নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে দিয়ে শুরু প্রচার-প্রচারণা, আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন হবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই চেনা উত্তেজনাই আবার ফিরছে রাজনীতির মাঠে। বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেও, তার আগেই সহিংসতা, সংঘাত আর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৭ এএমআপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চেনা উত্তেজনা ফিরছে রাজনীতির মাঠে। বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেও, তার আগেই সহিংসতা, সংঘাত আর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছড়িয়েছে জনমনে।
একদিকে দীর্ঘদিন পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাত ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শঙ্কা। এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই শুরু হচ্ছে এবারের নির্বাচনি যাত্রা।
বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। সিলেট থেকে প্রচারাভিযান শুরু করে একটানা সাতটি নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর ঢাকায় জনসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠনিকতা। এক মাস ১০ দিন ধরে চলে মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত ঘোষণা। বারোই ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার আগ পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার চালানো যাবে।
বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া বার্তায় বলা হয়েছে, সিলেটে বুধবার রাতে হয়রত শাহ জালাল (রঃ)-এর মাজার জিয়ারত করবেন তারেক রহমান এবং বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দেবেন।
এরপর তারেক রহমান মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত উপজেলা মাঠে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর এলাকা সংলগ্ন এলাকায়, নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার রুপগঞ্জের গাউসিয়ায় সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন।
নির্বাচনি প্রচারের শুরুতেই বিএনপি তাদের নির্বাচনি ‘থিম সং’ উন্মোচন করতে যাচ্ছে। দলের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, বুধবার রাত ১২টা ১ মিনিটে ঢাকার লেকশোর হোটেলে ‘থিম সং’ উদ্বোধন করবেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল জবিউল্লাহসহ দলের নেতারা।
অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকায় জনসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
এরপর ২৩এ জানুয়ারি সকালে পঞ্চগড়ে, দুপুরে দিনাজপুর জেলা জামায়াত আয়োজিত স্থানীয় গোর-ই-শহীদ ময়দানে এবং বিকালে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারণা চালাবেন তিনি। একই দিন সন্ধ্যায় বিভাগীয় শহর রংপুরে একটি সমাবেশে যোগ দেবেন জামায়াতের আমীর।
পরদিন রংপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন শফিকুর। পরে গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়িতে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন তিনি।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুরে বিএনপি-জামায়াতের সংঘাতকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে।
দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা সহিংসতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ২০২৫ সালে ১৩৩জন নিহত এবং মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৮জন নিহত হয়েছেন।
২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশ ও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৯১৪টি সহিংসতা ঘটে।
এসব সহিংসতায় নিহত ১৩৩জনের মধ্যে বিএনপির ৯৩জন, আওয়ামী লীগের ২৩জন, ইউপিডিএফের ছয়জন, জামায়াতে ইসলামীর তিন জন এবং ইনকিলাব মঞ্চ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আছেন এক জন করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিন জন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদী হত্যাকাণ্ড।
২০২৫ সালের ১৩ই ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরদিন গুলি করা হয় ওসমান হাদীকে। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে। এক পর্যায়ে বিদেশেও নেওয়া হয়। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। ১৮ই ডিসেম্বর মারা যান ওসমান হাদি।
হাদির পর আরেক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ছিল স্বেচ্ছাসেবক নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যা। জুলাই আন্দোলনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন মুছাব্বির।
ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুছাব্বির। হাদির পক্ষে দেওয়া স্লোগানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জানুয়ারির প্রথম দিকে গুলি করে হত্যা করা হয় মুছাব্বিরকেও।
আলোচিত দুইটি ঘটনার কোনোটির তদন্তেই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে একাধিক জেলায় বিএনপি-জামায়াত সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবশেষ মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুরে বড় দুই দলের সংঘাতের ব্যাপারটি আবারও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে।
বিষয়টি নিয়ে এনসিপি নেতা আরিফুজ্জামান তুহিন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ঢাকা ১৫ আসনের পীরবাগে মহিলা জামায়াতের নারীদের উপর হামলা করে যুবদলের রাজুসহ কিছু পেশিশক্তির নেতা। কত বড় কাপুরুষ হলে মহিলাদের উপর আক্রমণ করতে হয়। নারীদের উপর অসহনশীল এইসব মানুষদের পরিত্যাগ করুন। যারা নারীদের সম্মান দেয় না, গায়ের জোরে ইলেকশন জিততে চায় তাদেরকে ব্যালট পেপারে পরাজিত করুন।”
‘এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’
নির্বাচনি পরিবেশ এখনো ভালো আছে বলে মনে করেন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, এখনও কিন্তু বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি।
“ভয় আছে, আশঙ্কা আছে। কিন্তু এখনো পরিস্থিতির গুরুতর কোনো অবনতি ঘটেনি”, বলেন আলতাফ পারভেজ।
তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশে অতীতে নির্বাচনে স্বল্পমাত্রায় হলেও এক ধরনের সংঘাত-সহিংসতা ঘটেছে। শুধু বাংলাদেশে না দক্ষিণ এশিয়ায়ও হয়। তবে এবার আমি বলব এবার কমই ঘটবে। কারণ এবার বড় একটা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেই। সংঘাত তুলনামূলকভাবে কম ঘটবে।”
একই সুরে কথা বলেছেন গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয় আছে। তবে আমি মনে করি যে সরকার যদি দায়িত্বশীল থাকে তাহলে এটা কাটানো সম্ভব।
“আমি মনে করি না, বাংলাদেশে বড় রকম নিরাপত্তা সংকট রয়েছে, সরকার চাইলে নিরাপত্তা সংকট হবে না।”
শঙ্কা কতটা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলছেন, “একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে যদি কখনো বড় কিছু ঘটে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দির মাঝে যদি সংঘাত বেঁধে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন যে অবস্থায় রয়েছে যাতে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”
“বিগত ১৭ মাসে এই বাহিনী বড় ধরনের কোনো সহিংসতা মব কিছু রুখতে পারেনি। সেই কারণে ভিতর একটা ভয় আছে। আবার প্রার্থীরাও বেশ অনেকদিন ধরে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে যাচ্ছে, যা নির্বাচন কমিশনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।”
নির্বাচনের আগে এমন সহিংস পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক চিত্র বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, এই যে কোনো নির্বাচনের আগে সময়টা খুব ভালনারেবল থাকে এবং পৃথিবীর ইতিহাসে সেটা দেখা যায়।”
“বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেছে, ঘটছে এবং এই অতি সম্প্রতি যে, হাদি শহীদ হলেন এবং বিএনপি কয়েকজন নেতা কর্মী জখম এবং আহত হয়েছেন। সবকিছু কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক।”
প্রচারণা যখন শুরু হবে তখন এই সহিংসতাটা আরও বাড়বে মত দিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, “এর পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। প্রথমত ব্যক্তিগত একটা হিরোইজামের একটা টেন্ডেন্সি কারো কারো ভিতরে থাকে, কেউ আবার পদ-পদবী ভবিষ্যতে পাওয়ার আশায় যারা প্রার্থী আছেন তাদের চোখে একটু হিরো হওয়ার চেষ্টা করেন। দলের জন্য তাদের কন্ট্রিবিশন আছে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।”
এটা প্রমাণ করার ক্ষেত্রে কে কয়জন কয়টা মিছিল পণ্ড করে দিতে পেরেছে, কয়টা নির্বাচনি অফিস ভেঙে দিতে পেরেছে সেটা দেখানো মুখ্য হয়ে ওঠে বলে মনে করেন নাসির উদ্দিন।
“দুঃখজনক হলো দল বা যারা নির্বাচিত হন তারাও কিন্তু তাদেরকে ওভাবেই মূল্যায়ন করেন। যার জন্য সহিংসতা হবে এটাতে কোনো রকমের সন্দেহ নেই; এবং এটা অবশ্যই বাড়বে, কমবে না।”
আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন
তবে ভরসা রাখতে চান আলতাফ পারভেজ। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন চাচ্ছে। সম্ভাব্য সুষ্ঠু একটা নির্বাচন তাদের প্রত্যাশা। ফলে মানুষের শুভবোধের উপর ভরসা করা ছাড়া আর ভরসার কিছু নাই।”
“মানুষ এখনো আমার মনে কোন ধরনের সহিংসতা অংশ নেয়নি। মোটা দাগে রাজনৈতিক দলগুলো এখন পর্যন্ত বড় সংঘাতে লিপ্ত হয়নি।”
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতি কতটা সহনীয় থাকবে সেটাই প্রশ্ন, বিশেষ করে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো নৈতিকভাবে এবং সাংগঠনিকভাবে খুবই দুর্বল আছে। আর সরকারের দুর্বলতাও দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি এখনো আমার মনে হয় ভেঙে পড়েনি বা ভেঙে পড়ার মতো ভয় তৈরি হয়নি।”
নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে মেজর (অব.) নাসির বলেন, “বিরোধী শক্তিরা অনেক সময় নির্বাচনে প্রচারে বাধা দেন এবং সহিংসতা করেন যেন ভোট কম পড়ে। বিশেষ করে নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করতে পারছে না সেটা দলীয়ভাবে হোক অথবা মনোনয়ন না পাওয়ার কেউ, তাদের একটা টেনডেন্সি থাকে যে এটাকে পণ্ড করা।”
“তারা বোঝাতে চায় এই এলাকার মধ্যে আমাকে ছাড়া নির্বাচন বা আমার দলকে ছাড়া নির্বাচন করা যে সম্ভব নয়, প্রমাণ করে দিলাম”, যোগ করেন মেজর নাসির।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন আশার নাকি আশঙ্কার এমন প্রশ্নের জবাবে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “যারা 'ডাই হার্ড' তাদের জন্য যেকোনো কিছুই তাদেরকে নির্বাচনের দমাতে পারবে না। আবার যারা ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি করেন, তাদের নির্দিষ্ট একটা ছকই আছে, কে কখন শুধু তারা ভোট দিবেই।”
তবে নতুন ভোটারদের জন্য এই পরিস্থিতি শঙ্কার বলে মত দেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তিনি বলেন, “যারা একটু সেফটি কমফোর্ট এবং এগুলো চিন্তা-ভাবনা করেন তাদের জন্য এই এটা একটা আশঙ্কার ব্যাপার।”
“খুব দুঃখজনক যে গত পনেরো বছর একটা জেনারেশন আমাদের বড় হয়ে উঠেছে তারা আসলে নির্বাচনের যেই ফেস্টিভ আমেজ আছে, নির্বাচন যে একটা উৎসব, এটা জানে না। একটা দেশের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমার মতেরও একটা দাম আছে এই ধরনের যে একটা ফিলিংস। এই ফিলিংসটা কিন্তু একটা প্রজন্ম পায়নি গত পনেরো বছরে।”
তারা এবার ভোট দিতে না পারলে এর চেয়ে দুঃখজনক কিছু হয় না বলে মন্তব্য করেন মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, “সেক্ষেত্রে আমাদের বলতে হবে যে, জুলাই বিপ্লব হলো। সে বিপ্লবের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি একটা কাজ হবে।”
শিক্ষক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ খান রবিউল আলম বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিতর্ক জমে না উঠলে ভোটাররা নির্বাচনের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেইরকম চিত্র এখনো দেখা যাচ্ছে না। যদি প্রচারণা জমে ওঠে তাহলে হয়তো ভোটারদের আগ্রহ বাড়বে।”
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও আস্থা তৈরি করতে হবে। যাতে ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে আগ্রহী হয়। কারণ আস্থাহীনতা নিয়ে ভোটাররা সিদ্ধান্তগ্রহণে দ্বিধান্বিত থাকবে বলেও মনে করেন খান রবিউল আলম।
গণসংহতির ফিরোজ আহমেদ আলাপ-কে বলেন, “বাংলাদেশে এই অন্তর্বর্তী সরকার থেকে একটা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক স্তরে যাওয়ার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা আয়োজন হচ্ছে নির্বাচনটা। সেই কারণে এই নির্বাচনে ঠিকঠাক মতো অনুষ্ঠিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর নির্বাচনকে নিয়ে অনেক রকম উদ্বেগ আশঙ্কায় আছে মানুষ।। আমি আশা করব যে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বশীলতার সাথে এই উদ্বেগগুলোর মোকাবিলা করবেন।”
নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে দিয়ে শুরু প্রচার-প্রচারণা, আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন হবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই চেনা উত্তেজনাই আবার ফিরছে রাজনীতির মাঠে। বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেও, তার আগেই সহিংসতা, সংঘাত আর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চেনা উত্তেজনা ফিরছে রাজনীতির মাঠে। বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেও, তার আগেই সহিংসতা, সংঘাত আর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছড়িয়েছে জনমনে।
একদিকে দীর্ঘদিন পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাত ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শঙ্কা। এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই শুরু হচ্ছে এবারের নির্বাচনি যাত্রা।
বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। সিলেট থেকে প্রচারাভিযান শুরু করে একটানা সাতটি নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর ঢাকায় জনসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠনিকতা। এক মাস ১০ দিন ধরে চলে মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত ঘোষণা। বারোই ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার আগ পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার চালানো যাবে।
বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া বার্তায় বলা হয়েছে, সিলেটে বুধবার রাতে হয়রত শাহ জালাল (রঃ)-এর মাজার জিয়ারত করবেন তারেক রহমান এবং বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দেবেন।
এরপর তারেক রহমান মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত উপজেলা মাঠে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর এলাকা সংলগ্ন এলাকায়, নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার রুপগঞ্জের গাউসিয়ায় সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন।
নির্বাচনি প্রচারের শুরুতেই বিএনপি তাদের নির্বাচনি ‘থিম সং’ উন্মোচন করতে যাচ্ছে। দলের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, বুধবার রাত ১২টা ১ মিনিটে ঢাকার লেকশোর হোটেলে ‘থিম সং’ উদ্বোধন করবেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল জবিউল্লাহসহ দলের নেতারা।
অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকায় জনসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
এরপর ২৩এ জানুয়ারি সকালে পঞ্চগড়ে, দুপুরে দিনাজপুর জেলা জামায়াত আয়োজিত স্থানীয় গোর-ই-শহীদ ময়দানে এবং বিকালে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারণা চালাবেন তিনি। একই দিন সন্ধ্যায় বিভাগীয় শহর রংপুরে একটি সমাবেশে যোগ দেবেন জামায়াতের আমীর।
পরদিন রংপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন শফিকুর। পরে গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়িতে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন তিনি।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুরে বিএনপি-জামায়াতের সংঘাতকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে।
দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা সহিংসতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ২০২৫ সালে ১৩৩জন নিহত এবং মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৮জন নিহত হয়েছেন।
২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশ ও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৯১৪টি সহিংসতা ঘটে।
এসব সহিংসতায় নিহত ১৩৩জনের মধ্যে বিএনপির ৯৩জন, আওয়ামী লীগের ২৩জন, ইউপিডিএফের ছয়জন, জামায়াতে ইসলামীর তিন জন এবং ইনকিলাব মঞ্চ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আছেন এক জন করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিন জন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদী হত্যাকাণ্ড।
২০২৫ সালের ১৩ই ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরদিন গুলি করা হয় ওসমান হাদীকে। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে। এক পর্যায়ে বিদেশেও নেওয়া হয়। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। ১৮ই ডিসেম্বর মারা যান ওসমান হাদি।
হাদির পর আরেক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ছিল স্বেচ্ছাসেবক নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যা। জুলাই আন্দোলনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন মুছাব্বির।
ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুছাব্বির। হাদির পক্ষে দেওয়া স্লোগানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জানুয়ারির প্রথম দিকে গুলি করে হত্যা করা হয় মুছাব্বিরকেও।
আলোচিত দুইটি ঘটনার কোনোটির তদন্তেই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে একাধিক জেলায় বিএনপি-জামায়াত সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবশেষ মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুরে বড় দুই দলের সংঘাতের ব্যাপারটি আবারও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে।
বিষয়টি নিয়ে এনসিপি নেতা আরিফুজ্জামান তুহিন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ঢাকা ১৫ আসনের পীরবাগে মহিলা জামায়াতের নারীদের উপর হামলা করে যুবদলের রাজুসহ কিছু পেশিশক্তির নেতা। কত বড় কাপুরুষ হলে মহিলাদের উপর আক্রমণ করতে হয়। নারীদের উপর অসহনশীল এইসব মানুষদের পরিত্যাগ করুন। যারা নারীদের সম্মান দেয় না, গায়ের জোরে ইলেকশন জিততে চায় তাদেরকে ব্যালট পেপারে পরাজিত করুন।”
‘এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’
নির্বাচনি পরিবেশ এখনো ভালো আছে বলে মনে করেন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, এখনও কিন্তু বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি।
“ভয় আছে, আশঙ্কা আছে। কিন্তু এখনো পরিস্থিতির গুরুতর কোনো অবনতি ঘটেনি”, বলেন আলতাফ পারভেজ।
তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশে অতীতে নির্বাচনে স্বল্পমাত্রায় হলেও এক ধরনের সংঘাত-সহিংসতা ঘটেছে। শুধু বাংলাদেশে না দক্ষিণ এশিয়ায়ও হয়। তবে এবার আমি বলব এবার কমই ঘটবে। কারণ এবার বড় একটা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেই। সংঘাত তুলনামূলকভাবে কম ঘটবে।”
একই সুরে কথা বলেছেন গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয় আছে। তবে আমি মনে করি যে সরকার যদি দায়িত্বশীল থাকে তাহলে এটা কাটানো সম্ভব।
“আমি মনে করি না, বাংলাদেশে বড় রকম নিরাপত্তা সংকট রয়েছে, সরকার চাইলে নিরাপত্তা সংকট হবে না।”
শঙ্কা কতটা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলছেন, “একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে যদি কখনো বড় কিছু ঘটে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দির মাঝে যদি সংঘাত বেঁধে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন যে অবস্থায় রয়েছে যাতে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”
“বিগত ১৭ মাসে এই বাহিনী বড় ধরনের কোনো সহিংসতা মব কিছু রুখতে পারেনি। সেই কারণে ভিতর একটা ভয় আছে। আবার প্রার্থীরাও বেশ অনেকদিন ধরে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে যাচ্ছে, যা নির্বাচন কমিশনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।”
নির্বাচনের আগে এমন সহিংস পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক চিত্র বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, এই যে কোনো নির্বাচনের আগে সময়টা খুব ভালনারেবল থাকে এবং পৃথিবীর ইতিহাসে সেটা দেখা যায়।”
“বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেছে, ঘটছে এবং এই অতি সম্প্রতি যে, হাদি শহীদ হলেন এবং বিএনপি কয়েকজন নেতা কর্মী জখম এবং আহত হয়েছেন। সবকিছু কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক।”
প্রচারণা যখন শুরু হবে তখন এই সহিংসতাটা আরও বাড়বে মত দিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, “এর পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। প্রথমত ব্যক্তিগত একটা হিরোইজামের একটা টেন্ডেন্সি কারো কারো ভিতরে থাকে, কেউ আবার পদ-পদবী ভবিষ্যতে পাওয়ার আশায় যারা প্রার্থী আছেন তাদের চোখে একটু হিরো হওয়ার চেষ্টা করেন। দলের জন্য তাদের কন্ট্রিবিশন আছে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।”
এটা প্রমাণ করার ক্ষেত্রে কে কয়জন কয়টা মিছিল পণ্ড করে দিতে পেরেছে, কয়টা নির্বাচনি অফিস ভেঙে দিতে পেরেছে সেটা দেখানো মুখ্য হয়ে ওঠে বলে মনে করেন নাসির উদ্দিন।
“দুঃখজনক হলো দল বা যারা নির্বাচিত হন তারাও কিন্তু তাদেরকে ওভাবেই মূল্যায়ন করেন। যার জন্য সহিংসতা হবে এটাতে কোনো রকমের সন্দেহ নেই; এবং এটা অবশ্যই বাড়বে, কমবে না।”
আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন
তবে ভরসা রাখতে চান আলতাফ পারভেজ। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন চাচ্ছে। সম্ভাব্য সুষ্ঠু একটা নির্বাচন তাদের প্রত্যাশা। ফলে মানুষের শুভবোধের উপর ভরসা করা ছাড়া আর ভরসার কিছু নাই।”
“মানুষ এখনো আমার মনে কোন ধরনের সহিংসতা অংশ নেয়নি। মোটা দাগে রাজনৈতিক দলগুলো এখন পর্যন্ত বড় সংঘাতে লিপ্ত হয়নি।”
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতি কতটা সহনীয় থাকবে সেটাই প্রশ্ন, বিশেষ করে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো নৈতিকভাবে এবং সাংগঠনিকভাবে খুবই দুর্বল আছে। আর সরকারের দুর্বলতাও দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি এখনো আমার মনে হয় ভেঙে পড়েনি বা ভেঙে পড়ার মতো ভয় তৈরি হয়নি।”
নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে মেজর (অব.) নাসির বলেন, “বিরোধী শক্তিরা অনেক সময় নির্বাচনে প্রচারে বাধা দেন এবং সহিংসতা করেন যেন ভোট কম পড়ে। বিশেষ করে নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করতে পারছে না সেটা দলীয়ভাবে হোক অথবা মনোনয়ন না পাওয়ার কেউ, তাদের একটা টেনডেন্সি থাকে যে এটাকে পণ্ড করা।”
“তারা বোঝাতে চায় এই এলাকার মধ্যে আমাকে ছাড়া নির্বাচন বা আমার দলকে ছাড়া নির্বাচন করা যে সম্ভব নয়, প্রমাণ করে দিলাম”, যোগ করেন মেজর নাসির।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন আশার নাকি আশঙ্কার এমন প্রশ্নের জবাবে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “যারা 'ডাই হার্ড' তাদের জন্য যেকোনো কিছুই তাদেরকে নির্বাচনের দমাতে পারবে না। আবার যারা ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি করেন, তাদের নির্দিষ্ট একটা ছকই আছে, কে কখন শুধু তারা ভোট দিবেই।”
তবে নতুন ভোটারদের জন্য এই পরিস্থিতি শঙ্কার বলে মত দেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তিনি বলেন, “যারা একটু সেফটি কমফোর্ট এবং এগুলো চিন্তা-ভাবনা করেন তাদের জন্য এই এটা একটা আশঙ্কার ব্যাপার।”
“খুব দুঃখজনক যে গত পনেরো বছর একটা জেনারেশন আমাদের বড় হয়ে উঠেছে তারা আসলে নির্বাচনের যেই ফেস্টিভ আমেজ আছে, নির্বাচন যে একটা উৎসব, এটা জানে না। একটা দেশের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমার মতেরও একটা দাম আছে এই ধরনের যে একটা ফিলিংস। এই ফিলিংসটা কিন্তু একটা প্রজন্ম পায়নি গত পনেরো বছরে।”
তারা এবার ভোট দিতে না পারলে এর চেয়ে দুঃখজনক কিছু হয় না বলে মন্তব্য করেন মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, “সেক্ষেত্রে আমাদের বলতে হবে যে, জুলাই বিপ্লব হলো। সে বিপ্লবের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি একটা কাজ হবে।”
শিক্ষক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ খান রবিউল আলম বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিতর্ক জমে না উঠলে ভোটাররা নির্বাচনের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেইরকম চিত্র এখনো দেখা যাচ্ছে না। যদি প্রচারণা জমে ওঠে তাহলে হয়তো ভোটারদের আগ্রহ বাড়বে।”
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও আস্থা তৈরি করতে হবে। যাতে ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে আগ্রহী হয়। কারণ আস্থাহীনতা নিয়ে ভোটাররা সিদ্ধান্তগ্রহণে দ্বিধান্বিত থাকবে বলেও মনে করেন খান রবিউল আলম।
গণসংহতির ফিরোজ আহমেদ আলাপ-কে বলেন, “বাংলাদেশে এই অন্তর্বর্তী সরকার থেকে একটা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক স্তরে যাওয়ার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা আয়োজন হচ্ছে নির্বাচনটা। সেই কারণে এই নির্বাচনে ঠিকঠাক মতো অনুষ্ঠিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর নির্বাচনকে নিয়ে অনেক রকম উদ্বেগ আশঙ্কায় আছে মানুষ।। আমি আশা করব যে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বশীলতার সাথে এই উদ্বেগগুলোর মোকাবিলা করবেন।”