মন্তব্য প্রতিবেদন

মশার কামড়ে সচিবের মৃত‍্যু যে বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়

বাণিজ্য সচিবের সম্প্রতি পাহাড়ে যাওয়ার ইতিহাস নেই। বিদেশ গেছেন বটে। সরকারি বয়ানে ঢাকায় ম্যালেরিয়ার জীবানুবাহী মশা অ্যানোফিলিসের অস্তিত্ব নেই। তবে গবেষকরা ঠিকই পেয়েছেন।

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো। হঠাৎ খবর পেলাম দুই দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত ছোট ভাই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জাহিদ হাসান ফাহাদের ডেঙ্গু ধরা পড়েছে।

বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ছুটলাম পাঠাও নিয়ে। ততোক্ষণে ওকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে।

এই নিয়ে দুইবার। পরেরবারতো প্ল্যাটিলেট নেমেছিল সাত হাজারে। উন্নতি না হওয়ায় হাসপাতাল পরিবর্তন করতে হয়। শেষ পর্যন্ত প্রফেসর এ বি এম আবদুল্লাহ স্টেরয়েড দিয়ে ওকে সারিয়ে তোলেন।

ঢাকায় যারা থাকি তাদের অনেক কিছুর যেন সহ্য হয়ে গেছে। কারো আর কিছু গায়ে লাগে না। জ্যাম, ধূলা এমনকি মশাও।

কেউ আর কারণও খোঁজে না। কেউ দায়ও নেয় না। দায় শুধু কপালের। কারণ ঢাকায় থাকি।

শুক্রবার সকাল বেলা খবর পেলাম বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান মারা গেছেন। তারও প্ল্যাটিলেট কমে গিয়েছিল। পাঁচদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

তবে তার ডেঙ্গু নয়, ধরা পড়েছিল ম্যালেরিয়া।

আমার একটু আধটু পাহাড় ডিঙানোর অভ্যাস আছে। সময় পেলেই পাহাড়চূড়ার জুমঘরে ঢুঁ মেরে স্ট্রেস রিলিফ করি। আসলে ইট কাঠের খাঁচা থেকে একটু নিস্তারের আশায়।

উঁচু  নিচু অন্ধকার পথ ভয় লাগে না। দুশ্চিন্তা হয় মশা নিয়ে। অ্যানোফিলিস কামড়ালে রক্ষা নাই। নিশ্চিত ম্যালেরিয়া।

খোঁজ নিয়ে জানলাম বাণিজ্য সচিবের সম্প্রতি পাহাড়ে যাওয়ার ইতিহাস নেই। বিদেশ গেছেন বটে। তাই কীভাবে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলেন তা একটা প্রশ্ন।

তবে একটু ঘাটতেই প্রশ্নের উত্তর পেলাম। সরকারি বয়ানে ঢাকায় ম্যালেরিয়ার জীবানুবাহী মশা অ্যানোফিলিসের অস্তিত্ব নেই।

তবে গবেষকরা ঠিকই পেয়েছেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে দৈনিক দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদন ঢাকায় ম্যালেরিয়া রোগের বাহক অ্যানোফিলিস মশা ও মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক গবেষণাটি করেছিলেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভেতর ও করপোরেশনসংলগ্ন স্থানে পূর্ণাঙ্গ অ্যানোফিলিস মশা ও মশার লার্ভা পেয়েছিলেন তারা।

ঢাকায় এর আগে অল্পবিস্তর অ্যানোফিলিস মশা পাওয়া গেলেও, লার্ভা পাওয়া গিয়েছিল প্রথমবারের মতো।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেছিলেন, “অ্যানোফিলিস মশা কামড়ের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া রোগটি ছড়ায়। যদি ওই মশার দেহে ম্যালেরিয়ার জীবাণু থাকে তবেই নতুন কেউ আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে অ্যানোফিলিস মশার ৩৬টি প্রজাতি আমরা পেয়েছি। একেক প্রজাতি একেক রকম। একেক জায়গায় হয়।”

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুব রহমান মারা যাওয়ার পর ড. কবিরুল বাশার আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন ঢাকায় ম্যালেরিয়ার মশা অ্যানোফিলিসের কথা।

একটি ভিডিওতে তিনি বলেছেন, “অ্যানোফিলিস মশার প্রায় ছয়টি প্রজাতি আমরা ঢাকা শহরে বিভিন্ন সময় পেয়ে থাকি। গত সপ্তাহেও আমরা বেশ ভালো ঘনত্বের অ্যানোফিলিস মশা পেয়েছি ঢাকাতে। ঢাকার উত্তরাতে সবচাইতে বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই আমরা এখন অ্যানোফিলিস মশা পাচ্ছি।”

তিনি সতর্ক করেছেন রীতিমতো। বলেছেন, “যেহেতু ঢাকা শহরে অ্যানোফিলিস মশার ঘনত্ব আছে বা অ্যানোফিলিসের অস্তিত্ব আছে, যদি রোগী অন্য জায়গা থেকে আসে সেখানে লোকালি ট্রান্সমিশন ঢাকাতে হতে পারে। আমাদেরকে আগামভাবেই প্রস্তুত থাকা দরকার।”

গবেষক তার কাজে করেছেন। খুঁজে বের করেছেন, সতর্ক করেছেন। কিন্তু এই যে আগাম প্রস্তুতির কথা বললেন, কে নেবে এই প্রস্তুতি?

মশা নিধনের দায়িত্ব কার? সিটি করপোরেশনের। জনগণেরও বটে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম সম্প্রতি বলেছেন, “শুধুমাত্র সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে কোনোভাবেই মশা নিধন করা সম্ভব না, পরিষ্কার রাখাও সম্ভব না, যদি জনগণ এগিয়ে না আসে।”

তিনি বলেছেন, “এ জন্য আমি সব সময় বলি, এই দায়িত্ব অর্ধেক-অর্ধেক।”

কিন্তু বাস্তবতা হলো মশা উড়ছে, কামড়াচ্ছে, মানুষ মরছে। বছরের একটা সময়তো ডেঙ্গু আতঙ্কের নাম হয়ে আসে শহরে।

এখন আর অবশ্য মৌসুমী নয়, সারা বছরই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় নগরবাসী।

২০০০ সালের দিকে ডেঙ্গুর আক্রান্ত হয়েছিল পাঁচ হাজারের বেশি। মারা যায় অন্তত ৯৩ জন। সেটি ছিল শুরু মাত্র।

২০১৯ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। মৃত্যু ১৬৪। মাত্র চার বছর পর, ২০২৩ সালে সেই রেকর্ডও ভেঙে যায়।

আক্রান্ত হয় ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ। এক হাজার সাতশ জনের মৃত্যুতে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের বছর হয়ে ওঠে।

সিটি করপোরেশন কী করে

গত ১০ বছরে মশা নিধন কর্মসূচি ও কীটনাশক কেনায় ঢাকার দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন এক হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন বলছে, মশা কেন মরছে না, সেটি নিয়ে খোদ সিটি করপোরেশন চিন্তিত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, মশার লার্ভা ধ্বংস করতে সকালে টেমিফস নামের একটি ওষুধ স্প্রে (ছিটানো) করা হয়, যা ভারত থেকে আমদানি করা। আর বিকেলে উড়ন্ত মশা মারতে মেলাথিউন নামের ওষুধ দিয়ে ফগিং (ধোঁয়া ছড়ানো) করা হয়, যা চীন থেকে আনা।

স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, পরীক্ষাগারে ওষুধের কার্যকারিতা ঠিকমতো পাওয়া গেলেও মাঠে প্রয়োগের পর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণে চলতি অর্থবছরে শুধু মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ব্যয় করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

কেবল মশা নিধনেই গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।

এই টাকাতো ট্যাক্সের টাকা। যে জনগণ ট্যাক্স দেয় মরে আবার সেই।

ম্যালেরিয়া ঠেকানো যাবেতো?

ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। বেশ গণমাধ্যমবান্ধব ছিলেন ভদ্রলোক।

সহকর্মী মেরাজ মেভিজ তাকে স্মরণ করে ফেইসবুকে লিখেছেন, “এত মিডিয়া ফ্রেন্ডলি বাণিজ্য সচিব কয়জন ছিলেন আমার জানা নেই। সময়-অসময়, দেশ-বিদেশ; তাকে ফোনে পাওয়া যেত। করা যেত যে কোন প্রশ্ন।”

তাকে আসলেই প্রশ্ন করা যেতো, উত্তর মিলতো। কিন্তু মশা নিয়ে প্রশ্ন করবো কাকে? এই যে ম্যালেরিয়ার মশা অ্যানোফিলিস ঢাকায় আছে, এরপর কী?

নাকি ডেঙ্গুর মতো এটাও বাড়তে থাকবে। মৃত্যু বাড়বে। মানুষ হয়ে যাবে সংখ্যা।

এক সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন পরিসংখ্যান দেবে, ২৪ ঘণ্টায় ম্যালেরিয়ার মৃত্যু আর আক্রান্তের সংখ্যা।

জনগণ কী করবে? কাকে জিজ্ঞেস করবে। মেয়র নেই, কাউন্সিলর নেই।

অবশ্য যখন ছিল তখনই-বা কী হতো।

মনে পড়ছে একবার ঘটা করে ঢাকার ড্রেনে গাপ্পি মাছ ছাড়া হয়েছিল মশার লার্ভা খেয়ে ফেলার জন্য। রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। আরেকবার কথা হয়েছিল ব‍্যাঙ চাষ করার। শেষ পর্যন্ত হাস‍্যরসের খোরাক জোগানো প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। গাপ্পিও হাস‍্যরস সৃষ্টি করেছিল বলে পরে আর গাপ্পিরও খোঁজ নেয়নি কেউ।

সেই গাপ্পিও নেই, সেই ব্যাঙও নেই, নেই সেই মেয়রও। কিন্তু মশা ছিল, মশা আছে। মশাই থাকবে?