।
পানি কমে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দা ঘরবাড়ি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা শুরু করেছেন। দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পানি নেমে যাওয়ার পর কাদাভরা ঘর এবং বাড়িজুড়ে ময়লা–আবর্জনা নতুন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক জায়গায় গ্রামীণ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি সচল না থাকায় দুর্দশায় পড়া মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় মালামাল পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক পরিবার এখনো ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছে।
সরকারের পুনর্বাসন পরিকল্পনা
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার কথা জানিয়েছে সরকার। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলার জন্য ৩২৭ টন ধানের বীজ বিতরণ, ১ লাখ ৫১ হাজারের বেশি গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া এবং পশুখাদ্যের জন্য ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, নগদ সহায়তা এবং পানি ও স্যানিটেশন সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তিনি বলেন, “ যে সব কৃষকের বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের হাতে দ্রুত বীজ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আর যাদের জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে এবং এখনই বীজ বোনার সুযোগ নেই, তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে বিকল্প বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে উৎপাদিত চারা ১৫ থেকে ২০ দিন পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা রোপণ করতে পারেন।”
গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, “বন্যার পর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় খুরা রোগ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের। তাই আজ থেকেই বন্যাকবলিত পাঁচ জেলায় ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে শতভাগ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।”
জরিপ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষীদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন আমিন উর রশিদ।
তালিকা হালনাগাদ করা প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, “সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলায় বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরা মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।”
পানি কমছে। কিন্তু বন্যার ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে। তা ছাড়া ক্ষতির চূড়ান্ত সরকারি হিসাব এখনো হয়নি। মাঠের পানি পুরোপুরি নেমে গেলে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
কিন্তু এর প্রভাব শুধু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আটকে নেই। এরই মধ্যে বাজারে চাল, মাছ ও মুরগির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্যার কারণে উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থের অঙ্ক নয়। প্রশ্ন হলো- বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কত দ্রুত ঘরে ফিরতে পারবেন, কত দ্রুত জীবিকা ফিরে পাবেন এবং পরবর্তী মৌসুমে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবেন কি না।
কারণ বন্যার পানি একসময় নেমে যায়। কিন্তু একটি পরিবার যখন ঘর, ফসল, মাছের খামার কিংবা গবাদিপশু হারায়, তখন সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক বেশি সময় লাগে।
এই কারণেই এবারের বন্যার প্রকৃত ক্ষতির হিসাব শুধু কয়েকশ কোটি টাকায় থেমে থাকবে না। পানি নামতে শুরু করলেও বন্যার ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে অনেক বেশি।
ফসল, মাছ ও গবাদিপশুর এই ক্ষতি শুধু কৃষকের নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য সরবরাহ, বাজারদরসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এখন প্রশ্ন- এই ক্ষতি সামলে দুর্গত মানুষ, কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে আদতেই কতটা সহায়তা দিতে পারবে সরকার? আর তাতে কতদিনে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
পানি কমছে, আসছে অর্থনীতির নতুন চাপ
সরকারের প্রাথমিক হিসাব বলছে, সম্প্রতি অতি বৃষ্টি ও বন্যায় তলিয়ে গেছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। এছাড়াও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট এমনকি আমদানি-রপ্তানি পণ্যও। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন- সব মিলে ক্ষতির পরিমাণ ছাপিয়ে যেতে পারে দুই হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন এখন পানি তো নামছে কিন্তু ঘর, ফসল ও জীবিকা হারানো মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তো?
এই তো কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে ছিলো ঘর-উঠান, মাঠজুড়ে ছিলো ফসল- সেখানে এখন শুধু কাদামাটি আর ধ্বংসের চিহ্ন। অনেকেই চোখের সামনে পানির তোড়ে হারিয়ে যেতে দেখেছেন আপন জন।
অতি বৃষ্টি আর বন্যার পানিতে কারও ঘর ভেসে গেছে, কারও ভেসে গেছে পুকুরের সব মাছ। কারও বাৎসরিক আয়ের অন্যতম উৎস প্রিয় গবাদিপশুটাও মারা গেছে অসহায় হয়ে।
এদের মন-মগজে বেঁচে থাকার চিন্তায় একটাই প্রশ্ন- পানি তো নামবে কিন্তু তারা ফিরবেন কোথায়? ঘরই তো আর নেই। পরের প্রশ্ন- সরকার না হয় কিছু দিন খাবার দিবে কিন্তু এরপর পেটের জ্বালা মিটবে কী করে?
সরকারি-বেসরকারি হিসাব বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তৈরি হওয়া বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে পানি। কিন্তু পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
এতে মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতিতে শুধু ঘরবাড়ি নয়, বড় ক্ষতি হয়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে।
প্রাথমিক হিসাবে শুধু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা। তবে পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
যা সব মিলে ২ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে যাবে বলেই মনে করছেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান।
“কৃষি, মৎস্য, প্রাণি, ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাট সবমিলে এবারের অতি বৃষ্টি ও বন্যার ক্ষতি দুই হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে যাবে। যদিও এভাবে বলা ঠিক হচ্ছে না। তবে আমার মনে হয় এর চেয়ে কম হবে না,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
তবে সরকারের প্রাথমিক হিসাব বলছে, যে ৪৮৮ কোটি টাকার হিসাব করা হয়েছে- তার মধ্যে শুধু মৎস্য খাতেই ক্ষতি হয়েছে ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং প্রাণিসম্পদ খাতে আরও ৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের হিসাব টাকার অংকে পাওয়া গেলেও তলিয়ে যাওয়া ফসলি জমিতে কতো টাকা, তার চূড়ান্ত হিসাব এখনো হয়নি।
টানা বৃষ্টিতে একসময় প্রায় ১ লাখ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। বৃষ্টিপাত কমায় পানি নামতে শুরু করলেও এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষতির হিসাব এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির এ হিসাব প্রাথমিক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১৭ই জুলাইয়ের হিসাব বলছে, বন্যায় ৫৬টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে এবং ৫১ হাজার ৮৮০টি পরিবার এখনো পানিবন্দি রয়েছে।
তবে আশার কথা গত কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন জায়গার পানি নামতে শুরু করেছে।
তবে জীবন কি ঘরে ফিরতে শুরু করেছে? ক্ষতি সামলে দুর্গত মানুষ, কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে কতোটা সহায়তা করতে পারছে সরকার?
এমন প্রশ্ন যখন ঘুরছে তখন চলুন জানি, বন্যায় কোন খাতে কত ক্ষতি, কোথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের জীবনের প্রভাব কতোটা।
পানির নিচে ফসলি জমি, মূল্যস্ফীতিতে চাপ
টানা বৃষ্টিতে একসময় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে সাড়ে ৬২ হাজার হেক্টর জমির আউশ ও আমনের বীজতলা প্লাবিত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে সবজির খেতও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫ লাখের বেশি কৃষক।
বৃষ্টিপাত কমায় পানি নামতে শুরু করলেও এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে।
যদিও ক্ষতির হিসাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ের প্রাথমিক মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া এ খাতে আর্থিক ক্ষতির হিসাব এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
নিশ্চিতভাবেই কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে আউশ ধান। প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর আউশের জমি পানিতে তলিয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির জমিও।
এ নিয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। অনেক এলাকায় ধানের চারা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে কৃষকদের নতুন করে রোপণের প্রস্তুতি নিতে হবে।”
তবে এখনো ব্যাপক পরিসরে আমন রোপণ না হওয়ায় বড় ধরনের ফসলহানির আশংকা তুলনামূলক কম রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
পানি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল।
“বর্তমানে ফসলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব তৈরি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে,” বলেছেন তিনি।
এ দিকে কৃষি অর্থনীতিবিদদের আশংকা, আউশ ধানের ক্ষতি হলে চালের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান আলাপ-কে বলেন, “এর আগে হাওরে এবং এবারের বন্য মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ টন চালের উৎপাদন কমতে পারে। কারণ এবার প্রায় ১৫ শতাংশ বা সাড়ে ৪ লাখ টন আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর আগে বোরো ক্ষতি হয়ে ছিলো প্রায় আড়াই লাখ টন। এতে খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশংকা রয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চাল ও গম আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে সবজি উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে। যা শীতের সবজি না আসা পর্যন্ত থাকতে পারে।”
সরকারের সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষমাত্রা পূরণ কঠিন সম্ভব নাও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এ জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত আর্থিক ও নগদ সহায়তার ওপর জোর দিচ্ছেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক এই মহাপরিচালক।
মাছের সঙ্গে ভেসে গেছে বহু পরিবারের আয়
বন্যায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মৎস্য খাতে। পুকুর, ঘের ও মাছের খামার ভেসে যাওয়ায় প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
প্রায় ৩৪ হাজার মাছের খামার ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ হাজার ৮৮৯টি মাছের ঘের এবং ৪৬টি মাছ ধরার নৌযান। পাঁচজন জেলের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
কিন্তু এই ক্ষতির অর্থ শুধু কয়েকশ কোটি টাকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার পরিবারের আয়।
অনেক ছোট চাষি ঋণ নিয়ে পুকুরে মাছ ছাড়েন। বন্যার পানিতে মাছ ভেসে যাওয়ার পর তাদের সামনে এখন নতুন করে পুকুর প্রস্তুত করা, পোনা কেনা এবং খাবারের ব্যবস্থা করার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
চট্টগ্রাম বিভাগে মৎস্য খাতে ক্ষতি ২০০ কোটি টাকার বেশি বলে প্রাথমিক হিসাব দিয়েছে সরকার। পাঁচ জেলার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ক্ষতি ২৮৭ কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম জেলায় মৎস্য খাতে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ছিলো ৯১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা।
উখিয়ার রাজাপালং এলাকার মাছচাষি মোহাম্মদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, “ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যার এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে। মাছ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিলো, এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের জরুরি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।”
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের সরকারি সহায়তার কথা জানিয়ে কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।”
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতেও বড় ক্ষতি
ফসল, মাছের সঙ্গে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গবাদিপশুর খামারও।
এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে- প্রায় ৪ হাজার ৮১৯টি গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৬ হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে আড়াই হাজারের বেশি।
প্রায় ১২ হাজার টন দানাদার পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খড় ও ঘাসের খেতও। সব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি ৩০ লাখ হাঁস-মুরগি আক্রান্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটির বেশি।
চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় বন্যায় ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ৩০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শুধু হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাই সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপপরিচালক (ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ) ডা. মুহাম্মদ ইজমাল হাসান বলেন, “বন্যার কারণে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় পানি এখনো নামেনি। তবে মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী সব মিলিয়ে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার চূড়ান্ত ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে।”
এখনো বিভিন্ন জায়গায় ক্ষয়ক্ষতির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বন্যায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও বাড়ছে ক্ষতির ঝুঁকি
বন্যার ক্ষতি শুধু কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিভিন্ন ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে পানি ঢুকে আমদানি করা কাঁচামাল, রাসায়নিক, খাদ্যপণ্য ও প্যাকেজিং সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণে বিলম্ব হলে অর্ডার বাতিল, মূল্যছাড়, জরিমানা ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
“ক্ষতির হিসাব শুধু পানিতে নষ্ট হওয়া পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ডেমারেজ-ডিটেনশন, স্টোরেজ ব্যয় এবং নগদ অর্থপ্রবাহের সংকট,” আলাপ-কে বলেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
ইতোমধ্যেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন দেশের শীর্ষ চার ব্যবসায়ী সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতারা।
নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া সেই চিঠিতে বলা হয়েছে- আমদানি করা তুলা, সুতা, কাপড়, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক, প্যাকেজিং সামগ্রী ও খাদ্যপণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রপ্তানির অপেক্ষায় থাকা তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত ও কৃষিপণ্য সময়মতো জাহাজীকরণ না হলে অর্ডার বাতিল, মূল্যছাড় ও বিলম্বজনিত জরিমানার আশংকাও রয়েছে।
ফলে বন্যার ক্ষতি শুধু নষ্ট হয়ে যাওয়া পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
জীবিকা হারানোর ভয়
বন্যার ক্ষতি হিসাব করার সময় সাধারণত জমির পরিমাণ, মাছের খামার কিংবা গবাদিপশুর সংখ্যা হিসাব করা হয়। কিন্তু এর পেছনে থাকা মানুষের গল্পটি আরও বড়।
একজন কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়া মানে শুধু একটি মৌসুমের আয় হারানো নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এর অর্থ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারা। আবার একজন মৎস্যচাষির পুকুর ভেসে যাওয়া মানে পরবর্তী কয়েক মাসের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল আলাপ-কে বলেন, “অনেক কৃষক বিক্রির উদ্দেশ্যেও ধান ও সবজির বীজতলা তৈরি করেন। তাই বীজতলা নষ্ট হওয়া মানে শুধু উৎপাদন নয়, সরাসরি আয় হারানোও।”
গবাদিপশু হারানো পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতি আরও দীর্ঘমেয়াদি। কারণ একটি গরু বা খামার অনেক পরিবারের সঞ্চয় ও ভবিষ্যত আয়ের প্রধান উৎস।
এ কারণে বন্যার পর শুধু ত্রাণ দিলেই সংকট শেষ হয় না। প্রয়োজন হয় পুনর্বাসন। কৃষকের জন্য বীজ ও সার। মৎস্যচাষির জন্য পোনা ও মাছের খাবার। খামারির জন্য পশুখাদ্য ও চিকিৎসা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তাও জরুরি।
নামছে পানি, বাড়ছে দুর্ভোগ
বন্যার সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। কিন্তু পানি নামতে থাকায় এখন সামনে এসেছে নতুন সংকট।
অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেছে। কোথাও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মানুষ ঘরে ফিরতে পারলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না।
চট্টগ্রামে পানি নামার পর ১৫ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি, ৩৮৭টি স্কুল ও ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। এখন সেখানে ত্রাণের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় বন্যার পানি কমছে তবে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বানভাসিদের দুর্ভোগ ও দুর্দশা লাঘবে পর্যাপ্ত ত্রাণ তৎপরতা নেই।
তাতে দুর্গত এলাকায় খাদ্য, জরুরি ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকট দেখা দিয়েছে।
পানি কমে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দা ঘরবাড়ি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা শুরু করেছেন। দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পানি নেমে যাওয়ার পর কাদাভরা ঘর এবং বাড়িজুড়ে ময়লা–আবর্জনা নতুন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক জায়গায় গ্রামীণ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি সচল না থাকায় দুর্দশায় পড়া মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় মালামাল পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক পরিবার এখনো ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছে।
সরকারের পুনর্বাসন পরিকল্পনা
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার কথা জানিয়েছে সরকার। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলার জন্য ৩২৭ টন ধানের বীজ বিতরণ, ১ লাখ ৫১ হাজারের বেশি গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া এবং পশুখাদ্যের জন্য ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, নগদ সহায়তা এবং পানি ও স্যানিটেশন সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তিনি বলেন, “ যে সব কৃষকের বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের হাতে দ্রুত বীজ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আর যাদের জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে এবং এখনই বীজ বোনার সুযোগ নেই, তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে বিকল্প বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে উৎপাদিত চারা ১৫ থেকে ২০ দিন পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা রোপণ করতে পারেন।”
গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, “বন্যার পর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় খুরা রোগ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের। তাই আজ থেকেই বন্যাকবলিত পাঁচ জেলায় ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে শতভাগ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।”
মন্ত্রী জানান, সৃষ্ট গোখাদ্যের সংকট মোকাবিলায় প্রথম ধাপে ৩৫ লাখ টাকার গোখাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তীতেও সহায়তা বাড়ানো হবে।
জরিপ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষীদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন আমিন উর রশিদ।
তালিকা হালনাগাদ করা প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, “সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলায় বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরা মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।”
স্বাভাবিক জীবনে ফেরাটাই চ্যালেঞ্জ
পানি কমছে। কিন্তু বন্যার ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে। তা ছাড়া ক্ষতির চূড়ান্ত সরকারি হিসাব এখনো হয়নি। মাঠের পানি পুরোপুরি নেমে গেলে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
কিন্তু এর প্রভাব শুধু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আটকে নেই। এরই মধ্যে বাজারে চাল, মাছ ও মুরগির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্যার কারণে উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থের অঙ্ক নয়। প্রশ্ন হলো- বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কত দ্রুত ঘরে ফিরতে পারবেন, কত দ্রুত জীবিকা ফিরে পাবেন এবং পরবর্তী মৌসুমে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবেন কি না।
কারণ বন্যার পানি একসময় নেমে যায়। কিন্তু একটি পরিবার যখন ঘর, ফসল, মাছের খামার কিংবা গবাদিপশু হারায়, তখন সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক বেশি সময় লাগে।
এই কারণেই এবারের বন্যার প্রকৃত ক্ষতির হিসাব শুধু কয়েকশ কোটি টাকায় থেমে থাকবে না। পানি নামতে শুরু করলেও বন্যার ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে অনেক বেশি।
ফসল, মাছ ও গবাদিপশুর এই ক্ষতি শুধু কৃষকের নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য সরবরাহ, বাজারদরসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এখন প্রশ্ন- এই ক্ষতি সামলে দুর্গত মানুষ, কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে আদতেই কতটা সহায়তা দিতে পারবে সরকার? আর তাতে কতদিনে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন ক্ষতিগ্রস্তরা।