‘আচমকা ব্রেক করতেই ট্রাকটা উলটে গেলো, বাবাও মারা গেছে’

টাঙ্গাইলে রড বোঝাই ট্রাক খাদে পড়ে ১৫ প্রাণহানি, শ্রমজীবী মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ ঈদযাত্রা নিয়ে আবারও প্রশ্ন।

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম

ত্রিপল দিয়ে ঢাকা রড বোঝাই ট্রাক। ওপরে ঘুমে বিভোর জনা সাতাশেক মানুষ। হঠাৎই বিকট শব্দ। এক লহমায় সব অন্ধকার।

“গাড়ি আচমকা ব্রেক করলেই ট্রাকটা উল্টায়ে যায়। সামনে গাড়ি ছিলো কি-না জানি না। কারণ আমরা শোয়া ছিলাম”, হাসপাতালে বসে বলছিলেন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে আসা তুহিন।

বারান্দাজুড়ে তখন কান্নার রোল। মানুষের দীর্ঘশ্বাস। এক মুহূর্তেই লাশ হয়ে গেলেন ১৫জন ঘুমন্ত মানুষ।

যাত্রীবাহী বাহন না হলেও, ট্রাকটিতে ছিলেন ২৭ জন যাত্রী। চট্টগ্রাম ও ফেনী থেকে যাচ্ছিলেন উত্তরবঙ্গের চাঁপাইনবাবগঞ্জ আর নওগাঁ।

অধিকাংশই কেউ ভাঙ্গারি প্লাস্টিকের ব্যবসা করেন, কেউ বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করা হাড়িপাতিল-তৈজস তথা ‘হরেক মাল’ বেচেন। ঈদ এলেই বাড়ি ফেরেন পরিবারের টানে।

স্বল্প আয়ের মানুষ। তাই টাকা বাঁচাতেই উঠেছিলেন ট্রাকে। ভাড়া ছিলো জনপ্রতি মাত্র ৫০০ টাকা।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে ওঠা চারজনের গন্তব্য ছিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আর ফেনী থেকে ১৯ জন উঠেছিলেন নওগাঁর উদ্দেশে।

সোমবার ভোরে যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর সরাতৈলে এসেই ট্রাকটি উল্টে খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৫ জন। আহত হন আরও অন্তত ৯ জন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ট্রাকটিতে রডের পাশাপাশি যাত্রীও বহন করা হচ্ছিলো। যাত্রীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। ভোরের দিকে মহাসড়কে পৌঁছানোর পর হঠাৎ জোরে ব্রেক করলে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খাদে উল্টে পড়ে। ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে রড, ভাঙা কাঠামো আর মানুষের আর্তচিৎকার। স্থানীয় লোকজন প্রথমে উদ্ধারকাজ শুরু করলেও ভারী রড ও ট্রাকের চাপে আটকে থাকা মানুষদের বের করতে হিমশিম খেতে হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার অভিযান চালায়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, “গাড়ির এক ফাঁক দিয়া আমি একা একাই বাইর হইছি। আল্লাহ আমাকে বাইর করে দিছে। আর সবারে তো গাড়ি চাপা দিছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমার শরীরে কোনো আঘাত লাগে নাই। কোনো গাড়িও ধাক্কা মারে নাই।”

জানা গেছে, আব্দুর রহমানের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নওগাঁর বিভিন্ন গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে।

এই দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মান্দা উপজেলার ১ নম্বর ভারশোঁ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক বাড়িতে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত হওয়ায় পরিবারগুলো অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

নিহতদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন, রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের মোহাম্মদ তারেক, মোহাম্মদ আব্দুল বারেক, মোহাম্মদ বাদশা, মোহাম্মদ সোহাগ, মোহাম্মদ রবিউল ও মোহাম্মদ সাগর। এছাড়া মুর্শিদপুর গ্রামের মইনুর ইসলাম এবং পাকুড়িয়া গ্রামের দুই ভাই মোহাম্মদ মাইনুল ও মোহাম্মদ গিয়াস নিহত হয়েছেন। বাকি কয়েকজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। 

আহতদের মধ্যে রয়েছেন বাবু, আব্দুল রহমান, তুহিন, আলমগীর, সিদ্দিক আলী, খোরশেদ, সমেজ ও নয়ন বিশ্বাস। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।

দুর্ঘটনার পর টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। নিহত এক যুবকের বাবা ছেলের মরদেহ দেখতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

এই দুর্ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে দেশের মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রী পরিবহনের বিষয়টি। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত ভাড়া ও পরিবহন সংকটের কারণে অনেক শ্রমজীবী মানুষ ট্রাক বা পণ্যবাহী যানবাহনে যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর (এআরআই) অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম তালুকদার আলাপ-কে বলেন, দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে সমন্বয়হীনতা ও তথ্যভিত্তিক নজরদারির অভাব রয়েছে। তার মতে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ, স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং এবং কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।

অধ্যাপক মাহবুব মনে করেন, সড়ক নির্মাণ ও তদারকিতে গাফিলতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অদক্ষ চালকদের কারণেও দুর্ঘটনা বাড়ছে। 

দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি চালু করার বিষয়েও জোর দেন অধ্যাপক মাহবুব আলম। তিনি জানান, দুর্ঘটনার তথ্য দ্রুত সংরক্ষণ করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে।   

তিনি যোগ করে বলেন, “রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছে, তারাসহ চালক ও পথচারী—সবাই অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বহীন আচরণ করছেন। সড়ক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর জবাবদিহি না থাকলে এই মৃত্যুমিছিল বন্ধ হবে না।”

এদিকে নিরাপদ সড়ক চাই-এর মহাসচিব লিটন এরশাদ জানান, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে দুর্বলতা এবং পরিবহন খাতে সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

তিনি আলাপ-কে বলেন, বাসভাড়ার অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে নিম্নআয়ের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাতায়াত করছেন। 

তার অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের সুযোগও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে ঘটনা নিয়ে তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে নিরাপদ সড়ক চাই জানাচ্ছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক খাদে পড়ে ১৫ শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু আবারও প্রমাণ করেছে, নিম্নআয়ের মানুষ এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক জাহিদুর রহমান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, নিহতরা কেউ ধনী পরিবারের ছিলেন না; তারা ছিলেন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। হয়তো পরিবারের জন্য ঈদের বাজার কিংবা সন্তানের নতুন কাপড় কেনার স্বপ্ন নিয়েই তারা বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু বিকল্প পরিবহন না থাকা, অতিরিক্ত ভাড়া এবং আর্থিক সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রাকেই যাত্রা করতে বাধ্য হন তারা। 

অন্যদিকে লিটন এরশাদ মনে করেন ভোরের দিকে চালকদের ক্লান্তি, এবং মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ লোকবল সংকটের কার্যকর নজরদারির অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। 

পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ চলছে। একই সঙ্গে হতাহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক চাই তাদের বিবৃতিতে বলেছে, অতিরিক্ত ভাড়া, পরিবহন সংকট এবং দারিদ্র্যের কারণেই নিম্নআয়ের মানুষ এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছেন। 

সংগঠনটি মহাসড়কে কঠোর নজরদারি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার এবং শ্রমজীবী মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে হাইওয়ে পুলিশের জনবল সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। সীমিত জনবল নিয়ে কার্যকর মনিটরিং সম্ভব না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। সংগঠনটির মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কেবল দুর্ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে অব্যবস্থা, অবহেলা, দুর্বল তদারকি এবং জবাবদিহির অভাব।