২০০৮ সাল। বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দেয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল। অর্থ, গ্ল্যামার আর আয়োজনের জৌলুসে এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-২০ লিগ দিয়ে পুরো দুনিয়ার ক্রিকেটেরই গতিপথ পাল্টে দেয় ভারত।
শুরুর সেই সময়ে আরো অনেকের মতো আইপিএলে যুক্ত ছিলেন পাকিস্তানি ক্রিকেটাররাও। বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে মাঠ মাতান শোয়েব আখতার, মালিক, আফ্রিদিরা। কোচিং ও কমেন্ট্রিতে দেখা যায় ওয়াসিম আকরাম, রমিজ রাজাদের। কিন্তু পরের আসর থেকেই বদলে যায় দৃশ্যপট পাকিস্তানিদের জন্য। এক অঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় এরপর আর কখনোই পাকিস্তানি কোনো ক্রিকেটারকে দেখা যায়নি আইপিএলে।
আইপিএলে এবার মুস্তাফিজ ইস্যু তৈরি করে ভারত কি একই কাণ্ড করলো? এখন ভারত-পাকিস্তান যেমন একে অপরের দেশে খেলতে যায় না, বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে যেমন তাদের জন্য রাখতে হয় নিরপেক্ষ ভেন্যু, বাংলাদেশ-ভারত ইস্যুতেও কি আসছে দিনগুলোতে একইরকম ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে?
আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ কিন্তু সেই ইঙ্গিত এরই মধ্যে দিয়ে দিয়েছে?
বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের বিশ্লেষকরাই ঘটনাপ্রবাহের দায় চাপাচ্ছেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের কাঁধেই। এমনকি খোদ ভারতের বিশ্লেষকরাই বলছেন, এসব করে ভারত তাদের ‘সফট পাওয়ার’ ধ্বংস করছে। আর বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা দেখছেন এশিয়ায় ভারতের ‘একঘরে’ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
আইপিএল, মুস্তাফিজ ও ফলাফল
শুরুর আসর থেকেই আইপিএলে সঙ্গী হয়েছে বাংলাদেশ। আবদুর রাজ্জাক, মাশরাফিদের হাত ধরে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতার পোস্টারবয় হয়ে উঠেন সাকিব আল হাসান। ২০১১ থেকে ২০২১ - টানা ১০ বছর আইপিএলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। মাঝে তার সাথে যুক্ত হন মুস্তাফিজুর রহমানও। সেই মুস্তাফিজকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্য ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে নিয়েও বিসিসিআইয়ের নির্দেশনায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হল কলকাতা নাইট রাইডার্স। যা ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া আছে ভারত-বাংলাদেশ দুদিকেই।
না, এখনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি আইপিএলের তরফ থেকে। তবে জল যেভাবে গড়াচ্ছে তাতে ব্যাপারটা আর শুধু ক্রিকেটীয় নেই মোটেও।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএল খেলতে সিলেটে রয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবির সভাপতিসহ বেশিরভাগ কর্মকর্তাও এখন সেখানে। শনিবার মুস্তাফিজের আইপিএল থেকে অব্যাহতির খবর আসার পরপরই জরুরি সভা করে বিসিবি। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর ব্যাপারে বেশ সাবধানী ছিল তারা।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমী ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা ক্ষোভে ফুঁসে উঠেন। আর সেই ক্ষোভ স্ফুলিঙ্গ আকার ধারণ করে রাতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ডা. আসিফ নজরুলের এক ফেসবুক স্ট্যাটাসের পর। যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, “গোলামীর দিন শেষ!”
তিনি বিসিবিকে প্রস্তাব দেন ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসিকে পুরো বিষয়টি জানাতে এবং আগামী মাসে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচের ভেন্যু ভারত থেকে সরিয়ে নেয়ার।
গত বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে ভারতের আপত্তিতেই আইসিসি টুর্নামেন্টে হাইব্রিড মডেল চালু হয়েছে । ফলে সেই টুর্নামেন্টের আয়োজক পাকিস্তান হলেও ভারতের ম্যাচগুলোর আয়োজন হয় দুবাইতে। সেই একই হাইব্রিড মডেলে এবার ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক ভারত হলেও পাকিস্তানের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে শ্রীলঙ্কায়।
গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচের ভেন্যু কলকাতা ও মুম্বাই। কিন্তু যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার স্ট্যাটাসের পর রোববার আবারো জরুরি বৈঠক করে বিসিবি। আর সেই বৈঠক শেষেই জানিয়ে দেওয়া হয় ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না বাংলাদেশ। বিসিবি আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে, যাতে তাদের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে সরিয়ে নেয়া হয়।
এর কারণ হিসেবে বোর্ড বলেছে, খেলোয়াড়সহ সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
“এটা অবশ্যই ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার বিষয়,” বলেন আজাদ মজুমদার।
দীর্ঘদিন ক্রীড়া সাংবাদিকতার পর এখন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিবের দায়িত্ব পালন করা আজাদ মজুমদার মনে করেন, ভারতই তাদের দেশে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি প্রমাণ করে দিয়েছে।
“সাধারণত আমরা কোনো দেশের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে আগে সেখানে প্রতিনিধি দল পাঠাই। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে সেটার দরকার পড়েনি। ভারতে যে নিরাপত্তা ঘাটতি, সেটা কলকাতা মুস্তাফিজকে ছেড়ে দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় আছে।“
এর আগেও নিরাপত্তা ইস্যুতে বিভিন্ন দেশ বিশ্বকাপে দল পাঠায়নি উল্লেখ করে ফেসবুকেও একটি পোস্ট দিয়েছেন আজাদ মজুমদার।
সেখানে এর আগে বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বকাপের মতো আসর বর্জন করেছে উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশেরও নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে।”
সফট পাওয়ার ধ্বংস করছে ভারত
বিসিসিআইয়ের মুস্তাফিজকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়া ও বিসিবির ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার এই সাম্প্রতিক ঘটনা দুই দেশের ক্রিকেটীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্কে কি দীর্ঘস্থায়ী বৈরীভাব তৈরি করতে পারে?
নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক তাসনিম খলিল মনে করেন, “যদি কোনো উগ্রগোষ্ঠী, আইপিএলের মতো লিগের একটা টিম বিদেশ থেকে একটা প্লেয়ারকে নিতে পারবে কি না সেই সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারে, এতে বোঝা যায় ভারতের ক্রীড়াঙ্গন অনিরাপদ।”
তাই বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে যুক্তিযুক্ত মনে করছেন এই সাংবাদিক ও বিশ্লেষক। তিনি যোগ করেন, “ভারতের ক্রিকেট রাজনীতিতে নিজেদের শোধরাতে হবে।”
“আমরা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখি যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও, শুধু বাংলাদেশ বা পাকিস্তান নয়, নেপাল, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপ সব জায়গায় একটা কট্টর ভারতবিরোধী মনোভাব অনেকদিন ধরে গড়ে উঠেছে। এখন ক্রিকেটের মতো খেলার ক্ষেত্রে ভারত যদি নিজেদের না শোধরায়, তাহলে ভারত একঘরে হবে।”
অনেকটা একই কথা বলেছেন ভারতীয় সাংবাদিক সুহাসিনী হায়দার। “একের পর এক প্রতিবেশীর সাথে বর্তমান সরকার সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কূটনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং নিজেদের ‘সফট পাওয়ার’ ধ্বংস করছে।” নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এটি লেখেন দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক।
নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো দেশে বিশ্বকাপ সফর থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়া ক্রিকেটে নতুন কিছু নয়। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ খেলতে আপত্তি জানায় অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০০৩ বিশ্বকাপের কেনিয়া ও জিম্বাবুয়েতে খেলতে যায়নি ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড।
এর আগে ২০১৩ সালের আইপিএলেও আপত্তির মুখে খেলতে দেওয়া হয়নি মুত্তিয়া মুরালিধরনকে। কিন্তু সবগুলোর পেছনে পর্যাপ্ত কারণ ছিল। যেমনটা পাকিস্তানিদের আইপিএলে বয়কটের পেছনে কারণ দেখানো হয় ২০০৮ মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলা।
কিন্তু মুস্তাফিজের বিষয়টা এখানেই ব্যতিক্রম বলে জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি।
“ওরা বলছে যে সরকারের নির্দেশে এটা করা হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো যথাযথ কারণ দর্শানো ছাড়াই মুস্তাফিজকে সরিয়ে দেয়াটা খুবই আনফরচুনেট।”
দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ক্রীড়াবিষয়ক পাক্ষিক ম্যাগাজিন ক্রীড়াজগতের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা দুলাল মাহমুদ অবশ্য মনে করেন বিয়ষটা পুরোপুরিই রাজনৈতিক।
“একজন ক্রিকেটার খেলবে অথবা খেলবে না, খুবই মামুলি একটা বিষয়। কিন্তু সেটা এই পর্যায়ে যাওয়ার পেছনে অবশ্যই অন্য কারণ আছে।”
দুলাল মাহমুদ বলেন, “অন্য সময় হলে হয়ত এত আলোচনাও হতো না, কারণ তিনি হয়ত সব ম্যাচ খেলতেনও না, কিন্তু এখানে মুস্তাফিজকে টার্গেট করা হয়েছে। কারণ যারা তাকে দলে নিয়েছে তারা কিন্তু বাদ দেয়নি, বাইরে থেকে প্রভাব খাটিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে।”
ইস্যু যখন ‘নিরাপত্তা’
শুরুতে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টানার কারণ, এই দুই দেশ যে প্রায় এক যুগ হল আর নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট খেলে না তার পেছনে স্পষ্টত রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চললেও, আপাতত বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার পেছনে নিরাপত্তার কথাটাই বলা হচ্ছে।
“আমরা নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চের ঘটনা দেখেছি। তাই ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা আমাদের সবার আগে,” বলেন আজাদ মজুমদার।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও জানিয়েছে, তারা বিশ্বাস করে এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশি খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, বোর্ডের সদস্য, দর্শক ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদেরও নিরাপদ ও যথাযথ পরিবেশের জন্য দরকারি।
বাংলাদেশে ৫ই অগাস্টের ঘটনাপ্রবাহের জেরে এরই মধ্যে ঢাকায় একাধিক সফর বাতিল করেছে ভারতের ক্রিকেট দল। এখন বাংলাদেশও বলছে তারা বিশ্বকাপের মতো আয়োজনে যোগ দিতেও ভারতে যেতে চায় না।
এখন পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক কিংবা দ্বিপাক্ষিক টুর্নামেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্যও আইসিসিকে হাইব্রিড মডেল বা নিরপেক্ষ ভেন্যুর খোঁজ করতে হয় কি না সেটা নিয়ে তৈরি হয়েছে জোর শঙ্কা।



ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না বাংলাদেশ
