মাঠের ক্রিকেট যখন ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ড: ঐতিহাসিক ভাঙনের মুখে বিশ্ব ক্রিকেট?

একটি অনিশ্চিত গন্তব্য নিয়ে ক্রিকেট এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সমাধান খুব একটা সহজ নয়।

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম

ক্রিকেট কি এখনও কেবল ‘ভদ্রলোকের খেলা’? নাকি এটি এখন বিশ্ব রাজনীতির এমন এক জটিল দাবার বোর্ড, যেখানে চাল চালছে বড় বড় কর্পোরেট হাউজ আর প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো?

সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ত্রিমুখী অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব ক্রিকেটে এক অভূতপূর্ব ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাঠের লড়াইকে ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে দুটি শব্দ, বাণিজ্যিক স্বার্থ আর রাজনৈতিক বাস্তবতা। 

মোস্তাফিজে সূচনা, অতঃপর অনড় বাংলাদেশের

সংকটের সূত্রপাত হয় যখন বিসিসিআই'র নির্দেশে আইপিএল'র ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স  হুট করে মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেয়। এই ঘটনা বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও এই পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেন।

এরপরই বিসিবি আইসিসি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয় যে, ভারতের মাটিতে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে ম্যাচ খেলতে চায় না, বরং নিরাপত্তার স্বার্থে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

আইসিসির কঠোরতায় বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ড

বিসিবি'র এই নিরাপত্তা শঙ্কা ও শ্রীলঙ্কায় খেলার অনুরোধকে পাত্তা না দিয়ে আইসিসি এক বিস্ময়কর ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় আইসিসি বাংলাদেশকে মূল টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ দিয়ে দেয়।

পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে মূল পর্বে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত সূচি ঘোষণা করে।

এই সিদ্ধান্তকে বিশ্ব ক্রিকেটের অনেক বিশ্লেষক ‘বিসিসিআই'র বাণিজ্যিক প্রভাব’ হিসেবে দেখছেন, যেখানে একটি দেশের দীর্ঘদিনের ক্রিকেটীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয়েছে।

পাকিস্তানের চরম পদক্ষেপ

বাংলাদেশের এই ঘটনার সময় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আইসিসি-কে চিঠি লিখে বাংলাদেশের অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন জানায়।

ভারত ও পাকিস্তানের ম্যাচগুলো আগে থেকেই নিরপেক্ষ ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় হওয়ার কথা ছিল।

তবে পরিস্থিতির চূড়ান্ত মোড় ঘোরে গত রবিবার। পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভী আইসিসি-কে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন, পাকিস্তান আর কোনো একপাক্ষিক আপস করবে না। তারা টুর্নামেন্টে থাকলেও ভারতের বিপক্ষে সব ম্যাচ বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছে।

নাকভীর এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব ক্রিকেটের বাণিজ্যিক কাঠামোর মূলে বড় আঘাত হেনেছে, কারণ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ছাড়া টুর্নামেন্টের সম্প্রচার স্বত্ব এবং মুনাফা অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে।

‘বাণিজ্যিক প্যারাডক্স’

বিশ্ব ক্রিকেটের এই মেরুকরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চলছে তীব্র সমালোচনা। আইসিসি'র সাবেক সভাপতি এহসান মানি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘প্রশাসনিক দেউলিয়াপনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষ্যে, "আইসিসি এখন আর ক্রিকেটের অভিভাবক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বোর্ডের বাণিজ্যিক এজেন্টে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো পূর্ণ সদস্যদের অধিকার এভাবে খর্ব করা ক্রিকেটের বৈশ্বিক কাঠামোর জন্য আত্মঘাতী।"

সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে লিখেছেন, "আমরা কি আসলেই ক্রিকেটকে গ্লোবাল করতে চাই? যদি নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে কোনো দেশ খেলতে না চায়, তবে তাদের বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। এটি মূলত অন্যদের ভয় দেখানোর একটি কৌশল মাত্র।"

আইসিসি'র সাবেক মিডিয়া হেড সামি উল হাসান এই সংকটকে এক ‘বাণিজ্যিক প্যারাডক্স’ হিসেবে দেখছেন।

আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আইসিসি এখন "খাদের কিনারায়।" বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তারা সদস্য দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে বারবার উপেক্ষা করছে।

অন্যদিকে, ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক হার্শা ভোগলে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ক্রিকেটে এই বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে খেলার জনপ্রিয়তায় ধস নামাতে পারে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম টেলিগ্রাফের ক্রিকেট এডিটর নিক হাউল্টের মতে ক্রিকেট এখন এমন এক মেরুকরণের শিকার হয়েছে যেখানে লবিং মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। "আইসিসি যদি এখনই নিরপেক্ষ অবস্থান না নেয়, তবে টেস্ট ক্রিকেটের পর ওয়ানডে ফরম্যাটও বিলুপ্তির পথে হাঁটা শুরু করবে।"

একটি অনিশ্চিত গন্তব্য নিয়ে ক্রিকেট এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সমাধান খুব একটা সহজ নয়।

বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ডকে নেওয়ার মতো আইসিসি’র একগুঁয়েমি সিদ্ধান্ত এবং এর প্রতিবাদে পিসিবি’র সর্বশেষ বয়কটের ঘোষণা, সবকিছুর চাপে পিষ্ট হচ্ছে ক্রিকেটের ‘স্পোর্টিং স্পিরিট’।

যদি বাণিজ্যিক স্বার্থ রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে বারবার হার মেনে নেয়, তবে টুর্নামেন্টগুলোর জৌলুস যেমন কমবে, তেমনি সাধারণ দর্শকদের মনে এই খেলার প্রতি আবেদনও ফিকে হয়ে আসবে। ক্রিকেট যখন ভূরাজনীতির দাবার বোর্ড, সেই বোর্ডে কি কিস্তিমাত হবে?