যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার প্রক্রিয়া কঠিন হচ্ছে

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সাজ্জাদ হোসেন। থাকেন ঢাকার আগারগাঁওয়ে। তার বড় ভাই যুক্তরাষ্ট্র থাকেন প্রায় ২১ বছর। সেখানকার নাগরিক হয়েছে বছর দশেক আগে। বিয়ে করে থিতু হয়েছেন।

মা, বাবা ও ছোট ভাইকে ‍যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইমিগ্রেন্ট ভিসার আবেদন করেছিলেন ২০২২ সালে। এই বছর ফেব্রুয়ারিতেই সাক্ষাৎকারের জন্য দিন ঠিক করা আছে।

কিন্তু বিধিবাম। সাক্ষাৎকার হয়তো ঠিকই দেবেন। কিন্তু ভিসা যে পাবেন না তা নিশ্চিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ৭৫টি দেশের জন্য ইমিগ্রেন্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। তালিকায় আছে বাংলাদেশও।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা দূতাবাস থেকে ইমিগ্রেন্ট ভিসা ইস্যু করা হয়েছে ১২ হাজার ৭৭১টি। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২৫৭টি।

২০২২ সালে ৯ হাজার ৬৪টি ইমিগ্রেন্ট ভিসা ইস্যু করা হলেও, কোভিডের কারণে ২০২১ সালে তা ছিল ৫ হাজার ৩১১টি ও ২০২০ সালে ইমিগ্রেন্ট ভিসা ইস্যু হয় ৬ হাজার ১৬২টি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেন্ট ভিসার জন্য বাংলাদেশিদের এক বছর থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট অপেক্ষমান যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেন্ট ভিসা আবেদনের সংখ্যা ৪০ লাখ ৩৪ হাজার ৬১টি। এর মধ্যে বাংলাদেশিদের আছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৩৮৬টি আবেদন। সর্বোচ্চ সংখ্যার বিচারে যা সাত নাম্বারে।

কেন এই সিদ্ধান্ত

যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্র দপ্তর বা ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছে, “পররাষ্ট্র দপ্তর ৭৫টি দেশের ইমিগ্র্যান্ট ভিসাপ্রক্রিয়া স্থগিত করবে, যেসব দেশের অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে অগ্রহণযোগ্য হারে কল্যাণমূলক সুবিধা নিয়ে থাকেন।”

একই পোস্টে জানানো হয়েছে, “নতুন অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে সম্পদ বের করে নেবেন না, এটা যত দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করতে না পারবে, তত দিন পর্যন্ত এই স্থগিত অবস্থা বহাল থাকবে।”

একুশে জানুয়ারি থেকে এই স্থগিতের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। তবে এটি শুধুমাত্র অভিবাসী ভিসার জন্যই প্রযোজ্য।

যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বিষয়ক সরকারি ওয়েবসাইট ট্রাভেল ডট স্টেট-এ জানানো হয়েছে, যাদের অভিবাসী ভিসা আবেদনের সাক্ষাৎকারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে তারা নির্ধারিত দিনেই সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন।

যারা আবেদন করতে চান তারা আবেদন করতে পারবেন, সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন, এমনকি সাক্ষাৎকারের জন্য সময়সূচি নির্ধারণের কাজও চলবে। তবে যতদিন স্থগিত থাকবে ততদিন কোন নতুন ভিসা ইস্যু করা হবে না।

যাদের বৈধ অভিবাসী ভিসা আছে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা যাওয়ায় কোন বাধা নেই। আর ইমিগ্রেন্ট ভিসা ছাড়া ট্যুরিস্ট ভিসাসহ যেকোন ধরনের নন ইমিগ্রেন্ট ভিসার কার্যক্রম থাকছে আগের মতো।

অভিবাসী ভিসা ইস্যু করার প্রক্রিয়ার পুনর্মূল্যায়নের পর এই বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত জানাবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কতদিন এই স্থগিতের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে তা স্পষ্ট করেনি স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের অবসান ঘটাতে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ কিছু মানুষ আমেরিকান জনগণের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।”

টমি পিগটের জানিয়েছেন ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। এই সাময়িক সময়ের নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি তিনি। অভিবাসন প্রক্রিয়ার নিয়ম পুনর্মূল্যায়নের পরই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র শুধু পরিবারিক সম্পর্ক, কর্মসংস্থান, দত্তক নেওয়া, বিশেষ শ্রেণি ও ডাইভার্সিটি ভিত্তিতে অভিবাসী ভিসা ইস্যু করে।

বিশেষ শ্রেণির আওতায় থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দপ্তরে কাজ করা সাবেক কর্মীরা। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার কম এমন দেশগুলোর নাগরিকদের যোগ্যতার কঠোর শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বার্ষিক ডাইভার্সিটি কর্মসূচির আওতায় অভিবাসী ভিসা দেওয়া হয়।

ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের কোন ধরনের ভিসা প্রয়োজন হবে তা ঠিক করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বা কনস্যুলেটে আবেদন করলে, কনস্যুলার কর্মকর্তা আবেদনকারীর ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করেন। যোগ্য হলে, ভিসা শ্রেণিও তিনি নির্ধারণ করবেন।

ইমিগ্রেন্ট ভিসা আবেদনের যোগ্য হন, মার্কিন নাগরিকের স্বামী বা স্ত্রী, বাগদত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও সেখানে বসবাস করেন এমন ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং দত্তক নিতে চাওয়া কেউ।

এ ছাড়া, পেশাজীবী এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে দোভাষী কিংবা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিরাও অভিবাসী ভিসার আওতায় পড়েন।

ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ হচ্ছে না

৭৫টি দেশের ইমিগ্রেন্ট ভিসা বন্ধের পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে যে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাই বন্ধ হয়েছে কি-না।

তবে ট্রাভেল ডট স্টেট ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, নন ইমিগ্রেন্ট ভিসা আবেদনকারীরা নতুন নিয়মের আওতায় পড়বেন না। 

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ভিসা দেওয়া হয় পর্যটক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, সেমিনারে বা কনফারেন্সে অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি, সাংবাদিক, শিল্পীসহ বিভিন্ন অস্থায়ী প্রয়োজনে ভ্রমণ আবেদনকারীদের। মোট ৩৪টি ক্যাটাগরিতে নন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে যেতে আগ্রহীরাও এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বেন না।

বাংলাদেশি নন ইমিগ্রেন্ট ভিসা আবেদনকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র চলতি মাসেই নতুন নিয়ম ঘোষণা করেছে। ‘ভিসা বন্ড’ নামের এই নীতিও কার্যকর হবে ২১ জানুয়ারি থেকে।

এর আওতায় পর্যটন, ব্যবসা, চিকিৎসার মতো প্রয়োজনে বি-ওয়ান ও বি-টু ক্যাটাগরির ভিসা পেতে হলে আবেদনকারীকে জামানত হিসাবে ৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার ডলার জমা দিতে হতে পারে। 

তবে কাকে কত দিতে হবে কিংবা কাকে দিতে হবে না, ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় তা নির্ধারণ করবেন কনস্যুলার কর্মকর্তা। তবে এই ফেরতযোগ্য জামানত ভিসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন ২৫ লাখ মানুষ

ইউএস সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৩ লাখ বাংলাদেশি আছেন। তবে এই সংখ্যা শুধু যারা নিজেদের বাংলাদেশি হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন তার ওপর তৈরি করা হয়েছে।

তবে এর মধ্যে অভিবাসী ভিসাধারী কতজন তা সুনির্দিষ্ট নেই পরিসংখ্যানে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ১৯ লাখ। যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশের বেশি। চলতি জানুয়ারিতে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩৩ লাখে।

গত সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। যা এক বছরে সর্বোচ্চ।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে ৬ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। আরও ২৫ লাখ মানুষ নিজ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন।

‘ব্লেসিং ইন ডিসগাইজ’

একটা সময় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশসহ অনেক দেশের নাগরিকদের কাছে জনপ্রিয় ছিল ডাইভারিসিটি ভিসা বা ডিভি। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ আর এই ভিসা কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি এই ভিসার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছে বলে বাংলাদেশ এই যোগ্যতা হারিয়েছে। কারণ ডিভি কর্মসূচি সেই দেশগুলোর জন্য যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার তুলনামূলকভাবে কম।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক প্রফেসর ইমতিয়াজ আহমেদ বলছিলেন, “এই সিদ্ধান্ত ব্লেসিং ইন ডিসগাইস হতে পারে। কারণ একটু সচ্ছল হলেই কিংবা অসচ্ছলরা নানাভাবে সর্বস্ব বিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার যে প্রবণতা তা কমে আসতে পারে।”

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু মনে করছে তাদের দেশে গিয়ে যারা স্থায়ী হন তারা সম্পদ না হয়ে বোঝা হয়ে ‍ওঠেন। সেজন্যই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।”

“সুতরাং দেশের মানুষের এবং সরকারেরও উচিত নিজের সক্ষমতা তৈরিতে মনযোগ দেওয়া। যাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে বরং মানুষ নিয়ে যেতে আগ্রহী হয়।”