মন্তব্য প্রতিবেদন

‘মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে!’

বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম তার সন্তানকে কখনো দেখেননি। প্রথমবারের মতো তিনি দেখলেন, কারাফটকে বসে। নয় মাস বয়সী একটি ছোট মৃতদেহকে।

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:১০ পিএম

“মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে!” ফেসবুকে এই লাইনটি লিখেছেন কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ। বাংলাদেশের এই সময়ের সেরা কবিদের একজন তিনি।

ইমতিয়াজ মাহমুদ একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর নিষিদ্ধ হওয়া সংগঠন ছাত্রলীগের একজন স্থানীয় নেতা, যিনি গত দশমাস ধরে কারাবন্দী আছেন, তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন, আত্মহত্যা করার আগে তরুণী বধুটি তার নয় মাস বয়সী শিশুটিকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করেছেন।

বুক ভেঙে দেওয়ার মতো এই ঘটনাটি ঘটে গেছে, দক্ষিণের জেলা শহর বাগেরহাটে। 

সদ্য স্ত্রী ও সন্তানহারা পিতাকে তার মৃত স্ত্রী-সন্তানের মৃতদেহ শেষবারের মতো দেখবার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি অথবা সিস্টেমের জাঁতাকল, এখতিয়ারের সীমানা কিংবা দায়িত্বশীলদের অমানবিক কর্মপন্থা তাকে প্যারোল পেতে দেয়নি।

শেষ পর্যন্ত মৃতদেহ দুটিকে টেনে নিয়ে যেতে হয়, পঁচানব্বই কিলোমিটার দূরে - বাবা যেন শেষবারের মতো এবং প্রথমবারের মতো তার শিশুসন্তানকে একনজর দেখতে পারেন। স্বামী যেন শেষবারের মতো দেখতে পারেন প্রিয়তম স্ত্রীকে।

বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম তার সন্তানকে কখনো দেখেননি।

প্রথমবারের মতো তিনি দেখলেন, কারাফটকে বসে। নয় মাস বয়সী একটি ছোট মৃতদেহকে।

বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের অনলাইন গণমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর লিখেছে, “শনিবার সন্ধ্যায় সাদ্দামের নয় মাসের সন্তান ও তার স্ত্রী সুবর্ণা স্বর্ণালীর লাশ নেওয়া হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানে তাদের শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখেন তিনি।”

সুবর্ণা স্বর্ণালীর বয়েস ছিল মোটে বাইশ বছর। 

বাগেরহাটে প্রথম আলোর সাংবাদিক ইনজামামুল হক শুক্র এবং শনিবার অন্তত ৬/৭ বার গিয়েছেন সাবেকডাঙায় সাদ্দামদের বাড়িতে।

সাবেকডাঙ্গা গ্রামটি শহর থেকে কিছু দূরে। সেখানে সাদ্দামদের বাড়িতেই সন্তান নিয়ে থাকছিলেন স্বর্ণালী।

ওই গ্রামের বেশ কয়জন বাসিন্দা, স্বর্ণালীর বোন এবং সাদ্দামের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেছেন ইনজামাম।

এই আলাপচারিতায় ইনজামামের উপলব্ধি, ভালোবেসে সাদ্দামকে বিয়ে করেছিলেন স্বর্ণালী। এজন্য নিজ পরিবারের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়। খুলনায় একটি কলেজে পড়তেন তিনি। 

গর্ভবতী হওয়ার পর তিনি শ্বশুরবাড়িতে এসে ওঠেন। ছাত্রনেতা স্বামী কারাগারে। কিন্তু এজন্য স্বর্ণালীকে অপাঙ্‌ক্তেয় করে দেননি তার শ্বশুরবাড়ির পরিবার। বরং কিছুদিন আগে আকিকা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় স্বর্ণালী-সাদ্দাম দম্পতির ছেলের জন্য - আকিকা দিয়ে তাদের ছেলের নাম রাখা হয় নাজিম হোসেন। 

এইসব ছোট ছোট ঘটনা বলে দেয়, স্বামীর অনুপস্থিতিতে শ্বশুরবাড়িতে নিগ্রহের শিকার হননি স্বর্ণালী। 

বরং তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন স্বামীর জামিন নিয়ে, বারবার জামিন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। 

এই হতাশাই কি স্বর্ণালীকে সন্তানসহ আত্মহননের পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে? 

প্রাথমিকভাবে এমনটাই ধারণা করছেন অনেকে। পুলিশ এটা নিয়ে তদন্ত করছে। এখনই তারা কিছু বলতে রাজি নয় এ নিয়ে।

কিছু কিছু সংবাদপত্র এই খবরও দিচ্ছে, ৫ই অগাস্টের পর থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত যখন গোপালগঞ্জে আত্মগোপনে ছিলেন সাদ্দাম তখন সম্ভবত তিনি আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। সেইসব খবরে বলা হচ্ছে, সাদ্দামের সেই স্ত্রী নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু সেই হিসেবও মেলে না। কারণ সাদ্দাম দশ মাস ধরে কারাগারে। 

ফলে এই আত্মহননের পর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ হলো তরুণী স্ত্রীর হতাশা, যে হতাশা হয়ত আরো বেড়ে গিয়েছিলো প্রসব-পরবর্তী বিপর্যস্ত মানসিক পরিস্থিতির কারণে।

দু'দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে হাতে লেখা একটি চিঠি। “আমার ছেলেটাকে কোলে নিতে পারলাম না এটাই কষ্ট” - বাজারের ফর্দের মতো লম্বা স্লিপে লেখা সেই চিঠির শেষ লাইনটি যে কোন পিতার হৃদয় ভেঙে দেবে।

ফেসবুকে যারা এই চিঠিটি শেয়ার করছেন, তারা দাবি করছেন, কারাগার থেকে স্ত্রী স্বর্ণালীকে চিঠিটি লিখেছিলেন সাদ্দাম। চিঠিটির সত্যাসত্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে এটি ভাইরাল হয়েছে। 

এটি যদি সত্যিই সাদ্দামের লেখা চিঠি হয়, তাহলে সেটা কি স্বর্ণালীর আত্মহত্যা প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলেছিল? কে জানে!

অবশ্য স্বর্ণালী কেন তার শিশুকে হত্যা করে নিজে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন সেই কারণ খোঁজা আমার এই লেখার উদ্দেশ্য না। আমি বরং খুঁজতে চাই, রাষ্ট্র কেন একজন স্ত্রী-পুত্র হারা তরুণ ছাত্রনেতার প্রতি চরম অমানবিক আচরণ করলো? রাষ্ট্র কি এই আচরণ করলো নাকি রাষ্ট্রের সিস্টেমটাই অমানবিক?

বাংলাদেশের প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষ এখন এই একটি প্রশ্নই করছেন - কেন সাদ্দাম তার স্ত্রী ও পুত্রের মরদেহ শেষবারের মত দেখার জন্য প্যারোল পেলেন না? গলদটা কোথায়? 

যে লাইনটি দিয়ে এই লেখাটি শুরু করেছি, কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা ওই লাইনটির মধ্যেই রয়েছে রাষ্ট্রের অংসবেদনশীল ব্যবস্থার প্রতি সূক্ষ্ম এক তীর্যক খোঁচা।

প্যারোল কী?

সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দিতে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন।

প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত এক পৃষ্ঠার একটি নীতিমালা রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা শাখা-২ এর এই নীতিমালায় ৫টি ধারা রয়েছে যার প্রথমেই বলা আছে, “বন্দিদের নিকটাত্মীয় যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে।”

ইংরেজি প্যারোল শব্দের অর্থই হচ্ছে শর্তসাপেক্ষে সাময়িক বা আগাম মুক্তি।

বাংলাদেশের নীতিমালা অনুযায়ী প্যারোলের সময়সীমা সর্বোচ্চ বারো ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে।

প্যারোল শব্দটি বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি আলোচনায় আসে ২০১৯ সালে, যখন দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাভোগ করছিলেন সদ্যপ্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বয়োবৃদ্ধ এই রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার একটি পরিত্যক্ত কারাগারে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রেখেছিল শেখ হাসিনার সরকার। তিনি অসুস্থ ছিলেন। এক পর্যায়ে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব সামনে আসে এবং এ নিয়ে বেশ কিছুদিন কথাবার্তা হয়।

সেসময় বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই খালেদা জিয়ার প্যারোল আবেদন নিয়ে খবরাখবর আসতো।

খালেদা জিয়া সাজা শেষ হওয়ার আগেই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, তবে সেটা প্যারোল ছিল না। তার সাজার দণ্ড স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল তাকে। তবে সেটা ঠিক মুক্তিও ছিল না। খালেদা জিয়াকে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা নানারকম বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হতো - সেটাকে বরং গৃহবন্দীদশা বললেই যথার্থ মনে হবে।

নিকটজন হারানোর কারণে বন্দিদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়া বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তরের একটি সাধারণ শিষ্টাচার হিসেবেই বজায় ছিল সবসময়।

বহু ভয়ংকর অপরাধীকেও নিকটজনের শেষকৃত্যে অংশ নেয়ার জন্য প্যারেলে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। 

পাশের দেশ ভারতের রাজস্থানে এ বছরই দুইজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খুনের আসামিকে পনেরো দিনের প্যারোল দেওয়া হয় বিয়ে করার জন্য।

হনুমান প্রসাদ ও প্রিয়া শেঠ নামে এই দুইজন মানুষ কারাভোগ করার সময়ই পরস্পরের প্রেমে পড়েন এবং বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

মানবিক বিবেচনায় রাজস্থানের আদালত দুজনকে বিয়ের জন্য পনেরো দিনের প্যারোল অনুমোদন করেন। 

সাদ্দাম কতটা ভয়ংকর অপরাধী?

বাগেরহাট সদর উপজেলার ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের অবস্থান আওয়ামী লীগের চেইন অব কমান্ডের একেবারেই নিচু পর্যায়ে।

তার বিরুদ্ধে যত মামলা আছে তার সবগুলোই দায়ের হয়েছে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর।

বেশ কিছুদিন পালিয়ে থাকার পর তিনি গ্রেপ্তার হন। এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের একটি মামলায় আসামি হিসেবে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

চব্বিশের অগাস্টের পর এই ধরনের মামলা হয়েছে হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে। সেসব মামলার আসামি হয়ে ওঠার কতটা যোগ্য এইসব মানুষেরা সেটা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন উঠেছে। 

সাদ্দামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তার পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার জামিনের আবেদন হয়েছে। অন্তত পাঁচবার তার জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। 

যতবার জামিন হয়েছে, সাথে সাথেই পুলিশ তাকে অন্য একটা মামলায় আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। 

ফলে জামিন পেলেও মুক্তি পাননি সাদ্দাম। বাগেরহাটের সাংবাদিক ইনজামামকে সাদ্দামের ভাই বলেছেন, এভাবে বারবার জামিন করানোর পরও ভাইকে মুক্ত করতে না পেরে এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে যান তারা। এই বাবদ বিস্তর অর্থনাশও হয়েছে তাদের। 

অবশ্য আটকের পর বাগেরহাটের কারাগারে মাত্র একমাস রাখা হয়েছিল সাদ্দামকে। এরপরই তাকে বদলি করে যশোরে পাঠানো হয়।

যেখানে সাদ্দামের মামলা-বিচার সবকিছুই বাগেরহাটে সেখানে তাকে পঁচানব্বই কিলোমিটার দূরবর্তী যশোরে কেন পাঠানো হলো, এটাও একটা বিরাট প্রশ্ন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাগেরহাট কারাগারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র সাদ্দামকে বর্ণনা করেছেন একজন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কয়েদি হিসেবে। 

তিনি বলেন, ‘‘ঝুঁকিপূর্ণ কয়েদিদের আমরা সাধারণত দূরবর্তী কারাগারগুলোতে রাখি।’’

বাগেরহাট জেলা কারাগারের ছয়শ বন্দির মধ্যে মাত্র তিনজনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় দূরের কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এরমধ্যে একজন হচ্ছেন, কচুয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান বাবু। তাকে রাখা হয়েছে মেহেরপুরের কারাগারে। বাবুকে মেহেরপুরে পাঠানোর কারণ হিসেবে ওই কর্মকর্তা জানান, তিনি ইয়াবায় আসক্ত। আদালতে হাজিরার জন্য নিয়ে যাওয়া হলেই তিনি পায়ুপথে করে ইয়াবা নিয়ে আসতেন কারাগারে। তার এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কারা কর্তৃপক্ষ তাকে মেহেরপুর পাঠায়।

আরেকজনের নাম রুমি বলে উল্লেখ করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি এনএসআই থেকে চাকুরিচ্যুত। তার ভাই একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের। তাকেও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করে ঝিনাইদহ কারাগারে পাঠানো হয়।

আর সাদ্দামকে ওই কর্মকর্তা বর্ণনা করেন, ‘উচ্ছৃঙ্খল কয়েদি’ হিসেবে। তিনি জানান, যে একমাস তাকে বাগেরহাটে রাখা হয়েছিল তখন তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কারাগার থেকে আদালত পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ রাখতে হতো শান্তিহানী হবার আশঙ্কায়।

“সাদ্দাম একবার আমাকেই হুমকি দিয়ে বলেছিল যে, ছাড়া পাওয়ার পর আমাকে দেখে নেবে,” পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন ওই কারা কর্মকর্তা। 

এসব কারণেই তাকে যশোরে পাঠানো হয়েছিল বলে উল্লেখ করছেন বাগেরহাটের কারা কর্মকর্তারা।

কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে একজন মানুষকে তার মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় কি না সেই প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে।

‘তাকে কেন ছাড়লো না’?

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একজন তরুণীকে আহাজারি করতে দেখা গেছে। তিনি স্বর্ণালীর বোন। 

তিনি স্বর্ণালী ও তার ছেলের মৃতদেহের সাথে যশোরে গিয়েছিলেন সাদ্দামের সাথে দেখা করতে। ফেরার সময় গাড়িতে বসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সে তো কোনও খুনি না, তাকে কেন ছাড়লো না?”

এই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঠেলাঠেলি সিস্টেম

কারা বিভাগের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার এখতিয়ার জেলা প্রশাসকের, কারা বিভাগের নয়।

মোহাম্মদ হেমায়েত উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি স্বাক্ষরিত একটি আবেদনের কপি আমার হাতে এসেছে। 

হেমায়েত উদ্দিন হচ্ছেন সাদ্দামের মামা। এই আবেদনটি তিনি করেছিলেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক বরাবর।

শুক্রবার কার্যালয় বন্ধ থাকায় হেমায়েত উদ্দিন আবেদনটি নিয়ে ডিসির বাসভবনে যান। আবেদনপত্রটি গ্রহনও করেছিলেন ডিসির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। কিন্তু পরে যখন তারা জানতে পারেন সাদ্দাম বাগেরহাটে নেই, তিনি যশোরে বন্দি, তখন ‘এখতিয়ারবহির্ভূত’ হওয়ায় তারা আবেদনপত্রটি ফিরিয়ে দেন।

আপাত দৃষ্টিতে এটা মনে হতে পারে, ঠিকই তো করেছে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন। এখতিয়ারে না থাকলে তারা কী করবেন? একটি স্বজন হারানো পরিবারের জন্য তাদের কী করার আছে?

বাংলাদেশের এই অমানবিক আমলাতান্ত্রিক কর্মপন্থা লেখক রাজিব হাসানের চোখে 'ঠেলাঠেলি সিস্টেম'।

ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, "এটাই বাংলাদেশের চিরকালীন সিস্টেম। এটাই ঠেলাঠেলি সিস্টেম। সরকারি যেকোনো অফিসে যান, প্রথমেই একজন কর্মকর্তা আপনাকে অন্য টেবিলে পাঠায় দিবে।"

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হেমায়েতউদ্দিন এরপর যান বাগেরহাটের কারা কর্তৃপক্ষের কাছে।

বাগেরহাটের কারাগারের যে সূত্রটির সাথে আমি কথা বলেছি, সেই সূত্রটি আমাকে জানায়, তারাই হেমায়েত উদ্দিনকে যশোরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

তারপরের ঘটনা আপনাদের জানা।

যশোরের জেলা প্রশাসন এবং কারা প্রশাসন বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, জুয়েল হাসান সাদ্দামের পরিবার তাদের কাছে প্যারোলের কোন আবেদন করেনি।

তাদের বক্তব্য সঠিক।

শনিবার ছুটির দিনে পঁচানব্বই কিলোমিটার দূরবর্তী শহর যশোরে গিয়ে প্যারোলের আবেদন করার চাইতে স্বর্ণালী আর তার ছেলে লাশ সাথে করে যশোরে যাওয়াই হয়ত শ্রেয় মনে করেছিলেন তার স্বজনেরা। 

শেষ পর্যন্ত তারা সেটাই করেছেন। 

যশোরের কারাফটকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ পৌঁছানোর পর সেখানকার কারা কর্মকর্তারা অমানবিকতার মাত্রা আর বাড়াতে পারেননি। সাদ্দামকে কারাফটক পর্যন্ত আসতে দিয়েছেন তারা। প্রিয়তমা স্ত্রী, না দেখা সন্তানকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখতে দিয়েছেন তারা।

কারা বিভাগের আমার যে সূত্রটি, তার ভাষায়, "মানবিকতা দেখিয়ে যশোরের কারা কতৃ‍‍পক্ষ সাদ্দামকে তার মৃত স্ত্রী-সন্তানের সাথে দেখা করতে দিয়েছে।"

ভাগ্যিস এই মানবিকতাটুকু তারা দেখিয়েছিলেন। নাহলে শেষপর্যন্ত মৃত শিশুর দেখা হত না জীবিত পিতার সাথে।

পিতা-পুত্রের এবং স্বামী-স্ত্রীর এই বেদনাবিধুর মিলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি আদপে কতটা নির্মম, কতটা অমানবিক!