“আপনারা জেনে খুশি হবেন যে আমাদের বোর্ডে এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যদি সাকিবের ফিটনেস, অ্যাভেলেবিলিটি এবং এক্সেসিবিলিটি…. থাকে, অবশ্যই বোর্ড বা সিলেকশন প্যানেল তাকে সিলেকশনের জন্য বিবেচনা করবে।”
“বাংলাদেশ যখন ভারতে বিশ্বকাপ খেলছে না, তখন হঠাৎ সাকিব আল হাসান উদয় হল কীভাবে? এটা কি বিশ্বকাপের ঘটনা আড়াল করার জন্য?”
উপরের প্রথম বিবৃতিটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনের। আর পরেরটা তার পরপরই করা প্রশ্নটা একজন সাংবাদিকের। যেই প্রশ্নটা পুরো ক্রিকেট মহলেই ঘুরপাক খাচ্ছে এখন।
বাংলাদেশের শেষ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়াটা কি বিসিবির কূটনৈতিক ব্যর্থতা? আর সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই কি সাকিব আল হাসানকে ঢাল করার চেষ্টা বিসিবির? অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে ধোঁকা দেয়ার ডিসট্রেকশন বা নজর অন্যদিকে সরানোর মত কোন কৌশল কি ব্যবহার করলো বিসিবি?
সাকিব যখন না থেকেও আছেন!
একবার এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আল হাসান মজা করেই বলেছিলেন, “যেভাবেই হোক আমাকে ক্রিকেটে রাখেন, নইলে আপনাদের লাইফ বোরিং হয়ে যাবে।” কথাটা তখন গণমাধ্যমকে উদ্দেশ্য করে বললেও এটা যেন এখন এসে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।
নইলে বাংলাদেশের যেদিন ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না থাকার খবরটা আনুষ্ঠানিক হল, সেদিনই কেন দীর্ঘ আট ঘন্টার বোর্ডসভা শেষে বিসিবির সংবাদ সম্মেলনে আলোচিত হয়ে উঠলেন সাকিব আল হাসান?
অর্থাৎ আমজাদ হোসেন যে বলেছেন “আপনারা জেনে খুশি হবেন…” কিন্তু আসলে খুশির চেয়ে এখানে সন্দেহ, আর অবিশ্বাসই বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ তার এই কথার পরপরই একরকম হট্টগোলই শুরু হয়ে যায় মিরপুরে বিসিবির হোম অফ ক্রিকেটের প্রেস কনফারেন্স রুমে।
একের পর এক প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসতে সংবাদ সম্মেলনের হেড টেবিলে বসা বিসিবির তিন পরিচালক, আমজাদ হোসেন, আসিফ আকবর ও আবদুর রাজ্জাকের দিকে।
আর একেবারে উপরে দ্বিতীয় প্যারায় থাকা প্রশ্নটা দিয়ে এসব প্রশ্নবাণের শুরুটা করেন সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক সেকান্দার আলি।
“এটা যদি তারা আরও কিছুদিন আগেও বলতেন, বা আগের মিটিংয়েও বলতেন তাহলেও এত কথা হত না। দেড় বছর যেটার কোন উদ্যোগ নাই, সেই প্লেয়ারকে নিয়ে হঠাৎ তাদের এত আলোচনা কেন, এর মানে হচ্ছে পুরোটাই পরিকল্পিত। তার মানে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই তারা এই বিষয়টা সামনে এনেছে এবং সাকিবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে,” বলেন দৈনিক সমকালের এই বিশেষ প্রতিনিধি।
‘টাইমিং’ নিয়ে যত প্রশ্ন
ক্রিকেট ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় টাইমিংটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বল ঠিকঠাক ব্যাটে লাগার উপর নির্ভর করে সেটা সীমানা ছাড়া হবে কি-না। অর্থাৎ কোন বলটা কোন সময় ব্যাটসম্যান কীভাবে খেলবে তার উপর অনেক সময় নির্ভর করে ম্যাচের ভাগ্য।
সাকিব আল হাসান সবশেষ জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, তাও দেশের মাটিতে নয়, ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টে। তারও প্রায় মাস চারেক আগে দেশের মাটিতে সবশেষ বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়ান টি-টোয়েন্টিতে জিম্বাবুয়ের সাথে।
এরপর থেকে দেশের বাইরে রয়েছেন এই ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়, নানা অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়, এমনকি গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়।
তাই ২০২৪ সালের শেষদিকে তাকে একবার দেশের মাটিতে ক্রিকেট খেলানোর জন্য ফেরানোর চেষ্টা ভেস্তে যায়। সেবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলতে ঢাকায় আসার পথে দুবাই থেকেই ফেরত যেতে হয় তাকে।
তারপর থেকে সাকিববিহীন বাংলাদেশ ক্রিকেট চলমান। সাকিবও টুকটাক বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলে বেড়াচ্ছেন।
এখন আবার এমন সময় সাকিব আল হাসানকে জাতীয় দলে ফেরানোর কথা বললো বিসিবি, যখন নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া হচ্ছে না। এমনকি শনিবার মিরপুরে যখন বিসিবির পরিচালকরা নানান ইস্যুতে দীর্ঘ বৈঠক করছে, তারই মধ্যে আসে আইসিসির প্রেস বিজ্ঞপ্তি। যাতে জানানো হয় বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ডকে নিয়ে হবে এবারের বিশ্বকাপ।
আর এর কিছুক্ষণ পরই উত্তপ্ত সংবাদ সম্মেলনে এসে বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাকিবকে জাতীয় দলে ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তাকে বাংলাদেশের হোম অ্যান্ড এওয়ে সকল সিরিজের জন্য বিবেচনা করা হবে। এমনকি তার দেশে এসে খেলার জন্য সরকারের সাথে কথা বলবেন বিসিবি সভাপতি।
আর বিসিবির এই বক্তব্যেই প্রবল আপত্তি সাংবাদিক সেকান্দার আলীর। এই টাইমিংটাকে তিনি মনে করছেন বিসিবির ‘কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নের’ অংশ।
“এরকম সেনসিটিভ ক্ষেত্রে যখন আপনি জানেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাকে নিষিদ্ধ করার কথাও হয়েছে, ক্রিকেট বোর্ডও এতদিন চুপ করে ছিল, হঠাৎ কী হল, আমিনুল ইসলাম বুলবুল কোন আলাদিনের চেরাগ পেলেন যে জাদুমন্ত্র দিয়ে সব ভুলিয়ে দেবেন, সেটা কিন্তু সম্ভব না। যে মিটিংয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে সেই মিটিংয়ে তারা এরকম সিদ্ধান্ত কীভাবে নেন?”
বিসিবির ব্যাখ্যা কতোটা যুক্তিযুক্ত?
অবধারিতভাবেই দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক বিসিবি সাকিব প্রসঙ্গে ওঠা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের ব্যাখ্যা হঠাৎ করেই সাকিব প্রসঙ্গ আসেনি বা কোন ডিসট্রেকশনের জন্যও তাকে ফেরানোর কথা বলেনি বিসিবি।
“বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা ডাইভার্ট করার জন্য নয়”, আমজাদ হোসেন বলেন, “এটা বেশ কয়েকদিন ধরেই আলোচনায় ছিল, মিটিংয়ে সেন্ট্রাল কন্ট্রাক্টের বিষয় যখন ওঠে তখনই সাকিবের কথা বলা হয়।”
আরেকটু পরিষ্কার করে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেন আরেক পরিচালক আসিফ আকবর। “মিটিংয়ে জাতীয় দলের ২৭ ক্রিকেটারকে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপরই সেখানে এক পরিচালক সাকিব আল হাসানের দলে ফেরার বিষয়টি উত্থাপন করেন। আর সেখানেই বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় সাকিবকে ফেরানোর।”
তিনি আরও জানান ব্যক্তিগতভাবে সাকিবের সাথে তার যোগাযোগ হয়েছে এবং তার ইচ্ছের প্রতি সম্মান জানিয়েই তাকে জাতীয় দলে ফেরাতে সবরকম সহায়তা করতে সম্মত হয়েছে বোর্ড।
“সাকিবের সাথে টানা যোগাযোগে ছিলাম, সাকিবের ইচ্ছে ছিল খেলে রিটায়ার করবে। আমরা জানি সাকিব একটা ব্র্যান্ড, তার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে আমরা কথা বলেছি,” বলেন আসিফ আকবর।
প্রশ্নটাও উঠছে এখানেই, এতদিন নয় কেন? এখনই কেন?
“বিসিবির উদ্দেশ্য যদি সৎ থাকতো তাহলে তারা প্রথম যে কাজটা করতো তা হল সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েশন, এরপর সরকার যদি সবুজ সংকেত দিত, তাহলে সরকারের মুখ দিয়েই সে কথাটা বের করে আনতে পারতেন,” সেকান্দার আলীর পাল্টা যুক্তি।
এটার জবাবে আসিফ আকবর বলেন, “সাকিব খেলবে এটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড, কীভাবে খেলবে সে বিষয়টা সরকারের সাথে আলোচনা করবেন বিসিবি সভাপতি।”
কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, সাকিবের ফিটনেস বা পারফরম্যান্স কোনটিই এখনও জাতীয় দলে ফেরার মতো প্রমাণিত নয়। তিনি দেশের ক্রিকেটে নেই প্রায় দেড় বছরের মতো।
এই সময়ে বিভিন্ন ইন্টারভিউয়ে অবশ্য সাকিব বলেছেন তিনি দেশের মাটিতে একটা পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে অবসরে যেতে চান। তবে তার সঙ্গে এ বিষয়ে বিসিবির বর্তমান সভাপতির কোন যোগাযোগ হয়নি বলেও সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেন সাকিব।
বরং পুরনো অভিজ্ঞতা মনে করে তার ইচ্ছেপূরণ নিয়ে সংশয়ই জানান তিনি। “২০২৪ সালে দুবাই পর্যন্ত এসেছিলাম, যারা বলেছিল আসতে তারাই জানায় যে দে আর ফেসিং সাম ইস্যুস না আসলে ভালো হয়। না পৌছানো পর্যন্ত অবশ্য আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না,” সপ্তাহ দুয়েক আগে বিডিক্রিকটাইমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন সাকিব।
তাইতো সেকান্দার আলী নিশ্চিত যে নিজেদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতেই সাকিব আল হাসান আসলে বিসিবির একটা ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার হয়েছেন।
“তাদের উচিত ছিল যে বিশ্বকাপ নিয়ে যে দাবি সেটা আদায়ে লবিং করা, অন্যান্য দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ করা, কিন্তু সেখানে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। আর যখন দেখলেন বিশ্বকাপ হচ্ছে না তখন সাকিব প্রসঙ্গ সামনে আনলেন।”
সাকিবের ফেরার আইনি প্রক্রিয়া কী হতে পারে?
সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে হত্যা মামলাসহ বেশকিছু মামলা আছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলমান, চেক জালিয়াতির এক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। এই অবস্থায় সাকিব আল হাসান যদি দেশে ফিরতে চানও সেটার আইনি প্রক্রিয়া কী হবে?
“সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে যে চার্জ আছে, সেটাতে অ্যারেস্ট হতে হবে,” বলেছেন আইনজীবী মিতি সানজানা। তবে কিছু শর্ত পূরণ করলে জামিন পেতে পারেন, জানিয়ে তিনি বলেন,“তাকে আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিন চাইতে হবে, যদি সেটা মঞ্জুর হয় তাহলে তিনি জামিনে মুক্ত হতে পারেন।”
মিতি সানজানা যোগ করেন, আইন অনুযায়ী সাকিব এখন পলাতক, আর জামিন পাওয়ার শর্ত হল তিনি নিয়মিত সশরীরে উপস্থিত হবেন।
তবে এছাড়া সাকিব আল হাসানের পাসপোর্ট জব্দ করা হতে পারে ও তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও দিতে পারে আদালত। কিন্তু এসবই বিচার বিভাগের বিষয় বলে জানান এই আইনজীবী।
তিনি মনে করেন এখানে বিসিবি সরকারের সাথে নেগোশিয়েনের যে কথা বলছে সেটার কোন সুযোগ নেই। এটার সুরাহা আসলে আইনগতভাবেই হওয়া উচিত।
“তারা জানে যে সাকিবের যে বিষয়টা রয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মুহূর্তে তাকে ফেরানোর উদ্যেগ সরকার নেবে না। তার মানে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই তারপরও এই বিষয়টা তারা সামনে এনেছে এবং সাকিবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে,” সাংবাদিক সেকান্দার আলী যোগ করেন এসব কর্মকান্ড একেবারেই অক্রিকেটীয়,“ আমার মনে হয় কেউ কেউ বিসিবিতে এজেন্ডা নিয়ে আসছে, আর এটা সেগুলোরই বাস্তবায়নের চেষ্টা।”
বিসিবি’র ‘আর্ট অফ ডিস্ট্রাকশন’
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় বিভিন্ন সময় কোন দেশ তাদের জাতীয় সমস্যা থেকে নজর ঘুরাতে অথবা কোন বিষয়ে নাগরিকদের এক করতে যুদ্ধ ঘোষণা করে থাকে। এই পদ্ধতি নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময় নানা কারণেই বেশ টালমাটাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার বর্তমান সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ জনপ্রিয় মনে হলেও বিসিবিকেও অঙ্ক কষতে হচ্ছে ভবিষ্যতের।
তার উপর বিপিএলে এক বিসিবি পরিচালকের বিরুদ্ধেই ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ওঠা ও তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি, আরেক পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে এর আগে বেফাঁস মন্তব্যের জন্য কারণ দর্শানো নোটিশ ও পরিচালক ইশতিয়াক সাদেকের পদত্যাগ বেশ চাপেই রেখেছে বোর্ডকে।
ঘরোয়া খেলা চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এত কিছুর মধ্যে সাকিব আল হাসান ‘ডিসট্রেকশন’ হিসেবে বেশ নিরাপদ অস্ত্রই বলা চলে।
“দেখেন আমরা এখন সব বাদ দিয়ে সাকিবকে নিয়ে কথা বলছি। আপনি কথা বলছেন। আর বিসিবিও এটাই চেয়েছিল,” ক্রিকেট সাংবাদিক সেকান্দার আলীর এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার লোক খুব বেশি আছে কি?



