“মা রে, ও মা গো তুমি কই”— ভেজা শরীরে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট শিশুটির সেই আর্তনাদ যেন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে। ডুবে যাওয়া বাস থেকে নিজে সাঁতরে উঠতে পারলেও মাকে খুঁজে পায়নি সে। পানির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করেছে, কেঁদেছে। কিন্তু সাড়া মেলেনি।
ঈদের আনন্দের মৌসুমে এমন একটি দৃশ্যই যেন হয়ে উঠেছে এবারের যাত্রাপথের প্রতীক, যেখানে ঘরে ফেরার গল্পগুলো বারবার থেমে যাচ্ছে দুর্ঘটনায়।
ঈদ মৌসুমে ঘরে ফেরার সময়টা আনন্দে ভরপুর থাকে। তবে এবারের চিত্র যেন ভিন্ন। একটির রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি দুর্ঘটনা। সড়ক, রেল, এমনকি নদীপথ সবখানেই যেন ছড়িয়ে পড়েছে অস্বস্তি, আতঙ্ক আর শোকের ছায়া।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বড় ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। কোথাও গেটম্যান নেই, কোথাও সিগনাল মানা হয় না, কোথাও নকশাগত নিরাপত্তা নেই, আবার কোথাও তাড়াহুড়ো আর প্রতিযোগিতায় নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে যানবাহন।
সবশেষ বুধবারের এক দুর্ঘটনা স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে পুরো দেশ। সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে শোক ও সমালোচনা।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে একটি যাত্রীবাহী বাস পানিতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। কেউ বের হতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। স্বজনদের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস।
সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে প্রায় অর্ধশত যাত্রী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। যাত্রীরা বুঝে ওঠার আগেই তা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই তলিয়ে যায় গভীরে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি ফেরিতে ওঠার সিরিয়ালে সবার সামনে ছিল। আগের ফেরি চলে যাওয়ার পর, নতুন ফেরি এসে ভেড়ার চেষ্টা করে। তার ধাক্কায় আগে থেকে ওঠার চেষ্টা করা বাসটি বেসামাল হয়ে পড়ে। পন্টিন থেকে মুহূর্তেই পড়ে যায় পানিতে।
যাত্রীরা কেউ জানালা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ পানির ভেতরে আটকে পড়েছেন। চারপাশে তখন শুধু চিৎকার আর আতঙ্ক।
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা আলাপ-কে জানিয়েছেন, বাসটি যেভাবে পড়েছিল সেখান থেকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই পুরো বাসটি তুলে মরদেহ উদ্ধার করার পরিকল্পনা করেন তারা।
এর মধ্যে কয়েকজন সাঁতরে ঘাটে উঠতে সক্ষম হয়। তাদের মধ্যে ছিল এক শিশু। উঠেই মাকে খুঁজতে থাকে। পানির দিকে তাকিয়ে আহাজারি করতে থাকে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিও এখন প্রশ্ন তুলেছে আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা নিয়ে।
কারণ গত কয়েকদিনে এমন কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে যা হয়তো একটু সচেতন হলেই এড়ানো যেত।
সড়ক, রেল ও নৌপথে ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঈদযাত্রায় ১৫ই মার্চ থেকে ২২এ মার্চ পর্যন্ত ১৮৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮২ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ২০২ জন।
একই সময়ে রেলপথে সাতটি দুর্ঘটনায় ৪২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ৪৪ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে সাতটি দুর্ঘটনায় ৫৬ জনের প্রাণহানি ও ৮৮ জন আহত হয়েছেন।
মোট মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮৬ জনের।

এবারের ঈদযাত্রার শুরুর দিকে ভয়াবহ এক লঞ্চ দুর্ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল সারাদেশ। ঢাকার সদরঘাটে ১৮ই মার্চ দুই লঞ্চের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিল দুইজন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়,ছোট ট্রলারের থেকে ‘আসা যাওয়া-৫’ নামে একটি লঞ্চে যাত্রী উঠছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকটি লঞ্চ পেছন থেকে আসা যাওয়া-৫ লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। দুই লঞ্চের মাঝখানে পড়ে ট্রলারে থাকা যাত্রীরা পিষ্ট হন। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।
একজনের মরদেহ মিললেও, আরেকজনের মরদেহ ভেসে যায় নদীতে। দুই দিন পর আধা কিলোমিটার দূরে ভেসে উঠে সেই মরদেহ।
ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় ছোট ট্রলারে করে লঞ্চে ওঠার চেষ্টা করছিল কয়েকজন। সেসময়ই আরেকটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। অথচ ট্রলারে করে লঞ্চে ওঠারই কথা ছিল না!
সেদিনই আরেকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে; রেললাইন থেকে ছিটকে পড়ে ট্রেনের নয়টি বগি।
ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী আন্তঃনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঈদে ঘরমুখী যাত্রীতে ভরা ছিল। সান্তাহার জংশন পার হয়ে উত্তরের বাগবাড়িতে এসে নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা নিচে পড়ে আহত হন। এ ছাড়া বগির ভেতরে থাকা অনেক যাত্রীও আহত হন।
বাগবাড়ি এলাকায় রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল, লাল নিশানাও টাঙানো ছিল। কিন্তু লোকোমাস্টারের সংকেত অমান্য করেই ট্রেনটি চলছিল।
ঈদের পরদিন ২২এ মার্চ রবিবার আরেকটি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। কুমিল্লার জাঙ্গালিয়া কচুয়া এলাকায় ভোররাতে একটি যাত্রীবাহী বাসকে চট্টগ্রাম মেইল ট্রেন সজোরে ধাক্কা দিলে মুহূর্তেই দুমড়ে মুচড়ে যায় বাসটি।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটি ক্রসিং পার হচ্ছিলো। ওই সময় গেটম্যান না থাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস রেললাইনে উঠে পড়লে সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের পর বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে টেনে নিয়ে যায় ট্রেন।
ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১২ জন। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং দুই শিশুও রয়েছে। আহত হন আটজন।
রেলের নিরাপত্তা নিয়েও তখনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কারণ এর আগেই সিগনাল অমান্য করে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেলেও সেই ঘটনাই যেন সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু তা গুরুত্ব পায়নি।
কেন দুর্ঘটনা ঠেকানো যায় না
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্ঘটনাগুলো আলাদা নয়, বরং একটি বড় বাস্তবতার অংশ। সড়ক, রেল, নদী যে পথেই যাওয়া হোক, কোথাও যেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। কোথাও গেটম্যান নেই, কোথাও সিগনাল মানা হয় না, কোথাও নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন, কোথাও অতিরিক্ত চাপ সামলানোর মতো প্রস্তুতি নেই।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেন, “ট্রেনের যে দুর্ঘটনাটা ঘটল সেখানে গেইটম্যান ছিল না। এটা না থাকলেও কি বাসকে সতর্ক করা যেত না? যদি অটোমেটিক সিস্টেম থাকতো যে ট্রেন আসার আগেই সাইরেন বাজবে তাহলেই তো সতর্ক হতে পারতো।”
লঞ্চের ক্ষেত্রেও ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা এর আগে ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কখনোই এর জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল নিয়ে কোনো ডিজাইনই করা হয়নি।
“আগে মানুষ পানিতে পড়তো, আর এবার (দুই লঞ্চের মাঝে) চাপে (পড়ে) মারাই গেল। আমাদের ডিজাইন সেফ হলে এটা প্রিভেন্ট করা যেত,” বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
বাস সিস্টেমও পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “এক হাজার বাস, এক হাজার কাউন্টার, এক হাজার চালক এটা করা যাবে না। প্রতিযোগিতা থাকে কে কার আগে যাবে।”
সেজন্যই এই বিপদ হয় বলে মনে করেন তিনি।
ফেরিতে ওঠার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, ফেরিতে ওঠার সময় সবাই নেমে যাবে এমনটা আশা করা যায় না। ডিজাইনটা এমন হবে যে বাসে কেউ ঘুমিয়ে থাকলেও নিরাপদ থাকবেন।
ঢাকায় লঞ্চ দুর্ঘটনার পর সিনিয়র সাংবাদিক শাহেদ আলম এক ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন, “সামনে ফিটফাট- ভিতরে সদরঘাট!”
এরপর লঞ্চ দুর্ঘটনা এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। পশ্চিমা দেশগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, “বাহামা, বার্বাডোজ, পর্তুগালের বার্সেলোনায় রিভারক্রজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জাহাজ ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে পৌছাতে হবে টিকেট কেন্দ্রে। সেখান থেকে পাস নিতে হবে, সেটি হাতে স্টিকার হিসেবে সেঁটে দেয়া হয়। এরপর হাতের সে ব্যাজ দেখেই লাইনে দাড়ানোদের একে একে ওঠানো হয় জাহাজে।”
তিনি বলেন, “আমাদের সদরঘাট নামেও সদরঘাট, কাজেও সদরঘাট! অর্থাৎ উন্মুক্ত ঘাট! ঘাটে প্রবেশের জন্য টিকেট আছে, এর পর শৃঙ্খলার বালাই নেই। যাত্রীদের বিশ্রামাগারের বা নির্দিষ্ট ওয়েটিং রুমের ব্যবস্থা আগে ছিল না, এখন কী অবস্থা আমার সরজমিন দেখা হয়নি। ব্রিফিং বা সতর্কতার ক্লাস নেই। জাহাজ ঘাটে আসা মাত্রই মুড়িমুরকির মত, ঘাড়ে চেপে, সাঁতার কেটে, গোসল করে জাহাজে ঢোকার দৃশ্যই দেখা যায়।”
সরকারের নতুন পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, “সব আনন্দ মাটি হয়ে যায় যখন দেখি হুড়মুড় করে জাহাজে উঠতে গিয়ে পড়ে থাকে শান্ত নিথর দেহ! অথচ, জাহাজ যাত্রী বন্দরে সিস্টেম সভ্য করতে পারলে এসব দুর্ঘটনা শুন্যে নামানো যেত! নতুন যারা দায়িত্বে, আশা করি তারা এ নিয়ে কার্যকর সমাধান ভাববেন।”

‘রোড সিস্টেম’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, “আগে একটা সিস্টেম ছিল বাস যখন ফেরিতে উঠবে তখন যাত্রীরা নেমে পড়বে এবং সিরিয়াল মেইনটেন করবে। কিন্তু সেটা হয় না।”
আলাপ-কে তিনি বলেন, ঈদের সময় ড্রাইভারর ছুটি কম পায়। তাই অনেক সময় হেল্পারদের বাস চালাতে দিয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। সে সময় ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ঈদের এই চাপটা নিতে হয় সবাইকে কিন্তু এটা সামলানোর কোনো ব্যবস্থা নেই বলে মত দেন সাইফুল আলম চৌধুরী।
তার মতে পুরো ব্যবস্থাটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বিচারও হয় না।
“গতকাল এত বড় অ্যাকসিডেন্ট (দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে) হলো, এখন পর্যন্ত কারা দায়ী সেটা খুঁজে বের করা বা ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো খবর আমরা পাইনি।
“অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পরে একেকজনকে ২০ হাজার টাকা, ২৫ হাজার টাকা দিয়ে জীবনের মূল্য আমরা শোধ করে দিব,” তিনি বলেন।
এবার বাস, ট্রেন, লঞ্চ সবখানে দুর্ঘটনা হয়েছে। কারণ কোনো ব্যবস্থাপনা ছিল না বলে এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মত।
তিনি বলেন, “পন্টুন রিস্কি হতেই পারে। কিন্তু একটা ম্যানেজমেন্ট তো থাকতে হবে এটা আমরা কীভাবে পার হবো।
“ট্রেনের গেইটম্যান না থাকা কিংবা সতর্কতা না মানলে তো দুর্ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক।”
দুর্ঘটনা না কমার আরেকটা বড় কারণ বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
“বাংলাদেশে যত দুর্ঘটনা হয়, কোনো বিচার হয় না। সেজন্যই দুর্ঘটনা কমে না,” তিনি বলেন।



