‘প্রেস ফ্রিডম’ র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অধঃপতন, সরকার কী বলছে?

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দুই তিনজন সাংবাদিককে তাদের মতামতের জন্য গ্রেফতার করছে। আমি এসবকে ক্রিটিক করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা মবের ভয় পেতেন। সেখান থেকে সেলফ সেন্সরশিপ হয়েছে। এসব কারণেই র‌্যাংকিং পিছিয়েছে বলে মনে হয়।

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অধঃপতন হয়েছে বলে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। র‌্যাংকিং তিন ধাপ পিছিয়ে নেমে গেছে ১৫২। 

মুক্ত সাংবাদিকতা নিয়ে করা বৈশ্বিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে “অত্যন্ত গুরুতর” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

আরএসএফ ২০২৬ সালের র‌্যাংকিংয়ে ১৮০টি দেশের গড় স্কোর গত ২৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম এত নিচে নেমে এসেছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২, ২০২৫ সালে যা ছিলো ১৪৯।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণমাধ্যমের উপর দিয়ে চলা নানা নিপীড়ন, সেন্সরশিপ, আইনি বাধাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। 

তবে সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত না থাকলেও, সেই সময়ে সাংবাদিকদের নামে হত্যা মামলা ও সেন্সরশিপের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। 

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আলাপ-কে বলেন, “যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দুই তিনজন সাংবাদিককে তাদের মতামতের জন্য গ্রেফতার করছে। আমি এসবকে ক্রিটিক করি।”

“আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা মবের ভয় পেতেন। সেখান থেকে সেলফ সেন্সরশিপ হয়েছে। এসব কারণেই র‌্যাংকিং পিছিয়েছে বলে মনে হয়।” 

অন্তর্বর্তী সরকার আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলার বিষয়ে বর্তমান সরকার কীভাবে ভূমিকা রাখবে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “সরকারের পক্ষে মামলা ডিজলভ করার কোনো স্কোপ নেই। এটা একটা বিচারিক প্রক্রিয়া।”

“আমি বলতে পারি, সরকার যেসব মামলার বাদি আছে, সেসব মামলা কীভাবে লিগ্যাল প্রসেসের মধ্যে পারসু করা যায়, সেসব নিয়ে আলোচনায় আছে।” 

তিনি আরও বলেন, সরকারের সদিচ্ছ আছে। তবে আমি মনে করি অনেকের অপরাধ খুনের চেয়েও বেশি। 

“যারা একটা মাফিয়া সরকারকে ক্ষমতায় রাখার জন্য ন্যারিটিভ তৈরি করেছে, তাদের অপরাধ খুনের চেয়েও বেশি। কিন্তু যে মামলা করা হয়েছে, সেটা প্রবলেম্যাটিক। এটা সঠিক নয়। মনে রাখতে হবে সরকার বিচার বিভাগ না। সুতরাং সরকারের তরফ থেকে কী কী করা যায় সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। 

বাংলাদেশের র‌্যাংকিং কেন পিছিয়ে পড়লো এই প্রশ্ন করা হলে আলাপ-কে পান্না বলেন, “র‌্যাংকিং পিছিয়ে যাবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে আমার তো মনে হয়, তাদের হিসেবে কিছু ক্রটি আছে।” 

“কারণ, যেভাবে মব তৈরি করে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, জেলে নেওয়া হয়েছে, এমনকি এখনও অনেকে কারাগারে। অভিযোগ যাই থাক, একজন মানুষের জামিন পাওয়াও তো সাংবিধানিক অধিকার। জামিনও হতে দেয়নি। তাই বললাম মাত্র তিন ধাপ পেছানো তো বিস্ময়ের।”  

মঞ্জুরুল আলম পান্না আরও বলেন, “ড. ইউনূস সাহেবের প্রেস উইং থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমাধ্যম নাকি সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে। ইউনূসের আমলে এমন আবহ তৈরি হয়েছিলো যে, আগেই সাংবাদিকরা সেলফসেন্সরশিপ তৈরি করে ফেলেছে। এমনকি যেসব পত্রিকা তাদের সমর্থন করেছে, তাদের অফিসও মব করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারাও রক্ষা পায়নি।” 

পান্না মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকজন কথা বলা ছাড়া আর কেউ সেভাবে বিগত বছর কথা বলতে পারেনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গ্রেপ্তার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। 

গণমাধ্যমে কী ধরনের নিপীড়ন হয়েছে- এই প্রশ্ন করা হলে আনিস আলমগীর আলাপ-কে বলেন, “ড. ইউনূসের শাসনামলে সাংবাদিকদের উপর যে নিপীড়ন হয়েছে, সেটা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।” 

“যারা গণমাধ্যমে কাজ করেন, তারা জানেন, কীভাবে প্রতিকূলতার ভেতর সময় গেছে। এই আমলে সংবাদপত্র অফিসে মব হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের প্রধান কে থাকবেন, কে থাকবেন না- সেটা নির্ধারিত হয়েছে, মালিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে।” 

আনিস আলমগীর আরও বলেন, “বড় পদে শুধু পরিবর্তন আনা হয়নি, সাধারণ সংবাদকর্মী যেমন রিপোর্টারদের পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। রিপোর্টাররা কী লিখবে সেটা নিয়েও ভীতির মধ্যে ছিলো। একজন উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করার জন্য মবের ভয়ে সাংবাদিকদের চাকরি চলে গেছে। তো র‌্যাংকিং তো পেছাবেই।” 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার করা হয়। 

এই আইন ভবিষ্যতেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে কিনা- এই প্রশ্ন করা হলে আনিস আলমগীর বলেন, এটা নির্ভর করবে সরকারের মনোভাবের উপর।  

একই প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল আলাপ-কে বলেন, “আইনের অপব্যবহার হলো মিডিয়াকে দমিয়ে রাখার পদ্ধতি। যখনই সরকার কারো কণ্ঠরোধ করতে চায়, সেটার জন্য কী কী খারাপ আইন আছে সেটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো, ওই সময় যারা শাসক ছিলো, তারা কতটা অসহনশীল ছিলো, সেটা প্রমাণ হয়। এটা আইনের সমস্যা নয়, এটা যারা আইন প্রয়োগ করে, তাদের সমস্যা।“

তবে বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থা রেখে আনিস আলমগীর জানান, “বর্তমানের সরকারের একটা ভালো দিক হলো, একজন যোগ্য লোককে তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি গণমাধ্যমকে সম্মান দিচ্ছেন। সরকারের সঙ্গে গণমাধ্যমের যে ব্রিজ, সেটা তৈরিতে তথ্যমন্ত্রী ভূমিকা রাখছেন।” 

তবে এখনও কিছু গণমাধ্যম দখলমুক্ত হয়নি দাবি করে আনিস আলমগীর জানান, “দুঃখজনক হলো, ইউনূসের সময় কিছু উগ্রমৌলবাদী এবং বিএনপির মুখোশ পরে কিছু লোক যে গণমাধ্যম দখল করেছিল, তাদের হাতে এখনও মিডিয়া রয়ে গেছে।” 

অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, “ড. ইউনূস দেশটাকে চালিয়েছে টোটালি স্বৈরাচারী কায়দায়। তাদের কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। একমাত্র জবাবদিহিতার জায়গা ছিল মিডিয়া। প্রথমে তারা কিছু বলেনি। কিন্তু পরে তারা মিডিয়াকে কঠোর হাতে দমন করেছে।” 

“আমার সঙ্গে তো একাধিক পত্রিকার সম্পাদকের পরিচয় আছে। তারা কয়েকজন আমাকে বলেছেন, ড. ইউনূসের প্রেস উইং থেকে ফোন দিয়ে বিভিন্ন সময় হুমকি দিতেন। এ থেকেই বোঝা যায় তারা মিডিয়ার উপর চাপ তৈরি করতেন, মবও তৈরি করা হতো।” 

মাসুদ কামাল আরও বলেন, বাংলাদেশে একইদিন দুইটা বড় পত্রিকার অফিসকে জ্বালিয়ে দেওয়ার ইতিহাস তো নেই। শুধু তাই নয়, সেই মব থামাতে গিয়ে নিউজ এইজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির হেনস্থা হয়েছেন। এই সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার র‌্যাংকিং তিন ধাপ যে কমবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। এটা আরও বেশিও কমতে পারতো।

বর্তমান সরকারের সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিস্থিতি উন্নতির দিকে কীভাবে নেওয়া যেতে পারে এই প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ বলেন, “সরকার পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। সরকার গণমাধ্যমে কোনোভাবেই বাধা দিতে চায় না। সরকারের কোনো সমালোচনা যদি সত্য হয় এবং সেটা যদি ছড়িয়ে পড়ে। সেই সমালোচনার কারণে কাউকে যদি গ্রেফতার করা হয়, তাহলে সমালোচনার চাইতেও বেশি ক্ষতি সরকারের হয়। সুতরাং একটা গণতান্ত্রিক সরকার কখনো এটা করবে না।“

সরকার মিসইনফরমেশন ডিসইনফরমেশন নিয়ে কাজ করছে এবং এসব নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে এবং আইনগতভাবে সরকার কাজ করছে। যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তুলবে না বলে জানান ডা. জাহেদ উর রহমান।