নির্বাচনের মাঠে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার কথা যখন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, ঠিক তখনই শেরপুরে একটি নির্বাচনি অনুষ্ঠান ঘিরে রক্ত ঝরেছে
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২৭ পিএমআপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম
নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর থেকেই অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন যে, সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটতে পারে যেকোনো সময়। বুধবার প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটল শেরপুরে।
তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি এবং পরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। ওই দুটি ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত’ বলে মনে করা হচ্ছে।
শেরপুরে ঘটেছে দুই দলের সংঘর্ষ, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা নির্বাচনি পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে।
যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
শেরপুরে সরকারের আয়োজিত অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত, তর্কাতর্কি মুহূর্তেই মধ্যে রূপ নেয় সংঘর্ষে, আর তাতেই প্রাণ হারান রেজাউল করিম।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, প্রশাসনের ব্যর্থ মধ্যস্থতা এবং প্রকাশ্য হুঁশিয়ারির মধ্য দিয়ে ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
এই ঘটনা নির্বাচনি পরিবেশে সহিংসতার ঝুঁকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলতা, সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ঘটনার পরপরই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও প্রশ্ন উঠছে যে, নির্বাচনি কর্মসূচিকে ঘিরে পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও কেন সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব হলো না?
কী ঘটেছিল
বুধবার বিকাল তিনটায় ঝিনাইগাতী উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নিয়ে ‘নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান’ আয়োজন করে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও ইউএনও।
পুলিশ সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যাচ্ছে, অনুষ্ঠান শুরুর আগেই বেলা আড়াইটার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে সামনে রাখা চেয়ারগুলোতে বসে পড়েন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের সমর্থকরা। বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল ও তার সমর্থকরা পরে আসেন। তারা দর্শকসারির সামনের চেয়ারগুলোতে বসতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন।
এ সময় জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাগবিতণ্ডা থেকে চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ভেঙে ও পুড়িয়ে দেওয়া হয় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল। লন্ডভন্ড হয়ে যায় অনুষ্ঠান মঞ্চ।
এই ঘটনায় উভয়পক্ষের পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়। পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মোতায়েন করা হয় বাড়তি সদস্য। তবে ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি।
ওই ঘটনার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা বাজারে অবস্থান নেয়। আর জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে শ্রীবরদী উপজেলার নেতাকর্মীরাও ছিলেন বাজারমুখী রাস্তায়। নিজ এলাকায় ফিরতে হলে, তাদেরকে বাজার হয়ে কিংবা গ্রাম ঘুরে যেতে হতো। জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল প্রাম ঘুরে যেতে অস্বীকৃতি জানান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রশাসনের তরফ থেকে বারবার তাকে অনুরোধ করা হচ্ছে, যেন তারা এই পথ ছেড়ে অন্য পথ দিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। না হলে নিরাপত্তা শঙ্কা রয়েছে।
তবে জামায়াতের প্রার্থী বলছিলেন, “আমার কর্মীদের আমি এই পথেই নিয়ে যাবো।”
ভিডিওতে দেখা যায়, জামায়াতের প্রার্থীকে জড়িয়ে ধরে স্থানীয় বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বার বার বোঝাচ্ছিলেন, আপনি আপনার নেতাকর্মীদের শান্ত করেন।
জবাবে জামায়াতের প্রার্থী বলেন, “আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি, পালিয়ে যাওয়ার জন্য না। আমি এখান দিয়েই যাবো।”
এটা নিয়ে শুরু হয় নতুন উত্তেজনা। প্রশাসন ও বিএনপির নেতারা তাকে উত্তর দিক যেতে অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হননি। এভাবে বেলা সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা সময় পেরিয়ে যায়।
এরই মধ্যে বাজারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। অনড় থাকেন যে, তারা বাদলকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে দেবে না।
এই সময় মাইকে কেউ একজন ভাষণ দেয় যে, গুপ্ত জঙ্গি সংগঠনকে প্রত্যাখান করেছে মানুষ।
বিএনপির মিছিল থেকে বলা হতে থাকে যে, বাদলকে ঘুরে যেতে হবে। অথবা শ্রীবরদীর লোকজনকে মারা হবে। পুলিশ রাস্তা ছাড়তে অনুরোধ করলেও তারা মানেননি।
এরপরও সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বাজারে প্রবেশ করে। কাছাকাছি থাকা বিএনপি নেতাকর্মীরা স্লোগান দেয় ও ঢিল ছুঁড়ে। এই সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুই পক্ষের ধাওয়া পালটা-ধাওয়া চলছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেয়। জামায়াত নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে পেছনে পরে যান তাদের নেতা রেজাউল করিম। তাকে একা পেয়ে কোপানো হয়।
শেরপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) কামরুল ইসলাম বলেন, “মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় তাকে শেরপুর থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। আমরা তার মৃত্যুর খবর শুনেছি।”
“আমরা দুই পক্ষকে শান্ত থাকার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা কেউই দায়িত্বশীল আচরণ করেননি।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি এমন অভিযোগে জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা আলাপকে বলেন, “এটা একটা কমন অভিযোগ। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি পরিস্থিতি শান্ত করার। কিন্তু কেউ দায়িত্বশীল আচরণ না করলে আমাদের কিছু করার নেই।”
আর কেউ হতাহত হয়েছেন কি না জানতে চাইলে কামরুল ইসলাম বলেন, “একজন বিএনপি নেতার মৃত্যুর গুজব উঠেছিল। কিন্তু তিনি নিজেই ফেসবুকে জানিয়েছেন যে, এটা শুধুমাত্র গুজব।”
পারস্পরিক দোষারোপ
সংঘর্ষের ঘটনায় হামলার জন্য একে অপরকে দায়ী করছে জামায়াত ও বিএনপি।
ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার রাতেই শেরপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জেলা জামায়াতে ইসলামী।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের নেতৃত্বে চালানো হামলায় জামায়াতের অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হওয়ার কথা বলেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী রুবেল সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, জামায়াতের নেতাকর্মীদের হামলায় জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম জুনসহ অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে দুইজন গুরুতর আহত হয়ে রক্তবমি করেছেন। তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জামায়াত যা বলছে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। অথচ অনুষ্ঠান শুরুর আগেই সাধারণ ভোটার ও নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মাঠ পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় প্রতিহিংসাপরায়ণভাবে বিএনপি ও যুবদলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জনাব মো. নুরুজ্জামান বাদলের সমর্থকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়।”
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমানও।
বৃহস্পতিবার মিরপুরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা ইঙ্গিত করে অসহিষ্ণুতা। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে জনগণের ওপর আস্থা নাই। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে, অন্যের বিজয় দেখে নিজের সহ্য হয় না।’
বিএনপি যা বলছে
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানকে ঘিরে উদ্ভূত ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। বিএনপি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চায়।
দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, “এই সংঘাত এড়ানো যেত কি না-সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কেন একটি দল সব চেয়ার দখল করে রাখল, কেন সেখানে লাঠিসোঁটা জড়ো করা হলো, সবার সম্মিলিত অনুরোধ উপেক্ষা করে কেন ওই দলের প্রার্থী সংঘাতের পথ বেছে নিলেন- এসব বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।”
তিনি বলেন, এই সংঘাতে একজন মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি যে দলেরই হোন না কেন, এমন মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। পাশাপাশি বিএনপির ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহত ও আহত সবাইই এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিলেন, যেখানে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে কোনো মারামারি বা সংঘাত থাকবে না।
বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলেননি এনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।
তবে রাজশাহীতে আয়োজিত বিএনপির জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, “কোথাও যদি কোনো অনাঙিক্ষত ঘটনা ঘটে থাকে, তবে অন্তবর্তীকালীন সরকারকে বলবো, সঠিক সুষ্ঠু তদন্ত হোক।”
তদন্তে বিএনপির ভূমিকা লাগলে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “অবশ্যই ঘটনার সঠিক তদন্ত হতে হবে। সঠিক তদন্ত অনুযায়ী, আইন অনুযায়ী বিচার হবে।”
“আমাদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কথা, আমরা দেশের শান্তি চাই।”
সরকার যা বলছে
শেরপুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, সহিংসতার ফলে প্রাণহানি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত দুঃখজনক।
প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “জাতীয় নির্বাচন আর মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে থাকাকালে সরকার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামসহ সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রদর্শন এবং তাদের সমর্থকদের মধ্যে সংযম নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণহানির কোনো স্থান নেই।”
বিবৃতিতে বলা হয়, শেরপুরে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কী প্রভাব পড়তে পারে
এই সহিংসতা নির্বাচনি পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “একটা মিটিং যখন অর্গানাইজ করা হয়, তখন তো পারমিশন নিয়েই করা হয়েছে। এখানে আসলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান কোথায়? সতর্ক অবস্থান থাকলে দুই পক্ষের মারামারি হলো, তারা কোথায় ছিল।”
যে সংকটময় পরিস্থিতি শুরু হয়েছে তা আরও বাড়তে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, যদি এখানে আর্মি ইন্টারভেন না করে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যদি সিরিয়াস না হয়, রাজনৈতিক দলগুলো যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করে, তাহলে এই ভায়োলেন্স আরও বাড়বে।”
“ছোট্ট বসার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে মারামারি হয়। এটা তো রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশ্ন করা উচিত এবং কার ভুল সেটা খুঁজে বের করা দরকার।” এই ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বলেন, “ব্যাপারটা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ বিষয়টা তো সুন্দর ছিল, দুইটা দলের প্রার্থী একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা করবে। উন্নত বিশ্বে আমরা এমনটা দেখি। কিন্তু পূর্বনির্ধারিত হওয়ার পরও নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা গেল না।”
তিনি বলেন, ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর আমরা এই দুঃখজনক ব্যাপারটা দেখলাম যা একবারেই প্রত্যাশিত নয়। আমরা ভাবতাম শহর বা শিল্পাঞ্চলে হয়তো সন্ত্রাস বেশি। কিন্তু মফস্বলের সহজ-সরল মানুষও এই সহিংসতায় জড়ালো এবং প্রাণ গেল।
এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, যদি বিষয়টির সমাধান না হয়, এবং দোষীদের খুঁজতে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তবে ভবিষ্যতে তা বড় আকার ধারণ করবে এবং নির্বাচনি পরিবেশে প্রভাব ফেলবে।
নিরাপত্তা আরও বড় শঙ্কার কথা জানিয়েছে মেজর (অব.) নাসির বলেন, এখানে তো দুই দল জড়িয়েছে, তাদের ওপর তো কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ আছে। কিন্তু যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী নেই, সেখানে তো এই নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ড. সাব্বির আহমেদও মনে করেন, এই ঘটনা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন,“ এটাতো প্রচারণার সময় হলো এটা আরও বাড়তে পারে। যদি হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
নির্বাচনি সহিংসতায় প্রথম মৃত্যু, কী বার্তা দিচ্ছে
নির্বাচনের মাঠে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার কথা যখন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, ঠিক তখনই শেরপুরে একটি নির্বাচনি অনুষ্ঠান ঘিরে রক্ত ঝরেছে
নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর থেকেই অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন যে, সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটতে পারে যেকোনো সময়। বুধবার প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটল শেরপুরে।
তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি এবং পরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। ওই দুটি ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত’ বলে মনে করা হচ্ছে।
শেরপুরে ঘটেছে দুই দলের সংঘর্ষ, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা নির্বাচনি পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে।
যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
শেরপুরে সরকারের আয়োজিত অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত, তর্কাতর্কি মুহূর্তেই মধ্যে রূপ নেয় সংঘর্ষে, আর তাতেই প্রাণ হারান রেজাউল করিম।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, প্রশাসনের ব্যর্থ মধ্যস্থতা এবং প্রকাশ্য হুঁশিয়ারির মধ্য দিয়ে ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
এই ঘটনা নির্বাচনি পরিবেশে সহিংসতার ঝুঁকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলতা, সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ঘটনার পরপরই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও প্রশ্ন উঠছে যে, নির্বাচনি কর্মসূচিকে ঘিরে পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও কেন সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব হলো না?
কী ঘটেছিল
বুধবার বিকাল তিনটায় ঝিনাইগাতী উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নিয়ে ‘নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান’ আয়োজন করে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও ইউএনও।
পুলিশ সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যাচ্ছে, অনুষ্ঠান শুরুর আগেই বেলা আড়াইটার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে সামনে রাখা চেয়ারগুলোতে বসে পড়েন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের সমর্থকরা। বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল ও তার সমর্থকরা পরে আসেন। তারা দর্শকসারির সামনের চেয়ারগুলোতে বসতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন।
এ সময় জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাগবিতণ্ডা থেকে চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ভেঙে ও পুড়িয়ে দেওয়া হয় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল। লন্ডভন্ড হয়ে যায় অনুষ্ঠান মঞ্চ।
এই ঘটনায় উভয়পক্ষের পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়। পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মোতায়েন করা হয় বাড়তি সদস্য। তবে ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি।
ওই ঘটনার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা বাজারে অবস্থান নেয়। আর জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে শ্রীবরদী উপজেলার নেতাকর্মীরাও ছিলেন বাজারমুখী রাস্তায়। নিজ এলাকায় ফিরতে হলে, তাদেরকে বাজার হয়ে কিংবা গ্রাম ঘুরে যেতে হতো। জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল প্রাম ঘুরে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রশাসনের তরফ থেকে বারবার তাকে অনুরোধ করা হচ্ছে, যেন তারা এই পথ ছেড়ে অন্য পথ দিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। না হলে নিরাপত্তা শঙ্কা রয়েছে।
তবে জামায়াতের প্রার্থী বলছিলেন, “আমার কর্মীদের আমি এই পথেই নিয়ে যাবো।”
ভিডিওতে দেখা যায়, জামায়াতের প্রার্থীকে জড়িয়ে ধরে স্থানীয় বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বার বার বোঝাচ্ছিলেন, আপনি আপনার নেতাকর্মীদের শান্ত করেন।
বিএনপি নেতাকে বলতে শোনা যায়, “আমি আপনার পায়ে ধরি, আপনি সামনে যায়েন না।”
জবাবে জামায়াতের প্রার্থী বলেন, “আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি, পালিয়ে যাওয়ার জন্য না। আমি এখান দিয়েই যাবো।”
এটা নিয়ে শুরু হয় নতুন উত্তেজনা। প্রশাসন ও বিএনপির নেতারা তাকে উত্তর দিক যেতে অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হননি। এভাবে বেলা সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা সময় পেরিয়ে যায়।
এরই মধ্যে বাজারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। অনড় থাকেন যে, তারা বাদলকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে দেবে না।
এই সময় মাইকে কেউ একজন ভাষণ দেয় যে, গুপ্ত জঙ্গি সংগঠনকে প্রত্যাখান করেছে মানুষ।
বিএনপির মিছিল থেকে বলা হতে থাকে যে, বাদলকে ঘুরে যেতে হবে। অথবা শ্রীবরদীর লোকজনকে মারা হবে। পুলিশ রাস্তা ছাড়তে অনুরোধ করলেও তারা মানেননি।
এরপরও সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বাজারে প্রবেশ করে। কাছাকাছি থাকা বিএনপি নেতাকর্মীরা স্লোগান দেয় ও ঢিল ছুঁড়ে। এই সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুই পক্ষের ধাওয়া পালটা-ধাওয়া চলছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেয়। জামায়াত নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে পেছনে পরে যান তাদের নেতা রেজাউল করিম। তাকে একা পেয়ে কোপানো হয়।
শেরপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) কামরুল ইসলাম বলেন, “মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় তাকে শেরপুর থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। আমরা তার মৃত্যুর খবর শুনেছি।”
“আমরা দুই পক্ষকে শান্ত থাকার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা কেউই দায়িত্বশীল আচরণ করেননি।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি এমন অভিযোগে জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা আলাপকে বলেন, “এটা একটা কমন অভিযোগ। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি পরিস্থিতি শান্ত করার। কিন্তু কেউ দায়িত্বশীল আচরণ না করলে আমাদের কিছু করার নেই।”
আর কেউ হতাহত হয়েছেন কি না জানতে চাইলে কামরুল ইসলাম বলেন, “একজন বিএনপি নেতার মৃত্যুর গুজব উঠেছিল। কিন্তু তিনি নিজেই ফেসবুকে জানিয়েছেন যে, এটা শুধুমাত্র গুজব।”
পারস্পরিক দোষারোপ
সংঘর্ষের ঘটনায় হামলার জন্য একে অপরকে দায়ী করছে জামায়াত ও বিএনপি।
ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার রাতেই শেরপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জেলা জামায়াতে ইসলামী।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের নেতৃত্বে চালানো হামলায় জামায়াতের অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হওয়ার কথা বলেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী রুবেল সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, জামায়াতের নেতাকর্মীদের হামলায় জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম জুনসহ অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে দুইজন গুরুতর আহত হয়ে রক্তবমি করেছেন। তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জামায়াত যা বলছে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। অথচ অনুষ্ঠান শুরুর আগেই সাধারণ ভোটার ও নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মাঠ পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় প্রতিহিংসাপরায়ণভাবে বিএনপি ও যুবদলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জনাব মো. নুরুজ্জামান বাদলের সমর্থকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়।”
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমানও।
বৃহস্পতিবার মিরপুরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা ইঙ্গিত করে অসহিষ্ণুতা। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে জনগণের ওপর আস্থা নাই। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে, অন্যের বিজয় দেখে নিজের সহ্য হয় না।’
বিএনপি যা বলছে
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানকে ঘিরে উদ্ভূত ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। বিএনপি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চায়।
দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, “এই সংঘাত এড়ানো যেত কি না-সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কেন একটি দল সব চেয়ার দখল করে রাখল, কেন সেখানে লাঠিসোঁটা জড়ো করা হলো, সবার সম্মিলিত অনুরোধ উপেক্ষা করে কেন ওই দলের প্রার্থী সংঘাতের পথ বেছে নিলেন- এসব বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।”
তিনি বলেন, এই সংঘাতে একজন মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি যে দলেরই হোন না কেন, এমন মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। পাশাপাশি বিএনপির ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহত ও আহত সবাইই এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিলেন, যেখানে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে কোনো মারামারি বা সংঘাত থাকবে না।
বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলেননি এনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।
তবে রাজশাহীতে আয়োজিত বিএনপির জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, “কোথাও যদি কোনো অনাঙিক্ষত ঘটনা ঘটে থাকে, তবে অন্তবর্তীকালীন সরকারকে বলবো, সঠিক সুষ্ঠু তদন্ত হোক।”
তদন্তে বিএনপির ভূমিকা লাগলে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “অবশ্যই ঘটনার সঠিক তদন্ত হতে হবে। সঠিক তদন্ত অনুযায়ী, আইন অনুযায়ী বিচার হবে।”
“আমাদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কথা, আমরা দেশের শান্তি চাই।”
সরকার যা বলছে
শেরপুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, সহিংসতার ফলে প্রাণহানি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত দুঃখজনক।
প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “জাতীয় নির্বাচন আর মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে থাকাকালে সরকার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামসহ সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রদর্শন এবং তাদের সমর্থকদের মধ্যে সংযম নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণহানির কোনো স্থান নেই।”
বিবৃতিতে বলা হয়, শেরপুরে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কী প্রভাব পড়তে পারে
এই সহিংসতা নির্বাচনি পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “একটা মিটিং যখন অর্গানাইজ করা হয়, তখন তো পারমিশন নিয়েই করা হয়েছে। এখানে আসলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান কোথায়? সতর্ক অবস্থান থাকলে দুই পক্ষের মারামারি হলো, তারা কোথায় ছিল।”
যে সংকটময় পরিস্থিতি শুরু হয়েছে তা আরও বাড়তে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, যদি এখানে আর্মি ইন্টারভেন না করে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যদি সিরিয়াস না হয়, রাজনৈতিক দলগুলো যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করে, তাহলে এই ভায়োলেন্স আরও বাড়বে।”
“ছোট্ট বসার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে মারামারি হয়। এটা তো রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশ্ন করা উচিত এবং কার ভুল সেটা খুঁজে বের করা দরকার।”
এই ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বলেন, “ব্যাপারটা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ বিষয়টা তো সুন্দর ছিল, দুইটা দলের প্রার্থী একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা করবে। উন্নত বিশ্বে আমরা এমনটা দেখি। কিন্তু পূর্বনির্ধারিত হওয়ার পরও নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা গেল না।”
তিনি বলেন, ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর আমরা এই দুঃখজনক ব্যাপারটা দেখলাম যা একবারেই প্রত্যাশিত নয়। আমরা ভাবতাম শহর বা শিল্পাঞ্চলে হয়তো সন্ত্রাস বেশি। কিন্তু মফস্বলের সহজ-সরল মানুষও এই সহিংসতায় জড়ালো এবং প্রাণ গেল।
এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, যদি বিষয়টির সমাধান না হয়, এবং দোষীদের খুঁজতে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তবে ভবিষ্যতে তা বড় আকার ধারণ করবে এবং নির্বাচনি পরিবেশে প্রভাব ফেলবে।
নিরাপত্তা আরও বড় শঙ্কার কথা জানিয়েছে মেজর (অব.) নাসির বলেন, এখানে তো দুই দল জড়িয়েছে, তাদের ওপর তো কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ আছে। কিন্তু যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী নেই, সেখানে তো এই নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ড. সাব্বির আহমেদও মনে করেন, এই ঘটনা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন,“ এটাতো প্রচারণার সময় হলো এটা আরও বাড়তে পারে। যদি হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
বিষয়: